২০১৮-০৭-২০

রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

জান্নাতুল বাকি: যেখানে ঘুমিয়ে নুরানি কাফেলা

OURISLAM24.COM
news-image

নাজমুল ইসলাম কাসিমী: মক্কা মুকাররমা’-এর কবরস্থান জান্নাতুল মুআল্লা। আর মদিনা মুনাওয়ারার কবরস্থান জান্নাতুল বাকি। এর মূল নাম ‘বাকিউল গারকাদ’। হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় থাকাবস্থায় তাঁর দুধভাই হযরত উসমান ইবনে মাযঊন রাযি-এর মৃর্ত্যু হয়। সাহাবায়ে কেরাম তখন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেন, তাকে কোথায় দাফন করা হবে? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করবন, আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে, তাকে ‘বাকিউল গারকাদ’-এ দাফন করা হবে। (মুসতাদরাকে হাকিম, খ.১১ পৃ.১৯৩)।

এভাবেই এ জায়গা কবরস্থান’র জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়ে যায় এবং সর্বপ্রথম হযরত উসমান ইবনে মযঊন রাযি.-কে দাফন করার মধ্য দিয়ে কবরস্থানটির ভিত্তি স্থাপিত হয়। তারপর কবরস্থান তিনদিকেই প্রশস্ত হতে থাকে। আজ সেটি বিশাল জায়গা জুড়ে বিস্তৃত।

জান্নাতুল বাকি মসজিদে নববির পুবদিকে অবস্থিত। প্রথমদিকে মদজিদে নববি আর বাকির মাঝখানে ‘হারতুত দাগওয়াত’ নামে একটি মহল্লা ছিলো। যেখনে মদজিদে নববির খাদেমরা তাদের বংশধর নিয়ে বসবাস করতেন। ১৪০৫ হিজরীতে মসজিদে নববি সংস্কারের সময় এই মহল্লাকে অন্য এক জায়গায় স্থানান্তরিত করা হয়। এখন এই জায়গাটি মসজিদে নববির বারান্দা হিসেবেই ব্যবহার হয় এবং এটার শেষ প্রান্তেই মসজিদে নববির চার দেয়াল।

মসজিদে নববির দেয়ালের পর ‘আবু যর’ নামে একটি সড়ক। তারপর যথেষ্ট উচ্চতার পর জান্নাতুল বাকি। কবরস্থানের চতুর্দিকে একটি উঁচু বাউন্ডারি। পশ্চিম দিকে একটি বড় গেইট। কবরস্থানে যাওয়ার জন্য একটি প্রশস্ত সিঁড়ি। ফজরের পরে এবং আসরের পরে কবরস্থান সবার যিয়ারতের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। বাইরে কয়েক প্লাটুন পুলিশের অবস্থান। ভেতরেও শক্তভাবে নজরদারি করা হয়। কোনোপ্রকার বেদাতি কাজ শুরু হলে শক্তহাতে দমন করা হয়।

মৃতদের দাফন করার জন্য জান্নাতুল বাকিকে নির্বাচন করে স্বয়ং আল্লাহ পাক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আদেশ দিয়েছেন। সর্বপ্রথম হুজুর সাল্লাল্লাহু আলালাইহি ওয়া সাল্লাম তার দুধভাইকে দাফন করেন। তারপর তাঁর চাচি- হযরত ফাতেমা বিনতে আসাদ (হযরত আলী রাযি.-এর আম্মা)। তারপর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলালাইহি ওয়া সাল্লামের ছেলে হযরত ইবরাহিম রাযি.-কে এখানে দাফন করা হয়।

হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তিন মেয়ে- হযরত রুকাইয়া রাযি., হযরত যয়নাব রাযি., এবং হযরত উম্মে কলসুম রাযি.-এর কবরও এখানে। এই তিন মেয়েই হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবিত থাকাবস্থায় ইন্তেকাল করেন। এর একটু সামনে উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজাতুল কুবরা রাযি. এবং উম্মুল মুমিনিন হযরত মায়মূনা রাযি. ছাড়া বাকি সকল উম্মুল মুমিনিনের কবর।

হযরত খাদিজাতুল কুবরা রাযি.-এর ইন্তেকাল হয় মক্কায়। তাই তাকে জান্নাতুল মুআল্লায় দাফন করা হয়। উম্মুল মুমিনিন হযরত মায়মূনা রাযি.-এর ইন্তেকাল মক্কা থেকে দশ মাইল দূরে “মাকামে সরফে’ হয়। সারাফ মদিনা দিকে আসতে যে সড়ক পাওয়া যায়, এর পাশেই। এটা আশ্চর্যজনক যে, হুজুর সা.-এর সঙ্গে হযরত মায়মূনা রাযি.-এর বিয়েও এখানেই হয়েছিল। মৃর্ত্যুও এখানে। দাফনও এখানেই করা হয়েছে তাঁকে।

