২০১৮-১০-১১

বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

লজিং যুগের নীরব অবসান

OURISLAM24.COM
news-image

বশির ইবনে জাফর
চিফ রিপোর্টার

শহর কিবা গ্রাম যেখানেই ছিলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেখানেই ছিলো লজিং বা জায়গির থাকার ব্যবস্থা। স্বচ্ছল ব্যক্তিরা তাদরে সন্তানদের পড়ানোর শর্তে নিকটস্থ প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের নিজ বাড়িতে থাকতে দিতেন এবং খাবার দাবারের সুব্যবস্থাও করতেন।

এটিই ছিলো লজিং বা জায়গির। লজিং থাকা শিক্ষার্থীরা বাড়ির ছাত্র পড়াতো বলে তাকে বলা হতো ‘লজিং মাস্টার’। মাদরাসা পড়ুয়া ছাত্র কিংবা শিক্ষকদের জন্য আবার অনেকেই বিনা শর্তে তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থা করতেন আন্তরিকতা ও নেকির উদ্দেশ্যে।

নিজেদের খাবারের একটি অংশ নবী সা. এর ওয়ারিসদের জন্য বিনা শর্তে দিয়ে দেয়া যেন তাদরে কাছে পরম সৌভাগ্যের।

শহর এলাকায় এই লজিং প্রথা পুরোপুরিভাবে বিলুপ্ত বলা গেলেও গ্রামাঞ্চলে এখনোও যেসব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে মাদরাসায় দূর দূরান্ত থেকে ছাত্ররা পড়তে আসে এলাকার মানুষ তাদের জন্য লজিং এর ব্যবস্থা করে থাকেন।

এখনোও মানুষ তাদরে নিজের বাড়িতে তার এলাকার ইমাম সাহেবের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে পেরে যেন পুলক অনুভব করেন ও আখেরাতে নাজাতের উসিলা পাবেন এমনটি ভাবেন এমন মানুষ নেহায়েত কম নয়।

মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জন্য মানতিক কতটা জরুরী?

লজিং থেকে পড়াশোনা করে বড় হয়েছে এমন মানুষদের তালিকায় যাত্রাবাড়ি মাদরাসার শায়খ মাহমুদুল হাসানের মতো বড় বড় ওলামায়ে কেরাম যেমন রয়েছেন তেমনি রয়েছেন রাজনীতিবিদসহ নানান পেশার প্রতিষ্ঠিত অনেক ব্যক্তিবর্গ। এ তালিকায় আছেন বর্তমান বাংলাদশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও।

আল্লামা মাহমুদুল হাসান ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদীর চরাঞ্চল থেকে এসে ময়মনসিংহের ত্রিশাল বালিপাড়া কাজিগ্রাম মাদরাসায় আসেন পড়াশোনার জন্য। থাকতেন লজিংয়ে।

তেমনি রাষ্ট্রপতি জনাব আবদুল হামিদ ভাটি অঞ্চল থেকে পড়াশোনার জন্য আসেন কিশোরগঞ্জ শহরে। থেকেছেন লজিং বাড়ি।

এভাবে বিংশ শতকের পূর্বকার প্রতিষ্ঠিত অনেক বড় বড় ব্যক্তির ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যাবে যাদের জীবন এই লজিংয়ের সাথে মিশে আছে।

কালের ধারায় সে লজিং প্রথা আজ বিলুপ্তপ্রায়। এলাকার ধনাট্য ব্যক্তিরা এখন আর তাদের সন্তানদের পড়ানোর দায়িত্ব দিতে বাড়িতে লজিং রাখেন না ছাত্রদের।

যুগ এখন কোচিং এর। প্রথমশ্রেণি থেকেই শিশুদের পাঠিয়ে দেয়া হয় নামিদামি নানা কোচিংয়ে। মাদরাসায়ও একটা সময় রান্নাবান্নার ব্যবস্থা না থাকলেও এখন উন্নত খাবার দাবারের ব্যবস্থাসহ রাখা হয়েছে আবাসন ব্যবস্থা। ফলে কোনো ছাত্ররও আর থাকা খাওয়ার জন্য লজিংয়ের দরকার পড়ছে না।

পুরানা পল্টন জামে মসজিদের সাবেক খতিব মাওলানা সৈয়দ শিবলি ফোরকানী র. প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান জামেউল ঊলুম হাক্কানিয়া মাদরাসা

জামালপুর জেলার অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ এ প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের লজিং থাকার হার গেল দশকেও ছিলো শতকরা ৫০-৬০ ভাগ।

আর বাকিরা হয়ত নিজ বাড়ি কিংবা যাদের লজিং না হতো মাদরাসার বোর্ডিংয়ের খাবার খেতো। এখনও সেখানে কিছু সংখ্যক ছাত্র লজিং থাকছে বলে জানা যায়।

সে এলাকায় এমন কিছু বাড়ি আছে যারা যুগ যুগ ধরে কোন না কোন ছাত্রকে লজিং রেখে আসছেন। ছাত্ররা তাদের বাড়িতে খাবার খেয়ে আলেম হয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে ফের নতুন কোন ছাত্রকে রাখছে লজিং।

এভাবেই ঐতিহ্য ও বরকতের ধারা ধরে রেখেছেন অনেকেই। এটি শুধুমাত্র জামালপুরই নয় বাংলাদেশের আরো কিছু অঞ্চলেও রয়েছে তবে দশ-বিশ বছর আগের তুলনায় কম।

জামালপুরের বিশিষ্ট আলেম মাওলানা জাফর আহমদ কাসেমী ছোট বেলায় ময়মনসিংহের খাগডহর মাদরাসায় লজিং থেকে পড়াশোনা করতেন।

আপনার মাদরাসা হিসাব রাখতে এসে গেল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার – বিস্তারিত জানুন

তিনি বলতেন, ‘দীর্ঘদিন একটি বাড়িতে থেকে খেয়ে দেয়ে পড়াশোনার পর উচ্চ শিক্ষার জন্য অন্যত্র চলে যাওয়াটা লজিং রাখা পরিবারের জন্যও হতো বেদনাময়। কেননা দীর্ঘ সময় থাকার ফলে তাদের সাথে যে হৃদ্যতা গড়ে উঠতো তা আপন পরিবারতুল্য।

লজিং মাস্টারের কাছে নিজ সন্তানের মতোই থাকতো ছাত্ররা। আর দূর থেকে আপনজন ছেড়ে আসা ছাত্ররা পেতো নতুর আরেকটি পরিবার। এভাবেই এক সুখময় স্মৃতির মধ্য দিয়ে সাজানো ছিলো লজিং যুগটি’’।

লজিং যুগের নীরব অবসানের ইতিহাস এখনো খুব বেশি পুরোনো না হলেও একটা দিন তা হয়ত সত্যিই আদিম যুগের কোনো কল্পকাহিনী মনে হবে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে যখন লজিং থেকে পড়াপশোনা করে বড় হওয়া মানুষগুলো চলে যাবেন এই পৃথিবী ছেড়ে।

রাজধানীর বেশ কয়েকজন মাদরাসা শিক্ষার্থী আওয়ার ইসলামকে বলেন, এক সময় আমরা লজিং ছিলাম। গ্রামে লজিং রাখাকে একটা ঐতিহ্য মনে করা হতো। কিন্তু এখন যুগ পাল্টেছে। মাদরাসায় মাদরাসায় চালু হয়েছে বোর্ডিং। সবাই এখন সেখানেই খায়।

লজিং ও বোর্ডিংয়ের পার্থক্য জানিয়ে তারা বলেন, লজিংয়ে খাবারের বৈচিত্র্য ছিলা। মনে হতো বাড়িতেই খাবার খাচ্ছি। কিন্তু বোডিংয়ে সে সাদ নেই। একই রূপ রস গন্ধের খাবার খেতে খেতে শিক্ষার্থীরা হাপিয়ে উঠে।

হোটেল থেকে তরকারি কেনা ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেকেই চিপস, চানাচুর দিয়েও ভাত খায়। সে সময় বড়ো মনে পড়ে যায় লজিংয়ের কথা।

-আরআর

[মালিবাগে চালু হয়েছে অত্যাধুনিক হিজামা সেন্টার। নবীজি সা. নির্দেশিত এ চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করে সুস্থ থাকুন। হার্টের রোগ, কিডনির, লিভারের ও স্ট্রোকসহ শরীরের বাত ব্যথার জন্য খুবই উপকারী হিজামা: যোগাযোগ ০১৮৫৮১৪১৮৪৬]