২০১৮-০৫-২৫

মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮

বাইতুল মুকাদ্দাস বনাম কুফুরি ষড়যন্ত্র

OURISLAM24.COM
news-image

সাঈদ আহমাদ খান

বাইতুল মুকাদ্দাস মুসলিম জাতির তৃতীয় পবিত্র ধর্মীয় স্থান৷ প্রতিটি মুসলিমের হৃদয়ের গহীনে রয়েছে এর প্রতি গভীর ভালোবাসা৷ একে ঘীরে বর্ণিত হয়েছে কুরআনে কারিমের বহু আয়াত আর হাদিস শরিফের অসংখ্য রেওয়ায়েত৷ হিজরি ১৭ সনে দ্বিতীয় খলিফায়ে রাশেদ হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. ‘র বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের সুবাদে তা পরিণত হয়েছে মুসলিম জাতির এক ধর্মীয় অনুভূতির কেন্দ্রস্থলে৷

কিন্তু দু:খের বিষয়, রাসুলে আরাবি সা.’র যুগ থেকেই কুফুরি শক্তি মুসলিমদের নির্মূলে ছিঁড়ে যাওয়া মালার মতো একের পর এক আঘাত হেনে এসেছে৷ বিশেষকরে, মানব ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় রচনাকারি ইহুদি জাতি বাইতুল মুকাদ্দাসকে ছিনিয়ে নিতে ষড়যন্ত্রের নীল নকশা আঁকছে বহু পূর্ব থেকেই৷ অবশেষে ৭ই ডিসেম্বার ২০১৭ তে আমেরিকা একে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণার মাধ্যমে যেনো মুসলিম – হৃদয়ে ছুড়ে মারলো শেষ বিষাক্ত তীর৷ তাই নতুনকরে শুরু হলো মযলুমানের আর্তচিৎকার-৷

এক:
“আল কুদস” কী? কী-ই বা তার ফযিলাত?

“আল কুদুস” এতে বাইতুল মুকাদ্দাস এবং এর পূর্ণ এলাকাই অন্তর্ভূক্ত৷ তাই “কুদস” শব্দটির সাথে কুদস শহরসহ আরো তিনটি জায়গাও অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত৷
১, মাসজিদে আকসা এবং এর সকল আঙ্গিনা ও দেয়াল৷
২, কুব্বাতুস সাখরা৷
৩, জামে মুছল্লা৷
তবে শুধু “মাসজিদে আকসা” বললে এ তিনো স্থানই গণ্য হয়ে যায়৷
“মাসজিদে আকসা কে বারে ম্যাঁ জালিস হাকায়েক” , পৃষ্ঠা: ৭

কুরআনে কারিমে মাসজিদে আকসার বর্ণনা:
১,
سبحان اللذي أسري بعبده ليلا من المسجد الحرام إلي المسجد الأقصي الذي باركنا حوله لنريه من أياتنا، الأية ـ
অর্থ- পবিত্রতা বর্ণনা করছি ঐ সত্ত্বার যিনি নিজ প্রিয় বান্দাকে (মে’রাজের) রাতে মাসজিদে হারাম থেকে মাসজিদে আকসা ভ্রমণ করিয়েছেন, যার আশপাশ বরকতময়; তাঁর কতিপয় নিদর্শনাবলি দর্শনের জন্য৷
সুরা ইসরা- ১
ড. ঈসা আল কদুমি এ আয়াতের প্রেক্ষাপটে লিখেছেন- মাসজিদে আকসা সম্পর্কীয় অন্য কোনো আয়াত না থাকলেও এ আয়াতটিই শুধু তার ফযিলাত বর্ণনার জন্য যথেষ্ট হতো৷

২, কুদস হলো, আম্বিয়ায়ে কেরামের শহর৷ যার পুরাতন নাম হলো, “কিনআন”৷ এটাই হলো, সুলাইমান, দাউদ, শুআইব আ. ‘র মতো মহান নবীগণের প্রিয় শহর৷ সুলাইমান আর দাউদ আ.’র আলোচনায় এর বর্ণনা কুরআনে এভাবে এসেছে-
و ورث سليمان داود
সুরা নামল- ১৬
মুসলিমগণ এসকল আম্বিয়ায়ে কেরামের উত্তরসূরি হিসেবে মাসজিদে আকসা তাদেরই একচ্ছত্র হক৷

