রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮

৩ দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন যিনি

OURISLAM24.COM
ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৮
news-image

আতাউর রহমান খসরু

উসমানীয় সামরিক বাহিনীতে স্বপ্নীল দিন শুরু করেছিলেন ফাওজি আল কাওকাজি। কিন্তু নিজের সব সম্ভাবনা পেছনে ফেলে তিনি বুকটান করে দাঁড়ালেন ব্রিটিশ সম্রাজ্যের বিরুদ্ধে।

লড়াই করলেন নিজে এবং নেতৃত্ব দিলেন অসংখ্য তরুণকে। তিনি ও তার বাহিনী পরিণত হলেন যমদূতে। সুদীর্ঘকাল তিনি সিরিয়া, ইরাক ও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে অকুতোভয় সৈনিক কাওকাজি হয়ে উঠলেন আরব কিংবদন্তী।

১৮৮০ সালে লেবাননের (তৎকালীন) ত্রিপলিতে জন্মগ্রহণ করেন ফাওজি আল কাওকাজি।

লেখাপড়া করেন ইস্তাম্বুল সামরিক কলেজে। ইস্তাম্বুল সামরিক একাডেমি থেকে ১৯১২ সালে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন ইরাক ও ফিলিস্তিন ফ্রন্টে।

একুশে বইমেলায় প্রকাশিত সব বই দেখতে ও কিনতে ক্লিক করুন 

উসমানীয় বাহিনীর পতন ও আনাতোলিয়ার পিছু হটার পর আল কাওকাজির ক্যারিয়ার থমকে দাঁড়ায়। পরবর্তী বছরগুলোতে তরুণ সেনা অফিসার সিরিয়ায় ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। ১৯২৫ সালের গণবিপ্লবে সফল নেতৃত্ব দেন তিনি।

ফ্রান্স অনুদানে গঠিত সিরিয়ান বাহিনী তার ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ার পরও তিনি দমে যান নি। বরং একের পর এক আরব জাতীয়তাবাদী সবগুলো যুদ্ধে কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বপালন করেন।

তার যুদ্ধজীবন শুরু হয় উসমানীয় সম্রাজ্যের হয়ে। ১ম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় সম্রাজ্যের পক্ষে ইরাকের মসুলে অবস্থিত ১২তম উসমানীয় পদাতিক বাহিনীর ক্যাপ্টেনের দায়িত্বপালন করেন। ইরাকের কুরনা, ফিলিস্তিনের বিরসেবাসহ গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় তুরস্ক তাকে মাজিদি মেডেল এবং জার্মান আইরন ক্রোস পদক প্রদান করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উসমানীয় সম্রাজ্য ভেঙ্গে পড়লে আল কুয়েকজি আরব রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন করে।

তিনি ১৯২০ সালে গঠিত আরব কিংডম অব সিরিয়াকে সমর্থন করেন। সিরিয়া ভিত্তিক ক্ষণজন্ম (মাত্র ৪ মাস স্থায়ী হয়) রাষ্ট্রের পক্ষে কিং ফয়সালের বাহিনীর একজন সেনা অফিসার হিসেবে মাইসালুন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

মূলত তুরস্ক থেকে লেবাননে ফিরে যাওয়ার পর শরিফ হুসাইনের ছেলে ফয়সাল তাকে সরাসরি তার নেতৃত্বাধীন বাহিনীতে যোগদানের প্রস্তাব করেন। তিনি তাতে সম্মত হন।

কিন্তু আরব কিংডম অব সিরিয়া প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। সিরিয়া ফ্রান্সের ম্যান্ডেটভূক্ত হয়। আল কাওকাজি তখন ফ্রান্স সরকারের অনুমোদন ও সহায়তায় গঠিত ফ্রেন্স-সিরিয়ান আর্মিতে যোগদান করেন।

যে ভাষায় কথা বলার মানুষ মাত্র ৩জন

তিনি ফ্রান্সের সামরিক একাডেমিতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে হামায় একটি অশ্বারোহী স্কোয়াড্রনের কমান্ডার নিযুক্ত হন।

ফ্রান্সের সামরিক বাহিনীতে তার যোগদানের সমালোচনা করেন অনেকে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, ফ্রান্সের সামরিক একাডেমির আধুনিক প্রশিক্ষণ তার পরবর্তী জীবনের জন্য আশির্বাদ হয়েছিলো।

১৯২৫ সালে লেবানন পর্বতে সুলতান আল আতরাস ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। যা অব্যহত থাকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত। এ বিদ্রোহের পরপর হামায় আল কাওকাজির অধীনে থাকা সৈন্যদের নিয়ে তিনি সে বছরের অক্টোবরে বিদ্রোহীদের দলে যোগদান করেন এবং ফরাসি বাহিনীর জন্য বিভীষিকা হিসেবে উপস্থিত হন। সামনে থেকে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন।

এরপর লেবাননের বিখ্যাত রাজনীতিক ও লেখক সাকিব আরসালানের অনুরোধে তিনি হেজাজে আগমন করেন এবং সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজের সেনা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেন।

কিন্তু তিনি আবদুল আজিজের সঙ্গে একমত হতে পারেন নি। তার মনে হয় বাদশাহ আবদুল আজিজ স্বার্থপর এবং তার কর্মকাণ্ড সন্দেহজনক। বিশেষত তিনি সৌদি আরবের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ককে ভালো চোখে দেখেন নি। তিনি সৌদি আরবে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত অবস্থান করেন।

১৯৩২ সালে তিনি বাগদাদের আহবানে ইরাকি সামরিক বাহিনীর অফিসার ও মিলিটারি একাডেমির প্রশিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।

ইসলামি কিতাব, বয়ান ও মালফূযাতের অন্যন্য অ্যাপ

১৯৩৬ সালে আল কাওকাজি ব্রিটেন ও ইহুদি দখলদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। তার এ যুদ্ধের ফলে আরবে গণজাগরণ শুরু হয়।

যাকে ১৯৩৬-৩৯ আরব গণজাগরণ বলা হয়। এ সময়ে তিনি ইরাক ভিত্তিক সোসাইটি ফর দ্য ডিফেন্স অব প্যালেস্টান-এর প্রতিনিধিত্ব করেন। ফিলিস্তিনি যুদ্ধের নেতৃত্বের জন্য ইরাকি সামরিক বাহিনী ও রয়েল মিলিটারি কলেজের পদ থেকে অব্যহতি নেন।

ফিলিস্তিন সংগ্রামে সহায়তার জন্য কাওকাজি ইরাকে নিযুক্ত জার্মান অ্যাম্বাসেডরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সহযোগিতা লাভে সক্ষম হন। আল কাওকাজি ‘সুপ্রিম কমান্ডার অব দ্য আরব রেভ্যুলেশন ইন সাউথ-সিরিয়ান প্যালেস্টাইন’ নামে একটি বাহিনী গঠন করেন।

যাতে ইরাক, সিরিয়া ও জর্ডানের স্বেচ্ছাসেবী সৈনিকগণ যোগদান করেন। ২৬ অক্টোবর ১৯৩৬ আল কাওকুজি ও বাহিনী জর্ডান নদী পার হয়ে ফিলিস্তিনে উপস্তিত হন। কাওকাজির এ বাহিনীতে প্রায় পাঁচশত অনিয়মিত সৈনিক ছিলো। ১৯৪১ সাল পর্যন্ত তিনি ফিলিস্তিনে সংগ্রাম করেন।

Related image

১৯৪১ সালে রাশিদ আলি আল খিলানির ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিতে ইরাকে ফিরে আসেন এবং ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন ট্রান্সজর্ডান আর্মির সঙ্গে এক যুদ্ধে মারাত্মকভাবে আহত হন।

তখন উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে জার্মানিতে পাঠানো হয়। ২য় বিশ্ব যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত তিনি জার্মানিতেই অবস্থান করেন এবং একজন জার্মান নারীকে বিয়ে করেন।

জার্মান সেনা বাহিনী তাকে কর্নেল পদমর্যাদা প্রদান করে। জার্মানে অবস্থানকালে তিনি আরব-জার্মান জোট গঠনের চেষ্টা করেন। জার্মান সরকারের প্রচণ্ড চাপের মুখে তিনি এ উদ্যোগ গ্রহণ করেন বলে পরবর্তীতে জানা যায়।

কিন্তু তিনি তাতে সফল হওয়ার আগেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু হয়। যুদ্ধের শুরুতেই ১৯৪৫ সালে রুশ বাহিনীর হাতে আটক হন এবং ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ পর্যন্ত বন্দী থাকেন। মুক্তি পাওয়ার পর ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ সালে তিনি মিসরের কায়রোতে পৌঁছান।

অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকার ফাওজি কাওকাজিকে নিয়ে বেশ বিব্রত ছিলো নিজ দেশে। ব্রিটিশ সরকার চাইলো ফ্রান্স থেকে মিসর পৌঁছানোর পূর্বেই তাকে হত্যা করা হবে।

মিসরগামী কাওকাজির বিমানটি লিডা বিমানবন্দরে অবতরণ করতে বাধ্য করা হয়। তাকে খুঁজতে ব্রিটিশ বাহিনী প্রতিটি ব্যক্তি ও মালামাল চেক করেন। কিন্তু রহস্যজনকভাবে তিনি বেঁচে যান।

ব্রিটিশ বাহিনী যখন তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলো তিনি তখন তার স্ত্রীর সঙ্গে নিখাঁদ জার্মান ভাষায় কথা বলছিলেন। এতে তারা তাকে আর জেরা করে নি।

ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ডকুমেন্টস-এ বলা হয়েছে কাওকাজি সেদিন জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করেছিলো। তার মালামালও রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছিলো অন্যের নামে।

ব্রিটিশ সরকার কাওকাজিকে গ্রেফতার করতে না পেরে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। তাকে মিসরে যেনো প্রবেশ করতে দেয়া না হয় সে অনুরোধ জানায় মিসর সরকারকে।

ইফোর্ট: টি শার্টে আধুনিকতা ও শালীনতার সমন্বয়

মিসরের প্রধানমন্ত্রী নুকরাশি পাশা প্রথমে তাকে তাৎক্ষণিক দেশত্যাগের নির্দেশ দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে সেনা বাহিনীর চাপে তিনি কাওকাজিকে ৪দিন অবস্থানের অনুমতি প্রদান করেন। তবে কাওকাজি পরের দিন মিসর ছেড়ে বৈরুতে চলে যান।

আরব ভূমিতে পা রেখেই তিনি আরব জনগণকে অস্ত্র ধরার আহবান জানান। আগস্ট ১৯৪৭ এ জাতিসংঘে ইসরাইল রাষ্ট্রের ব্যাপারে যে ভোট হয় কাওকাজি তা অন্যায় ও অন্যায্য বলে প্রত্যাখ্যান করার আহবান জানান।

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজন সর্বাত্মক যুদ্ধ। আমরা শহিদ হবো এবং ধ্বংস করবো যা কিছু আমাদের চলার পথে বাধা হবে। তারা ইহুদি, আমেরিকান বা ব্রিটিশ যাই হোক না কেনো।’

জাতিসংঘের ভোটে ফিলিস্তিন ভূমি ভাগ হওয়ার পর আরব জনগণ ও সরকারগুলো তা প্রত্যাখ্যান করে এবং ফাওজি কাওকাজির আহবান মতে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। তারা ‘আরব লিবারেশন আর্মি’ গঠন করে কাওকাজিকে ফিল্ড কমান্ডার নিযুক্ত করে। ১৯৪৮ আরব-ইসরাইল যুদ্ধে তিনি ফিল্ড কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আরব ইসরাইল যুদ্ধে আরব রাষ্ট্রগুলো পরাজয় মেনে নিলেও কাওকাজি তা মানতে ছিলেন নারাজ। তিনি ৫টি ট্রাকে প্রায় দুইশো সেনা সদস্যসহ ফিলিস্তিনের উদ্দেশে রওনা হন। দামেস্ক হয়ে তিনি ফিলিস্তিনে প্রবেশের চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্রিটিশ বাহিনী তাকে বাধা দেয়।

Image result for Fawzi al-Qawuqji

যুদ্ধের পর বিশ্রামে ফাওজি কাওকাজি

তবুও তিনি ছিলেন অনমনীয়। ইহুদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি ফিলিস্তিনে যাবো। সেখানে থাকবো এবং যুদ্ধ করবো যতোদিন না ফিলিস্তিন মুক্ত হয়। লক্ষ্য অর্জনের জন্য হয়তো সম্মিলিত আরব রাষ্ট্র অথবা আমি ধ্বংস হয়ে যাবো এবং আমাকে সেখানে দাফন করা হবে।’

ফাওজি কাওকাজি ইহুদি মুক্ত ফিলিস্তিনের স্বপ্ন দেখতেন। ১৯৪৮ এর এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কাওকাজি ফিলিস্তিনে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করেন এবং ইহুদি দখলদারদের পিছু হটতে বাধ্য করেন। কিন্তু ইহুদি বাহিনী যখন বিদেশি ভাড়াটে সৈনিক ব্যবহার শুরু করলো তখন তিনি যুদ্ধ অবসানে বাধ্য হলেন।

যুদ্ধ শেষ করে তিনি সিরিয়ার দামেস্কে ফিরে আসেন এবং লেবাননের বৈরুতে ডিসেম্বর ১৯৭৬ সালে মারা যান। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।

সূত্র : আল আহরাম, উইকিপিডিয়া, মিডল ইস্ট আই ও জিউস লাইব্রেরি

আমার জীবনের শুরুর মুহূর্ত