বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই ২০১৮

তাহিয়্যাতুল অজুর নামাজ

OURISLAM24.COM
মে ১৬, ২০১৮
news-image

মুফতি মুহাম্মাদ শোয়াইব

সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিয়া রহমানিয়া সওতুল হেরা, টঙ্গী, গাজীপুর।

অজু করার পর অজুর অঙ্গগুলো শুকানোর পূর্বেই দুই রাকাত নামাজ পড়া মোস্তাহাব। ইসলামী পরিভাষায় এই নামাজকে “তাহিয়্যাতুল অজু” বলে।

তাহিয়্যাতুল অজু পড়ার নিয়ম:

সাধারণ সুন্নাত ও নফল নামাজের ন্যায় যে কোনো সুরা-কিরাত দ্বারা  তাহিয়্যাতুল অজু আদায় করা যায়। উভয় রাকাআতেই সূরা ফাতিহার পর অন্য সুরা মিলাতে হবে এবং আখেরী বৈঠক আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ শরীফ ও দোয়ায়ে মাছুরা সব পড়ে সালাম ফিরাতে হবে।

নামাজের নিষিদ্ধ ও মাকরুহ সময় ছাড়া যে কোনো সময় অজু করার পর এ নামাজ পড়া যায়। অর্থাৎ তিন সময় নামাজ পড়া নিষিদ্ধ।  (তিরমিযী শরীফ, ২য় খ-, ৩৪১ পৃষ্ঠা) (নামাজের মাকরুহ ও হারাম সময় সম্পর্কে একটু পরে আলোচনা আসছে)

হাদিস শরিফে এসেছে,

عَن عقبَة بن عَامر الْجُهَنِيّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْه، أَن رَسُول الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم َ قَالَ: “مَا من أحد يتَوَضَّأ فَيحسن الْوضُوء، وَيُصلي رَكْعَتَيْنِ يقبل بِقَلْبِه وَوَجهه عَلَيْهِمَا؛ إِلَّا وَجَبت لَهُ الْجنَّة “. أخرجه أَبُو دَاوُد.(304)  رواه مسلم (234) .

উকবা ইবনু আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে মুসলমান সুন্দর রুপে অজু করে তারপর দাঁড়িয়ে দেহ ও মনকে পুরোপুরি তার প্রতি নিবদ্ধ রেখে দুই রাকআত নামাজ আদায় করে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়। ” (সহিহ মসলিম, হাদিস নং 234, আবু দাউদ, হাদিস নং 304)

عن عُثْمَانَ بْن عَفَّانَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : (مَنْ تَوَضَّأَ نَحْوَ وُضُوئِي هَذَا ثُمَّ قَامَ فَرَكَعَ رَكْعَتَيْنِ لَا يُحَدِّثُ فِيهِمَا نَفْسَهُ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ.(

হজরত ওসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,  যে ব্যক্তি আমার অজুর মতো অজু করে (একাগ্রতার সহিত) দুই রাকাআত নামাজ পড়বে এবং এ সময় অন্তরে অন্য কোনো ধারনা উদয় হবে না বা কোনো কথা বলবে না। তাহলে তার পূর্বেকার গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (বুখারি, মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ, বাইহাকি, ইবনে হিব্বান)

হাফেজ ইবনে হাজার রহ. তাহিয়্যাতুল অজু সংক্রান্ত এই দুটি হাদিস উল্লেখ্য করার পর বলেন,

“فيه استحباب صلاة ركعتين عقب الوضوء ” انتهى .

