২০১৮-০৭-১৬

বুধবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৮

পুরাতন স্বর্ণের বিনিময়ে নতুন স্বর্ণ নেওয়া যাবে কি?

OURISLAM24.COM
news-image

শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসাইমিন
সৌদি মুফতি ও গবেষক

আমরা জানি, অনেক স্বর্ণের দোকানদার ব্যবহৃত ভাঙ্গাচূরা স্বর্ণ ক্রয়ের কারবার করে । তারা সেইসব পুরাতন স্বর্ণ নিয়ে স্বর্ণকারের কাছে যায় এবং সমান সমান ওজনে তৈরি করা নতুন স্বর্ণ নিয়ে আসে । এ-ক্ষেত্রে স্বর্ণকার নতুন স্বর্ণ তৈরি বাবদ বাড়তি পারিশ্রমিক গ্রহণ করে— এমতাবস্থায় এর বিধান কী হবে?

কিংবা দেখা যায়, কোনো কোনো স্বর্ণের দোকানদার গ্রাহকের নিকট থেকে ব্যবহৃত স্বর্ণের বিনিমেয়ে তাদের নিকট রক্ষিত নতুন স্বর্ণের রদ-বদল করে থাকেন এবং তার উপর তৈরি বাবদ বাড়তি পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন— এ ব্যাপারে শরয়ী বিধান কী?

প্রথমেই মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের জন্য লেনদেনের ব্যাপারে ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক সুস্পষ্ট পরিপূর্ণ নিয়ম-পদ্ধতি বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন, অন্য কোন ব্যবস্থা বা পদ্ধতিই তার সমকক্ষ হবে না; আর লেনদেনের ক্ষেত্রে যদি তা সুদের সাথে সম্পৃক্ত হয়, তাহলে তা হবে যুলুম এবং ন্যায় ও সঠিক পথ থেকে দূরে সরে যাওয়ার অন্তর্ভুক্ত।

যে সুদ থেকে আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবের মধ্যে এবং তার রসুলের সা. ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন; আর সকল মুসলিম তা হারাম হওয়ার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। এ-ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা বলেছেন—

“আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ের ফয়সালা দিলে কোন মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে তাদের কোন (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার সংগত নয়। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল, সে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হলো। [সূরা আহযাব, আয়াত ৩৬]

শরয়ী সূত্র :  হাদিস বর্ণিত আছে— “স্বর্ণ স্বর্ণের বিনিময়ে, রৌপ্য রৌপ্যের বিনিময়ে, গম গমের বিনিময়ে, যব যবের বিনিময়ে, খেজুর খেজুরের বিনিময়ে এবং লবন লবনের বিনিময়ে লেনদেন সমান সমান ও নগদ নগদ হতে হবে।

[মুসলিম, অধ্যায়: বাগান বর্গাচাষ বা পানি সিঞ্চন ( كتاب المساقاة ), পরিচ্ছেদ: লেনদেন ও রৌপ্যের বিনিময়ে স্বর্ণের নগদ বিক্রয় প্রসঙ্গে ( باب الصَّرْفِ وَبَيْعِ الذَّهَبِ بِالْوَرِقِ نَقْدًا), হাদিস, ৪১৪৭, উবাদা ইবন সামেত রা. থেকে বর্ণিত]

রাসুল (সা.) থেকে আরও বর্ণিত আছে— “যে ব্যক্তি তার অতিরিক্ত কিছু দিবে অথবা অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করবে, তবে তা সুদ হবে। [মুসলিম, আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রা.) থেকে হাদিসটি বর্ণিত, হাদিস ৪১৪৮]

অন্য হাদিসে আছে— তার নিকট উৎকৃষ্ট মানের খেজুর নিয়ে আসা হলে তিনি সেই ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেন, তখন জবাবে সাহাবীগণ বলেন, আমরা দুই সা খেজুরের বিনিময়ে এ উৎকৃষ্ট মানের এক সা এবং তিন সায়ের বিনিময়ে দুই সা খেজুর ক্রয় করে থাকি। তখন নবী সা. এ ধরেনের কেনাবেচাকে পরিহার করার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন এ ধরনের ক্রয়-বিক্রয় নির্ভেজাল সুদ।