হাদিস শরিফে মাসজিদে আকসার আলোচনা:
১, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত৷ আল্লাহর রাসুল সা. বলেছেন-
لا تشد الرحال إلا إلي ثلاثة مساجد ـ المسجد الحرام، و مسجد الرسول صلي الله عليه و سلم، و المسجد الأقصي.
অর্থ- তিনটি মাসজিদের উদ্দেশ্যেই কেবল সফর করলে সওয়াব পাওয়া যাবে৷ মাসজিদে হারামা, মাসজিদে নববি আর মাসজিদে আকসা৷
বুখারি- ১১৮৯, দারিমি- ১৪৬১, আবু দাউদ- ২০৩৩

২, ইবনে মাজায় বর্ণিত, হযরত মাইমুনা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর নবি সা. কে বললাম- আমাদেরকে মাসজিদে আকসার বর্ণনা দিন৷ আল্লাহর রাসুল সা. তখন বললেন- এটা তো হাশরের ময়দান৷
আলবানি রহ. এ রেওয়ায়েতটিকে সহিহ বলেছেন৷

কুরআন ও হাদিসের এমন অসংখ্য রেওয়ায়েত ভরপুর৷ কিন্তু ক্ষুদ্র এ প্রবন্ধে বিস্তারিত বলা অসম্ভব৷ দিবালোকে সূর্যের মতো আলো দিয়ে এসব আয়াত ও হাদিস যেনো চিৎকার করে বলছে, বাইতুল মুকাদ্দাস কেবল মুসলিমদের হক৷

একৈশ্বরে বিশ্বাসী ঐসব দিনকানাগণ তাদের “ইশ্বর”‘র এ পবিত্র বাণিগুলো দেখতে না পেলে সূর্যের কী আসে যায়? সুলাইমান আর দাউদ আ.’র মতো মহান নবিগণকে নিজেদের নবি দাবি করেও তাদের ব্যাপারে অসত্য রটানো আর অপবাদ আরোপই কি ওরাছাতের পরিচয়? না, এটা হতে পারে না৷

ইতিহাস বলে, বাইতুল মুকাদ্দাস আদম আ. ‘র যামানা থেকেই মাসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে৷ খৃস্ট পূর্ব ১৮৫০ সনেই মুসলিম জাতির পিতামহ ইবরাহীম আ. এখানে এসেছিলেন৷ তাই বলি, নবিগণের ব্যাপারে সৎ আকিদায় বিশ্বাসী মুসলিমগণই ওমর রা. ‘র সংস্করণকৃত আজকের এই বাইতুল মুকাদ্দাসের যোগ্য উত্তরসূরি৷
“আকসা কে আঁসু” ২২০- ২২

দুই:

কুফুরি ষড়যন্ত্র

পূর্বেই বলেছি, মুসলিমদের একনিষ্ঠ এ হক কব্জা করতে কাফেরগণ তাদের পূর্ণ শক্তি দিয়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে৷ অপকৌশল আর অপচেষ্টার ভয়ঙ্কর কাঁটা বিছিয়েছে মুসলিমদের মসৃণ সব পথগুলোতে৷

ইহুদিদের বন্ধুগোষ্ঠি – খৃস্টান জাতিও তাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক সঙ্গে কাজ করে আসছে৷ তাই তো ইতিহাস সাক্ষি, ফ্রান্স, জার্মানি আর ব্রিটেনের মতো দেশেগুলো ১৯৯৬ সালেই কুদসকে ইসরাইলের রাজধানি বানাতে আওয়ায উঠিয়েছে৷

এমনিভাবে একই সালে জাতি সঙ্গের প্রধান সেক্রেটারিও ইসরাইলের পক্ষে মুখ খুলেছে৷
“আল কুদস ফি দা- ইরাতিল হাদাস” – ১/ ১৭৯-৮০

১৯৮০ সালে এমেরিকা পশ্চিম কুদসকে ইসরাইলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে৷ এ ঘটনার নাম দিয়েছে তারা “The great Qudus project” ৷ “হাযারায়ে সোওম কি কিয়ামাতে সোগরা” পৃষ্ঠা- ৯৮

