২০১৮-১০-১৬

বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮

সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপমুক্ত কওমি স্বীকৃতি বিরল ঘটনা: মুফতি ওয়াক্কাস

OURISLAM24.COM
news-image

কওমি মাদরাসা সরকারি স্বীকৃতি অর্জনের পর একে কিভবে এগিয়ে নেয়া হবে তার আলোচনা এখন সর্বত্র। স্বীকৃতিকে কেন্দ্র করে মাদরাসাগুলো একিভূত হয়েছে একটি সূত্রে। জাতীয় অঙ্গনে স্বীকৃতি কেমন ফল দেবে তা নিয়ে পর্যালোচনা করছেন বোদ্ধাজনরা। এমন কিছু বিষয় নিয়ে আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের সহসভাপতি মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাসের সঙ্গে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইসমাঈল আযহার

আওয়ার ইসলাম: কওমি সনদের স্বীকৃতির পর এর কৃতিত্ব নিয়ে নানাজন নানা কথা বলছেন, আপনার বক্তব্য কী, কাদের দাবির পর স্বীকৃতির আলোচনা ব্যাপকতা পায়?

মুফতি ওয়াক্কাস: ২০০১ এর পর বেফাকের পক্ষ থেকে আমরা ওলামায়ে দেওবন্দ সবাই সম্মিলিতভাবে স্বীকৃতির দাবি উত্থাপন করি। যদিও এ দাবি আরো আগের থেকে তোলা হয়েছে বললে চলে। কিন্তু বর্তমান স্বীকৃতি আদায়ে আমরা সফল, তার শুরু ২০০১ সালে।

অন্যরা কেউ যদি দাবি করে থাকে, তাদের কারণে স্বীকৃতি হয়েছে বা এ দাবি সর্বপ্রথম তারা তুলেছে– এটা মিথ্যা। আমি শুনেছি বিভিন্নজন বলছে তারা প্রথম দাবি উত্থাপন করেছে, এরা সবাই মিথ্যাবাদী।

আওয়ার ইসলাম: স্বীকৃতির আন্দোলন সংগ্রামে কাদের ভূমিকা তাহলে সবচে বেশি?

মুফতি ওয়াক্কাস: এটা কোন আন্দোলন ছিল না। এটা ছিল বেফাকের পক্ষ থেকে একটা দাবি। মুক্তাঙ্গনে আল্লামা আজিজুল হক রহ. এর অবস্থান বেফাকের পরামর্শক্রমে ছিল না এবং এ অবস্থান বেফাকের সম্মিলিত কর্মসূচিও ছিল না। স্বীকৃতির দাবি আদায়ের লক্ষে ওটা ছিল ওনার দলের আলাদা একটা পদক্ষেপ।

এখানে নির্দিষ্ট করে কারো নাম বলা যায় না। সকলেই বড় বড় ব্যক্তি, আমি কাকে আগে দেব আর কাকে পরে দেব? স্বীকৃতির বিষয়ে বেফাকের সব কর্মকর্তাই সমানভাবে কাজ করেছেন।

তাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন, মাওলানা আতহার আলী রহ., আল্লামা হারুন ইসলামাবাদী রহ., আল্লামা নুরুদ্দিন গহরপুরী রহ., খতিব ওবায়দুল হক রহ., মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ., মুফতি আব্দুর রহমান রহ., মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ., মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করীম রহ., মাওলানা আব্দুল জব্বার জাহানাবাদী রহ., মাওলনা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহয়াহ রহ. প্রমুখ।

আর বর্তমার সময়ে এর নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং স্বীকৃতির আদায়ের লক্ষে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন আল্লামা শাহ আহমাদ শফী।

আওয়ার ইসলাম: আপনি তো একটা সময় সংসদ সদস্য ছিলেন। স্বীকৃতি বিল চূড়ান্ত হওয়া পর্যন্ত আপনার ভূমিকা কী ছিল?

মুফতি ওয়াক্কাস: আমার একক ব্যক্তিগত কোনো ভূমিকা ছিল না। স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে আল্লামা শাহ আহমাদ শফীর নেতৃত্বে।

আমি যখন এমপি ছিলাম তখনও আল্লামা শাহ আহমাদ শফী ও বেফাকের সঙ্গে ছিলাম, এখনো আছি। শুরু থেকে এর জন্য আমার বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়েছে, অনেকের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলতে হয়েছে। এক কথায় এ সংক্রান্ত সকল কাজের সঙ্গে আমি জড়িত ছিলাম।

আওয়ার ইসলাম: বর্তমান সরকারের আমলে আলেমদের দাবি মেনে স্বীকৃতির বিল পাস হয়েছে, বিষয়টিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ণ করবেন?