উম্মাহাতুল মুমিনিনের মধ্যে শুধু উম্মুল মুমিনিন হযরত যয়নাব বিনিতে খুযাইমা রা.-এর মৃর্ত্যু হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবিত থাকাবস্থায় হয়। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে তাকে দাফন করেন। অন্যান্য উম্মাহাতুল মুমিনিন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিদায়ের পর মৃর্ত্যুবরণ করেন। তাদের সবাইকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়।

উম্মাহাতুল মুমিনিনের কবর হয়ে সামান্য বামে গেলেই হযর‍ত আলী রাযি.-এর ভাই হযরত আকিল ও তার ভাতিজা আবদুল্লাহ ইবনে জাফর তৈয়্যার রাযি.-এর কবর। এর বরাবর একটি রৌশ। শুরতেই হযরত নাফে রাযি. এবং হযরত ইমাম মালিক রহ.-এর কবর। এর সোজা বরাবর সামনে বেড়ে আরো কিছু কদম পরে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহেবজাদা হযরত ইবিরাহিম রাযি.-এর কবর। এর কিছুটা দূরে হযরত ওসমান রাযি.-এর কবর।

হযরত উসমান রাযি.-এর কবরের বিপরীত দিকে হযরত হালিমা সা’দিয়া রাযি.-এর কবর। এর মাঝখানে আরেকটি বেড়া, যেখানে শুহাদাদের দাফন করা হয়েছে।

দরোজা দিয়ে প্রবেশ করে ডান দিকে দেয়ালের একদম নিচে ইসমাঈল ইবনে জাফরের মাযার। বামদিকে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফুর কবর। এই পুরো কবরস্থানেই বড় বড় ব্যক্তিদের কবর।

এখন আর সেখানে কাউকে দাফন হয় না। অবশ্য সৌদি সরকার এখন এটাকে উত্তর-পশ্চিম দিকে যথেষ্ট প্রশস্ত করছে। সেখানে সাধারণ মুসলমানদের দাফন করা হয়। এর বেশিরভাগই হাজি। মূলত তারাই সৌভাগ্যবান, যারা মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন।

সৌদি সরকার দু’বার জান্নাতুল বাকি সংস্কার করেছে। প্রথম সংস্কার হয় শাহ ফয়সাল ইবনে আবদুল আজিজের আমলে। এসময় ‘বাকিউল গামাত’ এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত একটি সড়ককে বাকির সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। উত্তর দিক থেকেও এক অংশকে বাকির সঙ্গে প্রশস্ততায় যুক্ত করা হয়। সর্বমোট ছয় হাজার মিটার সংযোগ করা হয়।

তাছাড়া বাকির ভেতরে পাকা রাস্তা বানানো হয়। যাতে বৃষ্টির মৌসুমে দর্শনার্থী এবং দাফন করতে আসা লোকদের কোনধরনের কষ্ট না হয়।

দ্বিতীয় দফা সংস্কার হয় শাহ ফাহাদ-্এর আমলে। এসময় আশপাশের সব মহল্লা, বাজার, সড়ক উচ্ছেদ করে জান্নাতুল বাকিতে সংযুক্ত করে জান্নাতুল বাকিকে প্রশস্ত করা হয়। এখন জান্নাতুল বাকির চতুর্দিকে সতেরশো চব্বিশ মিটার লম্বা দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। এতে মরমর পাথর লাগানো হয়েছে। দেয়ালে কালো লোহার জালি লাগানো। জান্নাতুল বাকির একপাশে মৃতের গোসল দেয়া এবং কাফন পরানোরও ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে।

জান্নাতুল বাকির মর্যাদা বিষয়ক হাদিস অনেক। এ কবরস্থানের সবচেয়ে বড় মর্যাদা হলো, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাত্রিবেলা সবসময় ঘুম থেকে উঠে এখানে চলে আসতেন। এখানে শায়িত লোকদের মাগফিরাতের জন্য দোআ করতেন। হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত লম্বা একটি হাদিসের ঘটনা-

একদিন রাসুল সা. আমার পাশে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর যখন দেখলেন আমার চোখের পাতা বুজে গেছে, তিনি আস্তে আস্তে উঠলেন এবং সাবধানে দরোজা খুলে বাইরে বের হয়ে গেলেন।
আবার শান্তশিষ্টভাবে দরোজা বন্ধ করে দিলেন।

