সোমবার, ২৫ জুন ২০১৮

বেফাকের কমিটি নিয়ে ময়মনসিংহ আলেমদের নতুন কর্মসূচি; সমাধান কোন পথে?

OURISLAM24.COM
মার্চ ১০, ২০১৮
news-image

উবায়দুল্লাহ সাআদ
বিশেষ প্রতিবেদক

বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের ১০ম কাউন্সিল নিয়ে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল ময়মনসিংহ আলেমদের মধ্যে তা এখনো বিদ্যমান।

ইত্তেফাকুল উলাম ময়মনসিংহের ডাকে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ৬টি কর্মসূচির ঘোষণা করেছিলেন তারা। সুরাহা না হলে নতুন কর্মসূচিতে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

তারা অভিযোগ করেছে, বেফাকের অধীনে নয় হাজারের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে তিন হাজারের মতো প্রতিষ্ঠান ময়মনসিংহে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে বেফাকের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পেয়েছেন মাত্র নয়জন।

এর আগে অনুষ্ঠিত বেফাকের কাউন্সিলে ইত্তেফাকুল উলামা মজলিশে আমেলার সভাপতি মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী তিনটি প্রস্তাব করেছিলেন।

প্রস্তাব তিনটি হল

১. বেফাকের ‘মজলিসে খাসসা’ তথা ‘বিশেষ কমিটি’ বিলুপ্তি করা হোক। কারণ, এতে মজলিসে আমেলার অবমূল্যায়ন হয়।

২. যে এলাকায় যত বেশি প্রতিষ্ঠান বেফাকে অন্তর্ভূক্ত, সে দিকে লক্ষ্য রেখে সদস্য নির্বাচন করা। যাতে বেফাকে অগ্রগামী ব্যাক্তিগণ বঞ্চিত না হয়।

৩. কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কোনো এক অঞ্চলে নেতৃত্বের দায়ভার যেন অর্পিত না হয়। তাহলে এই আঞ্চলিক করণের কারণে বেফাকের বদনাম হতে পারে। অতএব নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে যথাযোগ্য ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেয়া।

ময়মনসিংহ আরেমদের দাবি, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদীর প্রস্তাব সময় উপযোগী হওয়া সত্বেও প্রস্তাব কোনো পর্যালোচনা ছাড়াই তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।

সূত্র জানিয়েছে মূলত ক্ষোভের সৃষ্টি এখান থেকেই। পরে কমিটি ঘোষিত হলে তাতে দেখা যায় মাত্র ৯জন স্থান পেয়েছেন বৃহত্তর ময়মনসিংহ থেকে। আলোচিত হয়েছে বেফাক কাউন্সিলে মাওলানা খালেদ খালেদ সাইফুল্লাহ সাদীর দর্শকসারীতে দাড়িয়ে বক্তব্যের বিষয়টিও।

কাউন্সিল শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মাথায় নানা আলোচনা সমালোচনার পর এ বিষয়ে কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করতেই গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বৃহত্তর ময়মনসিংহের কওমি মাদরাসাসমূহের প্রিন্সিপাল ও কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে শেষে তারা ছয় দফা কর্মসূচিও ঘোষণা করেন যেখানে সদ্য অনুষ্ঠিত বেফাকের ১০ম কাউন্সিল বাতিলসহ গঠনতন্ত্র সংশোধন ও অনুমদন বিধি মোতাবেক না হওয়ায় পূণরায় গঠনতন্ত্র সংশোধন ও অনুমদনের দাবি জানানো হয়।

মজলিশে খাসসা নামে কার্যকরি পরিষদের সংক্ষিপ্ত পরিষদ বাতিলের সাথে সাথে বিগত সময়ে মজলিশে খাসে এ যাবৎকাল পর্যন্ত গৃহীত সিন্ধান্তবলী পুনর্বিবেচনারও দাবি জানিয়েছে তারা।

সৃষ্ট জটিলতা নিয়ে কথা বলেছিলাম বেফাকের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজু’র সঙ্গে। তিনি আওয়ার ইসলামকে বলেন, ময়মনসিংহের উলামায়ে কেরাম কেরামের বৈঠক ছিল ইত্তেফাকুল উলামার বৈঠক, এটা বেফাকের কোনো বৈঠক নয়।

কাউন্সিলের অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বেফাকের এই সহ সভাপতি বলেন, বেফাকের কাউন্সিলে যদি কোনো ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকে তাহলে সেটা সমাধানের নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে।

বেফাকের মজলিশে সুরা রয়েছে সেখানে আলোচনা করে সমাধান করা উচিৎ বলে আমরা মনে করি।

কাউন্সিলে মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদীর প্রস্তাব তিনটির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজু বলেন, প্রস্তাব তো যে কেউ করতে পারেন। সেই প্রস্তাবের পক্ষে বিপক্ষে আরো প্রস্তাব এসেছে আমাদের মুরুব্বীরা সেখানে ছিলেন অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতেই তো সব নীতিমালা পাশ হয়েছে। এটা নিয়ে ক্ষোভের কিছু নেই।

বেফাকের গঠনতন্ত্র বিধি মোতাবেক হয়নি ময়মনসিংহের উলামায়ে কেরামের এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, যদি গঠনতন্ত্রের মাঝে কোনো অসংগতি দেখা দেয় অবশ্যই সংশোধন করা হবে, কারণ গঠনতন্ত্র তো সবার সহজতার জন্যেই করা হয়েছে।

ময়মনসিংহের উলামায়ে কেরামের এমন কর্মসূচি স্যোশাল মিডিয়ায় মুহুর্তেই সারা দেশে ছড়িয়ে পরার পর এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা সমালোচনা হয়।

এ ক্ষেত্রে বেফাক সহসভাপতি মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজু মনে করেন, বিষয়টি এভাবে আলোচনা না করে বেফাকের নীতি নির্ধারণী ফোরামে আলোচনা করে সমাধান করা যেত। ময়মনসিংহের মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সা’দী সাহেবের বেফাকে অনেক অবদান রয়েছে। বেফাকের প্রবীণ মুরুব্বীদের তিনি একজন। হুজুরের নেতৃত্বে বেফাকের নির্বাহী কমিটিতে আলোচনা করে বিষয়গুলো সমাধান করা যেত।

এদিকে বেফাকের কাউন্সিল নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিয়ে বসে নেই বৃহত্তর ময়মনসিংহের উলামায়ে কেরাম, তারা তাদের কর্মসূচি চালিয়ে জাবেন বলে আওয়ার ইসলামকে জানিয়েছেন ইত্তেফাকুল উলামা বৃহত্তর ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ।

বেফাক জাতীয় সংগঠন এটাকে কোনো নির্দিষ্ট বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করবে তা হতে পারে না উল্লেখ করে মাওলানা আবুল কালাম সব অনিয়মের সমাধান দাবি করেন মুরুব্বীদের কাছে।

ময়মনসিংহের উলামায়ে কেরামের দেয়া দাবিগুলির সাথে একমত কিনা জানতে চাইলে বেফাকের সহসভাপতি মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজু বলেন, সংখ্যানুপাতিক হারে দায়িত্বশীল নির্বাচিত করা অর্থ্যাৎ যে এলাকায় যত বেশি প্রতিষ্ঠান বেফাকে অন্তর্ভূক্ত, সে দিকে লক্ষ্য রেখে সদস্য নির্বাচন করা এ দাবিটির সাথে একমত পোষণ করি।

বেফাকের অধীনে সব চেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠান ময়মনসিংহে এমনকি বেফাকের ভিত্তি যে কটি মাদরাসাকে মনে করা হয় যারা শুরু থেকেই বেফাকে আছেন সেগুলি ময়মনসিংহে, সুতরাং তাদের দাবি না মানার প্রশ্নই আসে না। অবশ্যই তারা যদি মুরুব্বীদের বলেন মুরুব্বীরা সেটা মানবেন বলে আমি আশা করি।

বেফাকের অধীনে ময়মনসিংহের এত বেশী প্রতিষ্ঠান থাকা সত্বেও কমিটিতে কেন মাত্র ৯জন এমন প্রশ্ন করা হলে বেফাকের সহসভাপতি মাওলানা মুসলিহুদ্দীন রাজু আওয়ার ইসলামকে জানান, ময়মনসিংহ নতুন বিভাগ হয়েছে ইতিপূর্বে ঢাকা বিভাগের অধীনে ছিল ময়মনসিংহ কোন বিভাগ থেকে কতজন কমিটিতে এসেছে সেটা হিসাব করে কমিটি হয়নি।

তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে আমি মনে করি কেন্দ্রের সাথে বৃহত্তর ময়মনসিংহের আলেমদের যোগাযোগটা কম, মিটিংগুলিতে তাদের অংশগ্রহণ আরো বাড়াতে হবে।

ইত্তেফাকুল উলামা বৃহত্তর মোমেনশাহীর উদ্যোগে গত ৫ মার্চ সোমবার ময়মনসিংহ বড় মসজিদে বৃহত্তর মোমেনশাহীর তথা ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর, শেরপুর ও টাঙ্গাইলের ইত্তেফাক নেতৃবৃন্দের এক বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বেফাকের অসাংবিধানিক কার্যক্রম সংক্রান্ত জাতীয় স্বার্থে ইত্তেফাকুল উলামা বৃহত্তর মোমেনশাহীর উদ্যোগে আল্লামা আবদুর রহমান হাফেজ্জী, আল্লামা আবদুল হক ও মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদীর আহ্বানে আগামী ১৫ মার্চ দেশের বিভিন্ন জেলার ওলামাদের অংশগ্রহণে ময়মনসিংহের বড় মসজিদে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

ইত্তেফাকুল উলামার কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল আওয়ার ইসলামকে এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ১৫ মার্চের আলোচনা সভায় ঢাকার একাংশ, সিলেট বিভাগের একাংশ, বরিশাল বিভাগ, গাজীপুর, যশোর, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর, শেরপুর, টাইঙ্গাল, ময়মনসিংহসহ আরও বেশ কিছু এলাকার ওলামাদের উপস্থিতি আশা করা হচ্ছে।

বৃহত্তর ময়মনসিংহের উলামায়ে কেরামের উত্থাপিত দাবি নিয়ে বেফাক কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছে কিনা জানতে চেয়েছিলাম বেফাকের মহাপরিচালক অধ্যাপক মাওলানা যোবায়ের আহমদ চৌধুরীর আওয়ার ইসলামকে জানিয়েছেন, আমরা সংবাদ মাধ্যমে তাদের দাবিগুলি জেনেছি। এখন লিখিতভাবে পেলে মুরুব্বীরা এ ব্যাপারে আলোচনা করে সিন্দান্ত নিবেন।

তিনি বলেন, মিটিংগুলিতে তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে আলোচনা করে তা সমাধান করা যাবে, তাই বলে তরুণদেরকে মুরুব্বীদের বিরোধিতায় উৎসাহ প্রদানের পক্ষে আমি নই।

 

আরও পড়ুন: বেফাক নিয়ে ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের অভিযোগ: যা বললেন বোর্ড নেতারা