চির অভিশপ্ত, ধূর্ত এ জাতির অবাধ স্বার্থে অন্যান্য কাফেরগণও (তথা, নাস্তিক- মুরতাদ এবং ক্ষমতার লোভী আধুনিক নামধারি কিছু মুসলিম শাষকবৃন্দ) নিজেদেরকে সপে দিচ্ছে৷ স্বল্প পরিসরে আর সেদিকে যেতে চাচ্ছি না৷ এভাবেই সমগ্র কুফুরি শক্তি মিলে মুসলিমদেরকে তাদের অজান্তেই পাতানো জালে আটকে দিচ্ছে৷

* ইহুদি চক্রান্ত্র:
১, ইহুদিগণ চিরকাল বাইতুল মুকাদ্দাসকে তাদেরই হক ভেবে আসছে৷ তাদের ধারণা হলো, যেদিন তারা বাইতুল মুকাদ্দাসকে পূর্ণরুপে দখল করতে পারবে, সেদিন থেকে তাদের বিজয়ের পূর্ণ ধারা শুরু হয়ে যাবে৷ তারা মনে করে, তাদের রব মাসিহে দাজ্জাল নাকি এ পবিত্র ভূমি থেকেই পুরো বিশ্বকে শাষণ করবেন৷

আর এ “মহাউদ্দেশ্য” বাস্তবায়নেই তারা যুগে যুগে খৃস্টানদেরকে প্ররোচিত করে আসছে৷ খৃস্টান- সহযোগিতায় বাইতুল মুকাদ্দাসে হামলা করে ক্রুসেড যুদ্ধ বাঁধিয়েছে৷ ইতিহাস বলে, হিজরি ৪৯৩ সনে ইহুদিগণ বাইতুল মুকাদ্দাসকে মুসলিমদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়৷

এর ঠিক নব্বই বছর পর হিজরি ৫৮৩ সনে খলিফায়ে রাশেদ হযরত সুলতান সালাহুদ্দিন আউয়ুবি রহ. পুনরায় একে উদ্ধার করেন ইহুদিদের নির্মম মুষ্ঠি থেকে৷

৬৫৮ হিজরিতে “আইনে জালুত” যুদ্ধে তাতারিদের হাত থেকে রক্ষা করা হয়৷ এরপর ৯৩৪ হিজরিতে শকুনের কালো থাবা থেকে হেফাযত করতে বাইতুল মুকাদ্দাসকে উসমানি খলিফাগণ নিজেদের অধীন করে নেন৷ পরিশেষে ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ চলাকালীন আবারও কুটকৌশলের মহাপণ্ডিত এ ইহুদি জাতি মাসজিদে আকসাকে ফেলাফাতে উসনানিয়া থেকে নিজেদের করায়েত্ত্বে নেওয়ার প্রয়াস চালায়৷

অবশেষে ১৯২৪ সালে উসমানি খেলাফাত ধ্বংস করে বাইতুল মাকদিসের রাস্তা পরিস্কার নেয় তারা৷
“আকসা কে আঁসু”- পৃষ্ঠা: ২০

এভাবেই তারা ক্ষণে ক্ষণে বাইতুল মুকাদ্দাস আয়ত্বে নিতে প্রচেষ্টা চালিয়েছে৷ লক্ষ্য হলো, বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয় করে প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যে এরপর পুরো মুসলিম বিশ্বে নিজেদের দাপট প্রতিষ্ঠা করা৷ আর তাই ব্রিটেন, ফ্রান্স আর আমেরিকাকে বরাবর উসকানি দিয়ে চলেছে৷ অবশেষে বাইতুল মুকাদ্দাসকে ইসরাইলের রাজধানি হিসেবে ঘোষণা করেছে, সমালোচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প৷

২,এখানে আল্লামা সাইয়িদ সালমান নদভি দা.বা.’র একটি লেখার তরজমা উল্লেখ করা সমুচিন মনে করছি-
ইহুদিরা মনে করে,”হায়কালে সুলাইমানি” নির্মাণ করে তাদের প্রতিশ্রুত দাজ্জালের পথকে সুগম করতে পারবে৷ (“হায়কালে সুলাইমানি” বলতে তারা হযরত সুলাইমান আ.’র যুগে নির্মিত মাসজিদে আকসার সেই পুরাতন নকশাকে বুঝায়৷ “আকসা কে আঁসু”- পৃষ্ঠা:২১৯)

