২০১৮-০১-২২

বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮

তাবলিগের সমস্যা সমাধানের পথ একটাই

OURISLAM24.COM
news-image

মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী
লেখক-সম্পাদক, দার্শনিক আলেমে দীন, বহুভাষা, ইতিহাস, রাষ্ট্র ও সমাজতত্ত্ববিদ

এ বছর বিশ্ব ইজতিমায় দিল্লীর মাওলানা সা’দ সাহেবের আগমনকে কেন্দ্র করে যে বিশৃংখলা হলো, এর কোনো প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয় না। আমার ধারণা এ জন্য কিছু মানুষের হঠকারিতাই দায়ী। তারা নিজেদের জেদ বহাল রাখার জন্য তাবলিগের বদনাম করেছেন, দীনদার মানুষের মনে কষ্ট দিয়েছেন, আলেমদের রাজপথে নামিয়েছেন, সা’দ সাহেবকে কষ্ট দিয়েছেন, তার কষ্ট ও লাঞ্ছনায় গোটা তাবলীগি সমাজ ও উলামায়ে কেরাম দুঃখ পেয়েছেন।

সা’দ সাহেবের এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার কথা ছিল না। তিনি হঠকারী কিছু লোকের দেখানো ভুল পথে পা বাড়িয়েই এমন বিতর্কিত ও বিপদগ্রস্থ হচ্ছেন। এসব অতি উৎসাহী লোকের কারণেই আজ আলেম সমাজ চরম বিরক্ত। মনে না চাইলেও এই মোবারক কাজটি রক্ষার জন্য তাঁরা ময়দানে নামতে বাধ্য হয়েছেন।

যারা আল্লাহওয়ালা হাক্কানী-রাব্বানী আলেম ও মুখলেস দা’ঈ তাদের ভেতরকার মতান্তর সম্পূর্ণ দীনী ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যে থেকেই সবসময়ই সুরাহা হয়ে থাকে। তাঁদের বিরোধ, বিসম্বাদ এমনকি পরষ্পরের যুদ্ধও হয়ে থাকে দীনের রূপরেখা অনুযায়ী।

নিজামুদ্দীনের সমস্যাও দীনী মেজাজে সমাধান হওয়া উচিত। এ বিষয়ে উলামায়ে দেওবন্দ ও বিশ্বের নানাদেশের উলামা মাশায়েখগণ চিন্তাভাবনা করবেন এবং যথারীতি এর সমাধানও বের করবেন। কিন্তু আমরা জানতে পেরে বিস্মিত হই যে, নিজামুদ্দীনে সমস্যা সমাধানে একধরনের ভাবগাম্ভীর্যহীন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

দুনিয়ার ক্ষমতা, মসনদ কিংবা চর দখলের মতো পরিবেশ নাকি মাওলানা ইসমাইল দেহলভী ও তার সুযোগ্য সন্তান মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর স্মৃতি বিজড়িত দিল্লীর নিজামুদ্দীন মহল্লার বাংলাওয়ালী মসজিদে গত কিছুদিন যাবত দেখা যাচ্ছে।

প্রায় শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই দীনি জামাত যে নিষ্ঠা, লিল্লাহিয়্যত, নম্রতা ও মহব্বতের মধ্য দিয়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়কে বিগলিত করতো, হঠাৎ করেই এ জামাতের নেতৃপর্যায়ে কেন এমন রুক্ষতা, নিষ্ঠুরতা ও অবিবেচনাপ্রসূত আচরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে তা শত চিন্তা করেও বুঝে আসে না।

তরুন নেতা, তাবলীগি পরিবারের সন্তান ও তাবলীগ জামাতের অন্যতম কেন্দ্রীয় মুরব্বী মাওলানা সা’দ সাহেব কেন বড়দের সাথে মানিয়ে চলতে পারছেন না, এ প্রশ্ন আজ বিশ্বের সকল চিন্তাশীল আলেমের। তিনি যেভাবে চিন্তা করছেন সেটি কতটুকু সঠিক, এ ফায়সালা তিনি নিজে না নিয়ে বড়দের কাছে এর ভার ছেড়ে দিলেই ভালো করতেন।

তাছাড়া একটি স্বতসিদ্ধ নিয়ম অনুসরণ করেই তার উচিত ছিল তাবলীগের কাজ চালিয়ে নেওয়ার শুরা তৈরি, ফয়সাল নির্ধারণ অথবা একক আমীর নির্বাচন ইত্যাদি যে কোনোকিছু করা। সম্ভবত তিনি তার যে কোনো সীমাবদ্ধতার কারণে সমন্বয়ের এ কাজটি যথারীতি করতে পারেন নি।

বিশেষতঃ তারুণ্যের সূচনা থেকেই মাওলানা সা’দ একটু প্রথাবিরোধী কথাবার্তা বা ভাবধারা নিয়ে চলতেন। তার ব্যখ্যা-বিশ্লেষণ ছিল আকাবিরদের থেকে কমবেশি ভিন্ন। যা আহলে ইলমদের নজরে গত ত্রিশ বছর ধরেই পড়ছিল। দীনি বিষয়ে সীমার মধ্যে থেকে নানা মত পোষন ও প্রকাশ চিরদিনই চলে এসেছে।

এসব তাফাররুদাত, একান্ত ব্যক্তিগত বক্তব্য বা পছন্দ হিসাবে কোনো ব্যক্তি ধারণ করতে পারে। কিন্তু যদি তিনি একটি বড় জামাতের চালিকাশক্তি হন তখন তাকে বড়দের পদ্ধতিই ধরে রাখতে হবে। সাধারণ আহলে ইলমরা যে মত পোষণ করেন, যে ঐতিহ্য লালন করেন, যে ভাবধারা বিস্তার করেন এর বাইরে তার যাওয়া চলবে না।

স্পষ্ট বলতে হবে, এসব আমার ব্যক্তিগত পছন্দ বা বক্তব্য। আমি শতবছরের চলমান ধারা বা ঐতিহ্য ভাঙার অধিকার রাখি না। তা ছাড়া এতো বড় ভার বইবার মতো মজবুত ঈমান, আকাবিরদের মতো দৃঢ় একিন, নিষ্কলুস ইখলাস, সূক্ষাতিসূক্ষ তাকওয়া, গভীর জ্ঞান, অপরিসীম প্রজ্ঞা, ভুবনজয়ী আখলাক এবং সর্বোচ্চ স্তরের ইলম ও হিলম যখন দরকার তখন পরিপূর্ণরূপে নিজের উস্তাদ, মুরব্বী ও সমকালীন আহলে ইলমদের স্বাভাবিক আস্থাটুকু অর্জন ছাড়া এ কাজের দায়িত্ব এককভাবে নিজের কাঁধে নিয়ে নেওয়ার চিন্তা অন্তত দাওয়াত ও তাবলীগের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

এ পর্যায়ে আমাদের পরামর্শ থাকবে নিম্নরূপ: ১. ঐতিহ্য ও রীতি অনুযায়ী স্বতসিদ্ধ পদ্ধতি মেনে তাবলীগ জামাত চলুক।

২. শুরা পদ্ধতি ও সমন্বিত আমিরাত পদ্ধতি যদি মঙ্গলজনক মনে হয় তাহলে বিগত হযরতজির নির্দেশনামত তাই ধরে রাখা হোক।

৩. যদি বিশ্ব তাবলীগের ‘আসহাবুর রায়’ বা ‘আসহাবে হাল্ ও আকদ’ মনে করেন একক আমীর পদ্ধতিতে ফিরবেন তাহলে সেটিও যেন ঐকমত্যের ভিত্তিতে ইনসাফের সাথে হয়।

৪. এ নীতি অনুসরণ করে যদি সা’দ সাহেব আমীর নির্বাচিত হন তাহলে তাকে মেনেই বিশ্ব তাবলীগ এক ও অখণ্ডভাবে চলুক।

৫. যদি এ নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছা সম্ভব না হয়, তাহলে নিজের পরিবারের ঐতিহ্য বজায় রাখতে মাওলানা সা’দ সাহেব যেন নিজের চাওয়া পাওয়া কোরবানী করে দেন। যেকোনো মূল্যে তাবলীগকে বিভক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করেন। বড়দের সাথে নিঃশর্ত সমঝোতা করে নেন। বৃহত্তর শুরা পদ্ধতি ধরে রাখেন। একক আমির নয় বরং সমন্বিত আমিরাত বা ফয়সাল পদ্ধতির ছোট্ট কেন্দ্রীয় শুরা নিয়েই দীনের কাজ চালিয়ে যান।

