২০১৮-০১-১৫

বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮

ভারতের প্রধান বিচারপতিকে ঘিরে সঙ্কট মিটে গেছে: কেন্দ্রীয় সরকার

OURISLAM24.COM
news-image

অনলাইন ডেস্ক: ভারতের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে তারই চারজন সতীর্থ বিচারপতি প্রকাশ্যে অভিযোগ আনার পর দেশের বিচারবিভাগে যে নজিরবিহীন সঙ্কট শুরু হয়েছিল, সোমবার তা মিটে গিয়েছে বলে সরকার দাবি করেছে।

আ্যাটর্নি জেনারেল কে. কে. ভেনুগোপাল বলেছেন, চায়ের কাপে ওঠা তুফান এখন থিতিয়ে গেছে। পাশাপাশি বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়াও একই ধরনের দাবি করেছে।

তবে সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতিরা সোমবার স্বাভাবিক কাজকর্ম করলেও বিচারবিভাগের ভেতর থেকেই যে সব অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠেছে এবং এই বিতর্কে রাজনীতি পর্যন্ত যেভাবে ছায়া ফেলছে – তাতে সঙ্কট সহজে মিটবে কি না, তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান।

প্রতিদিন এজলাসে যাওয়ার আগে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা জাজেস লাউঞ্জে চা বা কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে নিজেদের মধ্যে খানিকক্ষণ কথাবার্তা বলেন।

গত শুক্রবার চারজন বিচারপতির বেনজির বিদ্রোহের পর আজ সোমবারেও কিন্তু সেই রুটিনের ব্যতিক্রম হয়নি, তবে আদালতের কর্মীদের লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে যেতে বলা হয়েছিল।

সেই ঘরোয়া আলোচনার কিছুক্ষণ পরেই অ্যাটর্নি জেনারেল কে. কে. ভেনুগোপাল একটি টিভি চ্যানেলকে জানান, “চায়ের কাপে ওঠা তুফান থেমে গেছে”।

বিচারপতিদের সঙ্গে রোববার ও সোমবার কয়েকদফা দেখা করার পর একই দাবি জানায় বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়াও।

কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মনন কুমার মিশ্র বলেন, এটা একেবারেই সুপ্রিম কোর্টের অভ্যন্তরীণ বিষয় ছিল – ছোটখাটো কিছু বিষয় নিয়ে তাদের মতান্তর হয়েছিল, কিন্তু তাতেই আশেপাশের লোকজন সেই ঝগড়ার ফায়দা নিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

তার মধ্যে কিছু রাজনৈতিক দল ছিল, ছিলেন কিছু আইনজীবীও। কিন্তু তা মিটে গেছে, কেউ ফায়দা লুটতে পারেনি – কারণ আমরা এটা জানি আমাদের এই প্রতিষ্ঠানের গরিমা আমাদেরই অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।

আপাতত নিজেদের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে এই সঙ্কট মেটানো সম্ভব বলে বিশ্বাস করেন সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি অশোক কুমার গাঙ্গুলিও।

তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, সমস্যাটা তো তাদের ভেতরের, তাই আমি মনে করি তারা নিজেরা বসে আলোচনা করলে এটা মিটে যাবে। প্রধান বিচারপতি সচরাচর এই চারজন বিচারপতির কথা শুনছিলেন না, আর তাই বিষয়টা বাধ্য হয়ে প্রকাশ্যে আনতে হয়েছে।

তবে এখন বিষয়টা প্রকাশ্যে আসার পর যে ধরনের তীব্র জনমত তৈরি হয়েছে তাতে আমার ধারণা প্রধান বিচারপতিকে এখন তার কেস আ্যাসাইনমেন্টের ক্ষমতা এমনভাবে প্রয়োগ করতে হবে যাতে সেটা বিচারবিভাগের পক্ষে ভাল হয়।

বিতর্কর নিষ্পত্তি যে এখন অনেকটাই প্রধান বিচারপতির ওপর নির্ভর করছে, তা জাস্টিস গাঙ্গুলির কথা থেকে স্পষ্ট।

তবে দেশের সাবেক অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যর মতে, এই সঙ্কটের সমাধান অত সহজে হবে না। কারণ এটি বিচারবিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

তার মতে, ‘চারজন সিনিয়রমোস্ট বিচারপতি – যাতের সততা প্রশ্নাতীত – তারা যখন বিচারবিভাগীয় নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ জানান, তখন বোঝা যায় সব কিছু আদৌ ঠিকঠাক চলছে না। তাদের এই মনোভাবকে যদি কার্পেটের তলায় চাপা দেওয়ার চেষ্টা হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের কাজকর্মের সঙ্গে আপস করা হয় তাহলে আমাদের গণতন্ত্রই মুখ থুবড়ে পড়বে!’।

বর্তমান বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ্-র বিরুদ্ধে ভুয়ো এনকাউন্টারের মামলা শুনছিলেন যিনি, সেই বিচারপতি বি এইচ লোয়ার মৃত্যু নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে পিটিশনের মতো সংবেদনশীল কেস কেন অপেক্ষাকৃত জুনিয়র বিচারপতিকে শুনতে দেওয়া হয়েছে, এটা ছিল চারজন বিদ্রোহী বিচারপতির ক্ষোভের অন্যতম কারণ।

জাস্টিস অশোক গাঙ্গুলিও মনে করেন, রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে এমন মামলাগুলোর সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করাটা খুব জরুরি।

তার কথায়, আজকাল বহু মামলা তো এমন আসছে, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণেও যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব আছে। ফলে এই মামলাগুলোর অন্তত সুষ্ঠু বিচার হোক, এটা তো সবাই চায়।

কিন্তু মানুষ যা চায়, আজ দেশের শীর্ষ আদালতে বাস্তবেও কি তা ঘটছে?

জাস্টিস গাঙ্গুলির জবাব, “সেটা বলা খুব শক্ত। আমি তো আশা করি বিচারবিভাগে সব ঠিকমতোই চলবে, কিন্তু এমন ধারণা তৈরি হওয়ারও কারণ আছে যে কেউ হয়তো সেখানে ঠিকমতো নিজের ক্ষমতার প্রয়োগ করছেন না!”

কারণ যে চারজন বিচারপতি মুখ খুলেছেন, তারাও তো বিচারবিভাগেরই অংশ এবং অত্যন্ত দায়িত্ববান বিচারপতি – কিন্তু তারা মনে করেছেন মানুষকে জানানো দরকার বিচারবিভাগের ভেতরে কী চলছে। আমরা যে স্বচ্ছ্বতার কথা বলি, সেই ট্রান্সপারেন্সির স্বার্থেই এটা দরকার ছিল।

বস্তুত প্রধান বিচারপতি তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রমে রাজনীতি ছায়া ফেলছে, গত শুক্রবারের পর এই ধারণা ভারতে অনেকের মধ্যেই দানা বেঁধেছে।

শীর্ষ আদালতে আপাতত স্বাভাবিক কাজকর্ম ফের শুরু হলেও এই সন্দেহ ভারতে বিচারবিভাগের ওপর মানুষের আস্থায় পাকাপাকি ফাটল ধরাবে বলেই বহু পর্যবেক্ষকের অভিমত।

সুত্র: বিবিসি বাংলা অনলাইন

এসএস/