অতঃপর তিনি তাদেরকে নির্দেশনা প্রদান করে বলেন, তারা যেন নিম্ন মানের খেজুর বিক্রয় করে দেয়, তারপর সেই বিক্রয়লব্ধ দিরহাম দিয়ে উৎকৃষ্ট মানের খেজুর ক্রয় করে।
[বুখারী, অধ্যায়: ক্রয়-বিক্রয় ( كتاب البيوع ), পরিচ্ছেদ: উৎকৃষ্ট মানের খেজুরের বিনিময়ে তার চেয়ে নিম্ন মানের খেজুর ক্রয়-বিক্রয় প্রত্যয় প্রসঙ্গে ( باب إذا أراد بيع التمر بتمر خير منه ), হাদিস, ২০৮৯; মুসলিম, অধ্যায়: বাগান বর্গাচাষ বা পানি সিঞ্চন (كتاب المساقاة ), পরিচ্ছেদ: সমান সমানভাবে খাদ্যদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় প্রসঙ্গে ( باب بَيْعِ الطَّعَامِ مِثْلاً بِمِثْلٍ ), হাদিস ৪১৬৬]

হাদিসের বিধান : এসব হাদিস থেকে আমরা এটা গ্রহণ করতে পারি যে, স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ পরিবর্তনের পর যে কোনো একটির সাথে (গহনা বানানো বাবদ) অতিরিক্ত মজুরি ধার্য করার ব্যাপারে প্রশ্নকর্তা যা উল্লেখ করেছেন, তা একটি হারাম লেনদেন তথা অবৈধ এবং সুদের অন্তর্ভুক্ত, যা থেকে নবীজি (সা.) নিষেধ করেছেন।

সঠিক পদ্ধতি : তাই এ ব্যাপারে সঠিক পদ্ধতি হলো, কোনো প্রকার পূর্ব চুক্তি ব্যতীত প্রথমে ভিন্ন জাতের কোনো মুদ্রার মূল্যের বিনিময়ে ভাঙ্গাচুরা পুরাতন স্বর্ণ বিক্রয় করবে । এভাবে স্বর্ণের মালিক থেকে মূল্য গ্রহণ করার পর তার কাছ থেকে নতুন স্বর্ণ ক্রয় করবে । তবে এ-ক্ষেত্রে আর সবচে’ উত্তম হলো সেই দোকান বাদ দিয়ে অন্য দোকানে গিয়ে নতুন জিনিস অনুসন্ধান করা ।

তারপরও যদি তা না পাওয়া যায়, তাহলে যার নিকট সে স্বর্ণ বিক্রয় করেছিল তার নিকট ফিরে আসবে এবং প্রচলিত মুদ্রার মাধ্যমে তা ক্রয় করবে; আর এ অবস্থায় যদি প্রচলিত মুদ্রার পরিমাণ বেশি হয়, তাহলে স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণের লেনদেন না হওয়ার কারণে তাতে কোনও প্রকার সমস্যা নেই।

আর যদি দোকানদার নিজেই স্বর্ণকার হয়, তাহলে তার (বিক্রেতার) জন্য এ কথা বলার সুযোগ রয়েছে যে, তুমি এ স্বর্ণ গ্রহণ কর এবং তা দিয়ে আমার জন্য পছন্দসই অলংকার তৈরি করে দাও; আর যখন অলংকার তৈরির কাজ শেষ হবে, তখন আমি তোমাকে তার পারিশ্রমিক দিয়ে দেব; আর তাতেও কোনো প্রকার অসুবিধা নেই।

তথ্যসূত্র : মাজমূয়াতু আসইলাতিন ফি বাইয়ি ওয়াশশিরাই আয-যাহব (বই)

আরও পড়ুন : ইসলামে বিবাহের ১২ সুন্নত