এছাড়া উপরে বর্ণিত আমাদের নিবেদন অনুযায়ী তার ব্যক্তিগত মতামত বা চিন্তাধারা ঘোষণা দিয়ে আলাদা করে ফেলেন। তাবলীগের মূল শিক্ষা যেন আগের তিন হযরতজির চিন্তা-চেতনার বাইরে না যায়। দেওবন্দের সাথেও তার স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করুন।

ভুলের জন্য বারবার তওবা বা রুজুনামা দেওয়া, প্রত্যাহার করা, গ্রহণযোগ্য হওয়া, পুনরায় প্রত্যাখ্যাত হওয়া ইত্যাদি যে ছেলেখেলা পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে ধরনের হালকামি একশ্রেণীর অবুঝ ও অধীর মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চালিয়ে যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ পথ থেকে ফিরে আসতে হবে।

বাংলাদেশেও নিজামুদ্দিনের সমস্যা চলে এসেছে। দিল্লী ঠিক হলে, ঢাকাও ঠিক হবে। অন্যান্য দেশও কেন্দ্রের সাথে যুক্ত। সুতরাং ঢাকার উচিত দিল্লীকে শোধরানোর মহব্বতপূর্ণ চেষ্টা জারি রাখা। ঢাকার আলেমরা যে উপায় অবলম্বন করেছেন তা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া তাদেরই কাজ।

বাংলাদেশের আলেম সমাজ তাবলীগ জামাতের জন্য আল্লাহর রহমত স্বরূপ। আলেমগণ মনোযোগী হলে দাওয়াতের কাজ সম্পূর্ণ ও গতিশীল হবে। যারা আলেম নন তাদের উচিত সহায়কের ভ‚মিকায় থাকা, পরিচালকের নয়। কার্যনির্বাহ তারা করতে পারেন বটে, তবে দীনি বিষয়ে সিদ্ধান্ত শুধু আলেমরাই নেওয়ার অধিকার রাখেন, অন আলেমরা নন।

ইজতিমা সুন্দরভাবে শেষ হলো। এখন ঢাকার শুরা নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ড বিচার-বিশ্লেষন করে ইখলাসের সাথে চলুন। নতুন করে যেন কেউ কারো পেছনে না লাগেন। আলেম উপদেষ্টাদের প্রতি আস্থা রাখুন। ধৈর্য ও বুদ্ধির পরিচয় দিন। যে কোনো সমস্যায় সরকার নয়, ক্যাডার নয়, সমর্থক নয়, সহায়তা নিন কেবল আলেমগণের।

মিল মহব্বতের সাথে শত বছরের মতো নরম মেজাজ, বিনয়ী ভাষা ও খোদাভীরু অন্তর নিয়ে ঢাকার শুরা বৈঠকে বসুক। ইসলাহ ও তরক্কীর জন্য হাক্কানী-রাব্বানী আলেমগণের দারস্থ হোক। দ্বিমত পোষণকারী সাথীদের হামলা-মামলা, পুলিশি ধাওয়া বা শাস্তি দিয়ে নয়, ভালোবেসে কাছে টানতে হবে।

তিক্ত হলেও নিজের মতের বিরুদ্ধে আলেমদের দেওয়া সমাধান মানতে হবে। দিল্লীকে ঐক্য ও সমঝোতার মেসেজ দিতে হবে। প্রয়োজন মনে করলে যে কেউ আমাদের তাদের কাছে পাবেন। আমরা যারা এই ইস্যুতে কলিজার খুন অশ্রু আকারে বইয়ে দিচ্ছি, এই মোবারক কাজটি সঠিক পদ্ধতিতে দুনিয়ায় কিয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকুক, সে আশায়।

আমাদের তড়পানি ও নিরব কান্না তাদের বুঝতে হবে। বুঝতে হবে ঢাকার শুরার। বিভিন্ন পক্ষ নেওয়া তাবলীগী সাথীদের। বিশ্বব্যাপী আলেম সমাজের। নিজামুদ্দিনের ছন্নছাড়া মুরব্বীদের। মাওলানা সা’দ সাহেবের।

এটিও পড়ুন : সঙ্কটে তাবলিগ: সমাধান মাওলানা সাদ কান্ধলভির হাতে!