বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই ২০১৮

দাওয়াত ও তাবলীগের নীতি ও আদর্শ (১)

OURISLAM24.COM
এপ্রিল ৪, ২০১৮
news-image

শাইখুল হাদীস মুফতী মনসূরুল হক
জামিয়া রাহমানিয়া মুহাম্মদপুর ঢাকা

মিরপুরের রুপনগরের আবাসিক এলাকায় গত ১৪ জানুয়ারি উলামাদের জোড়ে, ‘নৈশ মাদরাসা’ [বছিলা, মুহাম্মাদপুর, ঢাকা]-তে ২৬ ফেব্রুয়ারি, চরওয়াশপুর জামি‘আ ইসলামিয়া মাদরাসা, [ওয়াশপুর, মুহাম্মাদপুর, ঢাকা]-এর মাহফিলে ৩ মার্চ এবং মুহাম্মাদপুর তাবলীগী মারকায কবরস্থান মসজিদে ১৫ মার্চ বাদ মাগরিব প্রদত্ত বয়ানের পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত সারসংক্ষেপ।

আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতে দুটি রাস্তা চালু করেছেন, একটি হিদায়াত এবং জান্নাতের রাস্তা। আর অপরটি গোমরাহী এবং জাহান্নামের রাস্তা

পবিত্র কুরআনে পাকে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا

অর্থ- আর আমি তাকে [মানুষকে] পথ দেখিয়েছি, হয়তো সে কৃতজ্ঞ হয়েছে, অথবা অকৃতজ্ঞ । [সূরা দাহর; ৩]

এ দুনিয়া হলো দারুল ইমতেহান, তথা পরীক্ষার জায়গা। এখানে বান্দা থেকে পরীক্ষা নেওয়া হবে যে, আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী চলে, না কি শয়তানের হুকুম অনুযায়ী চলে।

এরপরের জগত হলো বারযাখের জগত, যেটা মূলত ওয়েটিং রুম। ট্রেন স্টেশনে আমি যদি ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট ক্রয় করি, তবে আমার জন্য ফার্স্ট ক্লাস ওয়েটিং রুম থাকবে, সেকেন্ড ক্লাসের টিকিট ক্রয় করলে ওয়েটিং রুমও সেকেন্ড ক্লাসের হবে, তেমনি যে দুনিয়াতে ভালো আমল করে যাবে, তার কবরের যিন্দেগীও ততটা আরামাদায়ক হবে।

যার আমল খারাপ হবে, তার কবরের যিন্দেগীও কষ্টের হবে। আলমে বারযাখের পর আসবে ফলাফল প্রকাশের দিন। সেখানে আল্লাহ তাআলা বান্দার পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করবেন।

فَرِيقٌ فِي الْجَنَّةِ وَفَرِيقٌ فِي السَّعِيرِ

অর্থঃ (কেয়ামতের দিবসের দিন) একদল বেহেশতে দাখিল হবে, আর একদল দোজখে দাখিল হবে। [সূরা শুরা: ৭]

দুনিয়ার এ পরীক্ষার হলে যেন মানুষ উত্তীর্ণ হতে পারে- এ জন্য আল্লাহ তা‘আলা লক্ষাধিক নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। ‘আসবাবের’ উপর যে গলদ ইয়াকীন মানুষের অন্তরে পয়দা হয়েছে, তা দূর করে সবকিছু আল্লাহ থেকেই হয়, তার ইয়াকীন ও বিশ্বাস সৃষ্টি করার জন্য আম্বিয়া আ. মানুষের দিলের উপর মেহনত করেছেন।

কেননা, আসবাবের ইয়াকীন হলো শয়তানের রাস্তা, জাহান্নামের রাস্তা। আর আল্লাহ থেকে হওয়ার ইয়াকীন হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির রাস্তা, জান্নাতের রাস্তা।

