২০১৮-১১-০৬

মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮

‘জীবনে মাত্র তিনটি জিনিসের প্রয়োজন’

OURISLAM24.COM
news-image

আমিনুল ইসলাম হুসাইনী

দুই অক্ষরের ছোট্ট একটি শব্দ ‘বই’। যার দুই মলাটের ভেতর শুয়ে আছে পৃথিবী, পৃথিবীর মতো আরও অসংখ্য গ্রহ-নক্ষত্র। কালো অক্ষরের সেলাই করা জীবনের কথা, সফলতার কথা, ভালোলাগার কথা, ভালোবাসার কথা। জীবনঘনিষ্ঠ আরও কতো কথাই যে ফুল হয়ে ফুটে থাকে বইয়ের পাতায় পাতায়।

কি নেই বইয়ে? অজানাকে জানা, অচেনাকে চেনার সব উপায়ই তো বই পই পই করে বলে দেয়। বই কি প্রাণহীন? হ্যাঁ, আপাত দৃষ্টিতে বইকে জড়বস্তু মনে হতেই পারে। কিন্তু পাঠক যখন বইয়ের মুখোমুখি হয়, তখন বই হয়ে ওঠে জীবন্ত। বলে দেয় পৃথিবীর গত হওয়া কাহিনী। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সম্ভাবনার আগমী।

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ তার চিন্তা-চেতনা ও অভিজ্ঞতার বিবরণ লেখনীর মাধ্যমে অন্যের কাছে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করেছে। আর সেই চেষ্টা-প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় সফলতার জোয়ার এনে দেন জোহানেস গুটেনবার্গের অক্ষরযন্ত্র। যখন থেকে (১৪৪০-৫০) এ অক্ষরযন্ত্রের আবির্ভাব হয়েছে, তখন থেকেই শুরু হলো বইয়ের দুরন্ত পথচলা। অতীত-বর্তমান, দূর-দূরান্তের দেশ আর কালের গণ্ডির দুস্তর ব্যবধান দূর হয়ে গেল বইয়েরই সেতুবন্ধনে।

মানবজীবনে রয়েছে বইয়ের সীমাহীন প্রয়োজনীয়তা। কেন না বই হচ্ছে মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ মাধ্যম।মানুষের অবসরের সঙ্গী। অকৃত্রিম বন্ধু। যেমন তেমন বন্ধুই নয়, একশত মানুষ বন্ধুর চেয়ে একটি ভালো বই অনেক ভালো বন্ধু।

মানুষ বন্ধুর দ্বারা ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলেও বইয়ের দ্বারা সে সম্ভাবনা নেই। নেই প্রতারণার ছলচাতুরী। মনুষ্য বন্ধুত্ব ততক্ষণই অটুট থাকে, যতক্ষণ দু’জনের মাঝে বিনিময়ের আদান-প্রদান থাকে। কিন্তু বই তার সম্পূর্ণ বিপরীত। বই শুধু দিয়েই যায়, বিনিময় প্রত্যাশা করে না। তাই সেই বিখ্যাত আরবি প্রবাদটি বলাই যেতে পারে, ‘অখাইরো জালিদিন ফিজ জামানুল কিতাব।’ অর্থাৎ, সময়ের সর্বশেষ্ঠ বন্ধু হলো বই।

বই মানুষের ঘুমন্ত মনুষত্বকে জাগিয়ে তোলে। জাগিয়ে তোলে সুপ্তপ্রতিভা। নৈতিকতাকে করে উজ্জীবিত। বইয়ের অপর নাম আলোর ভুবন। তাই বই মানুষের মন-মননকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে পৌঁছে দেয় জীবনের কাঙ্ক্ষি মাঞ্জিলে। পৃথিবীর জগদ্বিখ্যাত বরেণ্য ব্যক্তিদের উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আলোকিত করতে যে মাধ্যমটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, সে মাধ্যমটির নামই হচ্ছে বই।

তাই তো রুশ ঔপন্যাসিক ও দার্শনিক তলস্তয় মানবজীবনে বইয়ের প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, ‘জীবনে মাত্র তিনটি জিনিসের প্রয়োজন। বই, বই এবং বই।’

মানবজীবনে বইপাঠের উপকারিতার শেষ নেই। বিজ্ঞান বলে, বেশি বেশি বই পড়লে মানসিক বিকারগ্রস্ততা দূর হয় এবং নৈতিক চেতনায় মানসিক প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকে। একটা সময় ছিল যখন লাইব্রেরিগুলোতে লেগে থাকত পাঠকের উপচেপড়া ভিড়। তখন বই ছিল মানুষের চিত্তবিনোদনের নির্মল উপাদান।

অথচ এখন অধিকাংশ লাইব্রেরিই পাঠকশূন্য। এর অন্যতম কারণ প্রযুক্তির প্রভাব। মানুষ এখন বইয়ের বদলে মোবাইল ধরেছে। ছোট্ট এই মোবাইলটি গেমস, ফেসবুক, ইউটিউবসহ নানা মাধ্যমে মানুষের মূল্যবান সময় খেয়ে নিচ্ছে। ফলে দিন দিন কমছে বইয়ের পাঠক। হাতেগোনা যে ক’জন বই পড়ে, তাদের অধিকাংশই ছাত্রছাত্রী।

পাঠ্যপুস্তক পড়াশোনার বাইরে অন্য কোনো বইয়ে হাতই দিতে চায় না। বাকি যারা আছে তাদের অধিকাংশ আবার নিম্নশ্রেণীর গল্প-উপন্যাসের পাঠক। অথচ এসব বটতলার কুরুচিপূর্ণ বইয়ে নিজেকে গড়ার মতো কিছুই নেই। বরং এসব অশ্লীলতার সহজলভ্যতায় নষ্ট হচ্ছে সভ্যতা।

সামাজিক মূল্যবোধ। অধিকতর এসব বইয়ের দ্বারা আলোর ভুবনের পরিবর্তে তরুণ প্রজন্ম হারিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসের অতল গহ্বরে।

বইয়ের পাঠকশূন্যতার পেছনে প্রযুক্তির আরেকটি বিষফোঁড়ার নাম ‘পিডিএফ’। এই পিডিএফের কারণেও বইয়ের বাজারে পাঠকের খড়া সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে লেখক-প্রকাশকগণ যেমন চরমভাবে আর্থিক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন, তেমনি আগ্রহ হারাচ্ছেন নতুনের সৃজনে। ফলে দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে বইয়ের সাম্রাজ্য। একটা কথা আমাদের ভালো করে মনে রাখতে হবে। মায়ের আদর যেমন বিমাতার কাছে আশা করা যায় না। তেমনি বইয়ের স্বাদও পিডিএফের কাছে পাওয়া যায় না।

তাই এসব সমস্যা নিরসনে আমাদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না বই মানুষের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে। করে ন্যায়-নিষ্ঠা ও নীতিবান। অতএব, এই ধসে পড়া সমাজ ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধির পর্বতারোহণ আর ম্রিয়মাণ তারুণ্যকে শান্তির সবুজ অরণ্যে পৌঁছাতে চাই ভালোর অধ্যয়ন।

পরিশেষে ওমর খৈয়ামের সেই চিরন্তন বাণীটিই স্মরণ করিয়ে দিতে চাই ‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বই একটি অনন্ত যৌবনা। যদি তা তেমন বই হয়।’

লেখক : প্রাবন্ধিক