সোমবার, ২৫ জুন ২০১৮

কওমি মাদরাসায় কারিগরি শিক্ষা : আমার দেখা কিছু বদলে যাওয়া জীবন

OURISLAM24.COM
জুলাই ২, ২০১৭
news-image

লাবীব আবদুল্লাহ : আমি তখন একটি কওমি মাদরাসার নাযেমে দারুল ইকামা৷ এই  পদে ছিলাম এক যুগ৷ সাথে দায়িত্ব ছিলো নাযেমে তালিমাতেরও৷ এই পদে দুই যুগের উপরে৷ দায়িত্বের সূত্রে অভিভাবকগণ আমার কাছে ছেলেদের সমস্যাগুলো বলেন এবং প্রয়োজনে পরামর্শ নেন৷ আমি আমার মতো করে সুপরামর্শ দেবার চেষ্টা করি৷ ইচ্ছে করে কুপরামর্শ দেই নি কখনও৷

এক শায়খুল হাদীস সাহেব এলেন একবার৷ ছেলে চরম সব কিছুতেই৷ আমার কামরায় রাখতে বললেন৷ আমি আমার কামরায় তালেবে ইলম রাখা পছন্দ করি না৷ আমার উস্তায বলেছিলেন তালেবে ইলম থেকে কোনো খেদমত না নেয়া৷ আমি তখন মাদরাসার বড় এক কামরায় একা থাকি এবং আমার ছিলো অনেক বই নানা বিষয়ের৷

দারুল উলুম দেওবন্দ বহু আগ থেকেই কারিগরি শিক্ষা দিয়ে আসছে: মুফতি জহির ইবনে মুসলিম

তবে সেই তালেবে ইলমের প্রতি বিশেষ নেগরানির জিম্মাদারি নিলাম৷ ছেলে দরসে ঠিক মতো থাকে না৷ থাকলেও পড়ে না৷ একদিন ডেকে বললাম, তোমার কী ভালো লাগে?
– পড়া ভালো লাগে না, মোবাইল ভাঙ্গা ভালো লাগে৷ ভালো লাগে কম্পিউটারে কী আছে তা ভেঙ্গে দেখা আমি তাকে পড়ালেখার যত ওয়াজ নসিহত করলাম সব ব্যর্থ হলো৷

একদিন সে সামানপত্র নিয়ে পালিয়ে গেলো৷ ছেলেটির নাম শাকির৷

দুই.

দরসে একটি হাফেয ছেলে৷ মেধাবী৷ কম কথা বলে৷ তবে ক্লাসে ভালো পড়ালেখা পারে কিন্তু পরীক্ষা ছাড়া সে পড়ে না৷ হেদায়েতুন্নাহু পড়ে৷ আমি আরবী সাহিত্যে পড়াই৷ ছেলেটি দরসে অমনোযোগী হয়েও পরীক্ষায় মেধা তালিকায় শীর্ষে থাকে৷ মুখে সবসময় হাসি হাসি ভাব৷ মিষ্টি চেহারা তার৷ বাড়তি কোনে বই পড়তে বললে সে বলল, আমার পড়তে ভালো লাগে না৷ – তোমার কী করতে ভালো লাগে?
– যন্ত্রের ভেতরে কী আছে তা দেখতে ভালো লাগে৷ মন চায় ইঞ্জিনিয়ার অইতাম৷ ছেলেটি বার্ষিক পরীক্ষা না দিয়ে চলে গেলো এবং মাদরাসায় এলো না৷

ধরে নিলাম ছেলেটি সাজিদ৷

কওমি মাদরাসায় কারিগরি প্রশিক্ষণ: এটুআই ও ইকরার চুক্তিসই

তিন.

ঈদের আগে আমি জামা কাপড় বানাতে আগ্রহী নই৷ দর্জিরা কাজ নিতে চায় না শেষ মুহূর্তে৷ আমার ঘরের বেগম সাহেবাকে বলেছি আমার জামা বানাতে৷ বিবি সাহেবা আমার ছেলের মাধ্যমে দর্জির কাছে জামা পায়জামা পাঠিয়ে দিয়েছে৷ আমাকে শুধু নিয়ে আসতে হবে৷ বার বার তাকাদা দেওয়ায় গেলাম দর্জির দোকানে৷ দর্জি সাহেব বললেন, উস্তায কফি আনি?

– কিছু আনতে হবে না
– দর্জিগিরি করে কী আয় করেছো?
– জায়গা কিনে ফাউন্ডেশন দিয়ে বাসা করছি উস্তায
– ঈদের আগে কত টাকা উপার্জন করলা?
– উস্তায, চার লাখ তো হবে, সারা বছরের ইনকাম দুই ঈদে ছোট একটি দর্জির দোকান৷ কারিগর কয়েক জন৷ নিজে শুধু কাপড় কাটে৷
আমার পাঞ্জাবির মজুরি কত?
– যা মন চায় দেন, আমি সাড়ে তিন শত টাকা লই৷ আপনি উস্তায, তিন শত টেহা দিলেই হবে৷ আর না দিলেও আমি খুশী৷ আমি সাড়ে তিন শত টাকাই দিলাম৷ যেহেতু সে আমার কাছে কিতাব পড়েছে তাই কম দিলে মনে মনে বলতে পারে হুজুরগো কাজ করে আরাম নাই৷ পয়সা কম দেয়৷ সে মাদরাসায় কাফিয়া পড়ে পড়ালেখা বাদ দিয়ে দর্জিগিরি করে৷ নাম তাঁর আল আমীন৷

চার.