আপনি-আমি দেখছি যে, পিয়ন টাকা দিয়ে যাচ্ছে, আসলে পিয়ন টাকা দিচ্ছে না, বরং আপনার-আমার আত্মীয় যে বিদেশে থাকে, সে টাকা পাঠাচ্ছে। তেমনি যমীন, চাকরি, ব্যবসা সব আল্লাহর পিয়ন।

মূলত আল্লাহ দিচ্ছেন। এক পিয়ন নষ্ট হয়ে গেলে পেরেশানীর কিছু নেই, আল্লাহর আরো অনেক পিয়ন আছে, আল্লাহ তা‘আলা সেই পিয়নদের মাধ্যমে দিয়ে রিযিক দিবেন।

দিল হলো দেহের রাজা, রাজা ঠিক হয়ে গেলে প্রজা ঠিক হয়ে যায়। হাদীসে পাকে নবীজি এ কারণেই বলেছেন, নিশ্চয় শরীরে একটি গোশতের টুকরা রয়েছে, যদি তা ঠিক হয়ে যায়, তবে পুরো শরীর ঠিক হয়ে যাবে। আর যদি তা নষ্ট হয়ে যায়, তবে সম্পূর্ণ শরীরই নষ্ট হয়ে যাবে। আর তা হলো ‘কলব’ [অন্তর]। [বুখারী; হা.নং ৫২]

আখেরী নবী সা. সাহাবায়ে কেরামের দিলের উপর মেহনত করেছেন, সাহাবায়ে কেরামের দিল তৈরি হয়ে গেছে। ফলে যখন মদ হারাম হওয়ার ঘোষণা হয়েছে, তখন মদীনার অলি গলিতে মদের বন্যা বয়ে গেছে। কোনো সেনাবাহিনীর দরকার হয়নি, ডান্ডা-লাঠিরও দরকার হয়নি।

নবীজির মেহনতের কারণে সাহাবায়ে কেরামের দিল তৈরি হয়ে গিয়েছিলো, ফলে আল্লাহর হুকুম মানাও তাদের জন্য সহজ হয়ে গিয়েছিলো। তো সারকথা হলো নবীওয়ালা মেহনতের মূল হলো মানুষের দিলের উপর মেহনত করা।

উম্মাতে মুহাম্মাদী: শ্রেষ্ঠত্ব ও দায়িত্ব

আমাদের ভাগ্য বড় ভালো, নবীওয়ালা সে মেহনতের যিম্মাদারী বিনা দরখাস্তে আমাদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে। হারুন আ. এর জন্য হযরত মূসা আ.এর দরখাস্ত করতে হয়েছিলো।

আমাদের বিনা দরখাস্তে শেষ নবীর উম্মাত হিসাবে নবীওয়ালা মেহনত দেওয়া হয়েছে।

চেয়ারম্যান না থাকলে যেমন মেম্বার কাজ করে, তেমন যেহেতু শেষ নবীর পর আর কোনো নবী আসবে না, কাজেই এখন যিম্মাদারী আখেরী নবীর উম্মাতের উপর ন্যাস্ত হয়েছে।

এ কাজের কারণে আমাদের খাইরুল উম্মাত (শ্রেষ্ঠ উম্মত) উপাধি দেওয়া হয়েছে। এ কাজ না করলে আমারা এ উপাাধির উপযুক্ত হবো না। চোখ দিয়ে যে না দেখে, তাকে বলা হয় অন্ধ, কান দিয়ে যদি না শোনে, তবে তাকে বলা হয় বধির।

তেমনি আমরা যদি এ মেহনত না করি, তবে আমরা খাইরুল উম্মাত হতে পারবো না। কাজেই দাওয়াতের এ কাজ আমাদের জন্য করা আবশ্যক।

তবে হ্যাঁ, এ উম্মাতের উপর দাওয়াতের এ কাজ দুভাবে ফরয। এক. ফরযে কিফায়াহ, সবসময় কাফেরদের ইসলামের দিকে দাওয়াত দেওয়া । দুই. ফরযে আইন, তথা মুসলমানদের তাজদীদে ঈমান এবং আমলের দাওয়াত দেওয়া।

