২০১৮-০৮-১৬

রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮

ভারত থেকে পাকিস্তান যাওয়ার পথে কয়েক টুকরো স্মৃতি

OURISLAM24.COM
news-image

[জামিয়া দারুল উলুম করাচির মুখপাত্র ‘ماہنامہ البلاغ মাহনামা আল-বালাগ’ এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত বিশ্বনন্দিত আলেম, স্কলার আল্লামা তাকি উসমানির আত্মজীবনী আওয়ার ইসলামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হচ্ছে আলহামদুলিল্লাহ।

এ বিষয়ে আল্লামা তাকি উসমানি আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ার ইসলামকে ভাষান্তর করে প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন। গত ২ জানুয়ারি জামিয়া দারুল উলুম করাচির তাখাসসুস ফিল ইফতার শিক্ষার্থী, আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকমের শুভাকাঙ্ক্ষি উমর ফারুক ইবরাহীমীর মাধ্যমে আল্লামা তাকি উসমানি ও পত্রিকা কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মজীবনী ‘ইয়াদে’ অনুবাদের অনুমতি চাওয়া হলে তারা খুশি মনে রাজি হন এবং আওয়ার ইসলামকে ধন্যবাদ জানান বাংলাভাষায় ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য।

আল্লামা তাকি উসমানির নতুন ধারাবাহিক আত্মজীবনী “یادیں ইয়াদেঁ ” মাহনামা আল-বালাগে সফর ১৪৩৯ হিজরি, নভেম্বর ২০১৭ ইংরেজি মাস থেকে। আওয়ার ইসলামে লেখাটি সপ্তাহে দুদিন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হচ্ছে। আজ প্রকাশ হলো ২১ তম কিস্তি। অনুবাদ করেছেন মাওলানা  উমর ফারুক ইবরাহীমী।]

পাঁচবছরের একটি ছোট্ট শিশুর স্বদেশ ত্যাগ করা, নবরাষ্ট্র গঠন হওয়া এবং আজীবনের জন্য সেখানে হিজরতের অন্তর্নিহিত বিষয় আশয়ের কী ধারণাইবা থাকতে পারে! স্বভাবত আমি এসবের ঝঞ্ঝাট থেকে মুক্তস্বাধীন ছিলাম।

শুধু এতটুকুই জানতাম, বাবা-মা, ভাই-বোনদের সাথে রেলের লম্বা সফর করতে হবে। সুতরাং আমি ঝক-ঝকাঝক রেলের জানালা আঁকড়ে ধরে রাখতাম আর প্রতিটি নতুন স্টেশনের হৃদয়কাড়া দৃশ্য দেখে শিহরিত হতাম।

আমার এটাও জানা ছিলো না, কোন স্টেশন ছেড়ে যাবার কালে রেলের ইঞ্জিন তিনবার বাঁশি বাজায় এবং তৃতীয়বারের পর রেল চলতে শুরু করে। আমার বড় দুইভাই যখন বাঁশির আওয়াজ শুনতো অথবা গার্ডের সবুজ ঝাণ্ডা দেখতো তখন আমাকে বলতো- ‘রেল চালিয়ে দেবো?’

আমি মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিলে তারা রেলের গায়ে সজোরে হাত বুলিয়ে ধাক্কা দিতো।অমনি রেল চলতে শুরু করতো।

তাদের এই কীর্তিকলাপ দেখে আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যেতাম যে, তারা এই ডাব্বায় বসে পুরো রেলটাকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে!

সে সফরের এই কথাও আমার মনে আছে, আমি জানালার পাশে বসে রুটি খাচ্ছিলাম আর একের পর এক স্টেশন দেখে পুলকিত হচ্ছিলাম। আকস্মিক একটি চিল এসে আমার হাত থেকে রুটি ছোঁ মেরে নিয়ে গেলো!

