২০১৮-০৬-১৪

মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮

চাকরিজীবীর জাকাত

OURISLAM24.COM
news-image

মুহাম্মদ শামসুল হক সিদ্দিক

আপনি চাকরিজীবী। বেতনের টাকাই আপনার একমাত্র সম্বল। চাকরির ফাঁকে আপনি কোনো ব্যবসা-বানিজ্য করেন না। অর্থাৎ আপনি শুধুই একজন চাকরিজীবী। অবশ্য আপনি মাস শেষে মোটা অঙ্কের বেতন পান। তবে মাসের টাকা মাসেই শেষ হয়ে যায়। আপনি কোনো সঞ্চয় করতে পারেন না। এমতাবস্থায় জাকাত দেয়া আপনার জন্য আবশ্যক কিনা।

আপনি হয়তো সহজেই বলে ফেলবেন: নাহ, আমার ওপর কোনো জাকাত নেই। কিন্তু বিষয়টি এতো সহজে বলে দেওয়ার মতো না।

কারণ, জাকাত ফরজ হওয়ার সময় যাদের কাছেই কোনো না কোনো প্রকারের বর্ধনশীল সম্পদ ছিল তাদের ওপরই জাকাত ফরজ হয়েছে। সম্পদের ধরন বুঝে নিসাব নির্ধারিত হয়েছে।

ধরুন কেউ উট লালন করে জীবিকা নির্বাহ করে। তার উটের সংখ্যা ৫ টা হয়ে গেল। এক বছর অতিক্রান্ত হল। এই ব্যক্তির ওপর জাকাত ফরজ হয়ে গেল। পাঁচ উটের বিপরীতে জাকাত হিসেবে দিতে হবে একটি বকরি।

গরু ও ছাগল লালন করে জীবিকা নির্বাহকরলেও জাকাত দিতে হয়। গরু ৩০ টা হলে এক বছর বয়সের একটি বাছুর জাকাত হিসেবে দিতে হবে। ছাগল ৪০ টা হলে একটি দিয়ে জাকাত আদায় করতে হয়।

অনুরূপভাবে কৃষকের ওপরও জাকাত ফরজ। কৃষক যে ফসল ফলায় তা যদি বৃষ্টির পানি দ্বারা উৎপাদিত হয়, সেচ-সার ইত্যাদি জন্য নিজ থেকে কিছু ব্যয় করতে না হয়, তাহলে প্রতি পাঁচ আউসুক (৭২০ কেজি) -তে ৭২ কেজি জাকাত হিসেবে দিতে হয়।

আর যদি নিজ থেকে খরচ করে ফসল উৎপাদন করতে হয়, তাহলে প্রতি ৭২০ কেজিতে ৩৬ কেজি জাকাত হিসেবে দিতে হয়। যারা ব্যবসা করে তাদের ব্যবাসায়িক পণ্যের ওপরও জাকাত আছে।

অর্থাৎ সকল প্রকার সম্পদ উপার্জনকারীকেই, সম্পদের ধরন বুঝে নিসাব নির্ধারণ করে জাকাত দিতে হয়। বাকি থাকে শুধু চাকুরিজীবী। প্রতি মাসে লাখ টাকা বেতন উঠিয়ে খরচ করে ফেললেই তার আর জাকাত দিতে হয় না। আর ওই নিরীহ কৃষক বেচারা টেনেটুনে ৭২০ কেজি ফসল ঘরে তুলতে সক্ষম হলেই ৭২ কেজি জাকাত হিসেবে দিয়ে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। বিষয়টি অনেকের কাছেই অযৌক্তিক মনে হতে পারে।

পবিত্র কুরআনে সকল প্রকার হালাল উপার্জন থেকেই কল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করার নির্দেশ রয়েছে – ‘মুমিন সম্প্রদায়, তোমাদের উপার্জিত হালাল সম্পদ থেকে ব্যয় কর, আর যা আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি তা থেকেও’ (আল কুরআন, সূরা বাকারাহ, আয়াত:২৬৭)।

চাকরিজীবীর উপার্জিত সম্পদ নিশ্চয় এই আয়াতের আওতায় পড়ে। তবে যেহেতু আধুনিক পদ্ধতিতে চাকরি করে অর্থ উপার্জনের রেওয়াজ সে কালে ব্যাপক ছিল না, সে কারণে প্রাচীন শরিয়া বিশেষজ্ঞগন এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য দিয়ে যেতে পারেননি। সে হিসেবে বিষয়টি সুরাহা করার দায়িত্ব বর্তমান যুগের শরীয়া বিশেষজ্ঞদের কাঁধেই।

বর্তমানযুগের প্রখ্যাত ফকিহ ড. ইউসুফ আল কারযাভি বিষয়টি নিয়ে অনেক ঘাটাঘাটি করে সর্বশেষ যে কথাটি বলেছেন তা হলো: تؤخذ الزكاة من الرواتب ونحوها (فقه الزكاة،المجلد1، ص 490)

অর্থাৎ ‘বেতন ইত্যাদি থেকে জাকাত নেয়া হবে।’

কীভাবে নেয়া হবে তা নিয়ে নানা মত রয়েছে। এসবের একটি হলো, বছরে এক বার চাকরিজীবীকে জাকাত দিতে হবে। বারো মাসে বেতন কত আসে তা হিসাব করতে হবে। নিজের ও নিজ সংসারের মৌলিক প্রয়োজনে কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হয় তা হিসেব করতে হবে।

মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করার জন্য কোনো ঋণ নিয়ে থাকলে তা হিসেব করতে হবে। মৌলিক খরচাপাতি ও ঋণের টাকা বিয়োগ করার পর যে টাকা অতিরিক্ত থেকে যাবে তা যদি নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে জাকাত দিতে হবে।

মনে রাখতে হবে যে এই টাকার ওপর একবছর অতিক্রান্ত হতে হবে না। ঠিক কৃষকের মতো যার উৎপাদিত নিসাব পরিমাণ ফসলের ওপর একবছর অতিক্রান্ত হতে হয় না।

এই মতটি গ্রহণ করলে অনেক চাকরিজীবীই জাকাতের আওতায় চলে আসবেন এবং ইসলামের একটি গুরত্বপূর্ণ রুকন বাস্তবায়ন করে নিজেকে ধন্য মনে করার সুযোগ পাবেন। ১৪.০৬.২০১৮

লেখক: প্রফেসর, এশিয়ার ইউনিভার্সিটি

-আরআর