প্রথম প্রকার মুসলমানদের একটি উল্লেখযোগ্য শ্রেণির উপর আবশ্যক, যাদের দ্বারা কাফেরদের দাওয়াত দেওয়ার দাবী পূরণ হয়। আর দ্বিতীয় প্রকার প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা সূরা বাকারার ১১০ নং আয়াতে ফরযে আইন দাওয়াতের দিকে আর সূরা আলে ইমরানের ১০৪ নং আয়াতে ফরযে কিফায়াহ দাওয়াতের দিকে ইশারা করেছেন।

এখন এ ফরযে আইন এবং ফরযে কিফায়াহ দু’ধরনের দাওয়াতই আমাদের জন্য আবশ্যক। উম্মাতের উপর সাধারণভাবে এবং উলামায়ে কেরামের উপর বিশেষভাবে।

আম্বিয়া আ. এর উত্তরসূরী: দায়িত্ব ও কর্তব্যের সীমারেখা

উলামায়ে কেরামকে দাওয়াতের এ যিম্মাদারী দেওয়া হয়েছে বিশেষভাবে। প্রথমত উম্মাত হিসাবে, যেমনটি উপরোক্ত দুই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় এবং দ্বিতীয়ত আম্বিয়া আ.এর ওয়ারিস হিসাবে।

পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী মোট চারটি যিম্মাদারী প্রমাণিত হয়। এক. দাওয়াত ও তাবলীগ; দুই. তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধি; তিন. কুরআনের হুকুম আহকাম শিক্ষা দেওয়া; চার. সুন্নাহ শিক্ষা দেওয়া।

এ চার যিম্মাদারীর কথা আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে চার স্থানে বলেছেন, এক. সূরা বাকারা : ১২৯, দুই. সূরা বাকারা : ১৫১, তিন. সূরা আলে ইমরান : ১৬৪, চার. সূরা জুম‘আ : ২ নং আয়াতে।

আর আমাদের ব্যাপারে নবীজি ঘোষণা করেছেন, উলামারা আম্বিয়া আ.-এর ওয়ারিস মুসনাদে আহমাদ; হাদীস নং ২১৭১৫। কত লোকের প্রশংসা নবীজি করলেন হাজী, গাজী, মুজাহিদ, সৎ ব্যবসায়ী! অনেকের প্রশংসা নবীজি করেছেন। কিন্তু কাউকেই নবীজি ওয়ারিস বলেন নি।

একমাত্র উলামায়ে কেরাম কে ওয়ারিস বলেছেন। প্রথমে বুঝতে হবে যে, আমাদের ওয়ারিস কেনো বললেন? ওয়ারিস না বলে ‘খুলাফাউল আম্বিয়া’ [আম্বিয়া আ. -এর খলিফা বা প্রতিনিধি], অথবা ‘নায়েবুল আম্বিয়া’ [নবীগণের স্থলাভিষিক্ত], বা ‘কায়িমুন মাকামাল আম্বিয়া’ [নবীগণের স্থলাভিষিক্ত] কেন বললেন না?

ওয়ারিস বলার মৌলিক কারণ বা ফায়দা দুটি- এক নম্বর ফায়দা, দুনিয়াতে কারো ওয়ারিস হতে গেলে মৃতের সাথে সম্পর্ক উল্লেখ করতে হয়। যেমন আমি তার ছেলে, আমি তার ভাই.. ইত্যাদি।

সম্পর্ক উল্লেখ না করে মীরাছ দাবী করলে তা গ্রহণযোগ্য হয় না। যেমন কারো মৃত্যুর পর কেউ এসে বললো, আমি তার গ্রামের লোক, আমি তার সাথে একই পার্টি করতাম, তাই মীরাছ নিতে এসেছি।

তাবলিগ ও মাওলানা সাদ বিষয়ে আলেমদের ৫ সিদ্ধান্ত

এ ধরনের কথা কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না। এখানে নবীজি ইশারা করছেন, যদি কেউ নিজেকে আলেম দাবী করে, তবে সে নবীজি পর্যন্ত সম্পর্ক বয়ান করতে পারে কি না? তার উস্তাদ কে? তার উস্তাদ কে? তার উস্তাদ কে?