তাদের মতে, “হায়কালে সুলায়মানি” নির্মিত হলে তাদের খোদা মাসিহে দাজ্জালের আগমন ঘণিয়ে আসবে৷ আর তাতে মুসলিমদের উপর বিজয়ের পথ স্পষ্ট হয়ে যাবে৷

তাই মাসজিদে আকসা ধ্বংস করে তদস্থলে “হায়কাল” নির্মাণ করতে চাচ্ছে৷ আর এ আকাঙ্খা পূর্ণ করতে তারা তিন ধরণের কর্ম- পদক্ষেপ নিয়েছেন৷ যেগুলোর প্রারম্ভ হয়েছে আজ থেকে এক যুগেরও পূর্বে-

ক, মাসজিদে আকসার নীচে খনন করা হয়েছে৷ ১৯৯৫ সালেই দু’টি বড় বড় কম্পানিকে এ কাজে নিযুক্ত করা হয়েছে৷
খ, মাসজিদে আকসার ভিত্ত্বি দূর্বল করতে এর আশেপাশে অসংখ্য সুরঙ্গ তৈরি করা হয়েছে৷ ১৯৯৬ সালে শুরু হয় এ কাজের ধারা৷
গ, মুসলিম আর ইহুদি বসতির মধ্যখানে নির্মাণ করা হয়েছে এক বিশাল ইট- পাতরের প্রাচীর৷ যার প্রতিটি অংশে মুসলিম স্বাধীনতাকামি মুজাহিদদের কর্মতৎপরতা উপলব্ধি করতে ফিট করা হয়েছে সি সি ক্যামেরা৷

আর এভাবেই বাস্তব হতে চলেছে, কুরআনের ভবিষ্যৎ বাণি-
لا يقاتلونكم جميعا إلا في قري محصنة أو من وراء جدر
অর্থ: “তারা (শত্রুগণ) তোমাদের সাথে সংরক্ষিত এলাকা কিংবা মজবুত প্রাচিরের ওপার ছাড়া যুদ্ধ করবে না”৷ সুরা হাশর- ১৪
“হাযারায়ে সোওম কি কিয়ামাতে ছোগরা” পৃষ্ঠা- ৫৪- ৫৮ থেকে সংক্ষেপিত৷

বাইতুল মুকাদ্দাসের পূর্ব তীর (অংশ) থেকেও এখন মুসলিমদের হটাতে নির্যাতনের স্টীম রোলার চালাচ্ছে তারা৷ এভাবেই তারা ইসলাম মাড়িয়ে নিজেদের স্বপ্নের পাখা উড়াতে হিংস্র বাঘের মতো ছুটে চলছে৷

হায় আফসোস! আজ সমস্ত কুফুরি জাতি মুসলিম ধ্বংসের পায়তারা নিয়ে পূর্ণ শক্তিতে মাঠে নেমেছে৷ আর মুসলিম জাতি নাকি অলসতার চাদর মুড়ি দিয়ে যেনো অনন্তকালের নিদ্রায় ডুব দিয়েছে৷

একদিকে শত্রুপক্ষ যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে বারুদের অগ্নি নিক্ষেপ করছে৷ অন্যদিকে মুসলিমগণ তাদেরই পা চেটে আপন ভাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে৷ নিজের সামান্য স্বার্থ রক্ষার্থে বিকিয়ে দিচ্ছে দ্বিন ও ধর্ম৷

ভয়ঙ্কর নদির ভাঙ্গা কুলে দণ্ডায়মান জাতিকে উদ্ধারে প্রয়োজন আজ এমন একদল সুলতান আউয়ুবির যারা হবে, ঈমানি জোশ ও জযবায় ভরপুর৷ সঠিক ও পরিকল্পিত রাজনৈতিক টেকনিকেলে দক্ষ৷ যারা মাঠে নামবে রক্ত আর কৌশল উপহারের দীপ্ত সাহস নিয়ে৷ হায়, কবে আসবে তুমি, সালাহুদ্দীন আউয়ুবি?!

অরো পড়ুন- যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ হলে কাজা ও কাফফারা ওয়াজিব হয়