বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই ২০১৮

মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণ এবং শ্রীলংকার সংখ্যালঘু মুসলিম (৪র্থ পর্ব)

OURISLAM24.COM
সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৭
news-image

[আরবের আশা আমরা অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছি। পরিবর্তিত দৃশ্যপটে বড় প্রত্যাশা নিয়ে চোখ রাখছিলাম তুরস্কের দিকে- প্রাপ্তিটা যদিও কাঙ্খিত গতিতে হচ্ছে না, তবে হতাশায়ও বদলে যায় নি। ইরান যেভাবে মূল মঞ্চে চলে আসছিলো কিংবা একক রাহবার হিসেবে স্বীকৃতি নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলো, আমাদের বড় বিকল্প সেখানে এরদোগানের তুরস্ক।

যে সংকটের মধ্য দিয়ে আজকের মুসলিম উম্মাহকে পথ চলতে হচ্ছে, এই মুহূর্তের বড় দাবি বিক্ষিপ্ততা এবং দেশ-সমাজের সাধারণ সীমা ছাপিয়ে এক মঞ্চে সমবেত হওয়া এবং তারও আগে চিন্তার সমন্বয়। খাদ থেকে চূড়ায় উঠে আসতে কিংবা পতনোন্মুখ হালত থেকে নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হতে শক্তি বা সংখ্যার চেয়েও বড় প্রয়োজন শিক্ষার। কৌশলের। নৈতিকতা এবং মনোবলের। আর এসবের মূলেই আছে চিন্তার বিকাশ ও সমন্বয়।

এক্ষেত্রে বছর কয়েক আগেও প্রায় একমাত্র দেশ হিসেবে উঠে আসতো ইরানের নাম। এখন আমরা বড় করেই তুরস্কের কথা বলতে পারছি। ধীর গতিতে হলেও অনেকাংশে যা তারা কাজে প্রমাণ করে যাচ্ছে। সামার স্কুল নামে তুরস্কের একটা প্রজেক্ট শুরু হয়েছে বছর কয়েক আগে।

সারাবিশ্বের মুসলিম তরুণ গবেষকদের নিয়ে কনফারেন্স আয়োজন, নিজেদের সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা এবং এর আলোকে সমাধান ও কৌশল প্রণয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া- এটাই মূলত প্রজেক্টের উদ্দেশ্য।

২০১৩ সালে সামার স্কুলের প্রথম আয়োজনের স্মারকটি আমার হাতে এসেছে। এই কনফারেন্সের প্রতিপাদ্য ছিলো- ‘ট্রান্সফরমেশন অব দ্য মুসলিম ওয়ার্ল্ড ইন ২১’স্ট সেঞ্চুরি’। পড়ছি। আরব বসন্ত পরবর্তী প্রথম আয়োজন হওয়ায় আশাবাদের কিছু ছড়াছড়ি আছে, গত ক’বছরে অনেক কিছু বদলেও গেছে। পাঠের ক্ষেত্রে সেটা একদিকে যেমন কিছুটা অস্বস্তির, ভাবনা ও বর্তমান পরিস্থিতি বিচারে যথেষ্ট সহায়কও।

আমাদের তরুণদের জন্য এই রচনাগুলোর পাঠ অত্যন্ত জরুরি। এমন চিন্তা থেকেই কিছু কিছু আলোচনা ওদের কাছে তুলে ধরার প্রয়াস নিলাম। শ্রীলংকা আমাদের খুব কাছের এবং বিশেষত ক্রিকেটের সুবাদে বেশ পরিচিত একটি দেশ। শ্রীলংকার মুসলিমইস্যুটি কখনো তেমন আলোচনায় আসে নি। খুব কিছু আমরা জানিও না। তাই এই নিবন্ধটিকেই প্রথমে বেছে নিলাম।

লেখক শ্রীলংকান ইসলামিক ছাত্র আন্দোলনের প্রেসিডেন্ট। সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিবন্ধের শেষে যুক্ত করে দেবো ইনশাআল্লাহ। সরাসরি ইংলিশ থেকে লেখকের নিজস্ব গদ্যরীতি ঠিক রেখেই অনুবাদের প্রয়াস নেয়া হয়েছে। আজ থাকলো চতুর্থ পর্ব… শাকিল আদনান।]

মধ্যপ্রাচ্যে পরিবর্তন ও সাম্প্রতিক বিষয়াদির সামাজিক দৃষ্টিকোণ

আরববিশ্বের চলমান প্রতিরোধ ক্রমশ বাড়তে থাকা পশ্চিমা খবরদারি ও হস্তক্ষেপের বিপরীতে চাচ্ছে বড় একটা পরিবর্তন। এই মুহূর্তে অবশ্য পর্যবেক্ষক যে কারো পক্ষেই ভবিষ্যদ্বাণী করা মুশকিল যে, এই পরিস্থিতি মুসলিমবিশ্বকে শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে। আরববিশ্ব বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের ঘটিতব্য পরিবর্তনের তো অনেক কিছুই আছে।

আরব বসন্তের ফলাফল এবং এই অঞ্চলের কৌশলগত নানান অস্থিরতা ভবিষ্যৎ অনুমানের এ কাজকে আরো জটিল করে তুলছে। ব্যাপার আরও আছে। আন্তর্জাতিক বাস্তবতাসমূহ এবং সীমাহীন অর্থনৈতিক ও স্ট্র্যাটেজিক পরিবর্তনও পরিস্থিতি জটিল করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে।

আরব বসন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়ে গেছে বলা যায়। সময় গড়াবার সাথে সাথে এটা আরো উন্নতি ও বিস্তার লাভ করবে। এটা শুধু সরকার পরিবর্তন করেই ক্ষান্ত হবে না, বরং আরববিশ্ব নিয়ে আমাদের ব্যক্তিগত উপলব্ধি এবং অন্যান্য দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে বাধ্য করবে। এটা নতুন ও সর্বব্যাপী একরকম বোধ ও সচেতনতা তৈরি করবে। আরব বসন্ত আমাদের হতাশা ও হীনমন্যতাবোধের দেয়ালগুলো ভেঙে দিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক কল্পনার নতুন এক জগৎ নির্মাণ করবে, যা আমাদেরকে অনৈতিক ক্ষমতাচর্চা ও স্বার্থপরতার বিপরীতে আশাবাদী হতে শেখাবে। নতুন করে স্বপ্ন দেখাবে।

আরববিশ্ব তো সৌভাগ্যবান- কারণ এই বসন্তের সূচনা হয়েছে তিউনিসিয়ার মতো একটা দেশ থেকে। তিউনিসিয়া বিভিন্ন সমজাতীয় নৃতাত্তি¡ক ও উপদলীয় গোষ্ঠীর মিলিত একটা সমাজ হলেও একে শিক্ষার লেভেল, সামাজিক শ্রেণীবোধ এবং রাজনৈতিক সচেতনতার নানা দিক বিবেচনায় সহজেই বিভক্ত করা যায়; যে বাস্তবতাগুলো এই আন্দোলনকে সহনশীল একটা মাত্রা দিয়েছে। নয়তো পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারতো।

নিয়ন্ত্রণের রজ্জুটা কারো হাতেই থাকতো না। তিউনিসিয়ার এই অভ্যুত্থান অনর্থক বিরোধ বা ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত সৃষ্টির বদলে অধিকার আদায়ের দারুণ একটা মডেল উপস্থাপন করেছে। এই মডেলের সূত্র ধরে দীর্ঘকালের জুলুম, বেপরোয়া দুঃশাসন এবং অনন্ত হতাশার নীচে দাফন হয়ে থাকা আরববিশ্ব নিয়ে আমরা নতুন করে আশাবাদী হতে পারছি।

আরব বসন্তের এই বিবর্তনধারা অব্যাহত থাকবে তিউনিসিয়ার মতোই; লিবিয়া, সিরিয়া এবং ইয়েমেনেও। এই দেশগুলোতে রাজনৈতিক বিরোধ এবং দলীয় লড়াই দিনকে দিন তীব্রতর হয়ে উঠার প্রেক্ষাপটে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির দুর্বলতার কারণে, রাজনৈতিক অভিজ্ঞাতার অভাবজনিত কারণে এবং সুশাসনের সুদীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে এই দেশগুলোতে সামনে নানারকম সংকট এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হবে। যে কোনো মূল্যে সবগুলো দলই চাইবে মসনদের দখল নিতে এবং ক্ষমতার রশি আঁকড়ে ধরতে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে আশা করা অনুচিত- তবুও এমন দিন খুব দূরে নয় যে সংশ্লিষ্ট সব দল ও পার্টিগুলোই উপলব্ধি করতে শুরু করবে যে, স্থিতিশীল রাজনীতি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের সবাইকে মিলেমিশে কাজ করতে হবে। তবেই স্বার্থক হবে তাদের আন্দোলন। সুফল আসবে আরব বসন্তের।

