২০১৯-০১-১৬

শনিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

আসুন তাবলিগের জন্য দুফোঁটা অশ্রু ঝরাই

OURISLAM24.COM
news-image

জহির উদ্দিন বাবর
সাংবাদিক, কলামিস্ট

তাবলিগ জামাত নিয়ে দ্বন্দ্বের কথা এখন আর কারও অজানা নয়। এই জামাতের সঙ্গে জড়িত এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা এটা নিয়ে বছরদুয়েক ধরেই আছেন চরম অস্বস্তিতে।

গত ১ ডিসেম্বর টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা মাঠে ঘটে যাওয়া ন্যাক্কারজনক ঘটনা সবাইকে লজ্জায় বিবর্ণ করেছে। এর ফলে বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংকট। তবে আশার কথা হলো, এখনও আশার প্রদীপ নিভে যায়নি।

বিবদমান দুই পক্ষের শীর্ষ ব্যক্তিরা এখনও একসঙ্গে বসছেন। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বিষয়টি সুরাহা করে তাবলিগে সেই ছন্দ ফিরিয়ে আনতে। যদিও কায়েমি স্বার্থবাদীদের কারণে সেই প্রচেষ্টা কতটুকু সফল হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

সরকারের মধ্যস্থতায় একটি প্রতিনিধি দল ভারতে যাওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। শিগগির তারা দেওবন্দে যাচ্ছেন এবং বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মাওলানা সাদ সাহেব সম্পর্কে সেখানকার সর্বশেষ অবস্থান জেনে এসে ইজতেমা আয়োজনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। আমাদের আশা ও বিশ্বাস, এই উদ্যোগ ফলপ্রসূ হবে এবং একটু দেরিতে হলেও ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে।

তাবলিগে চলমান সংকট নিয়ে সম্প্রতি উদ্যোগী হয়েছেন পাকিস্তানের শীর্ষ আলেমরাও। সেখানকার শীর্ষ ২৬ জন আলেম একসঙ্গে বসে তাবলিগের চলমান সংকট যেকোনো মূল্যে সমাধানের ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছেন।

তারা তাবলিগের প্রধান মারকাজ দিল্লির নিজামুদ্দিন, পাকিস্তানের রায়বেন্ড এবং বাংলাদেশের কাকরাইল মারকাজের মুরব্বিদের প্রতি একটি দরদমাখা চিঠি পাঠিয়েছেন। যারা এই ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছেন তাদের মধ্যে মুফতি রফি উসমানি, মুফতি তাকি উসমানি, মাওলানা জাহেদুর রাশেদির মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃত আলেমরা রয়েছেন।

পাকিস্তানি আলেমদের চিঠির ভাষা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। তারা বিবদমান দুই পক্ষের মুরব্বিদের কাছেই বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বিনীত আবেদন জানিয়েছেন। যেকোনো মূল্যে তাবলিগের চলমান দ্বন্দ্ব ও সংঘাত নিরসনে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

‘এক ও নেক’ হওয়ার মানসিকতা নিয়ে সবাই একত্রে বসলে সংকটের সমাধান হয়ে যাবে বলে তাদের বিশ্বাস। তবে তারা এটাও বলেছেন, কোনোভাবেই যদি সমাধান না আসে উভয় দল নিজেদের মতো করে দীনের কাজ করে যাবে। একে অন্যের রাস্তায় বিরোধ সৃষ্টি করবে না।

পাকিস্তানের শীর্ষ আলেমরা উভয় পক্ষের মুরব্বিদের প্রতি আবেদন জানিয়ে বলেছেন, তারা যেন তাদের অনুসারীদের খুব গুরুত্বের সঙ্গে এ কথা বলে দেয় যে, তারা অন্য দলের সম্পর্কে দোয়া ছাড়া আর কোনো মন্তব্য না করে। বিশেষ করে ঝগড়া সৃষ্টি করে এমন কোনো কথা বা আলোচনা যেন তারা না করে।

দেরিতে হলেও পাকিস্তানি আলেমদের এই উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। যদিও তারা আরও আগেই এই ধরনের উদ্যোগ নেয়ার দরকার ছিল। বাংলাদেশের আলেমরা বছরদুয়েক ধরেই তাবলিগ নিয়ে ভাবছেন এবং বিভিন্ন উদ্যোগও নিয়েছেন। পাকিস্তানি আলেমদের এমন কোনো উদ্যোগের কথা আগে শোনা যায়নি।

মূলত তাবলিগ জামাতের কাজ বিশ্বব্যাপী ছড়ানো হলেও উপমহাদেশেই এর কেন্দ্রবিন্দু। নিজামুদ্দিন, কাকরাইল ও রায়বেন্ড-তিনটি মারকাজের গুরুত্বই তাবলিগ জামাতের সংশ্লিষ্টদের কাছে অনেক বেশি। এই সংকটকালে তিন দেশের আলেমদেরই জোরালো ভূমিকা থাকা চাই।

বিশেষ করে এক্ষেত্রে দারুল উলুম দেওবন্দের সুস্পষ্ট ও জোরালো ভূমিকা সবাই প্রত্যাশা করে। তাবলিগ জামাত দেওবন্দেরই ফসল। বৈপ্লবিক ও ফলপ্রসূ এই কাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেওবন্দেরও ক্ষতি।

মাওলানা সাদ সাহেবকে কেন্দ্র করে যে বিতর্কের সূচনা তা নিরসনে ভারতের শীর্ষ আলেমরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। সাদ সাহেবের শিক্ষকতুল্য অসংখ্য মুরব্বি এখনও আছেন। তারা উম্মাহর বৃহত্তম স্বার্থে সাদ সাহেবসহ অন্যদের নিয়ে বসলে একটা সমাধান আসবে সেটাই সবাই বিশ্বাস করে।

তাবলিগ জামাত নিয়ে সৃষ্ট সংকট চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে। মতপার্থক্য ও মতবিরোধ থেকে এখন তা চরম শত্রুতার পর্যায়ে চলে গেছে। দাওয়াতি কাজ বাদ দিয়ে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ঘায়েল করতেই এখন পুরোদমে ব্যস্ত।

রক্তারক্তি, খুনোখুনির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি। এভাবে চলতে থাকলে সামনে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য এখনই তা থামাতে হবে।

সংকট নিরসনের অনেক চেষ্টা হয়েছে এবং এখনও চলছে। শেষ পর্যন্ত কতটুকু সফল হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে আমরা আশাবাদী, সব সংকট কেটে গিয়ে তাবলিগে আগের সেই ছন্দ ফিরবে। ইলহামি এই কাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হোক সেটা কারও কাম্য নয়।

তাই আসুন, আর কিছু না পারি অন্তত দুফোঁটা অশ্রু ঝরিয়ে তাবলিগের জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করি। বিশ^ব্যাপী বিস্তৃত এই কাজে আবার পুরোনো সেই ছন্দ ফিরে আসুক মাওলার দরবারে সেই মিনতি জানাই। কারণ যখন সব অস্ত্রের কার্যকারিতা হারায় তখন মুমিনের কাছে দোয়া ছাড়া তো আর কোনো অস্ত্র থাকে না!

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম