রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮

ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধ হবে তো?

OURISLAM24.COM
ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৮
news-image

সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন: কোনো জাতি বা গোষ্ঠীকে জানতে হলে তার সংস্কৃতির দিকে তাকালেই সব পরিষ্কার হয়ে যায়। অপরদিকে, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন হচ্ছে, একটি জাতি রাষ্ট্রের নিজস্ব সংস্কৃতি অন্য একটি জাতি বা রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আধুনিক সভ্যতার একটি বড় অভিশাপ।

আমাদেরও আছে গর্ব করার মতো হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। কিন্তু ভিনদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন আমাদের গৌরবোজ্জ্বল সংস্কৃতিকে আজ সুকৌশলে কোনঠাসা করছে। এককথায়, দিনে দিনে বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।

কিন্তু ঐতিহ্য রক্ষায় দায়িত্বশীলরা যে উদাসীন। তারা কি এমনটি ভাবেন না যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব থেকে রক্ষা করতে না পারলে একদিকে যেমন হারিয়ে যাবে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল সংস্কৃতি, তেমনি আমরা পিছিয়েও পড়ব।

আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিতে যেভাবে বিদেশি, বিশেষ করে ভারতীয় সংস্কৃতির মোড়কে বাস্তবতাবিবর্জিত কাল্পনিক ও মূল্যবোধের অবক্ষয় সৃষ্টিকারী সংস্কৃতির নগ্ন আগ্রাসন চালানো হচ্ছে, তাতে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে খুব বেশি দেরি আছে বলে মনে হয় না।

বলতে চাচ্ছি, ভারতের ফেনসিডিল আগ্রাসনে আমাদের যুব সমাজ শেষ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হওয়ার পর এবার দেশটির একাধিক টিভি সিরিয়ালের আগ্রাসনে রীতিমতো মগজ ধোলাই হতে চলেছে এই জাতির।

জন্ম পরিচয় আর নামে মুসলমান হলেও আচার-আচরণে, ভাবনা-চিন্তায় আমরা কেন ভারতীয় সংস্কৃতির ধারক এবং বাহক হয়ে পড়ছি? তাহলে কি নিজস্ব ‘স্বকীয়তা’ বলতে আমাদের কিছু থাকবে না? আমরা কি ভারতীয় সিরিয়াল নির্মাতাদের টার্গেট হয়েই বাঁচব? না, তা হতে পারে না। হওয়া উচিত নয়।

বলতে দ্বিধা নেই, ভারতীয় এসব চ্যানেলের কারণে বাংলাদেশি চ্যানেলগুলো আজ হুমকির মুখে। ভারতীয় চ্যানেলের চাপে বাংলাদেশি চ্যানেলগুলো যেন নিজেদের হারিয়ে খোঁজার উপক্রম।

সেই সঙ্গে হুমকির মুখে পড়েছে দেশীয় সংস্কৃতি। প্রশ্ন হতে পারে- ভারতীয় স্টার জলসা, জি-বাংলা, স্টার প্লাসসহ বিভিন্ন বিতর্কিত চ্যানেলগুলোতে কি মুসলমানদের সংস্কৃতি আছে? বলা যায়, তাদের নিত্যদিনের সিরিয়াল-নাটকে মন্দিরের ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, ঢোলবাদ্য, পূজার সরঞ্জাম প্রাধান্য দেওয়া হয়। তাদের সংস্কৃতিÑভাইফোটা, ভালোবাসা দিবস, উল্কি, হোলিখেলা, রাখি বন্ধন ইত্যাদি প্রচার করা হয়।

এককথায়, চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে ভারতীয় হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিচ্ছে আমাদের দেশে। যেসব সিরিয়ালে শিক্ষার কিছু না থাকলেও থাকে কপটতা, অনৈতিকতা, পারিবারিক কলহ, কুটিলতা, শিশুদের মিথ্যা বলা, ছলাকলা, চাতুরি শেখানোর কলা-কৌশল। আর ওই কলাকৌশলে কলুষিত হচ্ছে আমাদের সুন্দর সমাজ।

এসব সিরিয়ালের প্রভাবে বাঙালির (বাংলাদেশের) অনেক উৎসবে নারীকে পোশাকে কিংবা সাজ-সজ্জায় এখন আর চিরচেনা বাঙালির রূপে দেখা যায় না। চলছে অঘোষিত প্রতিযোগিতা- সবাই ভারতীয় অমুক সিরিয়ালের কায়দায় সাজবে আর তাদের অনুষ্ঠানের অনুকরণে আনুষ্ঠানিকতাও করবে।

ক্ষেত্রবিশেষ আধুনিকতার নামে বিয়ের রীতিতেও ঢুকে যাচ্ছে ভারতীয় রীতি। বিশেষ করে ঘরে ঘরে নারীরা যেন মাদকের মতো আসক্ত হয়ে পড়েছেন ভারতীয় চ্যানেলের প্রতি। এর কুপ্রভাব পড়তে শুরু করেছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সমাজ সভ্যতার ওপর। শুধু কি তাই? এসব চ্যানেলের চাকচিক্য আর আভিজাত্য দর্শনে আমাদের অনেকের মনে একধরনের বিলাসিতার বাসনা সৃষ্টি করছে। সাধারণ পরিবারগুলোতে দামি পোশাক কিনতে না পারার কারণে তৈরি হচ্ছে অসহিষ্ণুতা, ঘটছে নিত্য নতুন অপরাধ।

আমাদের বাচ্চারা এখন মায়ের ভাষা বাংলা শেখার আগেই হিন্দিতে কথা বলা রপ্ত করে ফেলছে! আর এটি হচ্ছে ভারতীয় চ্যানেলগুলোর কারণে। তাদের সিরিয়ালগুলোতে এমন কিছু শিশু চরিত্র দেখা যায়, যেগুলো শিশু চরিত্র হলেও তাদের সংলাপ, আচরণ ও মুখভঙ্গির মধ্যে সামান্য হলেও শিশুসুলভ কিছু থাকে না।

উদ্বিগ্ন হতেই হয় যখন দেখি, শিশুদের দিয়ে হিংসা, ঈর্ষার প্রতিযোগিতামূলক আচরণের অভিনয় করানো হচ্ছে। এতে করে কি শিশুদের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে না? এসব সিরিয়াল দেখে আমাদের শিশুরা কী শিখছে? তাদের ওপর কি এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে না?

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মুক্তবাজারের কল্যাণে আমাদের দেশে ভারতীয় স্টার প্লাস, স্টার জলসা, জি বাংলা, জিটিভি, স্টার ওয়ান, সনি, জি স্মাইল, ইটিভিসহ ভারতের ডজন তিনেক চ্যানেল দেখানো হচ্ছে। যদিও বিটিভিসহ আমাদের দেশের ৩০টির বেশি টিভি চ্যানেল রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এর একটিও কি ভারতের কোনো অঙ্গরাজ্যে সম্প্রচারিত হয়? ঔজ্জা নিয়ে বলতে হয়, ‘না’।

ভারতীয় একেকটি সিরিয়াল মাসের পর মাস, বছরের পর বছরজুড়ে চলতে থাকে। সিরিয়ালগুলোর মূল কিছু বিষয়বস্তু সুস্পষ্ট। এসব সিরিয়াল পারিবারিক ও সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব, প্রতিযোগিতা, প্রতিহিংসা, ঝগড়া আর কূটবুদ্ধির চর্চায় ভরপুর থাকে। সিরিয়ালগুলোতে ফুটিয়ে তোলা প্রতিহিংসা রূপ নেয় একে অপরকে হত্যা কিংবা হত্যা ষড়যন্ত্রের পর্যায়ে।

তাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু হলো ‘পরকীয়া’। এক নারীর সঙ্গে একাধিক পুরুষের দৈহিক সম্পর্ক, বিবাহ বহির্ভূত মেলামেশা, আবার এক পুরুষের সঙ্গে একাধিক নারীর দৈহিক সম্পর্ক ও মেলামেশাকে কেন্দ্র করে কাহিনী আবর্তিত হতে থাকে এসব সিরিয়ালে। যা দেখার পর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের পরিবর্তে সৃষ্টি হয় সন্দেহের। এক পর্যায়ে সুখের সংসারে আগুন লাগে।

তবে আমার মতে, তাদের মৌলিক বিষয়বস্তুর তালিকায় ধর্মও রয়েছে। এমনটি বলার কারণ আছে। যেমনÑকোনো কিছু নিয়ে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব, পরকীয়া, প্রতিযোগিতা বা প্রতিহিংসা যখন চরম পরিণতির দিকে যায় তখন ধর্মের কাছে গেলে তার সমাধান মেলে।

সিরিয়ালগুলোতে দেখা যায় চরম সমস্যা সঙ্কুল পরিস্থিতিতে সংক্ষুব্ধ নায়ক, নায়িকা বা সংশ্লিষ্ট চরিত্রের ব্যক্তিকে দেবী দুর্গার কাছে, কখনও কালির কাছে, কখনও সরস্বতীর কাছে, কখনও গণেশ, আবার কখনও রাম বা অন্যকোনো দেবতার মন্দিরে গিয়ে মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করতে।কোনো নিয়ে বিরূপ মন্তব্য আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি বিশ্বাস করি, ধর্ম (বিশ্বাস) যার যার ব্যক্তিগত বিষয়।

এক্ষেত্রে বলতে বাধ্য হচ্ছি, আমাদের দেশের নাটক, সিনেমা, সিরিয়াল সব কিছুতেই খারাপ চরিত্রটি বলতে ধার্মিক ব্যক্তি বা ধর্মের লেবাসধারী কোনো ব্যক্তিকে বোঝানো হয়। ধর্মটাকে এখানে সংস্কৃতির অঙ্গনে খারাপ অর্থেই ফুটিয়ে তোলা হয়। কিন্তু কেন? এদেশের সবাই তো ধর্মব্যবসায়ী নয়। সত্যিকার অর্থেই দেশে যারা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে, ধর্মকে প্রয়োজনে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে কোন হিম্মতওয়ালা কী পদক্ষেপ নিয়েছে? তাহলে কি বিশেষ লেনদেনে সব ঠিক হয়ে যায়?

আমরা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা যা কিছু নিজেদের সংস্কৃতি বলে ঘোষণা করব বা মেনে চলব, তা হওয়া চাই রুচিপূর্ণ, নান্দনিক ও সুন্দর। অন্যদের অনুকরণ করার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ আমাদের সংস্কৃতি যথেষ্ট সমৃদ্ধ। সেই সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতিমনাও হতে হবে। কেননা, সংস্কৃতি জাতির প্রাণ। জাতির প্রাণ রক্ষার দায়ও যে আমাদেরই।

লেখক : কবি, গবেষক ও সাংবাদিক
সহযোগী সম্পাদক, আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকম