রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮

আপনার সন্তান কি অবসাদে ভুগছে? অবসাদ দূর করুন আপনি নিজেই

OURISLAM24.COM
ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৮
news-image

শাহনাজ শারমিন

প্রত্যকের জীবন তার আপন গতিতে চলছেই। জীবনের গতি বাড়তে বাড়তে এতটাই প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে গেছে যে এর তাল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ। বিনাযুদ্ধে কেউ কাউকে ছাড়বে না। সকলকেই আগে যেতে হবে। এগিয়ে যেতে হবে। কিন্তু এতো কিছুর পরেও মানুষের এই যান্ত্রিক দৌঁড়ে পিছিয়ে পড়ছে জীবন। বাঁচার আনন্দটুকুও হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে মানসিক অবসাদে।

প্রত্যেকেই কখনো-না-কখনো হতাশ হয়ে পড়ে, কিন্তু ডাক্তারি পরিভাষায় যাকে অবসাদ বা বিষন্নতা ইংরেজিতে একে ডিপ্রেশন বলা হয়। অবসাদ হলো নিস্তেজ করে দেওয়ার মতো এমন এক অসুখ, যা ক্রমাগত চলতেই থাকে আর একজন ব্যক্তির প্রাত্যহিক জীবনকে ব্যাহত করে। বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে একমত নয় যে, কোনটা ‘স্বাভাবিক’ বিষন্নতা আর কোনটা  ‘অসুস্থতা’।

কিন্তু সচরাচর দেখা যায় যে, কেউ কেউ খুবই নেতিবাচক আবেগের দ্বারা জর্জরিত হয়ে থাকে আর কখনো কখনো এর সঙ্গে যুক্ত হয়, অযোগ্যতার অনুভূতি ও অত্যধিক অপরাধবোধ। তাই আপনাকে অবশ্যই একঘেয়েমিজনিত ব্যাপারগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে। সপ্তাহে একদিন কোথাও বেড়াতে যান, আড্ডা দিন, কিছু আনন্দকর ব্যায়াম উপভোগ করুন, মজাদার কাজকর্ম করুন, দেখবেন কেটে গেছে বিরক্তিকর অবসাদ বা ক্লান্তি।

কিন্তু যদি আপনার সন্তানের ক্ষেত্রে এমন হয়! যেমন, আপনার আদরের চঞ্চল সন্তানটি হঠাৎ করে চুপচাপ হয়ে গেছে? আগের মত চঞ্চলতা, উচ্ছাস আর দুরন্তপনা সব হারিয়ে গেছে নিমেষে? পড়ালেখায় মন নেই, স্কুলেও সহপাঠীদের সঙ্গে ঝগড়া করছে? সারাদিন থেকে গভীর রাত পর্যন্ত স্মার্টফোনে মুখ গুজে থাকছে? কারো সঙ্গে মিশছেও না, তখন শুধু আপনি না যে কোনো অভিভাবকই দুচিন্তায় পড়ে যাবেন।

সন্তানের এসব লক্ষণ থাকলে আপনাকে সতর্ক হতে হবে। আপনার সন্তান খুব সম্ভবত অবসাদে ভুগছে। আর এ অবসাদগ্রস্ততা তাকে ব্লু হোয়েলের মত বিপজ্জনক অনলাইন গেমে আগ্রহী করে তুলতে পারে। অবসাদ বা বিষন্নতার কথা শুনলে মনে হতে পারে এতো বয়স্কদের ব্যাপার। কিন্তু মনোবিদরা জানালেন অন্য কথা। অবসাদ আশঙ্কা শিশুদের মধ্যেই বরং বেশি।

এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমান সময়ে প্রতি ২০ জন শিশুর একজন অবসাদে ভুগছে। শিশুদের অবসাদের সমস্যা সচরাচর দেখা যাচ্ছে। শিশুরা খুব ভঙ্গুর মনের অধিকারী হয়ে থাকে। আর পরিস্থিতির চাপে তারা অবসাদে আক্রান্ত হতে পারে, এমনকি পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়ার মত বিষয়ও তাদের অবসাদগ্রস্ত করতে পারে। আর অবসাদের কারণে ক্ষতিকর যেকোনো অনলাইন গেমে আসক্ত হয়ে পরতে পারে তারা। ব্লু হোয়েল বা অন্য যে কোনো ক্ষতিকর কিছুতে আসক্তিকে অবসাদের গভীর পর্যায় বলা যেতে পারে। একটু সচেতন হলেই অভিভাবক ও শিক্ষকরা শিশু মনে অবসাদের উপস্থিতি ধরে ফেলতে পারেন।

স্বাভাবিক প্রাণোচ্ছল শিশু যদি হঠাৎ গুটিয়ে যেতে থাকে নিজের খোলসে, তাহলে সতর্ক হোন। দৃষ্টি রাখুন, খোঁজ নিন সে সহপাঠীদের সঙ্গে ঝগড়া বা মারপিটে জড়িয়ে পড়ছে কিনা। যে পিতা মাতা দুজনেই কর্মজীবী তাদের সতর্ক হতে হবে বেশি, কিন্তু সন্তানকে সারদিন নজরবন্দী করারও প্রয়োজন নেই। নজর রাখতে হবে বাচ্চাটির ঘুমানোর প্যাটার্নের দিকেও।

বেশি রাত জেগে মুঠোফোনে তাকিয়ে থাকা, বা মাঝরাতে উঠে মোবাইলে ব্যাস্ত হয়ে পড়া, যেকোন আসক্তির লক্ষণ হতে পারে। সন্তানের মাঝে এসব অবসাদের লক্ষণ দেখলে সতর্ক হতে হবে আপনাকে।

আর অবসাদের লক্ষণ দেখতে পেলে বাবা-মাকে প্রথমেই বাচ্চাদের ওপর চাপের বোঝা কমাতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে পড়ালেখা বা স্কুলের চাপে তার জীবন থেকে আনন্দ যেন বাদ না পড়ে যায়। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’, ‘তোমাকে একশতে একশ পেতেই হবে’, ‘তুমি যথেষ্ঠ পরিশ্রমী নও’ এধরনের কথা বাচ্চাদের ওপর পর্বতসম চাপ তৈরি করতে পারে, তাই সতর্ক হোন।

প্রতিনিয়ত তার কমতির কথাগুলো তাকে শুনিয়ে গেলে, তারা নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে যেতে পারে। এখানেই জায়গা করে নেয় ব্লু হোয়েলের মত অনলাইন গেম। এসব অনলাইন গেমে বাচ্চারা একটি নকল পরিপূর্ণতা বোধ বা ‘আমি পেরেছি’ ধাচের মেকি সন্তুষ্টি পায়।

কোনো শিশু অনলাইন জগৎ বা ইলেকট্রনিক্সে আসক্ত হয়ে পড়লে সেটি একবারে একধাপে বন্ধ করতে যাওয়া উচিৎ নয়। তাকে ধীরে ধীরে, সময় নিয়ে কাউন্সেলিং আর গাইডেন্সের মাধ্যমে এ কাজটি করতে হবে। নইলে তার মধ্যে পারিবার-সমাজ জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতাবোধ জন্ম নিতে পারে। তাই কৌশলি হোন।

বিভিন্ন ক্ষতিকর ওয়েবসাইট নিয়ন্ত্রণ করতে কম্পিউটার বা মোবাইলে এড ব্লকার, কনটেন্ট ব্লকার অ্যাপ ব্যাবহার করুন। রাউটারে বিভিন্ন অনলাইন গেমের ওয়েবসাইটও ব্লক করতে পারেন আপনি। আপনাকে এবং আপনার সন্তানকে আগে বুঝে নিতে হবে অনলাইন জগত কি এবং কেনো। আড্ডা বা সামাজিক মেলামেশার মতো এখানে ধারণা বা জানা-বোঝা তৈরির সুযোগটি কম। তাই শিশুদের ভালো বন্ধু বেছে নেয়া, বন্ধুত্ব তৈরি করা এবং সামজিক জীবনে উৎসাহিত করতে হবে।

প্রায় সব মানুষই জীবনের একটা সময়ে মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। অথবা কোনো বন্ধু-বান্ধব বা কাছের কোনো মানুষকে অবসাদে আক্রান্ত হতে দেখে এ সম্পর্কে একটা ধারণা লাভ করে থাকেন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আপনার আবেগ-অনুভুতির নিয়ন্ত্রণের ভার একান্তই আপনার নিজের উপরই ন্যাস্ত করা হয়েছে।

যদিও পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবরা আপনাকে মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তিতে সহায়তা করতে পারে তথাপি এক্ষেত্রে আপনি নিজেই আপনার বস। মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে অবসাদ থেকে মুক্তির পথ অনেক বেশি কঠিন।

এসএস/