শুক্রবার, ২২ জুন ২০১৮

কার ভুলে ঝরে গেল এতোগুলো তাজা প্রাণ?

OURISLAM24.COM
মার্চ ১৩, ২০১৮

সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন

‘উড়োজাহাজটি নামার আগমুহূর্তে বাঁ কাত হয়ে যায়। যাত্রীরা চিৎকার করতে শুরু করেন। হঠাৎ করে পেছনে আগুন দেখতে পাই আমরা। আমার বন্ধু আমাকে বলে, “চলো দৌড়ে সামনে যাই।” কিন্তু আমরা যখন দৌড়ে সামনে যাচ্ছিলাম, আমার বন্ধুর গায়ে আগুন ধরে যায়। সে পড়ে যায়।’

কাঠমান্ডুতে গতকাল সোমবার বিধ্বস্ত হওয়া ইউএস-বাংলার বিএস ২১১ ফ্লাইট থেকে প্রাণে রক্ষা পাওয়া যাত্রী শাহরীন আহমেদ এভাবেই গণমাধ্যমে ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন।

২৯ বছরের শাহরীন এক বন্ধুর সঙ্গে নেপালে বেড়াতে যাচ্ছিলেন। ওই দুর্ঘটনায় তাঁর শরীরের অনেক জায়গায় পুড়ে গেছে। বর্তমানে কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ টিচিং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এ লেখাটি যখন লিখতে বসেছি, তখন গণমাধ্যমে প্রকাশ- ইউএস-বাংলার বিমান দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫০ জনে দাঁড়িয়েছে। বিমানের আহত পাইলট ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতানও আজ (১৩ মার্চ)সকালে কাঠমান্ডু হাসপাতালে মারা গেছেন।

এদিকে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নিহত ৫০ জনের মধ্যে ২৬ জনই বাংলাদেশি। আর বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের যে ২২ আরোহীককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ৯ জন বাংলাদেশি। তারা কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হতাহতদের সনাক্ত করতে তাদের স্বজনরা আজ সকালে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে নেপাল গেছেন।

উল্লেখ্য, ঢাকা থেকে বিমানটি ৭১ জনকে নিয়ে আকাশে ওঠে। এতে ছিলেন ৩৩ বাংলাদেশি, ৩২ নেপালি এবং একজন করে চীন ও মালদ্বীপের নাগরিক। ক্রু ছিলেন চারজন। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার সময় আরোহীরা দুর্ভাগ্য কবলিত হন।

বিধ্বস্ত বিমানটিতে ছিল ১৩ জন মেডিকেল শিক্ষার্থী। যার মধ্যে ১১ জন মেয়ে ও ২ জন ছেলে। তারা নেপালের নাগরিক ছিলেন। বাংলাদেশের সিলেটের জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী।

পরীক্ষা শেষে নিজ দেশ নেপালে বাড়ি ফিরছিলেন তারা। কিন্তু তার আগেই নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডুতে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটে।

ধারণা করা হচ্ছে, হঠাৎ যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিলে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। রানওয়ের দক্ষিণ দিক দিয়ে অবতরণের অনুমতি ছিল। কিন্তু পাইলট বিমানটি নামিয়ে আনেন উত্তর দিক দিয়ে।

দেখা যায়, এলোমেলো গতিতে রানওয়ে স্পর্শ করলেও হড়কে গিয়ে বিমানটি পাশের ফুটবল মাঠে বিধ্বস্ত হয় এবং তাতে আগুন ধরে যায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এ বিমান দুর্ঘটনায় পরস্পরকে দায়ী করছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও ত্রিভুবন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। পাইলট কন্ট্রোল রুমের নির্দেশনা মেনে অবতরণ করেনি, বলে অভিযোগ করছে ত্রিভুবন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

আর দুর্ঘটনায় পাইলট বা বিমানের কোনো ত্রুটি ছিল না, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ভুলের কারণে বিমানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বলে দাবি ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষের।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইমরান আসিফ গত সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরের কন্ট্রোল রুমের অর্থাৎ এটিসির (এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল) ভুল বার্তার কারণে বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে যে তথ্য এসেছে সেটি তিন মিনিটের একটি রেকর্ড। ওই এটিসি (এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল) কনভারশনের ব্রিফিংটি ইউটিউবেও পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের পাইলটদের সঙ্গে নেপালের এটিসি টাওয়ারের কথোপকথন এটি।

এই কথোপকথন শুনলে বোঝা যাবে, এখানে এটিসির পক্ষ থেকে আমাদের পাইলটদের ভুল বার্তা দেওয়া হয়েছিল এবং নেপালিদের পক্ষ থেকে দায়িত্বে গাফিলতিও করা হয়েছিল। আমরা এ ব্যাপারে তদন্তও শুরু করেছি|’

এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল-এটিসি ও পাইলটের কথোপকথনের শেষ ৪ মিনিট শুনে বোঝা যায়, এটিসির দুইরকমের নির্দেশনায় পাইলট বিভ্রান্ত হন। অবশ্য এরইমধ্যে উড়োজাহাজের ব্ল্যাকবাক্স উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, রানওয়ের কোন দিক দিয়ে পাইলট ল্যান্ড করবেনÑ এ ব্যাপারে দিকনির্দেশনা ছিল নিশ্চয়ই। চার মিনিটের কথোপকথনে কি পাইলটদের ল্যান্ড করার জন্য বিভিন্ন বার্তা প্রদানের প্রমাণ মিলেনি? সেই বার্তায় কাঠমান্ডু টাওয়ারের এটিসি কর্তৃপক্ষ কি তবে পাইলটদের ভুল রানওয়েতে ল্যান্ড করতে বলেছিলেন?

