২০১৮-০৯-০৩

মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

একজন আত্মবিশ্বাসী বালকের গল্প

OURISLAM24.COM
news-image

আশিকুর রহমান
কাতার থেকে

অামার পাশের ফ্লাটে ১৭ বছর বয়সী একজন বাঙালী এসেছে। প্রথমে দেখে মনে হচ্ছিলো- শ্রীলংকান হবে। হ্যংলা-পাতলা, কালো কুচকুচে গায়ের রঙ। প্রচন্ড গরমে একটা অাইসক্রীম হাতে করে গেইটে হেলান দিয়ে কিছু একটা ভাবছে। অাইসক্রীম গলে গলে পড়ছে, সেদিকে খেয়াল নেই।

অামি কিছুক্ষণ লক্ষ্য করে ভেজা কাপড়গুলো নিয়ে ব্যলকনিতে এলাম। অামাকে দেখে ছেলেটা চলে যেতে চাচ্ছিলো। ডাকলাম। মুখ মুছে দাঁড়ালো। হিন্দি জানে না। ইশারায় বললো- ‘হাতটা ধুয়ে অাসি।’

কাপড় নাড়া শেষ। শ্রীলংকান কিনা, জিগেস করতেই বললো- বাঙালী। ভালো করে দেখে অনুমান করলাম- বয়স ১৭/১৮ হবে, এর বেশী হবার কথা না। তাই বয়সের কথা জানতে চাইলে, বললো- ২১ বছর। বললাম- সেটা হয়তো তোমার পাসপোর্টে হবে। তারপর মাথা নীচু করে বললো- ‘সতেরো বছর চলতেসে।’

নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা। হাতে নবম-দশম শ্রেণীর মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম পত্র বই। জিগেস করলাম- কী পড়ছো? বললো- রবীন্দ্রনাথের ‘সুভা’ পড়ছি। মূল নাম- সুভাষিণী।

ছেলেটির কথাবার্তা শুনে গ্রামের মনে হলো না। পরিবারের কথা জানতে চাইলে বললো- যখন ক্লাশ এইটে থাকি, তখন অাব্বা অসুস্থ হয়ে যান। পড়াশোনার পাশাপাশি দু’টো টিউশনি শুরু করি। যেহেতু বড়ো কোনো ভাই নেই, তাই দায়িত্বটা অামার। কিন্তু এতে সংসার চলে না।

একটা ছোটবোন অাছে ক্লাশ ফোরে পড়ে। একটা বড়ো বোন রয়েছে বিয়ের উপযুক্ত। তার উপর অাব্বার চিকিৎসার খরচ। চাল-ডাল থেকে শুরু করে মশলাপাতি, এসব তো টিউশনের টাকায় কোনোভাবেই চলে না।

পরিচিত একজন মামার স্টুডিওর দোকান অাছে কাতারে। উনার দোকানে অামাকে নেবে বলে অাম্মাকে বললো। অামার উপার্জনে কোনোরকম বড়ো বোনের বিয়েটা হয়ে গেলে, বাকীটা চালিয়ে নিতে পারবো। অার যদি বাবা সু্স্থ হয়ে যান, তবে ছুটকির পড়াশোনো বন্ধ হতে হবে না বা অল্পবয়সে কোথাও বিয়ে দেবো না।’

কথাগুলো বলতে বলতে প্রায় হাঁপিয়ে উঠলো ছেলেটা। ফের বললাম- অন্তত এসএসসি কমপ্লিট করতে পারতে। একটা সার্টিফিকেট থাকতো। ভবিষ্যতে কাজে লাগতো।

বললো- অামার দায়িত্বটা এখন বড়ো। পড়াশোনা ইচ্ছে করলে করতে পারতাম, কিন্তু বই হাতে নিয়ে যখন অসুস্থ বাবার দিকে তাকাই, ছুটকির বায়না পূরণ করতে পারি না, মায়ের গ্যাস্ট্রিকের ঔষধটা অানতে গিয়ে বড়ো বোনের অাইল্যান্স পরার স্বপ্নটার কথা মনে পড়ে- তখন বইটাকে একটা কাগজের বান্ডিল মনে হয় শুধু।

অামার ইচ্ছে করে মায়ের এক ভুরি স্বর্ণের চেইনটা জুয়েলার্সের দোকান থেকে ফিরিয়ে অানি, যা অামি দেশের বাইরে অাসবো বলে- মা সেটা বন্ধক রেখে টাকা এনেছেন।

অামার ইচ্ছে করে বড়ো বোনকে বনেদী ঘরে বিয়ে দিই। সাথে একটা ড্রেসিংটেবিল দিই। কারণ অাপু সাজতে খুব পছন্দ করে। ছুটকির খুব ইচ্ছে- একটা সোনার চেইন থাকবে, সেই ইচ্ছেটাও পূরণ করি।’

অামি ফের জিগেস করলাম- তোমার কোনো ইচ্ছে নেই, স্বপ্ন নেই? সে বললো- অামার স্বপ্ন এখন পরিবারের সবার স্বপ্নের সাথে মিশে গেছে। অামি শুধু তাদেরকে হাসিখুশি দেখতে চাই। বাবার দেনাপাওনা পরিশোধ করে, মায়ের সোনার চেইনটা অামি অাবার মায়ের গলায় ফিরিয়ে দিতে চাই।’

ছেলেটার প্রত্যেকটা কথায় অাত্মবিশ্বাসের নিপুণ ছাপ। অামি অাপ্লুত। বললাম- চা খাবে? মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। বাসা থেকে বের হয়েই একটা রেস্টুরেন্টে চা খেলাম। ছেলেটা ঘরের দিকে গেলো। ভাবছি- পারিবারিক দায়িত্বে মানুষ কতো সহজে মহৎ চিন্তাবিদ হয়ে যায়!

মাত্র সতেরো বছর বয়সে সংসারের গুরুভার নিতে ছেলেটি ঘর ছেড়ে একটি স্বজনবিচ্ছেদ পরিবেশে চলে এসেছে। যেখানে নেই মায়ের অাদুরে ডাক, বাবার মিঠাই শাসন, বড়ো বোনের হাসি, ছোট বোনের লজেন্সের বায়না।

অামাদের দেশে এমন সৎ নিষ্ঠাবান ছেলে এখনো অাছে। যারা কিশোর বয়সে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সুন্দর স্বপ্নগুলো নিজের চোখে না দেখে, পরিবারের চোখে দেখে। সংসারের হাল ধরতে এক অতি সাধারণ ছেলেটাও বাবার অসুস্থতায় বা অনুপস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় চলে অাসে।

ছেলেটার কথায়, চিন্তাভাবনায় কোথায় যেনো নিজেকে খুঁজে পেলাম। নামাজশেষে ওর পরিবার-পরিজনের জন্যে দোয়া করলাম। নিজের জন্যেও দোয়া করলাম।

(লেখকের নিজস্ব ফেসবুক টাইমলাইন থেকে সংগৃহীত)

ক্লিক বিসফটি

মুফতি তাকি উসমানি রচিত সমস্ত হাদীসগ্রন্থের নতুন ভার্সন

আরএম/