২০১৮-০৯-১৪

সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮

জারীর আরমানের গল্প, সঙ্গিনী

OURISLAM24.COM
news-image
  • সঙ্গিনী

জারীর আরমান

বৃষ্টিস্নাত অন্ধকার

বৈশাখ মাসের চার তারিখের রাত। বাইরে বৃষ্টি হইতেছে প্রচণ্ড। পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু দূষিত হইলেও কাল বৈশাখীর রুপ বদলে নাই। আজ দিনেও বিরতিতে দুইবার হানা দিছে বৃষ্টি। যেনতেন বৃষ্টি না, চারপাশ অন্ধকার হয়া মুষলধারে বৃষ্টি। মাঝে একঘণ্টা মুচকি হাসির মতো রোদ। ফের অন্ধকার, বৃষ্টি, আবার রোদ। সন্ধ্যা থেকে মোটামুটি আকাশে তারা দেখা গেছে।

এখন ঘড়ির কাটা বারোটা ছাড়াইছে । খাটের মধ্যখানে আফনান আর ইরা পাশাপাশি কম্বল জড়ায়া বইসা আছে। ঠিক পাশাপাশি না, আফনানের কাঁধের উপর ইরার মাথা ঝুঁকে আছে আদুরে খরগোশের মতো। আফনানের হাতের মধ্যে ইরার হাত। ঘরের যেদিকটার দিকে তারা মুখ কইরা আছে, ওইদিকের দেয়ালে ঝুলতেছে নীল ডায়ালের ঘড়ি। ডায়ালের মধ্যখানে একটা কৃত্রিম প্রজাপতি নাড়াচাড়া করতেছে।

স্মৃতির আরশি

বিয়ের পর প্রথম ছুটি পাইছে আফনান। শীতের ছুটি। আগে থেকেই আফনানের চাওয়া ছিল, প্রত্যেক ছুটিতে বউকে নিয়া ঘুরতে যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। রাতেই দুইজনে ব্যাগপত্র গোছায়া রাখে।

পরদিন ঘরেই ফজর পইড়া নেয়…

গ্রাম থেকে একটু দূরে নন্দপুর স্টেশন…

পৃথিবীর আর দশটা বাহনের তুলনায় ট্রেন নিয়া রোমান্টিক গল্প বেশি। নায়ক যুদ্ধে যাইতেছে, নায়িকা স্টেশনে বিদায় জানাইতেছে এমন দৃশ্য কমন। তাই আমার গল্পের নায়ক-নায়িকাও ট্রেনেই যাবে।

আম্মার বানানো রুটি আর ডিম ভাজির বক্স নিয়া স্টেশনের উদ্দেশে বের হয়া যায় আফনান ইরা।
চার ঘন্টার ট্রেন জার্নি শেষে তারা নামে কমলাপুর। উদ্দেশ্য খিলগাঁও। আফনানের বন্ধুর বাসা। রাতেই তাদের সাথে যোগাযোগ করা ছিল। মুহূর্তেই উবার ডেকে বন্ধুর বাসার দিকে রওনা হয় দুইজন।

দুই

ছুটি কাটাইতে তারা আইছে ঢাকা। উঠছে বন্ধুর বাসায়। সারাদিন ঘোরাঘুরি, সন্ধারাতে বন্ধু ও বন্ধুপত্নীর সাথে আড্ডা। মূলত ঢাকা আসা হইছে উদ্দেশ্যহীনভাবে । হয়ত সমুদ্রে যাইতে পারত, কিংবা পাহাড়ে। তা না গিয়া যান্ত্রিক শহরে আসার কারণ নগরজীবনকে একটু কাছে থেকে দেখা। তাছাড়া দুজনের মধ্যেই যেহেতু যাযাবর টাইপ এক সত্তা বাস করে। তাই উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরিই তাদের উদ্দেশ্য। তবে শহরে দেখতে আসা গ্রামের মানুষদের মতো তারা চিড়িয়াখানায় যায় না। শিশুপার্ক, জাদুঘরে যায় না। উদ্দেশ্যহীন বের হয় বাসা থেকে।

একদিন গেলো আরমানিটোলা। দ্য চার্চ অব হোলি রেজারেকশন। ১৭৮১ সালে আর্মেনিয়দের প্রতিষ্ঠিত খৃষ্টান কবরস্থান। অন্যদিন সদরঘাট। জায়গাগুলা এমন, য্যান জীবনের দিকে তাকানো যায়। সিনেমায় ফ্লাশব্যাকে গেলে যেমন আবহসঙ্গীত বাজে, এসব জায়গায় গেলে সেই সঙ্গীতটা টের পায় দুইজনে।