এই হাদিসদুটিতে দলিল রয়েছে অজুর পর দুই রাকাত নামাজ মুস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারে।

يستحب ركعتان عقب الوضوء للأحاديث الصحيحة فيها ” انتهى) .المجموع شرح المهذب (3 /545)

ইমাম নববী রহ. বলেন, বিশুদ্ধ হাদিসের দলিল থাকার কারণে বুঝা গেল, অজুর পর দুই রাকাত নামাজ পড়া মুস্তাহাব।

এ বিষয়ে আরও একটি হাদিস রয়েছে বুখারি ও মুসলিম শরিফে।

أَنَّ حُمْرَانَ مَوْلَى عُثْمَانَ أَخْبَرَهُ أَنَّ عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانَ – رضى الله عنه – دَعَا بِوَضُوءٍ فَتَوَضَّأَ فَغَسَلَ كَفَّيْهِ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ ثُمَّ مَضْمَضَ وَاسْتَنْثَرَ ثُمَّ غَسَلَ وَجْهَهُ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ ثُمَّ غَسَلَ يَدَهُ الْيُمْنَى إِلَى الْمِرْفَقِ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ ثُمَّ غَسَلَ يَدَهُ الْيُسْرَى مِثْلَ ذَلِكَ ثُمَّ مَسَحَ رَأْسَهُثُمَّ غَسَلَ رِجْلَهُ الْيُمْنَى إِلَى الْكَعْبَيْنِ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ ثُمَّ غَسَلَ الْيُسْرَى مِثْلَ ذَلِكَ ثُمَّ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم تَوَضَّأَ نَحْوَ وُضُوئِي هَذَا ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ مَنْ تَوَضَّأَ نَحْوَ وُضُوئِي هَذَا ثُمَّ قَامَ فَرَكَعَ رَكْعَتَيْنِ لاَ يُحَدِّثُ فِيهِمَا نَفْسَهُ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‏”‏ ‏.‏ وروى البخاري (160) ومسلم (226)

হারামালা ইবনু ইয়াহইয়া তূজীবী (রহঃ) … উসমান ইবনু আফফান (রাঃ) এর আযাদকৃত গোলাম হুমরান থেকে বর্ণিত যে, উসমান (রাঃ) অজুর পানি চাইলেন। এরপর তিনি অজু করতে আরম্ভ করলেন। (বর্ণনাকারী বলেন), তিনি [উসমান (রাঃ)] তিনবার তাঁর হাতের কব্জি পর্যন্ত ধুইলেন এরপর কুলি করলেন এবং নাক ঝাড়লেন। এরপর তিনবার তার মুখমন্ডল ধুইলেন। এবং ডান হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার ধুইলেন। অতঃপর বাম হাত অনুরুপভাবে ধুইলেন। অতঃপর তিনি মাথা মাসেহ করলেন। এরপর তার ডান পা টাখনু পর্যন্ত ধুইলেন এরপর বাম পা অনুরুপভাবে ধুইলেন।

এরপর তিনি বললেন যে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমার এ অজু করার ন্যায় অজু করতে দেখেছি। এবং অজুর শেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যাক্তি আমার এ অজুর ন্যায় অজু করবে এবং দাঁড়িয়ে এরুপে দু-রাকআত নামাজ আদায় করবে যে, সে সময়ে মনে মনে অন্য কোন কিছু কল্পনা করেনি, সে ব্যাক্তির পুর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৬০, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২৬)

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন,

” وَيُسْتَحَبُّ أَنْ يُصَلِّيَ رَكْعَتَيْنِ عَقِبَ الْوُضُوءِ وَلَوْ كَانَ وَقْتَ النَّهْيِ ، وَقَالَهُ الشَّافِعِيَّةُ ” انتهى . (الفتاوى الكبرى 4/345)

আল্লামা যাকারিয়া আল আনসারী রহ. বলেন,

“وَنُدِبَ لِمَنْ تَوَضَّأَ أَنْ يُصَلِّيَ عَقِيبَ وُضُوئِهِ رَكْعَتَيْنِ فِي أَيِّ وَقْتٍ كَانَ ” انتهى .(أسنى المطالب 1/44)

নামাজের মাকরুহ সময়সমূহ:

. ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর থেকে ফরজ নামাজের আগ পর্যন্ত ফজরের দুই রাকাত নামাজ ছাড়া অন্য কোনো নফল নামাজ পড়া মাকরুহ। হজরত হাফসা রা. বলেন, ‘ফজরের ওয়াক্ত শুরু হলে রাসুল (সা.) সংক্ষিপ্ত দুই রাকাত নামাজ ছাড়া আর কোনো নামাজ পড়তেন না।’ তবে এ সময়ে কাযা নামাজ পড়া যাবে।

২. মাগরিবের নামাজের পূর্বক্ষণে। ফিকহে হানাফী এবং ফিকহে মালেকীর মতে মাগরিবের ওয়াক্ত হওয়ার পর ফরজ নামাজের আগে কোনো নফল নামাজ পড়া জায়েয নেই। অবশ্য ফিকহে শাফেয়ীর মতে এই সময়ে দুই রাকাত নামাজ পড়া সুন্নতে গাইয়ে মুয়াক্কাদা। আর ফিকহে হাম্বলীর মতে এই সময়ে দুই রাকাত নামাজ পড়া জায়েয আছে বটে তবে তা সুন্নাত নয়।

৩. ইমাম খুতবা দেওয়ার জন্য নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ালে। এ সময় কোনো নফল নামাজ পড়া জায়েয নেই। হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন, ‘জুমার দিন ইমাম সাহেব খুতবা দেওয়ার সময় যদি তুমি তোমার পাশের লোককে বল ‘চুপ কর’ তাহলেও তুমি অনর্থক কাজ করলে।’ (সুবুলুস সালাম ২/৫০) ফিকহে শাফেয়ী ও হাম্বলী মতে যদি ইমামের সাথে তাকবীরে উলা ছুটে যাওয়ার সম্ভাবনা না থাকে তাহলে এই সময়ে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ার অবকাশ আছে। তবে শুধু নামাজের ওয়াজিবগুলো আদায়ের মাধ্যমে তা সংক্ষিপ্ত সময়ে শেষ করতে হবে।

৪. ঈদের নামাজের আগে ও পরে ঘরে ও ঈদগাহে এবং নামাজের পরে শুধু ঈদগাহে নফল নামাজ পড়া মাকরুহ। হজরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘রাসুল (সা.) ঈদের দিন দুই রাকাত নামাজ পড়েছেন। তার আগে ও পরে কোনো নামাজ পড়েন নি।’ (সুবুলুস সালাম ২/৬৬)

৫. ফরজ নামাজের ইকামত দেওয়ার সময়। ফিকহে হানাফী মতে এ সময় সব ধরনের নফল নামাজ পড়া মাকরুহ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ফরজ নামাজের ইকামত দেওয়া হলে আর কোনো নামাজ পড়ার সুযোগ নেই।’ তবে ফজরের সুন্নতের ক্ষেত্রে এর একটু ব্যতিক্রম আছে। কারো যদি তাশাহহুদে শরীক হওয়ার মাধ্যমেও জামাত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে জামাত শুরু হলেও ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত নামাজ পড়া যাবে।

৬. যদি ফরজ নামাজের সময় খুবই অল্প থাকে, যখন সুন্নাত পড়তে গেলে যথাসময়ে আর ফরজ পড়া যাবে না তখনও ফরজ ছাড়া ভিন্ন কোনো সুন্নাত নফল পড়া মাকরুহ।

৭. আরাফার দিন জোহর ও আসরের মাঝে ও আসরের পরে এবং মুজদালিফায় মাগরিব ও এশার মাঝে ও এশার পরে নফল নামাজ পড়া মাকরুহ।

নামাজের হারাম সময়:

এমন কিছু সময় আছে যখন নামাজ পড়া সম্পূর্ণরূপে হারাম। হাদীস সূত্রে জানা যায়, তিন সময়ে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ। সাহাবী উকবা বিন আমের জুহানী (রা.) বলেন, ‘তিনটি সময়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে নামাজ পড়তে এবং মৃতের দাফন করতে নিষেধ করতেন। সূর্য উদয়ের সময়; যতোক্ষণ না তা পুরোপুরি উঁচু হয়ে যায়। সূর্য মধ্যাকাশে অবস্থানের সময় থেকে নিয়ে তা পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়া পর্যন্ত। যখন সূর্য অস্ত যায়’। [সুবুলুস সালাম : ১/১১১, সহীহ মুসলিম : ১/৫৬৮] উক্ত হাদীসের ভাষ্যানুযায়ী নামাজের নিষিদ্ধ সময় তিনটি। যথা-

১. সূর্য যখন উদিত হতে থাকে এবং যতোক্ষণ না তার হলুদ রঙ ভালোভাবে চলে যায় ও আলো ভালোভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

২. ঠিক দ্বিপ্রহরের সময়; যতোক্ষণ না তা পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ে।

৩. সূর্য হলুদবর্ণ ধারণ করার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। উল্লিখিত তিন সময়ে সব ধরনের নামাজ পড়া নিষিদ্ধ। চাই তা ফরজ হোক কিংবা নফল। ওয়াজিব হোক বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এ সময়ে শুকরিয়ার সিজদা এবং অন্য সময়ে পাঠকৃত তিলাওয়াতের সিজদাও নিষিদ্ধ। তবে এই সময়ে জানাজা উপস্থিত হলে বিলম্ব না করে তা পড়ে নেয়া যাবে। ঠিক তদ্রুপ কেউ যদি ওই দিনের আসরের নামাজ সঠিক সময়ে পড়তে না পারে তাহলে সূর্যাস্তের আগে হলেও তা পড়ে নিতে হবে। কাযা করা যাবে না। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি সূর্যাস্তের পূর্বে আসরের এক রাকাত পড়তে পারলো সে পুরো আসরের নামাজই পেলো’।

অন্য হাদীসে আরো দুই সময়ে নামাজ পড়ার নিষেধাজ্ঞা এসেছে। সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, ফজরের নামাজের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত কোনো নামাজ নেই। আসরের নামাজের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোনো নামাজ নেই। [সহীহ মুসলিম : ৮২৭] এই দুই সময়ে কোনো ধরনের নফল নামাজ পড়া জায়েয নেই। তবে আসরের নামাজের পর সূর্য লালবর্ণ ধারণের আগ পর্যন্ত কাযা নামাজ পড়া যাবে। এরপর আর কাযাও পড়া যাবে না। তবে এ দুই সময়ে জানাজার নামাজ পড়া যাবে।

পূর্বের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, ফজর ও মাগরিবের পর নফল পড়া মাকরুহ সে হিসেবে উল্লেখিত সময়ে তাহিয়্যাতুল অজু ও দুখুলুল মাসজিদ পড়াও মাকরুহ তবে বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় এখানে তার দালীলিক আলোচনা করা হলো

ফজরের সময় ও আসরের সময় তাহিয়াতুল অজু ও দুখুলুল মসজিদ নামাজ পড়ার বিধান:

ফজরের সময় হওয়ার পর থেকে সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত ফজরের সুন্নত ব্যতিত সব ধরনের নফল নামাজ পড়া মাকরূহ। চাই তা ঘরে পড়া হোক কিংবা মসজিদে। অতএব ফজরের ওয়াক্ত হয়ে যাওয়ার পর তাহিয়াতুল অজু বা দুখুলুল মসজিদ পড়বে না। তবে ফজরে সুন্নতের সাথে তাহিয়াতুল অজু ও দুখুলুল মসজিদ নামাযের নিয়ত করে নিলে তার সাওয়াব পেয়ে যাবে৷ এবং জামাতের সময় হওয়া পর্যন্ত বাকি সময় তাসবীহ-তাহলীল, দরূদ শরীফ ইত্যাদি পড়বে।
(সুনানে আবু দাউদ ১/১৮১; ফাতহুল কাদীর ১/২৪০; রদ্দুল মুহতার ১/৩৭৪)
সুবহে সাদিকের পর ফজরের ফরয নামাযের আগে দুই রাকাত সুন্নাত ছাড়া অন্য নফল নামাজ পড়া প্রমানিত নয়, বরং মাকরুহ- বিষয়টির দলিল।

