সোমবার, ২০ আগস্ট ২০১৮

পরিবারিক বন্ধন অটুট রাখতে ইসলামের নির্দেশনা

OURISLAM24.COM
ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৮
news-image

কাউসার লাবীব : পারিবারিক বন্ধন মহান স্রষ্টার অপার ও নিপুন এক উপহার । সামাজিক বন্ধন শুধু মানবের জন্য হলেও পরিবারিক বন্ধন রয়েছে সৃষ্টি জগতের প্রায় সব প্রাণীর মাঝে। তবে পারিবারিক বন্ধনের বিমগ্ধলগন মানুষের জীবন চলার পাথেয়।

দিনের শেষে সন্ধ্যা এলে আমরা ফিরে আসি বাসস্থানে, পরিবারের আত্মিক বন্ধনে। রাতের আঁধার দূর করি ভালবাসার আলোয়ে। পুরোদিনের ব্যতিব্যস্ত মন সবকিছু ভুলে সম্প্রীতির জোছনায় গা ভেজায়। আমাদের অবসাদ চোখ পাপড়ি মিলিয়ে খুঁজে পায় নতুন এক বসন্ত। সবুজ পত্রপল্লবে সজীব ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে শ্রান্তমন।

আবার রাত শেষে প্রভাত এলে ছুটে চলি নিজ কর্মস্থলে। তবে দেহ আমাদের সঙ্গে চললেও মন থেকে যায় পরিবারে । আবার কখন গোধুলী এসে সন্ধ্যা নামিয়ে আনবে, ফিরব পারিবারের প্রিয়জনদের কাছে , ওই চিন্তায় উদগ্রীব হয়ে থাকে মন।
আর এ মনের টানের বড় কারণ, মহান প্রভু সৃষ্টিগভাবেই পারিবারিক বন্ধনের ভালবাসা আমাদের হৃদয়ে গেঁথে দিয়েছেন।

কিন্তু বড় দুঃখ ও পরিতাপের বিষয়। যতদিন যাচ্ছে আমাদের পারিবারিক বন্ধন ততই শিথিল হচ্ছে। চেষ্টা করছি ছিন্ন করতে নাড়ির টান। কেননা  চারপাশের পরিবেশ ক্রমেই আমাদের যান্ত্রিক ও পোশাকী করে তুলছে। এক পরিবারের সদস্য হয়েও প্রত্যকে যেন আলাদা গ্রহের বাসিন্দা।আর এ চিন্তাচেতনা আমাদের ঠেলে দিচ্ছে বিপদের দিকে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে দিন দিন বাড়ছে হার্টের রোগী। ক্রমেই মানুষ এ প্রাণঘাতী অসুখে আক্রান্ত হচ্ছেন। হা্র্টের রোগে প্রাণ হারাচ্ছেন শিশু থেকে কিশোর  তরুণ থেকে যুবক , বৃদ্ধ বণিতা অনেকেই। এ রোগ থেকে কিছুটা উপশমের জন্য ডাক্তারগণ বলে থাকেন সকালের মুক্ত বায়ু সেবন করতে। সেবন করা হচ্ছে মুক্ত বায়ু, আবিষ্কার হচ্ছে উন্নত থেকে অতি উন্নত মেডিসিন। কিন্তু শেষ রক্ষা কি হচ্ছে?

হার্টের রোগ ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে অবশেষে বেড়িয়ে এসেছে মূল রহস্য। পারিবারিক বন্ধনের দীপগুলো আলো হারানোর কারণে শক্তি হারাচ্ছে মানুষের হার্ট।  এ বিপদ থেকে রক্ষা পেতে পারিবারিক সম্প্রীতি বৃদ্ধির বিকল্প আছে কি?

মানবতার নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষকে এমন বিপদসঙ্কুল অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পারিবারিক সম্প্রীতি বৃদ্ধির দিকেই ইঙ্গিত করেন।
তিনি বলেন-

যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক প্রশন্ত হোক এবং আয়ু বর্ধিত হোক, সে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ন রাখে [ সহিহ বুখারি : ৫৯৮৬]

পারিবারিক বন্ধনমুক্ত কর্মজীবি মানুষের দ্বারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা সচলহলেও , ভোগ বিলাসের অপরিমিত সৃযোগ সৃষ্টি হলেও , সুস্থ সমাজ ও মানুষ যেন হয়ে যাচ্ছে রূপকথার গল্প।
বাড়ছে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, অনাচার , অনিয়ম। আর এরকম নাজুক পরিস্থিতিতে এককভাবে না হলেও সমাজে ও রাষ্ট্রে পারিবারিক বন্ধনের গুরুত্ব  উপলব্ধি হচ্ছে।আন্তর্জাতিকভাবে মে মাসের ১৫ তারিখকে পরিবার দিবস ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু একটি দিবস পালনকি আমাদের পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ় করতে পারবে? তবুও হাজার না পাওয়ার মাঝে একটু পাওয়া। তা কম কিসের!
দেরিতে হলেও আমরা কিছুটা উপলব্ধি করতে পারছি পারিবারিক সম্প্রীতির উপকারিতা । আত্মীয়তার বন্ধনের প্রয়োজনীয়তা আমাদের উচ্চবিলাসী প্রাসাদের দরজায় এসে করাঘাত করছে।

কিন্তু আমরা যদি মানবতার নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শে নিজেকে সাজাতে পারতাম, তাহলে পারিবারিক বন্ধনের প্রয়োজনীয়তা আমরা এতো পরে এসে বুঝতাম না। কেননা আমাদের মাঝখান থেকে পারিবারিক ও আত্মীয়তার বন্ধন হারাতই না।

প্রিয় নাবীজি এ বন্ধনের প্রতি গুরুত্বারোপ করার জন্য সেই দেড় হাজার বছর আগে সতর্ক করেছেন। হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন-

আমি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি মহান আল্লাহ বলেছেন- আমি রহমান। আত্মীয়তার বন্ধন হচ্ছে রহিম। যা আমি আমার নাম থেকে নির্গত করেছি। সুতরাং ওয ব্যক্তি আত্মীয়দেরকে সংযুক্ত রাখে আমিও তাকে সংযুক্ত রাখব এবং যে তাদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করবে। আমিও তার থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করব। [ সুনানে আবু দাউদ : ১৬৯৪]

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করে বলেন –
আত্মীয়তার বন্ধ ছিন্ন করার মতো মারাত্মক আর কোনো পাপ নেই। আল্লাহ তায়ালা যার সাজা পৃথিবীতেও প্রদান করেন এবং পরকালের জন্যও অবিশিষ্ট রাখেন। [ জামেউত তিরমিজি : ২৫১১ সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২১১]

তিনি আরো বলেন-
যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ বিনের প্রতি বিশ^াস রাখে। সে যেন আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ন রাখে। [ সহিহ বুখারি ও মুসলিম সুত্রে রিয়াযুস সলেহিন : ৩১৯]

মহান বন্ধনের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে মানবতার নবী মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
তোমরা যদি আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখ তাহলে নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে জান্নাতে প্রবেশ করবে। [রিয়াযুস সলেহিন : ৮৪৩]

আসুন এখন থেকেই পারিবারিক ও আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা এবং অটুটের ক্ষেত্রে আমরা যত্নশীল হই। ভালবাসায় ভরিয়ে দিই আমাদের আশপাশ। আত্মীয়তার বন্ধন হোক আমাদের পথ চলার পাথেয়।