শুক্রবার, ২২ জুন ২০১৮

‘২১ বছর হাদিস পড়ানোর পর মুসাফাহা মুআনাকা শিখেছি হারদুয়ী হজরতের কাছে’

OURISLAM24.COM
নভেম্বর ২৬, ২০১৭
news-image

পটিয়ার জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া জিরি মাদরাসার বর্তমান মুহতামিম আল্লামা শাহ মোহাম্মদ তৈয়ব। তিনি হারদুয়ী হজরত শাহ আবরারুল হক রহ. এর বিশিষ্ট খলিফা। দীর্ঘ প্রায় তিন যুগ ধরে তিনি হাদিসের খেদমতে নিয়োজিত রয়েছেন।

তিনি মজলিসে দাওয়াতুল হকের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মীও। বাংলাদেশে সুন্নতকে জিন্দা করতে কাজ করে যাচ্ছেন নিবিড়ভাবে। আগামী ২ ডিসেম্বর যাত্রাবাড়ীতে জামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়ায় শুরু হতে যাচ্ছে দাওয়াতুল হকের ইজতেমা। এতে দেশ বিদেশের উলামায়ে হজরত বয়ান করবেন।

বাংলাদেশে দাওয়াতুল হকের কাজ ও সুন্নতের প্রসার নিয়ে তিনি কথা বলেছেন আওয়ার ইসলামের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আওয়ার ইসলাম সম্পাদক হুমায়ুন আইয়ুব

হুমায়ুন আইয়ুব : আপনার ব্যক্তিগত জীবন, তালিমি জীবন এবং ব্যক্তিগত মুরব্বি ও তালিমি মুরব্বি সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।

শাহ মোহাম্মদ তৈয়্যব : আমি পড়াশোনা করেছি জিরি মাদরাসায়। এখানে আমি হাদিস পড়েছি শাইখুল হাদিস আল্লামা আবদুল ওয়াদুদ রহ.এর কাছে। তিনি এখানে ৫১ বছর হাদিস পড়িয়েছেন।

হুমায়ুন আইয়ুব : তাহলে তো মাদরাসা অনেক পুরনো…

শাহ মোহাম্মদ তৈয়্যব : মাদরাসার বয়স এখন ৫৯ বছর।

হুমায়ুন আইয়ুব : আপনার উস্তাদদের কথা বলছিলেন…

শাহ মোহাম্মদ তৈয়্যব: শাইখুল হাদিস হযরত মাওলানা আবদুল ওয়দুদ রহ. দেওবন্দ থেকে ফারেগ হয়ে এসেই এখানে দরস-তাদরিসের খেদমতে নিয়োজিত হন। হযরতের প্রথম শাগরিদ ছিলেন মুফতি আজিজুল হক সাহেব রহ.। যিনি পটিয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা।

হজরত রহ. হাদিস পড়েছেন শাইখুল হিন্দ- যাকে আমরা শাইখুল আরব ও আজম বলি, আল্লামা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী রহ.- যিনি কাসেম নানুতুবি রহ. এর শাগরিদ। এর পরের সিলসিলা সবারই জানা।

আমরা হযরতের কাছে পড়ালেখা করেছি। হযরতের খেদমতেও ছিলাম। এক কথায় হজরতের ছায়ায় থেকে আমরা তালিম ও তরবিয়ত পেয়েছি।

হুমায়ুন আইয়ুব : তাযকিয়ার লাইনে আপনার মুরুব্বি?

শাহ মোহাম্মদ তৈয়্যব : তাযকিয়ার লাইনে আমার মুরুব্বি হারদুয়ী হজরত শাহ আবরারুল হক রহ.। অবশ্য আমি শাইখুল হাদিস আল্লামা আবদুল ওয়াদুদ রহ. এর কাছেও বায়াত হয়েছিলাম।

এছাড়া আমাদের মাদরাসার ফারেগ ছিলেন, পটিয়ার ইমাম সাহেব হুজুর (মাওলানা আহমদ শাহ রহ.) এর কাছে পরবর্তীতে রুজু করেছিলাম। এরপর আমাদের মাদরাসার এক মজলিসে আসেন হজরত হারদুয়ী রহ.। হজরত এক শুক্রবার সকাল দশটা থেকে তিনটা পর্যন্ত ছিলেন।