ইতোমধ্যে আমরা দিল্লি থেকে রাজস্থানের শহর যোধপুর পৌঁছে গেলাম এবং সেখানে একরাত অবস্থান করেছিলাম। রাজস্থানের শুধু এতটুকু স্মৃতি আমার মনে আছে, যে ঘরে আমরা অবস্থান করেছিলাম সেটি রেললাইন সংলগ্ন ছিলো এবং ঘরের পাশ দিয়ে একটি দুর্গন্ধযুক্ত ময়লার ডিপো যাচ্ছিলো।

ডিপোটি হয়তো বেশিরভাগ ময়লা আবর্জনা বহনের কাজেই ব্যবহার হয়। সেখান থেকে রওনা হয়ে আমরা বাড়মেইল স্টেশন পৌঁছলাম। এখানে ঘটে গেলো এক মহা বিপত্তি। আমাদের দু‘বোনের কাপড়চোপড়ের ব্যাগপত্র হারিয়ে গেলো। অনেক খোঁজাখুঁজি শেষেও ব্যাগটি আর পাওয়া গেলো না। ফলে সীমাহীন পেরেশানি পোহাতে হয়েছে আমাদের।

এই স্টেশন পেরিয়েই পাকিস্তান শুরু। পাকিস্তান প্রবেশের আগে কাস্টম হচ্ছিলো। ভারতের কাস্টমস অফিসার, মুহাজিরদের আসবাবপত্র তল্লাশির ক্ষেত্রে সীমাহীন কঠোরতা করছিলেন।বিশেষত সেলাইবিহীন কাপড় নিতেই দিচ্ছিলেন না।

হয়তো তাদের উদ্দেশ্য এমন কিছু ছিলো, তারা পাকিস্তান স্বাধীনতার বিরোধিতা করে যে স্লোগান তুলেছিলো ‘ভুখা, নিরাবরণ পাকিস্তান’ এর বাস্তবতা মুহাজিরদের দেখাতে চেয়েছিলো। বলতে চেয়েছে, যে দেশ তোমরা চেয়েছো সেখানে পরিধানের জন্য কাপড়ও তোমাদের কপালে জুটবে না।

এ বছর হজের খুতবা দিবেন নতুন শায়খ, জানুন তার পরিচয়

আমাদের আসবাবপত্রের মাঝে একটি সেলাইমেশিন ছিলো। সেটিও ইন্ডিয়ান কাস্টমস বাজেয়াপ্ত করে দিয়েছে। কাস্টমসের সীমাহীন বিড়ম্বনাপূর্ণ তদন্ত শেষে রেল রওয়ানা হলো এবং এরপর অল্পসময়ে আমরা পাকিস্তানের সীমানায় পৌঁছে গেলাম।

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিলো হায়দারাবাদ, সিন্ধ। সেখানেও আমরা একরাত অবস্থান করি।

হায়দারাবাদ থেকে রওনা হয়ে ৬ মে, ১৯৪৮ ইংরেজি, আমরা করাচি সিটি রেলওয়ে স্টেশন পৌঁছি। এখানে হজরত মাওলানা ইহতিশামুল হক থানবি এবং আব্বাজানের বন্ধুবর খলিফা মুহাম্মদ আকেল সাহেব আমাদের স্বাগত জানাতে ও রিসিভ করতে পূর্বে থেকে উপস্থিত ছিলেন।

যেহেতু আব্বাজান রাষ্ট্রীয়ভাবে আমন্ত্রিত ছিলেন, তাই সরকার তাঁকে সদর এলাকায় (করাচির অভিজাত শহর) ভিক্টোরিয়া রোডস্থ একটি বিল্ডিং ‘কিংস কোর্ট’ এর চতুর্থ তলায় একটি ফ্ল্যাটে থাকার ব্যবস্থাপ করেছিলেন।

কিছুদিন আমরা সবাই এখানেই খালি ফ্লোরে ঘুমাতাম। বেশকদিন পর আমাদের জন্য খাটের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।

এটি একটি সৌন্দর্যমন্ডিত, ছিমছাম ফ্ল্যাট ছিলো। জানালাগুলো ছিলো সেই ভিক্টোরিয়া রোডমুখী। এটিকে এখন আবদুল্লাহ হারুন রোড বলা হয়। আজ সেখানে ট্রাফিক ও দোকানপাটের আধিক্যের ফলে যে ব্যস্ততা দেখা যায় এসবের মধ্যে, ১৯৪৮ সালের সেই ভিক্টোরিয়া রোডের কল্পনা অসম্ভব!

পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতা, পিনপতন নীরবতা, নিস্তব্ধ পরিবেশের ফলে এটি ছিলো শহরের সবচে সৌন্দর্যমন্ডিত একটি সড়ক।

আগের পর্ব : আমার জীবনের প্রথম প্রাইভেটকার ভ্রমণ

ব্যবসার জটিলতা দিয়ে দিন বিসফটিকে (কল- 01771 403 470) ক্লিক করুন

-আরআর