এভাবে আমি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ পর্যন্ত সে সম্পর্ক বয়ান করতে পারে কি না? এটা আগে তালাশ করতে হবে।

আলহামদুলিল্লাহ! আমরা আমাদের নবীজি পর্যন্ত সম্পর্ক বয়ান করতে পারবো। কেননা, আমাদের উস্তাদগণ তাদের সনদ তাদের থেকে নিয়ে ইমাম বুখারী পর্যন্ত বয়ান করে দিয়েছেন। আর ইমাম বুখারী থেকে নিয়ে নবীজি পর্যন্ত সনদ তো বুখারীতেই উল্লেখ আছে।

একই কথা মুসলিম শরীফ সহ অন্যান্য হাদীসের কিতাবের ব্যাপারে প্রযোজ্য। তো ওয়ারিস বলার একটা ফায়দা এটা হয়ে গেলো যে, রাসূল সা. উম্মাতকে নিষেধ করলেন, কেউ নিজেকে আলেম দাবী করলেই তোমরা তার বয়ান শুনবে না; বরং আগে দেখো যে, তার সনদ আছে কি না?

এর দ্বারা মওদূদী, জাকির নায়িক প্রমুখ সবাই বাদ পড়ে গেছে। কেননা, তাদের কারো কোনো সনদ নেই।

দুই নম্বর ফায়দা: যে ব্যক্তির ওয়ারিস হয়, তাকে বলা হয় ‘মুরিস’। নিয়ম হলো, ওয়ারিস যে হবে সে মুরিসের সকল সম্পত্তির মধ্যে ওয়ারিস হবে। কাজেই নবীজি যত কাজ রেখে গেছেন, উলামায়ে কেরাম তার সকল কাজের ওয়ারিস।

তাবলীগেরও ওয়ারিস, তাযকিয়ারও ওয়ারিস, তালীমে কুরআনেরও ওয়ারিস, তালীমে সুন্নাহরও ওয়ারিস। চারটি কাজেরই ওয়ারিস। নবীজির ওয়ারিস হিসাবে চারটা কাজই আমাদের দায়িত্ব।

এ চারকাজের মধ্যে শেষোক্ত তিনটি কাজের মধ্যে ‘তাকসীমে কার’ বা ‘কর্মবণ্টন’ আছে। অর্থাৎ উলামায়ে কেরামের একেকজন একেক দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু দাওয়াতের এ কাজের মধ্যে কোনো তাকসীমে কার নেই; বরং এ কাজ সকল উলামায়ে কেরামকেই করতে হবে।

যিনি মাদরাসায় খেদমত করছেন, তারও করতে হবে। যিনি খানকায় মেহনত করছেন, তারও করতে হবে। সবার উপর এ কাজ আবশ্যক। সারকথা, দাওয়াতের এ কাজ উম্মাতের সকল ব্যক্তির উপর যেমন ব্যাপক অর্থে ফরয, তেমনি উম্মাতের উলামা শ্রেণির উপর তা বিশেষভাবে ফরয।

কাজেই উলমায়ে কেরামকেও এ কাজ করতে হবে, বরং এ কাজের যিম্মাদারীও তাদের নিতে হবে। কেননা, ইলম ছাড়া নেতৃত্ব ফেতনা-ফাসাদ এবং গোমরাহীর পথ।

হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান নদভী রহ. উলামায়ে কেরাম সম্পর্কে হযরতজীর দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখ করে বলেন, “হযরত মাওলানার আন্তরিক বিশ্বাস ছিল, যে পর্যন্ত হক্কানী উলামায়ে কেরামের সতর্ক দৃষ্টি এই কাজের প্রতি আকৃষ্ট না হবে এবং যে পর্যন্ত তাঁরা দাওয়াত ও তাবলীগের এই নাযুক খেদমতের পরিপূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা না করবেন, সে পর্যন্ত কাজের ভবিষ্যত সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে না।

