শুক্রবার, ১৭ আগস্ট ২০১৮

দোষ কি শুধু তাসফিয়ার, নাকি দায়িত্বজ্ঞানহীন অভিভাবকেরও?

OURISLAM24.COM
মে ৬, ২০১৮
news-image

সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন
আওয়ার ইসলাম

সম্প্রতি নবম শ্রেণির ছাত্রী তাসফিয়া হত্যার ঘটনায় জোর দিয়েই বলা যায়, সতর্ক না হলে সামান্য ফেইসবুকও হতে পারে মানুষের মৃত্যুর কারণ। একটি ফেইসবুক একাউন্টের পথ ধরেই পরিবারের সদস্যদের অজান্তে ঘাতকরা তাসফিয়ার সাথে যোগাযোগ করে।

বন্ধুত্বের মাসপূর্তির অজুহাতে মেয়েটিকে একটি রেস্টুরেন্টে ডেকে নিয়ে যায়। তারপর দলবলসহ ধর্ষণ ও খুন করে পতেংগা সমুদ্র সৈকতে লাশ ফেলে যায়।

এমন বাস্তবতায় বলতে হচ্ছে, নিহত তাসফিয়া হাজারো তাসফিয়াকে মেসেজ দিয়ে গেছে, ভার্চুয়াল আর রিয়েলিটি এক নয়। তাই ফেসবুক রিলেশনকে ঠিক ততটুকুই গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ যতটুকু গুরুত্ব আমরা পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া অপরিচিতদের দেই।

একই প্রসঙ্গে বলতে হচ্ছে, সন্তানের কৈশোরের একটা সময়ে এসে অভিভাবকরা কিছুটা অসহায় হয়ে যায়! অহেতুক আতংকে বাবা-মা কেমন যেন দিশেহারা হয়ে বাজে আচরণ শুরু করেন। কিন্তু ওই সময়টা সন্তানদের সাথে বেশি মনযোগী ও ঘনিষ্ঠ হওয়া দরকার প্রতিটি অভিভাবকের।

খুব সাবধানে হাসিমুখে তার জানার পরিধি ব্যাখ্যা করার সাথে সাথে বাস্তব জীবনের ধারণা দেওয়ার মতো দায়িত্ব মূল অভিভাবক হিসেবে বাবা-মায়েরই। কারণ এই বয়সে সৃষ্ট হঠাৎ দূরত্বটা সন্তানদের বিপথে চালিত করে এবং নিজের ইচ্ছে মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে ধাবিত করে। যা ডেকে আনে সন্তানের সর্বনাশ।

ইনস্টল করুন ইসলামী যিন্দেগী, মোবাইলে পড়ুন বয়ান ও কিতাব

তাসফিয়ার আগেও অনেক নাম এসেছে। আমরা অনেক সন্তানকে হারিয়েছি। আমি মনে করি, তাদের হারানোর ক্ষেত্রে সন্তানদের দায় যত, তারচেয়ে বেশি দায় আমাদেরই, অভিভাবকদের। কারণ আমরা জানার প্রয়োজন মনে করছি না- সন্তানের বন্ধু হচ্ছে কে বা কারা?

মুঠোফোনে, ইন্টারনেটে সন্তান কার সঙ্গে কী নিয়ে ব্যস্ত থাকছে তা আমরা খেয়াল রাখছি কতটুকু? অনেকে আবার নিজের সম্পদ, প্রতিপত্তি প্রকাশের বাহন বা মাধ্যম হিসেবে সন্তানদের ব্যবহার করছেন! আর এভাবে ব্যবহার করতে গিয়ে কিংবা ছাড় দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত আর তাদের আয়ত্ত্বে রাখতে পারছেন না।

নিজ সন্তানদের কাছেই জিম্মি হয়ে পড়ছেন। ফল হিসেবে ভুল পথে পা রাখা সন্তান অপরাধী হয়ে ওঠছে, অস্বাভাবিক জীবন ও মৃত্যুর পথে হাঁটছে।