তো ঢাকা বিলাসের তৃতীয় দিন। আফনান ও ইরা বাইতুল মোকাররম থেকে আসরের নামাজ পড়ে বের হইলো। ঢাকা আসা হইলে বাইতুল মোকাররম থেকে কেনাকাটা করা আফনানের ছাত্র সময়ের অভ্যাস। যথারীতি পশ্চিমের ফুটপাত দিয়া ফাউন্ডেশনের লাইব্রেরি হয়া ঘড়ি মার্কেটে গিয়া পৌছালো দুইজন। তাদের বেডরুমের জন্য একটা বড় এবং ভাল ঘড়ি কিনতে হইবো। দোকানের এক কোণায় ঝুলতেছিলো একটা নীল ডায়ালের ঘড়ি। আর ডায়ালের মধ্যখানে একটা কৃত্রিম প্রজাপতি নাড়াচাড়া করতেছিলো।

বৃষ্টি অবিরাম

বৃষ্টি তখনো থামে নাই, তবে কমছে কিছুটা । দুইজন আগের মতোই আছে। পাশাপাশি, কাছাকাছি। হাতে হাত, নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস। ফিসফিস স্বরে কথা বলতেছে।

সিথানের পাশে টেবিলে রাখা হলুদ ল্যাম্পের আলোয় ঘরময় কেমন স্নিগ্ধতা, কেমন শান্তি শান্তি ভাব। অন্য পাশের দেয়ালে টাঙানো সমুদ্রের ছবিটাতে হলুদ আলো পরে সমুদ্রের রঙটা বদলে গেছে। সাদা নীল সমুদ্র হয়া উঠছে ধূসর, ফ্যাকাসে। এর মধ্যে রাত গভীর থেকে গভীরতর হইছে। একটু আগেই মৃদু শব্দের ঘণ্টাধ্বনি জানান দিছে “রাত্রি এখন দুইটা”। আফনান কফি খাওয়ার প্রস্তাব দেয় । ইরার ছোট উত্তর “খাবো”। শুনে বিড়ালের মতো চুপিচুপি কিচেনে যায় আফনান। দশ মিনিট পর ধোঁয়া ওঠা একই রঙের দুইটা মগ নিয়া ফিরা আসে।

বিছানা ছাইড়া থাই জানালার পাশের সোফায় গিয়া বসে দুইজন। মগে ঠোঁট ছোঁয়াইতে ছোঁয়াইতে আফনানের কাছে জানতে চায় ইরা

-এই মগগুলো কে গিফট করছে মনে আছে তোমার?
– আছে , তোমার বান্ধবী হালিমা।
– কবে গিফট করছে তা মনে আছে?
– তাও মনে আছে, আমাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে।

ইরা হাসে। হাসির কারণ জানতে চায় আফনান। ইরা এবার রহস্য করে হাসে। যেন এর কারণ কাউকে বলা যাবে না।

কিন্তু একটু পরেই বলে, ‘হালিমাকে কলেজে থাকতে ননদিনী বলে ক্ষেপাতাম। তাই মনে করে হাসলাম’। আফনান শুনে বলে, ‘মেয়েদের তো সমস্যা নাই, কিন্তু কোনো ছেলেবন্ধু কি অন্য ছেলেবন্ধুকে শালা বা সম্বন্ধী বলতে পারে’? দুইজনেই হাসে।

গ্লাসের ওপাশে কিছু দেখা যায় না অন্ধকার ছাড়া । কফি খাওয়া শেষ হইল। ঘুমোবে কিনা সেইটা ভাবতেছিল। শেষরাতের নামাজের(তাহাজ্জুদ) সময় প্রায় হয়া গেছে। একদম নামাজ পড়েই ঘুমানোর কথা বলে ইরা। ঝটপট জায়নামাজে দাঁড়ায় দুইজন। একটু নিচু কিন্তু সাবলীল কণ্ঠে তেলাওয়াত করতে থাকে আফনান।

“ফা’তারাফু বিজামবিহিম ফাসুহ কা’ল্লালি আসহাবিস সা’য়ির…।”

তার ডানপাশে একটু পিছিয়ে দাঁড়ায় ইরা। যখন ঘরের মধ্যে একজোড়া প্রাণ স্রষ্টার প্রেমে বুঁদ হয়ে আছে । তখন জানালার ওপাশে বৃষ্টি থেমে গেছে।

যাত্রাবাড়ী,ঢাকা