মঙ্গলবার, ১৯ জুন ২০১৮

‘প্রাইমারি শিক্ষকের বেতন যেখানে ২২-৩০ হাজার, ইবতেদায়ির ৫০০ টাকা কিভাবে হয়?’

OURISLAM24.COM
জানুয়ারি ৯, ২০১৮
news-image

শাহনূর শাহীন: মাদারাসা শিক্ষার প্রাথমিক স্তর ইবতেদায়ি শিক্ষা। ইবতেদায়ি শিক্ষার দুটি শাখা রয়েছে। এরমধ্যে একটি হলো সংযুক্ত ইবতেদায়ি শাখা অপরটি হলো স্বতন্ত্র। সংযুক্ত শাখার প্রতিষ্ঠানগুলো দাখিল মাদরাসার অন্তর্ভুক্ত থাকে।

সংযুক্ত শাখার শিক্ষক কর্মকর্তারা সরকারি বেতন স্কেলে বেতন পেলেও স্বতন্ত্র শাখার শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠার পর থেকে অধ্যবদি ন্যায্য বেতন ভাতা থেকে বঞ্চিত।

১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের এক অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে প্রায় ১৬ হাজার ইবতেদায়ি মাদরাসাকে রেজিষ্ট্রেশন দেয়। সে সময় একজন ইবতেদায়ি শিক্ষকের মাত্র ৫০০ টাকা ভাতা ধরা হয়।

বেতন-ভাতাসহ সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে বন্ধ হয়ে যায়। সারাদেশে এখন প্রায় ১০ হাজারের অধিক ইবতেদায়ি মাদরাসা রয়েছে। এসব মাদরাসায় প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষক কর্মরত আছেন। শিক্ষার্খী রয়েছে প্রায় ১০ লক্ষেরও অধিক।

ইবতেদায়ি মাদরাসাগুলোকে জাতীয়করণের দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বাংলাদেশ স্বতন্ত্র মাদরাসা শিক্ষক সমিতি’র অবস্থান ধর্মঘট থেকে নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।

ইবতেদায়ি শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ‘বাংলাদেশ স্বতন্ত্র মাদরাসা শিক্ষক সমিতি’র সভাপতি আলহাজ্ব কাজী রুহুল আমিন চৌধুরী এ বিষয়ে আওয়ার ইসলামকে বলেন, সেই ১৯৯৪ সালে রেজিষ্ট্রেশন দেয়ার সময় শিক্ষকদের ভাতা ধরা হয় ৫০০ টাকা।

এরপর থেকে প্রায় ২৪ বছর পার হয়ে গেলেও বাড়েনি শিক্ষকদের বেতন ভাতা। মেলেনি অন্যান্য সুযোগ সুবিধা। তিনি অভিমানের সুরে বলেন, একজন প্রাইমারি শিক্ষকের মতোই ইবতেদায়ি শিক্ষকরা সমান পরিশ্রম করেন। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদান করেন।

অথচ মাস শেষে একজন প্রাইমারি শিক্ষক বেতন পান ২২-৩০ হাজার টাকা, অপরদিকে একজন ইবতেদায়ি শিক্ষকের বেতন মাত্র ৫০০ টাকা। বর্তমান সময়ের জীবনমানের চাহিদায় এই সামান্য অর্থ শিক্ষক হিসেবে এটা সম্মনীর পরিবর্তে অসম্মান ছাড়া আর কিছুই না।

কাজী রুহুল আমিন বলেন, এই সামান্য অর্থ দিয়ে সংসার চালানোর কথা কল্পনাও করা যায় না। এই বৈষম্য শিক্ষক সমাজের সাথে চরম ঠাট্রা স্বরুপ।

তিনি বলেন, সারাদেশে সাকুল্যে ১৫১৯ টি মাদরাসার প্রধান শিক্ষক ২৫০০ টাকা এবং সহকারী শিক্ষক ২৩০০ টাকা মাসিক বেতন পান। আবার অনেক শিক্ষক এমনও আছেন যারা এক টাকাও পান না।

তিনি বলেন, সম্প্রতি বর্তমান সরকার সারাদেশে প্রায় ২৬ হাজার প্রাইমারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সরকারি করণের ঘোষণা দিয়েছে যা ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে। আমরা ১০ লক্ষ শিক্ষকের পক্ষ থেকে ১০ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সরকারি তথা জাতীয়করণের ঘোষণা চাই।

শিক্ষক সমিতির দফতর সম্পাদক ইনতাজ বিন হাকিম আওয়ার ইসলামকে বলেন, আমরা বেতন-ভাত, বোনাস, পরীক্ষার গার্ড ফি সব দিক থেকেই বঞ্চিত। আমরা কোনো বোনাস পাই না, পরীক্ষার হলে গার্ড ফি পাই না, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতাও পাই না।

সমমানের সার্টিফিকেট নিয়ে, সমান পরিশ্রম দিয়ে প্রাইমারি শিক্ষদের সাথে ইবতেদায়ি শিক্ষকদের এমন চরম বৈষম্যমূলক আচরণ কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না।

লক্ষীপুর এ রব স্বতন্ত্র ইবতেদাীয় মাদরাসার প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষক সমিতির সহ-সভাপতি মু. মুসলেহ উদ্দিন আওয়ার ইসলামকে বলেন, আজ ৯ দিন ধরে আমারা আমাদের ন্যায্য পাওনা আদায়ে রাস্তায় পড়ে আছি অথচ দেখার কেউ নেই। এখানে আমাদের অজু, গোসল, খাওয়া, ঘুম কিছুই হচ্ছে না। প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণেও আমাদের সীমাহীন দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমরা এর অবসান চাই। আমাদের ন্যায্য দাবির বাস্তবায়ন চাই।

গত ১ জানুয়ারি থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসুচি পালন করে আসছে ইবতেদায়ি শিক্ষকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ স্বতন্ত্র মাদরাসা শিক্ষক সমিতি’।

এর আগে গত ১০ নভেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ইবতেদায়ি মাদরাসাকে সরকারিকরণ ঘোষনার আল্টিমেটাম দিয়ে স্মারকলিপি দিয়েছিলো সংগঠনটি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত ঘোষণা না হওয়ায় ১ জানুয়ারি থেকে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচিতে যায় ‘বাংলাদেশ স্বতন্ত্র মাদরাসা শিক্ষক সমিতি’ নামের শিক্ষকদের এই সংগঠন।

এদিকে অবস্থান ধর্মঘটের ৯ম দিনে এসে অামরণ অনশন কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ। সারাদেশ থেকে দাবি আদায়ে উপস্থিত অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকারাও নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্তে একমত।

সংগঠনের সভাপতি কাজী রুহুল আমিন জানান, আজ বেলা ১১টা থেকে আমরা লাগাতার আমরণ অনশণ কর্মসূচিতে যাবো। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের দাবি মেনে না নেয়া হয় ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের আমরণ অনশন চলবে।

মাদরাসা শিক্ষক হিসেবে আমরণ অনশন তথা স্বেচ্ছামৃত্যুর মতো কর্মসূচি ইসলামারে দৃষ্টিতে বৈধতা রাখে কিনা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, স্বেচ্ছামৃত্যু বা আত্মহত্যা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম।

তিনি বলেন, আত্মহত্যা এমন একটি বিষয় যেখানে ব্যক্তি জানে যে, আত্মহত্যা করলে তার মৃত্যু নিশ্চিত। কেননা তাকে বাঁচানোর মতো কারো সামনে সে আত্মহত্যা করতে যায় না। বরং সম্পূর্ণ লুকিয়ে সে আত্মহত্যা করে। এবং সে জেনেশুনেেই করে। সুতরাং এটা হারাম।

কিন্তু আমরা আমরণ অনশণ করছি এটা আত্মহত্যার জন্য নয় বরং আমরা বাঁচার জন্যই এটা করছি। অবহেলিত জীবন-যাপনের চেয়ে ভালোভাবে বাঁচার জন্য সাময়িক কষ্ট স্বীকার করে খারাপ খাওয়ার চেয়ে না খেয়ে থেকে সংশ্লিষ্ট মহলের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি জাগ্রত করার জন্য আমরা এই কর্মসূচি পালন করবো।

সুতরাং এটা আত্মহত্যা হবে না। কারণ, আমাদের বিশ্বাস মানবিকবোধে নাড়া দিতে পারলে সংশ্লিষ্ট সর্বোচ্চ মহল আমাদেরকে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরিয়ে আনার ব্যাবস্থা করবে।

মূলত আপনার এখন কী চান? এমন প্রশ্নের জবাবে কাজী রুহুল আমিন আওয়ার ইসলামকে বলেন, আমরা চাই সারাদেশের ইবতেদায়ি মাদরাসাগুলোকে জাতীয়করণের ঘোষণা দেয়া হোক। এবং এই ঘোষণা আমরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে শুনতে চাই।

আমরণ অনশনেও যদি দাবি আদায় না হয় তাহলে কী কর্মসূচি দিবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা আশা করি অনশন পারবর্তী আর কোনো কর্মসূচিতে আমাদের যেতে হবে না।আমরা আশা করছি তার আগেই বিষয়টি সমাধান হওয়ার।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক সংকট মোকাবিলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাদার অব হিউমিনিটি উপাধিতে ভুষিত হয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের দাবি মেনে নিয়ে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন।

প্রাইমারি শিক্ষকদের ধারাবাহিকতায় ইবতেদায়ি মাদরসার শিক্ষকরাও পাবেন কি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস! সেই কাঙ্ক্ষিত উত্তরের অপেক্ষায় প্রেসক্লাবে আমরণ অনশনে রয়েছেন মানুষ গড়ার কারিগর হাজারো ইবতেদায়ি শিক্ষক।

আরআর