সোমবার, ২৫ জুন ২০১৮

বিধবা

OURISLAM24.COM
মে ৫, ২০১৮
news-image

মোরশেদ জাহান : মন্দিরের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বটগাছ। চৈত্রের ভ্যাপসা গরমে অনেকেই বটতলায় বসে শরীর খানিকটা জুড়িয়ে নেয়। মন্দিরের দক্ষিণে ফসলের খোলা মাঠ। মহল্লার কোথাও বাতাস না থাকলেও এখানটায় থাকে। ক্লান্ত দুপুরে অনিলা দেবী মন্দিরের বারান্দায় বসে আছে। দক্ষিণা শীতল বাতাসে দেহ শীতল হলেও তার মনটা শীতল হচ্ছে না।

বটবৃক্ষের ছায়ার মতো জীবনে যে ছায়া হয়েছিলো, সেই স্বামী যোগানন্দ মারা গেছে বহু বছর হলো। যোগানন্দ মাটি কাটা, গাছ কাটা কখনো বা জমিতে কাজ করে অল্প উপার্জন করে কোনোরকম সংসার চালাতো। কোনো ছেলে নেই, শুধু তিনজন মেয়ে রেখে মারা গেলো। সংসারে একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিলো সে৷ মেয়েদের বিয়ে দিয়েছে৷ তাদের সবার ঘরে সন্তানও আছে।

তবু কেমন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে অনিলা দেবীর৷ বাগানের বাঁশ, হাস-মুরগির দু-একটা ডিমই তার আয়ের উৎস। ভিটে-বাড়ি যা আছে, তা আবার যোগানন্দর খুড়াতো ভাইয়েরা দখলে নেওয়ার প্রহর গুনছে।

অনিলা দেবী বহুদিন ধরে পাড়ার লোকের মুখে শুনে আসছে, সরকার নাকি বিধবা ভাতা দেয়। নিজেও বুড়ি হয়ে যাচ্ছে৷ কিন্তু কোনো ভাতা সে পায় নি আজ অবধি। অথচ পাশের বাড়ির নির্মলের তিরিশ বছর বয়সী বউ নন্দিনী তো ঠিকই বিধবা ভাতা পাচ্ছে। নন্দিনীর দুই ছেলে আছে, তা সত্ত্বেও। নন্দিনী স্বামীর রেখে যাওয়া জমি চাষ করে ভালই ফসল পায়। সরকারি যেকোনো প্রকল্পে তার নাম থাকেই। দিনের আলোতে তার যেমন আয়, রাতের আঁধারেও তেমন মিটে সুপ্ত জ্বালা।

‘আমি বিধবা ভাতা পাই না কেনো? নন্দিনী বিধবা, আমিও বিধবা৷ ও ভাতা পায়, আমি পাই না কেনো?’ অনিলা দেবী পাড়ার যুবকদের মাঝেমধ্যে প্রশ্ন করে৷ ‘আরে! তুমি তো বুড়ি৷ তোমার তো আর নন্দিনীর মতো রূপ-যৌবন নাই৷ তাই তুমি পাও না। হর্তা-কর্তারা অমন লোকই চায়, যে তাদের খুশি করতে পারবে। দেখো না, স্বামী মারা যাওয়ার পরও মনে হচ্ছে নন্দিনী দিনদিন নব যৌবন লাভ করছে।’ যুবকরা তাকে বোঝায়৷

‘হায়রে সমাজ! হায়রে দেশ! কবে হবো তোদের চোখে বিধবা?’ অনিলা দেবীর মনের অজান্তে নিঃশ্বাসটি বেরোয় বড় দীর্ঘ হয়ে৷ চোখের জলে আঁচলতলে মুখ লুকোয়৷

শিক্ষার্থী : রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজ, গোপালগঞ্জ