২০১৮-১০-১০

বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

‘শাপলার ঘটনার সঙ্গে কওমি স্বীকৃতির সম্পর্ক নেই; এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করুন’

OURISLAM24.COM
news-image

মাওলানা মুহাম্মাদ সালমান নদভী। বিদগ্ধ লেখক, শিক্ষাবিদ আলেম ও আধ্যাত্মিক পুরুষ। রাজধানী ঢাকার মাদরাসা দারুর রাশাদের প্রিন্সিপাল। যুগশ্রেষ্ঠ আলেমে দীন আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভীর খলিফা।

কওমি শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি বিষয়ে এক বিকেলে তার সাথে কথা বলেছেন আওয়ার ইসলামের প্রতিবেদক হাসান আল মাহমুদ। সঙ্গে ছিলেন দারুর রাশাদের শিক্ষক লেখক ইব্রাহীম জামিল

আওয়ার ইসলাম: জাতীয় সংসদে কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিস সনদের স্বীকৃতির বিল পাস হয়েছে, বিষয়টিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ণ করবেন?

মাওলানা মুহাম্মাদ সালমান: আমি তো মনে করি, এটা আমাদের কওমি মাদরাসার শিক্ষা ব্যবস্থার একটি স্বীকৃতি। যেটা ব্রিটিশ আমলে দারুল উলুম দেওবন্দ চালাচ্ছিল।

দারুল উলুম দেওবন্দ ব্রিটিশ আমলে সরকারি ব্যবস্থাপনায় যাওয়ার সম্ভব ছিল না, যেহেতু পরাধীন রাষ্ট্র ছিল। নিজেদের দ্বীন ঈমানের স্বকীয়তা বজায় রাখার জন্য আলাদা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল।

আমরা যেহেতু স্বাধীন বাংলাদেশে আছি, এ দেশে আমরা আলাদা কিছু হয়ে থাকব, আওয়াম-পাবলিক ও এ দেশের শিক্ষা-সমাজ থেকে আমরা সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে থাকব, আমাদের দেশের সমাজে, এ দেশের রাষ্ট্রে আমাদের কোনো দাম থাকবে না, এটা পরাধীন দেশে হতে পারে, স্বাধীন দেশে চিন্তা করা যায় না।

সে হিসাবে এ স্বীকৃতি আমি মনে করি, আমাদের কওমি অঙ্গনের একধাপ এগিয়ে যাওয়া।

আওয়ার ইসলাম: স্বীকৃতির এই ঘোষণা মাদারে দারুল উলুম দেওবন্দের চিন্তা দর্শনের সাথে কতটা যৌক্তিক?

মুহাম্মাদ সালমান: আমি মনে করি, অযৌক্তিক কোনো কিছু না। দেওবন্দের চিন্তা ছিল একটা দিফায়ি কোশেশ (প্রতিরোধমূলক চিন্তা), ইক্বদামি কোশেশ (আগ্রাসনমূলক চিন্তা) না, বেঁচে থাকার চিন্তা।

আর বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে যে কওমি মাদরাসা চলছে এবং অন্য যেসব দেশে যেসব কওমি মাদরাসা চলছে, আমি মনে করি তাদেরও উচিত এখন ইক্বদামি কোশেশ করা এবং এগিয়ে যাওয়ার।

ওই সময় ছিল বেঁচে থাকার, এখন বেঁচে থাকার না, অধিকার আদায় করা এবং স্বপ্নের লাইনে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের। সে হিসাবে এটা ঠিকই আছে।

আওয়ার ইসলাম: দেওবন্দের ৮ মূলনীতির সাথে স্বীকৃতির কি কোনো বৈরিতা বা সামঞ্জস্যতা রয়েছে?

মুহাম্মাদ সালমান: আমিতো মনে করছি, এটা নির্ভর করছে আমাদের উপরে, আমাদের কওমির অঙ্গনের উপরে। বৈরিতা তেমন একটা নাই।

যদিও একটু দেখা যায়ও, তবুও আমরা সামলে নিতে পারি। আমাদের অঙ্গনে এটা কোনো অসুবিধার মধ্যে নাই।

আওয়ার ইসলাম: কওমি শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশ ও ভবিষ্যত নির্মাণে এই স্বীকৃতি কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আপনি মনে করেন?

মুহাম্মাদ সালমান: আমিতো মনে করি, ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এজন্য যে, আমাদের তেমন একটা প্রতিযোগিতা হয় না। আমাদের অঙ্গন ছিল খুবই ছোট, এ স্বীকৃতির পরে আমাদের অঙ্গন একটু বড় হয়েছে বলে আমি মনে করি।

অন্যান্য সমাজে প্রবেশ করার জন্য আমাদের মেধাকে যদি এখন আমরা কাজে লাগাই। আসলে এটা স্বীকৃতির তো কোনো দোষ না, মেধা বানাব আমরাই। আমাদের প্রতিষ্ঠান এবং আমরা যারা এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করি, তারাই এ মেধাকে বানানোর কারিগর বলে মনে করি।

আমাদের আসাতিযায়ে কেরাম, কওমি মাদরাসার পরিচালনায় যারা আছেন, তাদের কাছে দেশ এবং সমাজের গুরুত্ব, দেশে এবং সমাজের কোন কোন পয়েন্টে আমরা আমাদের সন্তানদের থ্রো করবো, সে হিসাবে আমাদের আমাদের চিন্তা, আমাদের চেতনা এবং আমাদের ভাবনা যদি অনেক দূরদর্শি হয়, সমাজের সকল স্তরে যদি কওমি মাদরাসার অঙ্গন বিস্তৃত করতে হয়, তাহলে আমাদের মেধা বাড়াতে হবে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে অনেক পরিবর্তন আনতে হবে। দেশ এবং জাতির কর্মক্ষেত্রে আমরা যেন অপরিচিত না থাকি। আমরা তো আছি মুসাফির হিসাবে, আমরা মুকিম হতে পারি, এজন্য আমাদের সেভাবে চেষ্টা করতে হবে।

এটা শুধু স্বীকৃতির সাথে সম্পর্ক না, এটাতো সবসময়ই। আগে থেকেই। কওমি মাদরাসার ছাত্র অনেক আছে, কিন্তু মেধাবী ছাত্র যারা বিভিন্ন ফিল্ডে কাজ করতে পারবে, তাদের ক্ষেত্র তৈরি করার জন্য আমাদের কওমি অঙ্গনের যারা পরিচালনায় আছি, তাদেরকে বিষয়টি আরো অনেক ভাবতে হবে।

আওয়ার ইসলাম: কওমি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং বহিঃবিশ্বে পড়াশোনার ক্ষেত্রে কওমি সনদের স্বীকৃতি কতটা ভূমিকা রাখতে পারে?

মুহাম্মাদ সালমান: আমিতো মনে করি, এটা অনেক ভূমিকা রাখতে পারবে। আমাদের বিদেশ যাত্রায়, অন্যান্য দেশের সাথে, আরবের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির সাথে আমাদের এ সনদ না থাকার কারণে অসুবিধায় পড়তে হয়েছে।

আমরা লক্ষ করি, আমাদের ছেলেরা অন্যান্য জায়গা হয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছে, আলিয়া ও আহলে হাদিসদের মাধ্যমে আমাদের ছেলেরা বিদেশে যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের অঙ্গন থেকেই যাওয়ার বা আমাদের সাথে অন্য কোনো ইউনিভার্সিটি বা কোনো রাবেতা ইত্যাদির সাথে সম্পর্ক গড়ে সম্ভব হয়ে ওঠছে না।

এ সনদের কারণে আশা করা যায়, ছাত্রদের জন্য সহজ হবে বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নিতে যাওয়া এবং মেধা বিকাশে আরো গবেষণামূলক লেখা-পড়ার সুযোগ নেয়ার।

আওয়ার ইসলাম: স্বীকৃতি প্রদান করায় প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা দেয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কেউ কেউ এই সংবর্ধনাকে শাপলার রক্তের সাথে বেঈমানী হবে বলে মন্তব্য করছেন। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?

মুহাম্মাদ সালমান: শাপলা চত্বরের ঘটনাটা একটা ব্যতিক্রম ঘটে গেছে এ আর কি। ওটার সাথে এটার কী সম্পর্ক। আমি জানি, যেটা বিএনপির সরকার দিতে পারে নাই, আগের সরকার দিতে অনেক ঘাবড়াইছে।

আমিতো মনে করি, এটা প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতার অধিকার বলে হয়েছে। অন্যান্য যেসব মন্ত্রী আছে, তাদের চিন্তা-চেতনা হল, কওমি মাদরাসার কোনো স্বীকৃতি হতে পারে! কওমি মাদরাসা যে কোনো চিজ, কোনো বস্তু, তা কোনো সরকার এ পর্যন্ত বুঝতে পারছে! এগুলা কেউ চিন্তা করছে!

শাপলা চত্বরে যা হয়েছে সেটা ব্যতিক্রমধর্মী। মানুষ যেটা করে, সে অনুযায়ী এর শুকরিয়া আদায় করতে হয়।

হ্যাঁ, শুকরিয়া আদায়ের বিভিন্ন তরিকা আছে, পদ্ধতি আছে, যেটা স্বাভাবিকভাবে আসতো, তা এসেছে অস্বাভাবিকভাবে, এটার কদর করা দরকার মনে করি। শুকরিয়া আদায় করা দরকার যেভাবেই হোক।

আওয়ার ইসলাম: কিছু মাদারাসার বিতর্কিত অনুষ্ঠানের কারণে বলাবলি হচ্ছে স্বীকৃতির বিকৃতি হতে শুরু করেছে। আসলেই কি এই স্বীকৃতির মাধ্যমে কওমির বিকৃতি ঘটবে বলে মনে করেন?

মুহাম্মাদ সালমান: না, আমি মনে করি না। আমি মনে করি, এটা আমাদের নিজস্ব অব্যবস্থাপনার কারণে হতে পারে, আমাদের নিজস্ব ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে হতে পারে।

স্বীকৃতির কারণে হচ্ছে না। কারণটা তো আমাদের মধ্যেই আছে, আগে থেকেই চলে আসছে। আমাদের ভিতরে তো আমরা অনেক দিক থেকে পেছনে পড়ে আছি। আমাদের সমঝ-বুঝ, আমাদের চেতনা, উপলব্ধি আমরা আত্মসমালোচনা করি, নিজেদেরই ভাবা উচিত আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি কোথায় আছে।

আমরা এমনভাবে চলি তাহলে সরকার আমাদের থেকে কাজ নিতে পারবে, আমরা সরকারকে কাজ দিতে পারব, সমাজ-জাতিকে আমরা বিভিন্ন মোড়ে কাজ দিতে পারব

আওয়ার ইসলাম: আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকমকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক মুবারকবাদ।

মুহাম্মাদ সালমান: আপনাদেরও ধন্যবাদ পাঠকের কাছে আমাদের তুলে ধরার জন্য।

কওমি মাদরাসা সনদ আইনের গেজেট প্রকাশ

মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ আমল

-আরআর