তাসফিয়ার মৃত্যু রহস্যের পুরোটা এখনও উন্মোচিত হয়নি। তবে কথা হচ্ছে, নবম শ্রেণির একটি মেয়ের ফেসবুক প্রেম, বন্ধুর সঙ্গে রেস্টুরেন্টে গিয়ে সময় কাটানো এবং আদনানের অস্ত্র মামলার আসামির সঙ্গে বন্ধুত্ব, কোনোটাই শিক্ষার্থী ও কৈশোর সুলভ বলে বিবেচিত হতে পারে না।

এক্ষেত্রে এলোমেলো, অগোছালো ও অনিয়ন্ত্রিত কৈশোর এবং দায়িত্বহীন অভিভাবকত্বের ছায়া স্পষ্ট। সন্তানের গতিবিধি নজরে রাখলে হয়ত এমনটি ঘটত না। তাই সন্তান যাতে সুস্থ-সুন্দর নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠতে পারে এজন্য তার খবর রাখতে হবে- এ সত্য ভুলে গেলে যে চলবে না।

তাদের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত ও সন্দেহজনক কিছু পেলে সন্তানের স্বার্থেই প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে। সন্তান স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ নিয়ে কী করছে, কোন ওয়েব সাইটে ঢুকছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে কতটা সময় কাটাচ্ছে, সেই ব্যাপারে অভিভাকদেরই দৃষ্টি রাখতে হবে।

মনে রাখা চাই, সন্তান বড় হওয়ার সাথে সাথে পড়ালেখায় ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। সে পরিবারের সদস্য ছাড়াও বাইরের লোকজন ও বন্ধু-বান্ধবের সাথে মেলামেলা শুরু করে। এ সময়ে অভিভাবকের দায়িত্ব অনেক বেশি।

সন্তান লালন পালনে ভুল করছেন না তো?

ছেলেমেয়ে কাদের সাথে মেলামেশা করে, কোথায় সময় কাটায় ইত্যাদি লক্ষ্য রাখা খুব জরুরি। কেননা কিশোর ও তরুণ বয়সে বাবা-মার সাথে সবকিছু সে শেয়ার করতে পারে না। কিন্তু বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে অনায়াসে সব কথা শেয়ার করে।

আবার বয়সের বৈশিষ্ট্যে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি তার একটা আকর্ষণ তৈরি হয়। এর ফলে অভিভাবককে সন্তান এড়িয়ে চলে এবং বাইরের জগৎ ও বিনোদনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। পড়ালেখা এসময় বিরক্তিকর মনে হয়।

এ অবস্থায় অভিভাবককে বাস্তবতা বুঝে খুব সতর্কতার সাথে সন্তানকে পথনির্দেশনা দিতে হবে। অভিভাবককে এক্ষেত্রে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে।

এ প্রসঙ্গে প্রিয় নবী সা. বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর সবাই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে। ইমাম একজন দায়িত্বশীল। তিনি তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। পুরুষ দায়িত্বশীল তার পরিবারের। সে জিজ্ঞাসিত হবে তার দায়িত্ব সম্পর্কে।

নারী দায়িত্বশীল তার স্বামীর গৃহের (তার সম্পদ ও সন্তানের)। সে জিজ্ঞাসিত হবে তার দায়িত্ব সম্পর্কে। ভৃত্যও একজন দায়িত্বশীল, সে জিজ্ঞাসিত হবে তার মুনিবের সম্পদ সম্পর্কে।

এককথায় তোমরা সবাই দায়িত্বশীল, আর সবাই জিজ্ঞাসিত হবে সে দায়িত্ব সম্পর্কে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১৩৮; তিরমিজি, হাদিস : ১৭০৫)

আরও পড়ুন: তাসফিয়ার সারা অঙ্গে আঘাত, বাবার দাবি গণধর্ষণের পর হত্যা

-আরআর