২০১৮-১১-২০

সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮

আধুনিক সমাজ আমাদের জটিল দরসি ভাষা বুঝতে অক্ষম

OURISLAM24.COM
news-image

মাওলানা শহীদুল ইসলাম ফারুকী
অতিথি লেখক

ইসলামের দৃষ্টিতে ইলম (জ্ঞান) একটি একক বস্তু। কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী হযরত আদম আ.কে ভূ-পৃষ্ঠের খেলাফত প্রদান করা হয়েছিল সৃষ্টি সম্পর্কীয় জ্ঞানের কারণেই। সুতরাং দীনি ও জাগতিক দু’ধরনের জ্ঞান জীবন নামক গাড়ির দু’টি চাকার ন্যায়। যে কোনো একটি চাকা বিকল হয়ে গেলে গাড়িটি আর সামনে অগ্রসর হতে পারে না।

তদ্রুপ মানুষ যদি দীনি জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয়ে যায় তাহলে মানুষ ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতে বিরাট ক্ষতির সম্মুখিন হবে, আর যদি জাগতিক জ্ঞান থেকে দূরে সরে যায় তাহলে পৃথিবীর নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে।

নবুওতের যুগ থেকে নিয়ে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বে সার্বজনীন ইসলামি একক শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিলো। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যেমনিভাবে হাফেজ, আলেম, মুফতি, ইমাম ও খতীব বের হয়েছেন তেমনিভাবে ইতিহাসবিদ, ভূগোলবিদ, রসায়নবিদ, গণিতবিদ, রাষ্ট্র বিজ্ঞানী, শাসক ও সেনাবাহিনীও বের হয়েছেন।

অতএব মুসলিম উম্মাহকে তার হারানো মর্যাদা ফিরে পেতে হলে আবার তাকে সার্বজনীন ইসলামি একক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে ফিরে যেতে হবে।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমাদের প্রচলিত ইসলামি শিক্ষার সিলেবাস ও কালিকুলামে আধুনিক যুগ-চাহিদার প্রতি দৃষ্টি না দেয়ার কারণে উলামায়ে কেরাম ক্রমেই দেশ ও জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।

উলামায়ে কিরাম যাদের দায়িত্ব গোটা মানবতার সামনে ইসলামের সৌন্দর্যকে তুলে ধরা, তারা আজ ক্রমেই মসজিদ-মাদরাসার চৌহদ্দির মধ্যে সীমিত থেকে সীমিততর হয়ে যাচ্ছেন।

আমাদের নতুন প্রজন্ম বিশেষ করে আধুনিক শিক্ষিত সমাজ উলামাদের কঠিন ও জটিল দরসী ভাষা বুঝতে অক্ষম। আর এ জটিলতাই মাদরাসা ও ইসলামী প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অনেক উদ্দেশ্য পশ্চাতে ফেলে দিয়েছে। কারণ ইলম শেখার আসল উদ্দেশ্য মানবতার সামনে তাদের ভাষা ও বুঝ অনুযায়ী সমকালীন পদ্ধতিতে দীনকে পৌঁছানো।

আমাদের নতুন প্রজন্ম পশ্চিমা চিন্তা-দর্শন ও ধ্যান-ধারণার সামনে পরাজয় বরণ করেছে। এ জন্য আধুনিক চিন্তা-দর্শন ও ইসলামের আধুনিক দাওয়াতপদ্ধতিতে ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে না পারলে আমাদের প্রতিটি কদমই পরাজয়ের দিকে ধাবিত হবে।

শুধু দীনি ও ইংরেজি ভাষা শেখাই যথেষ্ট নয়, বরং বিশ্বের জাতিগোষ্ঠীর সাথে তাদের মেধা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী পারস্পরিক ডায়ালগ ও আলোচনার উপযুক্ত প্রতিনিধি হওয়ার জন্য সেসব জ্ঞান-বিজ্ঞানের ওপরও ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে হবে, যেগুলোর গভীর সম্পর্ক জাতিগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্ব ও অভিরুচির সাথে।

উলূম ও ফুনূনে ব্যুৎপত্তি অর্জন করা ছাড়া ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা সম্ভব নয়। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানকে পেছনে ঠেলে দিয়ে ইসলামের শিক্ষা ও দাওয়াত তুলে ধরার অর্থই দীন ও ইসলামকে লাঞ্ছিত করা।

হাজার বছর পূর্বে যখন প্রাচীন দর্শন তার থাবা গেড়ে বসেছিল, তখন তাতে ব্যুৎপত্তি অর্জন করাকে যুগের দাবী সাব্যস্ত করা হলো। উলামায়ে কিরাম ইসলামী জ্ঞানের পাশাপাশি গ্রীক দর্শনে ব্যুৎপত্তি অর্জন করাকেও জরুরী আখ্যা দিলেন।

সে যুগের উলামায়ে কিরাম গ্রীক দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে গ্রীকদের থেকেও বেশি ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এখন সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। যুগ বহুদূর অগ্রসর হয়ে গেছে।

বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উৎকর্ষ মানুষের চিন্তাশক্তিকেও নিতান্ত অসহায় করে দিয়েছে। পাশ্চাত্য এই বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সাহায্যে মুসলিম বিশ্বের ওপর রক্তাক্ত থাবা বিস্তার করেছে। কিন্তু আমাদের মাদরাসাগুলো এখনো হাজার বছর পূর্বের দর্শন থেকে বের হতে পারেনি।

মনে রাখতে হবে, বর্তমান যুগে ইসলামি রেনেসাঁ ও পুনর্জাগরণের জন্য তাফাক্কুহ ফিদ-দীন এর পাশাপাশি সমকালীন সকল মতবাদ ও চিন্তা-দর্শন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে হবে।

লেখক: মহাপরিচালক, শায়খ আবুল হাসান আলী নদভী ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বিরুলিয়া, ঢাকা