এজন্য তাঁর আন্তরিক আকাংক্ষা ছিল, এ কাজের যোগ্য লোকেরাই যেন তাঁদের মেধা ও খোদাপ্রদত্ত প্রতিভা সহকারে দাওয়াতের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে এগিয়ে আসেন।

একমাত্র তাঁদের কোরবানী দ্বারাই ইসলামের বাগান প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে, তাঁদের মাধ্যমেই কেবল এই পবিত্র বৃক্ষের প্রতিটি শাখা-প্রশাখা নতুন করে উজ্জীবিত হয়ে ওঠা সম্ভব। [দীনী দাওয়াত, পৃ. ৯৯]

এ ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরামের কাছে তিনি বয়ান বক্তৃতার মৌখিক সহযোগিতাই চাচ্ছিলেন না। বরং এ যুগের ওলামায়ে কেরামের কাছে তাঁর আবদার ছিলো এই যে, তাঁরা তাদের পূর্বসুরীদের অনুসরণে দীন প্রসারের আমলী মেহনত মোজাহাদায় ঝাঁপিয়ে পড়বেন এবং দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে ঘুরে হকের পয়গাম পৌঁছাবেন।

শাইখুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া সাহেবকে লেখা এক চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন,
“লম্বা সময় ধরে আমি এই ধারণা পোষণ করে আসছি যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের আলেম সমাজ দীন প্রচারের জন্য সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে করাঘাত করা শুরু না করবেন এবং জনসাধারণের মত তাঁরাও শহরে-গ্রামে এ কাজের জন্য সময় লাগাতে শুরু না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এই কাজ পূর্ণতায় পৌঁছতে পারবে না।

কেননা বাস্তব কর্মক্ষেত্রে জনসাধারণের উপর কাজের যে প্রভাব পড়বে, তাঁদের অগ্নিঝরা বক্তৃতার মাধ্যমে সে প্রভাব পড়বে না। আমাদের আকাবিরগণের জীবনীতেও এমনই দেখা যায়, যা সম্পর্কে আপনাদের মত আলেমগণ ভালোই জানেন।”

[সাইয়্যেদ আবুল হাসান নদভী রহ. কৃত ‘হযরত মাওলানা ইলিয়াস আওর উনকী দীনী দাওয়াত : পৃ. ১০০]

দাওয়াতের পদ্ধতির ব্যাপকতা

তবে মনে রাখতে হবে, দাওয়াতের পথ ও পদ্ধতি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. এ জন্যই বলেছেন, “আমাদের এই তাবলীগী আন্দোলন দীনী তালীম ও তরবিয়ত বিস্তার করা এবং দীনী যিন্দেগী ব্যাপকভাবে প্রচার করার আন্দোলন। [মাওলানা মানযূর নোমানী রহ. কৃত ‘মালফুযাতে হযরত মাওলানা ইলিয়াস; মালফুয নং ১৩৫]

মাও. ইলিয়াস রহ. এর এ মালফুযাত দ্বারা বোঝা যায় যে, দাওয়াতের মূল লক্ষ্য হলো, প্রত্যেকের কাছে অন্যের দীনী ইলমের যে আমানত রয়ে গেছে, তা সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া।

সুতরাং মাকসাদ যদি হয় ইলম এবং দীনী আমানত পৌঁছে দেওয়া, তবে এ পৌঁছে দেওয়ার সকল মাধ্যমই দাওয়াত হিসাবে ধর্তব্য হবে।

কাজেই উম্মাতের কাছে দীন পৌঁছানোর নবীওয়ালা সকল জায়িয পদ্ধতিই দাওয়াতের অন্তর্ভূক্ত যেমন, দীনী বইপুস্তক লেখা, দীনী ওয়াজ মাহফিল করা, তালেবে ইলমকে শিক্ষা দেয়া, ইত্যাদি।

সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. তার বিখ্যাত গ্রন্থ দীনী দাওয়াত-এ উল্লেখ করেছেন, দাওয়াত ও তাবলীগের কোনো সাধারণ সাথী যদি দাওয়াতের কাজের প্রতি সাধারণ আলেম সমাজের অনীহা বা অনাগ্রহ সম্পর্কে অভিযোগ করতেন, তাহলে হযরত মাওলানা ইলিয়াস বিরক্ত হয়ে বলতেন, ‘তোমরা ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-কৃষি ইত্যাদি নিছক দুনিয়াদারি ত্যাগ করে এ কাজে আসতে কত ইতস্তত করে থাক, আর উলামায়ে কেরাম যেসব কাজ করেন, সেগুলো তো দীনের কাজ। তারা তাদের কাজ ছেড়ে এত সহজে চলে আসবেন, এমন আশা কর কেন?

তাদের প্রতি তোমাদের অভিযোগ কেন? জনসাধারণকে সম্বোধন করে তিনি আরো বলতেন, ‘যদি হাযারাত উলামায়ে কেরাম এই কাজের দিকে মনোযোগ কম দেন কিংবা অংশ গ্রহণ না করেন তাহলে তাদের অন্তরে যেন উলামায়ে কেরামের প্রতি কোন ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন না করে।

বরং এটা বুঝা উচিৎ যে, উলামায়ে কেরাম আমাদের থেকেও গুরত্বপূর্ণ কাজে মশগুল আছেন যার ফলে তারা আমাদের সময় দিতে পারছেন না। তারা তো গভীর রজনীতেও ইলমে দীনের খেদমতে মশগুল থাকেন যখন অন্যরা আরামের নিদ্রায় বিভোর হয়ে থাকে। [‘মালফুযাতে হযরত মাওলানা ইলিয়াস; মালফুয নং ৫৪]

কাজেই নবীওয়ালা তরীকায় দীন পৌঁছানোর সকল জায়িয মাধ্যমই তাবলীগ হিসাবে গণ্য হবে। উলামায়ে কেরাম দীনের যে খেদমাতে ব্যস্ত রয়েছেন, সব খেদমতই তাবলীগ হিসাবে ধর্তব্য হবে।

কিন্তু, দাওয়াতের এ সকল পদ্ধতির পাশাপাশি হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. দাওয়াতের মেহনতের যে ধারা শুরু করেছেন, সে পদ্ধতিতেও আমাদের আওয়াম, খাওয়াস জনসাধারণ এবং বিশেষভাবে উলামা শ্রেণী সকলেরই অংশগ্রহণ করা উচিত।

কেননা, এ পদ্ধতি উম্মাতের সব তবকার কাছে খুব সহজে দীন পৌঁছানো যায়। ফলে জনসাধারণের জন্য যেমন তাদের দাওয়াতের দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়া সহজ, তেমনি উলামায়ে কেরামের জন্যও তাদের ইলমী আমানত উম্মাতের সব তবকার কাছে পৌঁছে দেওয়া সহজ।

দ্বিতীয়ত দাওয়াতের একটি মাকসাদ হলো ইলম পৌঁছানো, কাজেই আহলে ইলম তথা উলামায়ে কেরামই এ দাওয়াতের কাজের সবচেয়ে বেশি হকদার হবে।

দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতে উলামায়ে কেরামের পৃষ্ঠপোষকতা

উলামায়ে কেরাম যেহেতু এ কাজের বেশি হকদার, কাজেই আল্লাহ তা‘আলা দাওয়াতের এ প্রচলিত পদ্ধতিকেও শুরু করেছেন উলামায়ে কেরামের পৃষ্ঠপোষকতায়।

হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. তার এই মোবারক মেহনত আমাদের আকাবিরদের পরামর্শ, সমর্থন এবং সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু করেছিলেন। ফলে এ মেহনত নিযামুদ্দীন থেকে সারা বিশ্বে এমনকি বাংলাদেশেও ছড়িয়েছে উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে।

আরও পড়ুন: ‘কুরআনে হাফেজদের রক্তে ভেসে যাচ্ছিল মেঝে’

মাওলানা ইলিয়াস রহ. দারুল উলূম দেওবন্দের সন্তান। তিনি পুরো দশ বছর মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. এর সোহবতে কাটিয়েছেন। এরপর দারুল উলূম দেওবন্দে গিয়ে শাইখুল হিন্দ মাহমূদুল হাসান দেওবন্দী রহ. এর কাছে বুখারী ও তিরমিযী শরীফ পড়েন।

শাইখুল হিন্দের নির্দেশক্রমে মাওলানা খলীল আহমাদ সাহারানপুরী রহ. এর হাতে বাইয়াত হন।

পরবর্তীতে হযরত সাহারানপুরী রহ. এর পরামর্শে এবং হাকীমুল উম্মাত থানভী রহ. এর পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি দাওয়াতের এ মোবারক কাজ নেযামুদ্দিনে শুরু করেন। [আবুল হাসান আলী নদভী রহ. কৃত ‘মাওলানা ইলিয়াস আওর উনকী দীনী দাওয়াত’ পৃ.৪৮, ৫১, ৫২, ৫৯]

ফলে দারুল উলূম দেওবন্দ, হযরত গাঙ্গুহী রহ. ও শাইখুল হিন্দ রহ.-এর ‘ফয়য’ এবং হযরত সাহারানপুরী ও থানভী রহ. এর পরামর্শ, পৃষ্ঠপোষকতা এবং দু‘আর বরকতে মাওলানা ইলিয়াস রহ. দাওয়াত ও তাবলীগের এ মহান সূচনা করতে সক্ষম হন।

দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত: হযরত থানভী রহ. এর ভূমিকা

হাকীমুল উম্মাত থানভী রহ. ছিলেন মুজাদ্দিদুল মিল্লাত। আল্লাহ তা‘আলা তার মাধ্যমে ‘তাজদীদে দীন’ তথা উম্মাতের মাঝে দীনের যে বিষয়গুলো দীন থেকে বের হয়ে গিয়েছে, তা দীনের মধ্যে দাখেল করেছেন এবং দীনের নামে উম্মতের মাঝে যেসব কুসংস্কার চালু হয়েছিলো, সেগুলোর মূলোৎপাটন করে সহীহ দীনকে উম্মতের মধ্যে যিন্দা করার মহান দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন।

হযরতের বিশিষ্ট খলীফা প্রফেসর হযরত মাওলানা আব্দুল বারী সাহেব রহ. হযরতের তাজদীদী ও সংস্কারমূলক কর্মকান্ডের উপর মূল্যবান চারটি কিতাব লিখেছেন- এক. জামিউল মুজাদ্দিদীন; দুই. তাজদীদে মাআশিয়াত; তিন. তাজদীদে তাসাউফ ও সুলূক এবং চার. তাজদীদে তালীম ও তাবলীগ। তালীম এবং তাবলীগের বিষয়েও যে হযরত থানবী রহ. মুজাদ্দিদ ছিলেন, চতুর্থ কিতাবটিতে তারই বিশদ বর্ণনা রয়েছে।

হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. বস্তী নিযামুদ্দীন-এ পিতা এবং বড় ভাইয়ের উত্তরসূরী হিসাবে দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত শুরু করেছিলেন, তা মূলত হযরত থানভী রহ. এর মাশওয়ারা, দু‘আ এবং সমর্থনের মাধ্যমেই উৎকর্ষ লাভ করেছিলেন।

‘আশরাফু সাওয়ানেহ’ [আশরাফ চরিত] গ্রন্থে হযরত থানভী রহ .এর বেশকিছু চিঠিপত্র রয়েছে, যাতে তিনি দাওয়াত ও তাবলীগের সাথীদেরকে এ কাজের ব্যাপারে পরামর্শ এবং সুসংবাদ শুনিয়ে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

প্রফেসর আব্দুল বারী রহ. ‘তাজদীদে তালীম ও তাবলীগে’ কিতাবের মধ্যে এ মর্মে বলেন,‘আমি একবার বস্তী নিযামুদ্দীন-এ হযরত ইলিয়াস রহ. এর দরবারে উপস্থিত হলাম। যতদূর মনে পড়ে উপস্থিতির দ্বিতীয় দিনই ‘নূহ’ এলাকায় তাবলীগের একটি বড় ইজতেমা ছিলো।

হযরত [ইলিয়াস রহ.] আমাকে তাগিদ দিয়ে সাথে নিয়ে গেলেন। দু তিন দিন সার্বক্ষণিক হযরতের সোহবতে থেকে তাবলীগের কাজ পর্যবেক্ষণ করার সৌভাগ্য অর্জিত হওয়ার পর যখন দিল্লী থেকে সোজা ‘থানাভবন’-এ উপস্থিতির সময় হয়ে এলো, তখন হযরত এ কথা বললেন যে, এ কাজের বরকত মূলত হযরত [থানভী রহ.]-এর দু‘আরই ফসল!

সাথে এ কথাও বললেন, ‘হযরতের খেদমতে উপস্থিত হয়ে আমার সালাম পেশ করবেন। এখানের কাজের বিবরণ শোনাবেন। এর জবাবে হযরত যা কিছু বলেন, অবশ্যই আমাকে তা লিখে জানাবেন!’

আমি যখন হযরতের দরবারে উপস্থিত হলাম এবং হযরতকে বাংলাওয়ালী মসজিদ থেকে নিয়ে নূহ পর্যন্ত দাওয়াত ও তাবলীগের কর্মকান্ডের উপর নিজের অভিব্যক্তি পেশ করলাম, তখন হযরত বললেন, ‘আসল কাজ তো এটাই’! [তাজদীদে তালীম ও তাবলীগ : পৃ. ১৭৩]

থানভী রহ. এর ইন্তেকালের পর বিগত জীবনে তাঁর এই পৃষ্ঠপোষকতার কারণে হযরতজী ইলিয়াস রহ.ও দাওয়াত ও তাবলীগের সাথীদেরকে থানভী রহ. এর জন্য বেশি বেশি কুরআন পাঠ করে তার উদ্দেশ্যে ঈসালে সওয়াবের জন্য, তার কিতাবগুলো পাঠ করার জন্য, তার সোহবাতপ্রাপ্ত বুযুর্গানে দীনের সংশ্রব গ্রহণ করার জন্য নির্দেশ দিতেন।

সাথে সাথে এ কথাও বলতেন যে, “হযরত মাওলানা থানভী রহ. বহুত বড় কাজ করেছেন, আমার দিল চায় যে, তালীম হবে তার তরীকায়, আর তাবলীগ হবে আমার তরীকায়।

এভাবে তার তালীম ব্যাপক হয়ে যাবে”। [সাইয়্যেদ আবুল হাসান নদভী রহ. কর্তৃক সংগৃহিত ও সংকলিত ‘মাকাতিব হযরত মাওলানা ইলিয়াস : পৃ. ১৩৭ (মেওয়াতিদের প্রতি প্রেরিত ১নং চিঠি)]।

দ্বিতীয় কিস্তি পড়ুন আগামী কাল ইনশাআল্লাহ

শাইখুল হাদিস মুফতি মনসূরুল হকের সমস্ত বয়ান, মালফুজাতসহ উলামা ও তাবলীগের মুরব্বিদের অসংখ্য বয়ান ও কিতাবের অন্যন্য অ্যাপ ইসলামী যিন্দেগী। উপকারী অ্যাপটি আপনার মোবাইলে এখনই ইনস্টল করতে ক্লিক করুন 

আরআর