১ নং দলিল:

عَنْ حَفْصَةَ قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- إِذَا طَلَعَ الْفَجْرُ لاَ يُصَلِّى إِلاَّ رَكْعَتَيْنِ خَفِيفَتَيْنِ وفى رواية إلا ركعتي الفجر

অনুবাদ-হজরত হাফসা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ফজর উদিত হবার পর ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত ছাড়া অন্য কোন নামাজ পড়তেন না।

(সহীহ মুসলিম হাদীস নং-১৭১১, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১১৭৩, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-১৫৮৭, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২৪২২৫, সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং-৪২২৭, সুনানে বায়হাকী, হাদীস নং-৯৭৯, আল মু’জামুল কাবীর হাদীস নং-৩৮৫)

২ নং দলিল:

عَنْ يَسَارٍ مَوْلَى ابْنِ عُمَرَ قَالَ رَآنِي ابْنُ عُمَرَ وَأَنَا أُصَلِّي بَعْدَ طُلُوعِ الْفَجْرِ ، فَقَالَ يَا يَسَارُ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَرَجَ عَلَيْنَا وَنَحْنُ نُصَلِّي هَذِهِ الصَّلَاةَ فَقَالَ : ( لِيُبَلِّغْ شَاهِدُكُمْ غَائِبَكُمْ لَا تُصَلُّوا بَعْدَ الْفَجْرِ إِلَّا سَجْدَتَيْنِ ) والحديث صححه الألباني رحمه الله في صحيح أبي داود .

(আবু দাউদ, হাদিস নং ১২৭৮, জামে তিরিমিযি, হাদিস নং ৪২৯)

নং দলিল:

روى البيهقي بسند صحيح عن سعيد بن المسيب أنه رأى رجلا يصلي بعد طلوع الفجر أكثر من ركعتين يكثر فيها الركوع والسجود فنهاه فقال : يا أبا محمد ! أيعذبني الله على الصلاة ؟ ! قال : لا ولكن يعذبك على خلاف السنة . )إرواء الغليل ” (2 / 236 (

ইমাম বাইহাকী সহিহ সনদে সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি এক ব্যক্তিকে ফজরের সময় (ফরজ ছাড়া) দুইয়ের অধিক নামাজ পড়তে দেখে তাকে নিষেধ করেন। লোক সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাবকে লক্ষ্য করে বলেন, হে আবু মুহাম্মাদ! আল্লাহ তায়ালা কি আমাকে নামাজ পড়ার অপরাধে শাস্তি দিবেন!! তিনি বলেন: না, বরং তোমাকে শাস্তি দিবেন সুন্নাহ পরিপন্থী আমল করার কারণে।

(ইরওয়াউল গলীল ২/২৩৬)

৪ নং দলিল:

ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন,

وهو ما أجمع عليه أهل العلم، كرهوا أن يصلي الرجل بعد طلوع الفجر إلا ركعتي الفجر.

আহলুল ইলম একমত যে, কোনো ফজরের সময় হওয়ার পর থেকে সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত সময়ে ফজরের দুই রাকাত সুন্নত ছাড়া অতিরিক্ত নফল পড়াকে মাকরুহ মনে করেন।

(জামে তিরমিজি ২/৭৫)

৫ নং দলিল:

فى صحيح البخارى– أبا سعيد الخدري يقول : سمعت رسول الله صلى الله عليه و سلم يقول لا صلاة بعد الصبح حتى ترتفع الشمس ولا صلاة بعد العصر حتى تغيب الشمس ( صحيح البخارى- كتاب مواقيت الصلاة، باب لا يتحرى الصلاة قبل غروب الشمس، رقم–1139)