মুফতী ওয়াক্কাস: আমরা সরকারের কাছে মাস্টার্সের মান চেয়েছিলাম। সরকার আমাদের তা দিয়েছে, এবং আমরা যেভাবে চেয়েছি ঠিক সেভাবে দিয়েছে। এ জন্য সরকারকে অবশ্যই ধন্যবাদ জানাতে হয়।

আল্লামা শাহ আহমাদ শফীকেও ধন্যবাদ জানাতে হয়। তিনি স্বীকৃতির জন্য অনেক ত্যাগ করেছেন। অসুস্থতা নিয়েও বিভিন্ন সভায় এসেছেন, এটা অনেক বড় কিছু।

স্বীকৃতি নিয়ে ভেতরে ভেতরে অনেক কিছু হয়েছে কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর মুখে একটা কথাই ছিল, আল্লামা আহমাদ শফী যেভাবে বলবেন ঠিক সেভাবেই হবে, স্বীকৃতির ব্যাপারে কারো কথা চলবে না।

আমাদের দাবি ছিল, সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত এবং হস্তক্ষেপমুক্ত স্বীকৃতি। আমরা তা পেয়েছি। আমি মনে করি হাটহাজারী হুজুরের মাধ্যমে এবং তার কারণেই স্বীকৃতিটা আজ আমরা পেয়েছি।

সরকারকে ধন্যবাদ জানাই তিনি আমাদের অনেক বড় উপকার করেছেন। হাইয়াতুল উলইয়াকে আমি ইউনিভার্সিটি মনে করি। আর অন্য সব মাদরাসা এর অধীনে পরীক্ষা দেবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটা একটা জটিল বিষয়।

আওয়ার ইসলাম: এই স্বীকৃতি দেওবন্দের চিন্তা-দর্শনের সঙ্গে কতটা যৌক্তিক?

মুফতী ওয়াক্কাস: আমরা অতীতে চেয়েছিলাম না এবং এখনও চাইনি যে, স্বীকৃতিতে কোন ধরনের সরকারি হস্তক্ষেপ থাকুক। সরকারি হস্তক্ষেপমুক্ত এমন স্বীকৃতি একটি বিরল ঘটনা। আর এই স্বীকৃতি দেওবন্দের চিন্তা-চেতনার সঙ্গে একশভাগ যৌক্তিক।

আমি এর ভেতর অযৌক্তিক কিছু দেখি না। পাকিস্তান দারুল উলুম দেওবন্দের অনুসারী। তারা তো সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এবং তাদের চেয়ে আমরা আরো অ্যাডভান্স। কারণ বেফাকের সঙ্গে তাদের আলাদা করে ইউনিভার্সিটিতে যেয়ে সিল মারতে হয়।

আমাদের হাইয়াতুল উলিয়ার এক সিলেই সব। আলাদা করে আর কোনো সিল মারতে হবে না।

আওয়ার ইসলাম: দেওবন্দ যে ৮ মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল স্বীকৃতির সাথে তার কোনো বৈরিতা বা সামঞ্জস্যতা আছে কী?

মুফতী ওয়াক্কাস: আট মূলনীতির মধ্যে আছে সরকারি হস্তক্ষেপমুক্ত রাখতে হবে। তো আমরা সম্পূর্ণ মুক্ত রেখেছি। অতএব কোন বৈরিতা নেই বরং সামঞ্জস্যতা রয়েছে পুরোপুরি।

সমাজে আমাদের মনে করা হয় ফাইভ সিক্স পড়া মানুষ। আমাদের ব্যাপারে যাতে এসব চিন্তা-ভাবনা দূর হয় এবং সামাজিকভাবে যেন আমাদের মূল্যায়ণ করা হয়, সেই সাথে আমরা যেন ভালোভাবে দীনি খেদমত করতে পারি, স্বীকৃতির পেছনে সেইটা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল।

আলহামদুলিল্লাহ মানুষ এখন কওমি মাদরাসার দিকে অনেক ঝুঁকেছে। আগে আলিয়া মাদরাসা ছিল এখন আর সেটার প্রয়োজন নেই।

আওয়ার ইসলাম: শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশ ও আগামীতে এই স্বীকৃতি কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে?

মুফতী ওয়াক্কাস: এখন সারা বাংলাদেশে প্রতিযোগিতামূলক পড়ালেখা হচ্ছে। পরীক্ষার ক্ষেত্রেও হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং আমরা চাচ্ছি কওমি মাদরাসা নোটমুক্ত করতে।

নোটের কারণে তাদের অনেক ক্ষতি হয়। যোগ্যতারও অনেক ঘাটতি হয়। শিক্ষার্থীরা যেন মূল কিতাবের দিকে ধাবিত হয় সেই চেষ্টা করছি। সেভাবে আমরা অগ্রসর হচ্ছি। আমরা আশা করি এর দ্বারা কওমি মাদরাসার আলেমদের মনোবল বাড়বে। তাদের রেজাল্টও ভালো হবে আগের তুলনায় ইনশাল্লাহ।

আর আমাদের যে মাঠ, আমি মনে করি এর বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ইসলামি ইউনিভার্সিটিতে আরবি কী পড়ায়? তারা তো আমাদের চেয়ে বেশি পড়ায় না।

কাজেই আমি মনে করি আমাদের দেশের ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে অধ্যায়নের কোন প্রয়োজন নেই। আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। এরপরও যদি কেউ ডক্টরেট করতে চায় তাহলে বাইরের কোন দেশে যাবে এটা মনে হয় অসম্ভব না।

তবে এটা আমাদের মূখ্য উদ্দেশ্য না। আমরা তাফরিরে মাহের (যোগ্য) হতে পারি, হাদিসে মাহের হতে পারি, ফেকাহে মাহের হতে পারি।

আওয়ার ইসলাম: বহিঃবিশ্বে পড়াশোনার ক্ষেত্রে এই স্বীকৃতি কতটা ভূমিকা রাখতে পারে?

মুফতী ওয়াক্কাস: মূলত বহিঃবিশ্বে গিয়ে পড়ালেখা করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আমরা যে শিক্ষা দিই এরপর বাইরে গিয়ে পড়াশোনা কোনো দরকার নেই।

তারপরও উচ্চ শিক্ষার জন্য যদি শিক্ষার্থীরা বাইরে যেতে চাইলে পারবে, কারণ এখন আমাদের সরকারি স্বীকৃতি হয়েছে। আগে কেউ বাইরে গিয়ে পড়ালেখা করতে চাইলে সেই সুযোগ ছিল না।

আওয়ার ইসলাম: মাদরাসা-তরুণদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কওমি সনদের স্বীকৃতি কতটা ভূমিকা রাখতে পারে?

মুফতী ওয়াক্কাস: কর্মসংস্থানের কোনো প্রয়োজন মনে করি না। আমি তো এদেশের কোন যোগ্য আলেমকে বেকার ঘুরে বেড়াতে দেখি না। আলিয়া মাদরাসা, কলেজ অথবা ভার্সিটি পড়ুয়া হাজার হাজার ছেলে চাকরিশূন্যতায় ভুগছে, বেকার পড়ে আছে।

তাদের অনেকের যোগ্যতা আছে টাকা নেই –চাকরি হচ্ছে না। আবার অনেকের যোগ্যতা এবং অর্থ কোনোটাই নেই।

আর আমাদের মাদরাসার থেকে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা শেষ করে বেরোবার আগেই তাদের চাকরি বা খেদমতের ব্যবস্থা হয়ে যায়। আমার নিজস্ব আলিয়া মাদরাসা আছে। সেখান থেকে পড়াশোনা শেষ করেও অনেকে বেকার ঘুরে বেড়ায়, চাকরি পায় না।

দশ-বিশ লাখ টাকা ঘুষ ছাড়া তাদের চাকরি হয় না। আর সেই তুলনায় আমাদের কওমি শিক্ষার্থীরা বেকার নেই। তারপরও যেহেতু আমাদের স্বীকৃতি হয়েছে কর্মক্ষেত্র তো বাড়বেই।

আওয়ার ইসলাম: আমাদেরকে আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।

মুফতি ওয়াক্কাস: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

-আরআর