আরব বসন্তের ছোঁয়া পাওয়া বড় দুই দেশ সিরিয়া ও মিশরের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে আমরা বিপরীতমুখী আচরণ লক্ষ করছি। বাশার আল আসাদের জুলুম ও দুঃশাসন গোপন কোনো ব্যাপার নয়। বাশার আল আসাদের কবল থেকে মুক্তি পাওয়া সিরিয়ানদের নাগরিক অধিকার।

সিরিয়ায় মডারেট শাসন গড়ার পক্ষে পশ্চিমা শক্তিগুলো বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র এবং কিছু আরব রাষ্ট্রেরও সমর্থন আছে। তবে তারা চায় সিরিয়ায় এমন সরকার আসুক যারা ইসলামী আন্দোলন থেকে যোজন যোজন দূরে থাকবে তো বটেই, ইজরাইলের জন্য হুমকি হবে না এবং পশ্চিমেরও কাছে থাকবে।

অন্যদিকে তুরস্ক, কাতার ও মিশর চায় স্বৈরশাসনের কবল থেকে বেরিয়ে সিরিয়া নিয়মতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় আসুক। সিরিয়ানরাই নিজেদের দেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিক। তবে এসবের বিপরীতে রাশিয়ার প্রকাশ্য সমর্থনে ইরান চাচ্ছে যে কোনো মূল্যে বাশার আল আসাদকে টিকিয়ে রাখতে।

সবমিলিয়ে সিরিয়া এখন গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে যাচ্ছে। অনিশ্চয়তায় আটকে যাচ্ছে সিরিয়ানদের নাগরিক অধিকার।

এদিকে, মিশরের অবস্থা আরো করুণ। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা মুরসি সরকারকে ইতোমধ্যেই বিতর্কিত এক সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র- সারা বিশ্বে যারা গণতন্ত্রের ফেরি করে বেড়ানোর দাবি করে- অবৈধ এই সেনাঅভ্যুত্থানকে এবার তারা নির্লজ্জভাবে সমর্থন করলো।

আরবের সবচে জনবহুল এই দেশটি মাত্রই প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের অধীনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণের রোডম্যাপ তৈরি করছিলো। পশ্চিমা শক্তিগুলোর উসকানি এবং সহযোগিতায় জেনারেল সিসি সাজানো এক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করে নিলেন। মুসলিম ব্রদারহুডের নেতাকর্মীসহ অসংখ্য নাগরিককে প্রকাশ্যে খুন ও কারান্তরীণ করলেন।

গণতন্ত্রের ঠিকাদারির দাবিদার যুক্তরাষ্ট্রকে এক্ষেত্রে আমরা গণতন্ত্রের পক্ষে রা টুকু পর্যন্ত করতে দেখলাম না। তুরস্ক এই সেনাঅভ্যুত্থানকে সরাসরি অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করেছে। বিপরীত দিকে সৌদি আরব, বাহরাইন ও আরব আমিরাতকে দ্রুতই আমরা অবৈধ সেনাশাসকের পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করতে দেখলাম।

আরব রাষ্ট্রগুলোতে সেনা বা স্বৈরশাসনের পক্ষে পশ্চিমের এমন সমর্থনকে বিশ্বরাজনীতির বোদ্ধামহল ও বিশ্লেষকগণ সরাসরি ডাবল স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে ব্যক্ত করছেন, মিশরের প্রেক্ষাপটে যা নিয়ে আর লুকোছাপার কিছু নেই।

দ্বিতীয় অংশ: সংখ্যালঘু হিসেবে শ্রীলংকার মুসলিম সম্প্রদায়

এক দৃষ্টিতে দক্ষিণ এশিয়া: দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থান বিরোধপূর্ণ আরববিশ্বের ঠিক বিপরীতে। অন্তহীন বিতর্ক, বিরোধ ও লড়াই-ই হলো দক্ষিণ এশিয়ার প্রধানতম পরিচিতি। শীতল যুদ্ধ, অযাচিত বিতর্ক, ছোট ও মাঝারি যুদ্ধ, সীমান্তসংঘাত এবং বারবার আছড়ে পড়া আফগান যুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার চেহারাটাই বদলে দিয়েছে। ১৯৮৯-৯১ এর মধ্যে সোভিয়েত ব্লক যখন মুখ থুবড়ে পড়লো, (যুক্তরাষ্ট্রের কালজয়ী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী) ফ্রান্সিস ফুকিয়ামার মুখের হাসিটা আরো চওড়া করে দিতে তাকে আর তার বই ‘এন্ড অব দ্য হিস্টোরি’ (ইতিহাসের সমাপ্তি) নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়ে গেলো।

বিভিন্ন দেশ নিজেদের পুনর্গঠন, সংস্কার ও নতুন বিশ্ববাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে উঠলো। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো অবশ্য এই যুক্তিকে উপেক্ষাই কওে গেলো। কাশ্মীর সংকট, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অস্ত্র বাড়ানোর প্রতিযোগীতা এবং আফগানিস্তানের ভ্রাতৃঘাতী লড়াই এর মতো ঘটনাগুলো তাই ফিরে আসতে শুরু করলো প্রতিহিংসার চূড়ান্ত রূপ নিয়ে।

দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত পরিস্থিতি বরাবরই সংজ্ঞায়িত ও পরিচালিত হয়ে আসছে ভারত-পাকিস্তান বিরোধের গতিধারা অনুসারে। এই দুটো রাষ্ট্রের যৌথ ঔপনবেশিক অতীত এবং দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রচুর সাদৃশ্য থাকার পরও রাষ্ট্র দুটোর সম্পর্কের গতি-প্রকৃতি অগ্রসর হচ্ছে শত্রুতা, অবিশ্বাস, বিরোধ ও যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। নিজেদের মধ্যে অনিরাপত্তা, শংকা, সংশয় ও সন্দেহের বাড়াবাড়িরকম উপস্থিতি দক্ষিণ এশিয়াকে নিউক্লিয়ার বোমার মুখোমুখি করার মতো উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।

প্রতিবেশীদের মধ্যকার শান্তি ও স্থিতি, সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের মতো জরুরি ব্যাপারগুলো তো বরাবরই এখানে পলায়নপর থেকেছে। বেশিরভাগ তথ্যনির্ভর বা অনুসন্ধানী গবেষণাগুলোই দেখিয়ে চলেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার ‘অনন্ত বিরোধের’ এই বৈরী চিত্র সহসা দূর হবার কোনো সম্ভাবনাই নেই।
এশিয়ার বিস্ময় শ্রীলংকার পরিচিতি

ভারত সাগরের তীরে অবস্থিত বহু নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী এবং বহু ধর্মবিশ্বাসী মানুষের সমন্বিত এক দ্বীপরাষ্ট্র হলো শ্রীলংকা। সিনহলী শ্রীলংকার জাতীয় ভাষা, যা মূলত ব্যবহার করে এদেশের বৌদ্ধ ও খৃস্টান সম্প্রদায়। তামিল হলো প্রাদেশিক ভাষা, যা ব্যবহার করে শ্রীলংকার মুসলিম, হিন্দু এবং তামিলে বসবাসরত অল্পসংখ্যক খৃস্টান ধর্মবিশ্বাসী লোকজন। শ্রীলংকার উত্তর ও পূর্ব দিক ছাড়া বাকি পুরো দেশেই সিনহলী ভাষা ব্যবহৃত হয়। দেশজুড়ে ইংলিশের ব্যবহারও এখন ব্যাপকরকম।

শ্রীলংকায় রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রচলিত, সাথে আছে বহু দলীয় গণতন্ত্র সম্বলিত স্বাধীন ও শক্তিশালী সংসদ। সমানভাবে সবার সমস্যা নিরসন ও ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শ্রীলংকার সংসদে সকল জাতি-গোষ্ঠীর তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং পুরো দেশকে মোট নয়টি প্রদেশে বিভক্ত করা হয়েছে।

এই ব্যাপকভিত্তিক ক্ষমতাচর্চার অধিকার সাংবিধানিকভাবেই স্বীকৃত। তারপরও নানা কারণেই এমন ব্যতিক্রমী ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থাকেও বাস্তবতা বিবেচনায় পর্যাপ্ত মনে হয় না। স্থানীয় নির্বাচনের বিভিন্ন স্তরে মানুষের অংশগ্রহণের দুরাবস্থার দিকে নজর দিলে সহজেই বুঝে আসে বর্তমান সরকারব্যবস্থার প্রতি দেশবাসীর অনাগ্রহ বা অনাস্থার বিষয়টি। এশিয়াজুড়েই এই সমস্যা অবশ্য দিনদিন প্রকট হচ্ছে।

শ্রীলংকান মুসলিমদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

প্রাচীন লোকদের কাছে শ্রীলংকা পরিচিত ছিলো সিলন নামে। ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে শ্রীলংকার পরিচিতি তুলে ধরা হয়েছে এমন এক দেশ হিসেবে, যুগে যুগে যার বুকে বিভিন্ন দেশের প্রখ্যাত নাবিক, ব্যবসায়ী ও ভ্রমণপিপাসুরা যাত্রাবিরতি বা ব্যবসা করেছেন এবং দর্শন ও আতিথেয়তা লাভে মুগ্ধ হয়েছেন। শ্রীলংকার বেশিরভাগ মানুষ বৌদ্ধ, তবে তাদের সাথে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হিন্দু, মুসলিম, রোমান ক্যাথলিক ও খৃস্ট ধর্মের অন্যান্য ফর্মের লোকজনও রয়েছেন।

সাংস্কৃতিক দৌড়ে বাজির ঘোড়া সিনহলীদেরই; তামিল, মুসলিম বা এ্যাংলো শ্রীলংকানদের উপস্থিতি সেখানে গৌণই বলা যায়। জানসংখ্যার বিচারে শ্রীলংকায় মুসলিমদের অবস্থান ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী হিসেবেই, মোট ২১ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে যাদের উপস্থিতি মাত্র ১০%।

শ্রীলংকান মুসলিমরা নিজেদের আরব ব্যবসায়ীদের উত্তরাধিকারী দাবি করেন, যারা ব্যবসা পরিচালনার উদ্দেশ্যে আরব থেকে শ্রীলংকায় এসে আর ফিরে যান নি। এমনকি ইসলামের আবির্ভাবের আগেই আরব ব্যবসায়ীদের এমন ‘রয়ে’ যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। আর মুসলিমদের মতোই শ্রীলংকার তামিল জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও ১০%।

শ্রীলংকার মুসলিমদের দুটো উপদলে ভাগ করা যায়; মুর এবং মালয়। শ্রীলংকান মুসলিমদের প্রথম গ্রুপ- মুরদের নামকরণ করেছে পর্তুগীজ ঔপনিবেশিক শাসকেরা। এরা মূলত আরববিশ্বের লোকদের মুর নামে ডাকতো, শ্রীলংকাতেও যেহেতু আরব ব্যবসায়ীদের হাত ধরেই ইসলামের প্রসার ঘটেছে তাই এখানকার মুসলিমদেরও ওরা মুর নামেই আখ্যায়িত করেছে।

আর মালয় মুসলিমরা হলেন মালয়েশিয়া ও পাশ্ববর্তী অঞ্চল থেকে আসা মুসলিমদের উত্তরাধীকারী। মালয় মুসলিমরা মুরদের থেকে স্বাভাবিকভাবেই ভিন্নরকম। শারীরিক দিক থেকে যেমন, ভাষাগত দিকে থেকেও। শ্রীলংকান মালয় মুসলিমরা তামিল ভাষা ব্যবহার করলেও তাতে প্রচুর পরিমাণ মালয় ভাষার মিশ্রণ লক্ষ করা যায়।… (চলবে ইনশাআল্লাহ)

শাকিল আদনান: পরিচালক- মানাম কনজ্যুমার প্রডাক্টস