হজরতের এ পাঁচঘন্টার অবস্থাদি দেখে ইমাম সাহেব হুজুর রহ. কে বললাম, আমার উনার কাছেই বায়াত হতে হবে। আমি হজরতের কাছে আরজি পেশ করলাম। হজরত বললেন, বাদ মে দেখা যায়েগা- পরে দেখা যাবে।

হজরত বাদ মে দেখা যায়েগা বলার পর আমি ওই বছরই হজে যাই। ওখানে গিয়ে জানতে পারি, হজরত মদিনা শরিফে আছেন। আমি হজরতের দরবারে হাজির হই। হজরত বললেন, ভাই, দরখাস্ত করো।

আমি বিস্তারিত লিখলাম দরখাস্তে- আমার পড়াশোনা, উস্তাদ, মুরুব্বি, বাইআত, রুজু সব বিষয় লিখলাম। হজরত বললেন, আগামীকাল মাগরিবের পর আসো। অবশেষে আমি হজরতের কাছে বাইআত হই।

বাইআত হওয়ার ছমাস পর আমি হারদুই যাই। আমার সঙ্গে ছিলেন মুফতি আবদুর রহমান রহ., প্রফেসর হামিদুর রহমান ও ডা. হাবিবুর রহমান। সেবার হজরত আমাকে তাজকিয়ার লাইনে কাজ করার এজাযত দেন।

হারদুয়ী হজরতের কাছে বাইআত হয়ে তাসাওউফ ও তাজকিয়ার লাইনে খুব বেশি উপকৃত হয়েছি।

হুমায়ুন আইয়ুব : হজরতের সঙ্গে আপনার বিশেষ কোনও স্মৃতি? যেটা আমাদের আমল ও তাজকিয়ার লাইনে উদ্বুদ্ধ করবে?

শাহ মোহাম্মদ তৈয়্যব : এমন অনেক স্মৃতি ও ঘটনাই আছে বলার মতো।

হুমায়ুন আইয়ুব : যে কোনও একটা যদি বলেন…

শাহ মোহাম্মদ তৈয়্যব : হযরতের একটা ওসিয়তের কথা আমি সবসময় স্মরণে রাখি। যেটা আমার জীবনের বড় একটা মাইলফলক।

সেবার এক সফরে আমার সঙ্গে (মুহিউস সুন্নাহ) মাহমূদুল হাসান সাহেব ছিলেন। উনি হজরতকে বললেন, হজরত, মাওলানা তৈয়ব সাহেব বাংলাদেশে খুব ভালো ওয়াজ করেন। আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, হজরত, আমি তো কিছু না, কেবল একটু উসিলা হতে চাই।

হজরত বললেন, ভাই, উসিলা হয়েই থাক এবং যখনই ওয়াজ করবে শেষে সুন্নতের ওপর বয়ান রাখবে। এতে সুন্নত জিন্দা হবে। হজরতের এ অসিয়ত আমি আজও মেনে চলার চেষ্টা করি। আমি মনে করি ওসিয়তটি সবার জন্যই খুব দরকারি।

হুমায়ুন আইয়ুব : হজরত তো দাওয়াতুল হক নিয়ে বাংলাদেশে প্রচুর কাজ করেছেন। দাওয়াতুল হককে জিন্দা করার পেছনে কারণগুলো কী ছিল? বা এর বিস্তারিত কার্যক্রম সম্পর্কে যদি একটু বলেন…

শাহ মোহাম্মদ তৈয়্যব : হজরত সবসময় বলতেন- দাওয়াতুল হক হলো প্রতিটি মুমিনে জীবনে সুন্নত জিন্দা করা। জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে, প্রতিটা পদক্ষেপে যেন সুন্নতের আলো থাকে সেদিকে মানুষের মন মস্তিষ্ক ফিরিয়ে দেয়াই দাওয়াতুল হকের লক্ষ্য ও কার্যক্রম। সুন্নত হচ্ছে সিদ্দীকিয়াতের পথ। এপথে চললে মানুষের তাজকিয়া হয়েই যাবে।

হুমায়ুন আইয়ুব : আমি এই জায়গাটায় একটু বলতে চাচ্ছি, দীনের অন্যান্য যে মেহনত, তাবলিগ, তালিম, সিয়াসাত- সেখানেও তো সুন্নতকে সামনে রেখেই কাজ করা হয়, তাহলে বিশেষভাবে সুন্নতকে শিরোনাম বানিয়ে আলাদা একটা মেহনত নিয়ে চলার কী উদ্দেশ্য। ইহয়ায়ে সুন্নত বা সুন্নত জিন্দা করার এ মেহনতের বিশেষ বৈশিষ্ট্যটা কী?

শাহ মোহাম্মদ তৈয়্যব : হ্যাঁ, সবাই রাসূলে কারিম সা. এর সুন্নতকে সামনে রেখেই কাজ করে। তবে শুধু সুন্নত জিন্দা করা তাদের মূল লক্ষ্য নয়। তাদের অন্যান্য নানা কার্যক্রম আছে। তারা সুন্নতের একেকটা বিশেষ দিককে সামনে রেখে কাজ করে।

আমরা সমগ্র সুন্নতকে সামনে রেখে কাজ করি। সুন্নত জিন্দা হলে দিল জিন্দা হয়। সুন্নত জিন্দা হলে দীন জিন্দা হয়। সুন্নত জিন্দা হলে তাজকিয়ার লাইনও জিন্দা হবে। যেন সবাই জিন্দা দিল ও জিন্দা দীন নিয়ে যার যার কাজ করতে পারে সে লক্ষ্যেই সুন্নত নিয়ে আমাদের বিশেষ কাজ।

হুমায়ুন আইয়ুব : দাওয়াতুল হকে কর্মপদ্ধিতে যেসব সুন্নত নিয়ে কাজ হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে থেকে এমন একটি বা দুটি সুন্নতের কথা একটু বলুন- যেগুলো সবার জানা দরকার কিন্তু সেভাবে মানুষের মধ্যে চর্চা হয় না।

শাহ মোহাম্মদ তৈয়্যব : বিয়েশাদী, নামায, অযু, কেরাত, সালাম, মুসাফাহা, মুআনাকাসহ হাজারও সুন্নত নিয়ে দাওয়াতুল হকের কাজ। অনেক সহজ সহজ সুন্নত সাধারণ মানুষ তো জানেই না; উলামায়ে কেরামের মধ্যেও এ ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা নেই।

আমি মদিনা শরিফে হজরতের সঙ্গে সাক্ষাত করতে গেলে হজরত আমাকে হাতে ধরে মুসাফাহা, মুআনাকা শিখিয়েছেন।

হযরত বললেন, মুসাফাহা দুহাতে করবে আর মুআনাকা অর্থ হচ্ছে, কাঁধের সঙ্গে কাঁধ মিলানো। বুকের সঙ্গে বুক মিলানো নয়। হজরত যেভাবে শেখালেন সেভাবে আমি বিষয়গুলো সঠিকভাবে জানতামও না।

একুশ বছর আমি মেশকাত শরিফ পড়িয়েছি, কিন্তু মুসাফাহা, মুআনাকার সঠিক পদ্ধতিটা হজরতের সঙ্গে সাক্ষাত করার আগ পর্যন্ত জানিনি।

Image may contain: one or more people, people standing and outdoor

হুমায়ুন আইয়ুব : আপনি বললেন, একুশবছর মেশকাত শরিফ পড়িয়েছেন, অথচ মুসাফাহা, মুআনাকাটা শিখলেন এসে এত বছর পর? মেশকাত শরিফ পড়া বা পড়ানোর সময়ই এটা জানা থাকা দরকার ছিল না?

শাহ মোহাম্মদ তৈয়্যব : শুধু তালিমে কী হয়? এজন্যেই তো তালিমের সঙ্গে মুরুব্বির প্রয়োজন। শুধু তালিমে হয় না- হা হা হা (একটু হেসে বোঝালেন, চাতুর্যপূর্ণ প্রশ্নটার কত সহজ উত্তর)

হুমায়ুন আইয়ুব : দাওয়াতুল হকের বর্তমান কার্যক্রমকে আরও ব্যাপক করতে কী কী উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন মনে করেন?

শাহ মোহাম্মদ তৈয়্যব : বেশি বেশি ইসলাহি বয়ানের পাশাপাশি ঘরে ঘরে মহল্লায় মহল্লায় সুন্নতের মশক চালু করতে হবে।

হুমায়ুন আইয়ুব : সময় দেয়ায় আপনাকে অনেক অনেক শুকরিয়া।
শাহ মোহাম্মদ তৈয়্যব : আপনাকেও শুকরিয়া