হজরত আবু সাঈদ খুদরী রাঃ বলেন-আমি নবীজি সাঃ কে বলতে শুনেছি যে, ফজরের নামাযের পর সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত কোন নামাজ নেই, এবং আসরের পর সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত কোন নামাজ নেই। (সহীহ বুখারী-১/৮২, হাদীস নং-১১৩৯)

৬ নং দলিল:

وفى صحيح المسلم- قال عمرو بن عبسة السلمى ………… فقلت يا نبى الله……أخبرنى عن الصلاة قال « صل صلاة الصبح ثم أقصر عن الصلاة حتى تطلع الشمس حتى ترتفع فإنها تطلع حين تطلع بين قرنى شيطان وحينئذ يسجد لها الكفار (صحيح مسلم- صلاة المسافربن، باب إسلام عمرو بن عبسة،رقم-1967)

হজরত আমর বিন আবাসা আস সুলামী রাঃ বলেন-আমি বললাম-হে আল্লাহর নবী! আপনি আমাকে নামাজ সম্পর্কে শিক্ষা দিন, রাসুলুল্লাহ সাঃ বললেন-ফজরের নামাজ আদায় করবে। তারপর সূর্য পূর্বাকাশে উঁচু হওয়া পর্যন্ত নামাজ পড়া থেকে বিরত থাকবে। কেননা সূর্য শয়তানের দুই শিংয়ের মধ্যখানে উদিত হয়, এবং সে সময় কাফেররা সূর্যকে সিজদা করে। (সহীহ মুসলিম-১/২৭৬, হাদীস নং-১৯৬৭)

মাজহাবের অবস্থান:

শুধু ইমাম শাফেয়ী রহ. ছাড়া বাকি সবাই এই ফজরের সময় ফজরের সুন্নত ছাড়া অন্য নফল নামাজ পড়াকে মাকরুহ মনে করেন।

একইভাবে আসরের পরও তাহিয়্যাতুল অজু বা মসজিদ নামাজ পড়া মাকরুহ। কারণ আসরের নামাজের পর সূর্যাস্ত পর্যন্ত অনুরূপ ফজরের জামাত হয়ে যাওয়ার পর সূর্যোদয় পর্যন্ত যে কোনো ধরনের নফল নামাজ নিষিদ্ধ। হাদিস শরিফে এসেছে,

হজরত আবু সাইদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

عن أبي سعيد الخدري رضي الله عنه قال: “لا صلاة بعد الصبح حتى ترتفع الشمس، ولا صلاة بعد العصر حتى تغيب الشمس”.

(বুখারী ও মসুলিম)

عن عقبة بن عامر الجهني رضي الله عنه قال: ثلاث ساعات كان رسول الله صلى الله عليه وسلم ينهانا أن نصلي فيهن أو أن نقبر فيهن موتانا: حين تطلع الشمس بازغة حتى ترتفع، وحين يقوم قائم الظهيرة حتى تميل الشمس، وحين تضيف الشمس للغروب حتى تغرب” .

তবে কোনো ব্যক্তি যদি জোহরের সুন্নতের সঙ্গে তাহিয়্যাতুল অজু ও তাহিয়্যাতুল মসজিদের নিয়ত করে নেয় তাহলে একই সঙ্গে সুন্নত, তাহিয়্যাতুল অজু, তাহিয়্যাতুল মসজিদ সবগুলো আদায় হয়ে যাবে। অনুরূপ যেসব নামাজের আগে সুন্নত নেই সেসব নামাজে যদি ফরজের সঙ্গে এই দুই ধরনের নামাজেরও নিয়ত করে নেয় আদায় হয়ে যাবে। (মুসলিম, নাসায়ী ও আবু দাউদ)

এ বিষয়ে লাজনা দায়েমার ফাতাওয়া নিম্মরূপ:

” إذا توضأ المسلم ودخل المسجد بعد أذان الظهر وصلى ركعتين ناويا بهما تحية المسجد وسنة الوضوء وسنة الظهر أجزأه ذلك عن الثلاث ؛ لقول النبي صلى الله عليه وسلم : (إنما الأعمال بالنيات ، وإنما لكل امرئ ما نوى) إلا أنه يسن له أن يصلي ركعتين أخريين إتماماً لسنة الظهر الراتبة القبلية ؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم كان يحافظ على صلاة أربع ركعات قبل الظهر ” انتهى .
“فتاوى اللجنة الدائمة” (7 / 248-249) .

মুসলমান যখন জোহরের আাজানের পর অজু করে মসজিদে প্রবেশ করে আর দুই রাকাত নামাজ তাহিয়্যাতুল মসজিদ ও তাহিয়্যাতুল অজু ও জোহরের দুই রাকাত সুন্নতের নিয়তে দুই রাকাত নামাজ পড়ে তাহলে এই দুই রাকাত সব নামাজের জন্যই যথেষ্ট হয়ে যাবে। কেননা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সমস্ত আমল নির্ভর করে নিয়তের ওপর। আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যে সে নিয়ত করে। তবে এভাবে নামাজ পড়লে তাকে জোহরের আরও দুই রাকাত সুন্নত পড়ে নিতে হবে। চার রাকাত সুন্নত পূর্ণ করার জন্য। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জোহরের পূর্বে চার রাকাত নামাজ নিয়তিম পড়তেন।

এ ক্ষেত্রে শায়েখ উসাইমিন রহ. এর দুটি ফাতওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম ফাতাওয়া:

وسئل الشيخ ابن عثيمين رحمه الله :
هل السنن تتداخل في بعضها ؟ مثل مَن أراد سنة الوضوء فإنه يدخلها في سنة الضحى .
فأجاب : ” نعم ، يصح ذلك ؛ لأن بعض السنن تكون مقصودة بذاتها ، فهذه لا تتداخل ، وبعض السنن يكون المقصود منها تحصيل الصلاة فقط ، فمثلاً : سنة الوضوء المقصود بها أن تصلي ركعتين بعد الوضوء ؛ سواء سنة الوضوء أو ركعتي الضحى أو راتبة الظهر أو راتبة الفجر أو السنة التي تكون بين الأذان والإقامة ؛ لأن بين كل أذانين صلاة ، وكذلك تحية المسجد يجوز إذا دخلتَ المسجد أن تصلي بنية الراتبة وتغني عن تحية المسجد .
أما إذا كانت العبادة مقصودة بذاتها فإنها لا تتداخل ، ولهذا لو قال قائل : سأجعل راتبة الظهر الأولى – التي هي أربع ركعات – ركعتين وأنويها عن الأربع ، نقول له : لا يصلح ، لماذا ؟ لأن السنة هنا مقصودة بذاتها ، بمعنى أن تصلي ركعتين ثم ركعتين ” انتهى .
“لقاء الباب المفتوح” (25 / 20) .

দ্বিতীয় ফাতাওয়া:

وسئل الشيخ ابن عثيمين – أيضاً – رحمه الله :
هل يصح صلاة سنة الوضوء مع سنة الظهر القبلية أو سنة المغرب مثلاً ؟
فأجاب : ” سنة الوضوء أن الإنسان إذا توضأ وأسبغ الوضوء وصلى ركعتين لا يحدث فيهما نفسه غفر الله له ما تقدم من ذنبه . فإذا صادف أن تكون راتبة الظهر بعد الوضوء وصلى الراتبة ولم يحدث فيهما نفسه فإنه يرجى أن يكون داخلاً في الحديث .
أما راتبة المغرب فتصويرها بعيد ، إلا إذا قلنا إنه بعد أن صلى المغرب أحدث ثم ذهب وتوضأ ثم صلى ركعتي المغرب ، فهذه يمكن ، وإلا فالغالب أن ركعتي المغرب تكون بعد صلاة المغرب ، ويكون الإنسان متطهراً ” انتهى .