আমি উঠে কাপড় পরিবর্তন করলাম। চাদর গায়ে দিয়ে তার পিছু নিলাম। তিনি জান্নাতুল বাকিতে প্রবেশ করে একটি জায়গায় দাঁড়ালেন। অনেক্ষণ তিনি সেখানে দাঁড়িয়েই থাকলেন। তিনবার হাত উঠিয়ে দোআ করলেন। তারপর মুখ ঘোরালেন। আমিও মুখ ফিরালাম এবং খুব দ্রুত- বলা যায়, দৌড়ে এসে ঘরে প্রবেশ করলাম। তারপর ঠিকঠাকভাবে আগের মতো আস্তে করে শুয়ে পড়লাম।

আমি ঘরে পৌঁছতে না পৌঁছতে দেখি, তিনিও ঘরে এসে পড়েছেন। এসে বলতে লাগলেন,
আয়েশা! তোমার কী হলো? তোমার শ্বাস যে ফুপে উঠছে।
বললাম, না কিছুই না।

বললেন, নিজে বলে দাও, নয়তো আমার সুক্ষ্ম সংবাদদাতা (আল্লাহ) আমায় সব বলে দেবেন। বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমার পিতা-মাতা আপনার উপর উৎসর্গ হোক! ঘটনা হলো, এই…।

বললেন, আচ্ছা! ওই ছায়া তাহলে তোমার ছিলো? যেটা আমি ওখানে দেখছিলাম।
বললাম, জি হ্যাঁ!
বললেন, তোমার সংশয় ছিলো, আল্লাহ এবং তার রাসুল তোমার উপর জুলুম করবেন।
বললাম, লোক যতোই লুকোচুরি করুক না কেন। আল্লাহ তা জেনেই ফেলেন।

তারপর তিনি আমাকে বললেন, কথা হলো, হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম আমার কাছে এসেছিলেন। তিনি আমাকে আস্তে আস্তে ডাকছিলেন, যাতে তুমি বুঝতে না পারো। তিনি ভেতরে আসতে পারছিলেন না, কেননা তখন তোমার কাপড় এলোমেলো ছিলো। আমিও ভাবলাম তুমি শুয়ে আছো। এজন্য আমি তোমাকে আর জাগানোও সমিচিন মনে করিনি। আমার এটাও ভয় ছিলো, তুমি একা এখানে ভয় পাবে।

জিবরাইল আলাইহিস সালাম আমাকে বলতে লাগলেন, আপনার রব আপনাকে হুকুম করছেন, আপনি (জান্নাতুল) বাকিবাসীদের কাছে যাবেন এবং তাদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করবেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-৯৭৩)

হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত আরেক হাদিসে আছে , তিনি বলেন, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বন্টিত আমার জন্য নির্ধারিত দিন আমার কাছে থাকাবস্থায় রাতের প্রায় শেষাংশে উঠে বাকিতে চলে যেতেন। এবং বলতেন-

‘হে মুমিন শহরবাসী! তোমাদের ওপর সালাম বর্ষিত হোক। কালই তোমরা তোমাদের প্রতিশ্রুত বস্তু পাচ্ছো। তোমরা (কিয়ামতের জন্য) বিলম্ব করছো। ইনশাআল্লাহ! আমরাও অচিরেই তোমাদের সঙ্গে মিলিত হচ্ছি। হে আল্লাহ! বাকিবাসীকে মাফ করে দাও।’

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. থেকে বর্ণিত, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- ‘কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে ব্যক্তির যমিন চিড় ধরবে, সে ব্যক্তি আমি। তারপর আবু বকর রাযি.; তারপর ওমর রাযি.; তারপর বাকিবাসীরা। আমি বাকিবাসীদের পাশে আসবো। তারা আমার সঙ্গে একত্র হবে। তারপর আমি মক্কাবাসীর অপেক্ষা করবো। তারা মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি জায়গায় এসে আমার সঙ্গে মিলিত হবে। (সুনানে তিরিমযি, হাদিস নং-৩৬২৫; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস নং-৩৬৯১)

হযরত উম্মে কায়েস বিনতে মু্ু্হসিন, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বর্ণনার উদ্ধৃতি দেন, কিয়ামতের দিন সত্তর হাজার লোক কবর থেকে এমনভাবে উঠবে যে, তাদের চেহারা চতুর্দশ রাত্রির পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় চমকাতে থাকবে। এবং এই সকল লোক কোনো হিসাব ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস নং-৭০৩৫)

লেখক,
মুফতি ও মুদাররিস
মারকাযুত তাকওয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা