140921

মালয়েশিয়ার মসজিদ; যে দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে দেয়

বশির ইবনে জাফর
মালয়েশিয়া থেকে

মালয়েশিয়া একটি মুসলিম দেশ। কিন্তু পথেঘাটে মানুষের পোশাক, আচার-আচরণ বা চলাফেরা দেখে এটাকে ইউরোপের কোন দেশ বললেও ভুল হবে না। উন্নত ও সমৃদ্ধশালী দেশ হওয়ায় পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে নানান কালচারের মানুষ এসে এতোটাই বিস্তৃত হয়েছে যে মুসলিম দেশ হিসেবে ধার্মিক মানুষের দেখা পাওয়া এক বিরল ঘটনা।

কিন্তু চমকে যাবার মতো ব্যপারটি তখনই দেখবেন যখন কোন মসজিদে ঢুকবেন নামাজের জন্য। নামাজের সময় হলে ছোট-বড় সব ধরণের মসজিদই মুসল্লিতে পরিপূর্ণ। আর নামাজের স্থিরতা ও ধীরতা দেখে মনে হবে আল্লাহর অগণিত ফেরেশতা বুঝি ভীড় করেছে মসজিদে।

প্রতিটি মসজিদেই ইমাম সাহেবের তিলাওয়াত শুনে মনে হবে স্বর্গীয় কোন সুর হৃদয়ে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে আসমান থেকে। প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর সম্মিলিত যিকির ও তাসবিহাতের আমল দেখে আভিভুত হয়ে ভাবনার জগতে চৌদ্দশ’ বছর পূর্বের কোন পরিবেশ যেন স্বীয় চোখে দেখতে পাবেন।

ফজর ও মাগরিবের পর আয়াতুল কুরসি ছাড়াও সুরা হাসরের শেষ তিন আয়াত, সুবহান আল্লাহ, আলহামদু লিল্লাহ ও আল্লাহু আকবারসহ আরো অনেক যিকির ও তাসবিহাতের আমল চলে দীর্ঘ এক সময় পর্যন্ত।

সবচেয়ে ভালো লাগার যে বিষয়টি তা হচ্ছে মসজিদে মসজিদে শিশুদের অবাধ বিচরণ। বাবা তার কোলের শিশুটিকে মসজিদে নিয়ে আসছে প্রায় প্রতি ওয়াক্তেই। অবুঝ সেই শিশু হয়ত জানে না তার বাবা তাকে কোন জান্নাতের পথে পথ চলতে অভ্যস্ত করছেন। কিন্তু মসজিদ ও নামাজের সাথে তার হৃদ্যতা ঠিকই গড়ে উঠছে দিনে দিনে।

কখনো কখনো দেখা যায় বাবা তার শিশুটিকে নিয়ে কাতারের এক প্রান্তে নামাজে দাঁড়িয়েছেন আর সে কাতারে কাতারে ঘুরে বেড়াচ্ছে আপন মনে, নির্ভিকচিত্তে। যেন সবাই তার কতো চেনা। আর মুসল্লিরাও নামাজের বিঘ্ন ঘটে এমন মনে করে বিরক্তির লেশমাত্রও প্রকাশ করছেন না কখনো।

কিছু কিছু মসজিদে কাতারের শেষ দিকে তাদের খেলার জন্য উন্মুক্তও করে দেয়া হয়েছে। সেখানে সবাই মিলে খেলা করছে হৈ-হুল্লোরও করছে। কিন্তু কোন মুসল্লিরই যেন সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। যেন এটাই তাদের ভালোলাগা ও ভালোবাসা।

আজ মাগরিবের নামাজ পড়ছিলাম মালয়েশিয়ার অন্যতম সেরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটির কাছে ছোট্ট একটি মসজিদে। মসজিদটির পাশেই মহিলাদেরও নামাজ ঘর। জামায়াত সবেমাত্র শুরু হলো আর তখনই পাশের দরজা থেকে বেরিয়ে এলো ছোট্ট একটি মেয়ে। হয়ত তার আম্মুর সাথে নামাজে এসেছে।

যেহেতু জামায়াত শুরু হলে তাকে আর ধরে রাখা সম্ভব নয় এই সুযোগে সে এখানে চলে এসেছে। কিছুক্ষণ আপন মনে কাতারে কাতারে ঘুরে বেড়িয়েছে। শেষ রাকাতে সালাম ফেরানোর পরে দেখি শিশুটি ইমাম সাহেবের সামনে মাইক্রোফোনের তার নিয়ে খেলা করছে। নামাজ শেষেও তাকে কেউ কোথাও সরিয়ে নিতে আসেনি আর কোথাও চলে যেতেও বলেনি।

ঠিক এই ঘটনাটি আমাদের দেশে হলে হয়ত এতক্ষনে তার বাবা-মাকেই মসজিদ থেকে বের হয়ে যেতে হতো তীব্র সমালোচনার মুখে। দশের দশ রকমের কথা শুনতে হতো। আর শিশুটি তো মসজিদ মানেই ধমক খাওয়ার জায়গা ভেবে আর মসজিদমুখী হবার সাহস করতো না। এখানেই আমাদের দেশের মসজিদগুলোর পার্থক্য। কেন মসজিদগুলো মুসল্লিশূন্য তার জবাবও এই একটি ঘটনাতেই চলে আসে।

নামাজী হবার সাথে সাথে আমাদের বিনয়ী হওয়া প্রয়োজন। অন্তত শিশুদের জন্য হলেও। রাসূল স. যখন নামাজ পড়তেন তখনও কি তার ছোট্ট নাতিরা কাঁধে চড়ে বসেননি? তবে আমরা কেন মসজিদে শিশুদের প্রতি এতো রূঢ় হই। কেন সহজ মনে মেনে নেই না মসজিদ হোক শিশুদের অবাধ বিচরণস্থল।

আরআর

ad

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *