২০১৮-১০-২০

মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮

ঘুমিয়ে আছেন আমারও অন্তরে, হে আহলুল্লাহ!

OURISLAM24.COM
news-image

যিয়াদ বিন সাঈদ >

উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে অগ্রযাত্রায় যখন বাঙলাদেশ ঠিক তখনি, সে মুহূর্তেই, ঢাকার শহরের চিরচেনা যানজটে বসে ধুকপুক করছে পিতা-পুত্রের দু দুটি ক্বলব। হাত কাঁপছে পুত্রের। তিরতির করছে ঠোঁট। কলজেটা হাতে নিয়ে ভাবছে সে পুত্র— এ জ্যাম এড়িয়ে কখনো কি তারা পৌঁছতে পারবে হাসপাতালের কাঙ্ক্ষিত বিছানায়?

পেছনে আধোঘুমে বসে থাকা পিতা, নীরব যন্ত্রণা সইতে সইতে একটা সময় অনিয়ন্ত্রিত যখন তিনি, তখনও তারা জ্যামে। শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। অন্ধকার হয়ে আসছে তার সামনে ব্যস্ত এ পৃথিবীর মহাকাশ।

বাস্তবতার তিক্তসত্যতা যখন কালো রঙের সে গাড়িটির ভেতর একটু একটু করে চেপে আসছে, তখনও জানে না পিতা-পুত্র, এই বুঝি তাদের স্কন্ধ চেপে ধরছে এক মহা সংবাদ।

ছোটবেলার চিরচেনা শ্বাসকষ্ট তখন পূর্ণ মাত্রায়। পিতার বুক সজোরে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছে বারেবার। এই একটু সময়ের জন্যে ডান দিকে ফিরলেন তিনি। কিন্তু তখনই শোনা গেলো ইল্লাল্লাহর ধ্বনি।

পিতা মুখ ফিরিয়ে শেষবারের মতো হয়তো দেখতে পারলেন না পুত্রের নির্বাক চাহনিটুকু। তিনি নিশ্চিত চলেই গেলেন। চলে গেলেন অন্তর্যামীর ডাক যেখান থেকে আসছে সেখানে। একান্ত সন্তর্পণে।

হ্যাঁ, বলছিলাম ওয়াসেল চাচ্চুর কথাই। যেন অবিশ্বাসের একদম চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমাকে বিশ্বাস করে নিতে হচ্ছে তার চলে যাওয়ার কথা। জোর করে মেনে নিতে হচ্ছে, তিনি আর আসবেন না।

কখনো অল্প আওয়াজে হাসি হাসি মুখে বলবেন না, যিয়াদ, বাসায় আসোনা কেন? কিন্তু কেন? কেন এমম নির্মমতা? উঁহু। এ প্রশ্নের অধিকার আমার নেই। আমাদের নেই। ওয়াল্লাহু য়্যুহয়ি ওয়া য়্যুমিতের ওপর যে বিশ্বাস করেছি, সেখানেই থাকতে হবে আমাদের। জান্নাতী ফুলকদম্বের পুষ্পবনে দেখা হবার প্রত্যাশা বুকে রেখে সয়ে যেতে হবে নীরবে। কিন্তু তবুও..

যখন দেখি ছোট্ট তাহিয়্যা, তুবা, নাবিল আর লাবীব ছলছল চোখে একমনে তাকিয়ে ভাবছে, এখন কাকে তারা আব্বু বলে ডাকবে; কার জন্যে প্রতিরাতে অপেক্ষা করবে তারা, তখনই কান্নারা দলা পাকিয়ে উঠে আসতে থাকে ক্রমশ।

অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ি। রোজ রাতে এসব ভাবতে ভাবতে পাশে শুয়ে থাকা লাবীবের মাথায় বিলি কেটে দিই। মনে হতে থাকে, এ মাথায় হাত রেখে জীবনের অপ্রতিরোধ্য সময়টুকু কে পার করে দিবে, কে?

সেদিন সকালেও আল কাউসারের মাকতাবায় ওয়াসেল চাচ্চুকে দেখে একটু চমকে উঠলাম। চেয়ারে বসে ঝিমুচ্ছেন। এতো ভোরে চলে এসেছেন তিনি! ছেলের সঙ্গে তার হৃদ্যতায় ভরে ওঠা মন কি তবে বেসামাল? নিশ্চিত। তিনি তার আহলকে ভালোবাসেন। আর তিনি তো আহলুল্লাহ।

সবকিছুর পর যেন আমি আর ভাবতে পারিনা, তিনি আজ নেই। এতো সুস্থ সবল মানুষটা কীভাবে চলে যায়! এতো উদ্যমতা, এতো হাস্যোজ্জ্বল মুখটুকু ধারণ করে তিনি কী করে হেঁটে চলেন না ফেরার দেশে?

বাড়ির পেছনটাতে একটু বাঁশবাগান পেরিয়ে মাদরাসায় দেয়াল ঘেঁষে যেখানটাতে শুয়ে আছেন ওয়াসেল চাচ্চু, সেখানে দাঁড়িয়েও আমার মনে হচ্ছিলো কোনো জীবন্ত অস্তিত্বের সামনে দাঁড়িয়ে পাঠ করছি সালাম। আবেগের তাড়নায় নয়, সত্যিই অকল্পনীয় মনে হচ্ছিলো সব। এই সেদিন নিজ হাতে যে গাছগুলো তিনি বুনে গেলেন এবং মাটিগুলো আওড়ে দিলেন, সে মাটিতেই কিনা তাকে ক’দিন পরেই চলে যেতে হলো চিরন্তন এক সময়ের জন্যে।

তিনি কি ভেবেছিলেন এসব? বলছিলেন পুত্রদের, ‘আগামী ছুটিতে এসে গাছগুলোকে ঠিকঠাক করবোনে, এবার চলো যাই’। কিন্তু তিনি কি জানতেন এ যাওয়াই তার সর্বশেষ যাওয়া?

আকাশ আর মাটি একসাথে মিশে যাওয়া এ পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে ছোট্ট ছোট্ট মুখগুলো এখন খুঁজতে থাকে তাদের আব্বুকে। আব্বু আসলে এ মাটিগুলো করবে তারা যতন। কেটে দিবে আগাছা৷ আব্বুকে ফিরে না পাওয়ার আর্তনাদ করতে করতেই তাদের মনে আসে, ‘আব্বু নেই’। চোখ থেকে দু’ফোটা অশ্রু বেয়ে পড়ে নীরবে। যত্ন করে তারা সরিয়ে দেয় আব্বুর কবরের ওপর জেগে ওঠা পরগাছাগুলো।

জীবনের যুদ্ধে নিজেকে অকাতরে সমর্পণ করে দেয়া এ মানুষটি যে একদম নিষ্পাপ হয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, তার ইয়াক্বিন আমার আছে। মাত্র দু বছর বয়সে মায়ের স্নেহ আর মমতা থেকে তাকে ছিটকে পড়তে হয়েছিলো। স্ট্রাগল আর সেক্রিফাইসে জর্জরিত হতে হয়েছিলো সেই ছোটোবেলাতেই। সুদূর ময়মনসিংহ থেকে কাঁধে পুটলি চেপে তাকে আসতেই হয়েছিলো নূরিয়ার সুপ্রসন্ন দরসগাহে।

ছুটতে হয়েছিলো লালবাগে মনোরম ইলমের বাগানে। নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবার যুদ্ধে একদম বিলীন করে দেবার বিনিময়ে তিনি পেয়েছিলেন এক মহৎ জীবন। উৎকৃষ্ট ও সর্বোচ্চ সুখের জীবন।

সাহিত্যের মাজালে যেমনি তিনি অপ্রতিরোধ্য ঠিক তেমনিই রাজনৈতিক অঙ্গনে। গদ্যে কী এক রিনিঝিনি অভিনব। ভেবে পুলকিত হই। আবার রাজনীতিতে কী সফল দৃষ্টান্তের স্রষ্টা, তাও ভেবে অবাক হই। মুফতি আমিনী রহমাতুল্লাহি আলাহির মতো মহান ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নিয়মিত চলযোগ। ওঠাবসা।

মিডিয়ায় ইসলামের প্রসারে অক্লান্ত পরিশ্রম। হেফাজতের আন্দোলনে নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা। এতো এতো গুণরাশির আদলে যার জীবনপ্রবাহ, তাকে ভুলে থাকা যায় কী করে!

ওয়াসেল চাচ্চুর সঙ্গে আমার আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক নেই নিশ্চিত, কিন্তু তবু যেন মনে হয় তার চেয়েও বেশী কিছু। ছোটবেলায় সালসাবিল অফিসে ‘মাসিক যমযম’র অফিসে আব্বুর সঙ্গে প্রায়ই যেতাম। তখন তো আব্বুদের চোখেমুখে বিপ্লবের পূর্ব প্রস্তুতি। আশা আকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত যৌবন।

লেখালেখির মাহাওলে কালিমার পতাকা উড্ডীন করবার প্রত্যাশা বুকে রেখে যে অগ্রযাত্রা আমি দেখেছিলাম, সেখানে ওয়াসেল চাচ্চু অবিস্মরণীয়। অবিসংবাদিত বিপ্লবের হাঁকডাক আসবে আসবে করছে। তারপরও কেমন করে যেন স্তিমিত হয়ে গেলো সব। কিন্তু আমার ভেতরে ওয়াসেল চাচ্চুর অদম্য তর্জনী ইশারা গেঁথে গেলো সুগভীর চৈতন্যে। আমি তার কাছাকাছি হতে চাইলাম। পেতে চাইলাম সাহচর্যের স্বাদ।

দুই হাজার চৌদ্দতে লাবীবের সঙ্গে পরিচয়। একইসঙ্গে দরসগাহে আর খাবারের দস্তরে। তারপর বন্ধুত্ব। বন্ধুত্বের একদম অতলে ঠেলে দিয়ে নিজেদেরকে নিয়ে এসেছি যখন আজকের দুই হাজার আঠারোয়, তখন আমরা একজন অন্যজনের চেহারায় দেখতে পাই নিজেকে। আয়নার মতো স্বচ্ছতা নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে।

ওয়াসেল চাচ্চু আর আমার মাঝে তারপর নির্মাণ হয় এক চিরন্তন প্রেমের ক্বানতারা। মনে হ’তে আব্বুর সঙ্গে ওয়াসেল চাচ্চুর অকৃত্রিম বন্ধুত্বের যে মহাসফলতা, তারই দিকে ছুটে যেতে যেতে একদিন আমরাও পৌঁছে যাব সুদূর মানযিলে মাকসুদে। প্রতিষ্ঠিত করবো তাদের স্বপ্নগুলো৷ বীজ বুনে করবো আরও বিস্তৃত। সবশেষে দুয়ার অনুযোগ।

আহলুল্লাহর ক্বদর যেন মহামহিম স্রষ্টার কাছে আহলুল্লাহর মতই হয়। আর তার রেখে যাওয়া আহল, তারাও যেন হয়ে ওঠে আহলুল্লাহ। সভ্য পৃথিবীর এ মাইদানে তাদের যেন না হয় কোনো বেক্বদর। হবেনা, এ বিশ্বাস আমার।

মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল বহুপ্রতিভার অধিকারী ছিলেন

-আরআর