এমন তির্যক প্রশ্নের কারণ হচ্ছে, গণমাধ্যমে এসেছে- এই দুর্ঘটনায় কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল না। দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত বিমানটির বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের এমন আরও চারটি বিমান আছে, আর এর চারটিই এখন ফ্লাই করে।

আর বিমানটির ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান ছিলেন অনেক অভিজ্ঞ। তিনি এয়ারফোর্সের সাবেক পাইলট। তার ফ্লাইং আউয়ার ৫ হাজারের বেশি। এই এয়ারক্রাফটে তিনি ১৭০০ ঘণ্টার বেশি ফ্লাই করেছেন। তিনি ছিলেন এই এয়ারক্রাফটের একজন ইনস্ট্রাক্টর। তবে কথা আছে, ভুল যে কারোর হতে পারে।

প্রসঙ্গত, হিমালয়কন্যা নেপালে গত ৭ বছরে ১৫টি ছোট-বড় প্লেন ক্রাশের ঘটনা ঘটেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিতি রয়েছে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের। পর্বত ছাড়াও প্রায়ই ঘন কুয়াশা ঘিরে ফেলে ত্রিভুবন বিমানবন্দরকে।

এ কারণে ফ্লাইট পরিচালনায় বিপত্তিতে পড়তে হয় পাইলটদের। কিন্তু বিমান সংস্থাগুলো লাভের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ এই বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা করে।

এই রুটে নিয়মিত চলাচল করেন, এমন চারজন পাইলট গণমাধ্যমকে বলেন, ত্রিভুবনে উড়োজাহাজ ওঠা-নামা করানোর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে হয়। অঙ্কের জটিল হিসাব কষে অবতরণ করাতে হয়।

ত্রিভুবন বিমানবন্দরের আরেক বিপত্তির কারণ, এখানে অটোমেটিক ল্যান্ডিং সিস্টেমও নেই। এ পদ্ধতি থাকলে বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে রানওয়ের ৫০ ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় থাকা উড়োজাহাজকে নির্দেশনা দেওয়া যায়।

শাহজালালসহ বিশ্বের অন্যান্য বিমানবন্দরে অবতরণের সময় সাধারণত ৮০০ মিটার দূর থেকে রানওয়ের দিকে লক্ষ রাখেন পাইলটরা। কিন্তু অটোমেটিক ল্যান্ডিং সিস্টেম না থাকায় তিন কিলোমিটার দূর থেকে ত্রিভুবনের রানওয়ের দিকে লক্ষ রাখতে হয় তাঁদের।

তা ছাড়া এর রানওয়ের দুই পাশেই রয়েছে পাহাড়। কোনো কারণে উড়োজাহাজ ত্রিভুবন বিমানবন্দর এলাকা পেরিয়ে গেলে আবার নতুন হিসাব কষে অবতরণ করাতে হয়।

এ তো গেল অবতরণের ঝক্কি। এবার উড্ডয়নের পালা! পর্বত-পাহাড়ের কারণে উড়োজাহাজ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আকাশের ওপর নিয়ে যেতে হয়। কারণ, ২৫ হাজার ফুট উচ্চতার অসংখ্য পর্বত রয়েছে। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সাড়ে ১১ হাজার ফুট ওপরে নিয়ে যাওয়ার পরই পাইলট ঠিক করেন কোন দিকে তাঁর উড়োজাহাজকে নিয়ে যেতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এ কেমন আয়োজন নেপালীদের?

নেপালের জরিপ সংস্থা নেপাল ইন ডাটা অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এসব প্লেন ক্রাশের ঘটনায় মোট ১৩৪ জন যাত্রী নিহত হয়েছেন। ওই ৭ বছরের প্রতিবছর কমপক্ষে একটি করে বিমান দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। চলতি বছরে বাংলাদেশি ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি বিমান সোমবার দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।

গতকাল বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশের সিভিল এভিয়েশনের টিম এরই মধ্যে নেপালে চলে গেছে। যেহেতু দুর্ঘটনাটি ঘটেছে নেপালে, এজন্য তদন্তের উদ্দেশ্যে সেখানেই কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে নেপালের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশের সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষেরও কথা হয়েছে।

দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যাপারগুলো চিহ্নিত করার জন্য ৬ সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করেছে নেপাল। আমরা ওই কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনের প্রতীক্ষায় থাকব। তবে সাধারণ্যে যা বলাবলি হয় তাও বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে।

মুনাফার তীব্র বাসনায় জরাগ্রস্ত উড়োজাহাজ সস্তায় ভাড়া করে এনে বহরবৃদ্ধির প্রবণতায় ভোগে বিভিন্ন এয়ারলাইনস-এই অভিযোগ পুরানো।

১২ মার্চের মর্মান্তিক ঘটনার জন্য এরকম কোনো প্রবণতা ক্রিয়াশীল ছিল কি না, কে জানে। এই দুর্ঘটনায় যারা আহত হলেন আমরা প্রার্থনা করি তারা দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠুন। যারা আকস্মিকভাবে তাদের প্রিয়জনকে হারালেন তাদের বেদনার সঙ্গে আমরা একাত্মতা প্রকাশ করছি। সেই সঙ্গে কামনা করছি এই ধরনের ট্র্যাজেডি যেন আর কখনো না ঘটে।

লেখক : কবি, গবেষক ও সাংবাদিক
[email protected]
১৩.০৩.২০১৮