শাকির বর্তমানে কম্পিউটারের দোকান দিয়েছে৷ এই রমাযানে চিল্লা দিয়েছে৷ পরিবারে আর্থিক সহযোগিতা করে৷ বিবাহিত৷ মেয়েরা মহিলা মাদরাসায় পড়ে৷ ভালো আয় সংসারে৷

এটুআই ও ইকরার সমঝোতা কওমি শিক্ষার উদ্দেশ্য পরিপন্থী: মাওলানা মামুনুল হক

সাজিদ টুপি পাঞ্জাবি গায়ে জড়িয়েই একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইনঞ্জিনিয়ার হবার পথে৷ নিয়মিত তারাবীহ পড়ায়৷ কিতাবখানায় শরহে বেকায়ার পর আর পড়ে নাই৷ আল আমীন লাখপতি৷ ছেলেদেরকে মাদরাসায় দিয়েছে৷

এই তিনজন একই মাদরাসার তালেবে ইলম৷ এই তিনজন কেউ আলেম হয় নাই বা হতে পারে নাই৷ বা আলেম হওয়া অভিভাবকের ইচ্ছে থাকলেও তারা সে পথে যায় নাই বা যেতে পারে নাই৷ তবে এই তিনজন হালাল উপার্জন করে পরিবারে সহযোগিতা করছে৷ নিজের ছেলেদেরকে মাদরাসায় পড়াচ্ছে৷ হয়তো তারা আলেম হবে৷ এটি আল্লাহর তওফিক৷ তবে সবাইকে আলেম হতেই হবে এটি জুররি নয়৷ দীনদার হতে হবে৷ ফরজ পরিমান ইলম শিখতে হবে৷

আমার ২৫ বছরের শিক্ষকতার জীবনে শত শত ছেলে পেয়েছি সাজিদ,শাকির ও আল আমীনের মতো৷ কারিগরি জ্ঞানে আগ্রহী কিন্তু কিতাবে অনাগ্রহী৷ এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ভেতরের টান৷ আমি ব্যাক্তিগতভাবে একটি বিদ্যুতের লাইট লাগাতেও অক্ষম এবং এর জন্য কথাও শুনতে হয়৷ কম্পিউটার, ইঞ্জিনিয়ারিং বা দর্জির প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই৷ আমি বই পড়ি এবং মনে হয় আর সব কাজ আমার জন্য দুরুহ, দুর্বিসহ৷ কঠিন৷ এবং নিয়মিত বাজার করতেও আমার অনীহা৷ বাজারে গেলে মনে হয় আমার সময় চলে গেলো পড়ার৷ এবং আমি পণ্য কিনে ধরা খাই বা প্রতারিত হই বার বার৷ তবে বই কিনতে উস্তাদ৷

পাঁচ হাজার ছেলে কওমি মাদরাসায় ভর্তি হচ্ছে৷ সব আলেম হবে এটি মনে হয় ঠিক চিন্তা নয়৷ নানা কারণে আলেম হতে পারবে না৷ যারা মেধাবী এবং যাদের আগ্রহ আছে তারা আলেম হবে৷ তবে যাদের আগ্রহ কারিগরি কাজের প্রতি তাদেরকে ফরজ পরিমাণ ইলম শিক্ষা দিয়ে দীনি পরিবেশে কারিগরি শিক্ষার আয়োজন করলে এটিও একটি ভালো পদক্ষেপ হতে পারে৷

তবে এনজিও বা কোনো এজেণ্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হবার জন্য কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজন নেই কওমি মাদরাসায়৷ মাদরাসার নিজস্ব উদ্যেগ ও আয়োজনে, দীনি মেজায ঠিক রেখে কিতাবে অনাগ্রহী তালেবে ইলমদের বহুমুখী কারিগরি শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে৷ প্রয়োজনে দীনদার দক্ষ কারিগর ও প্রযুক্তিবিদদের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে৷

তথ্য প্রযুক্তির যুগে কারিগরি বলতে আমি পুরনে দর্জিগিরির কথা বলছি না৷ এই কারিগরি ব্যাপক৷ আউট সোর্সিংও অন্তুর্ভুক্ত এই প্রস্তাবনায়৷ মুদ্রণ শিল্পও একটি ক্ষেত্র৷ তালেবে ইলমদেরকে এই বিষয়ে আগ্রহী করলে কিতাব পত্র, দীনি বইপত্র ছাপায় দীনদারদের আধিপত্য হবে কোনো সময়৷ কৃষি, গরুর খামার, মৎস চাষ জাতীয় কাজেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে৷

তবে তা হবে দীনি মেজায রক্ষা করে৷ মাদরাস সব করতে পারবে না তবে মাদরাসা উদ্যোগী হলে দীনদার মানুষের সহায়তা পাওয়া যাবে৷ এই সহায়তা আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা৷ তবে মাদরাসার প্রধান দায়িত্ব এই কাজ নয়৷ এর জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনা থাকতে পারে৷ এটি সব মাদরাসায় নয়৷ যেসব মাদরাসায় পর্যাপ্ত জায়গা জমিন আছে এবং অর্থ ও লোকবল আছে তারা উদ্যেগী হতে পারে৷

কোনো কোনো জামিয়া এই জাতীয় উদ্যোগ নিয়েছে৷ কেউ ব্যর্থ কেউ সফল৷ তবে সফলতা ও ব্যর্থতার ভেতর দিয়েই এগিয়ে যেতে হবে কওমী মাদরাসকে৷ অন্যের সন্দেহপূর্ণ আর্থিক সহযোগিতা থেকে নিজেরা হালাল উপার্জন করে একটি অংশ মাদরাসায় দান করলে সেই টাকায় বরকত হবে৷ সেই টাকায় মেধাবীরা পড়ালেখার সুযোগ পাবে৷ হারামখোরদের টাকার নিলে মাদরাসা রুহশূন্য হবে বা হতে পারে৷ এবং মাদরাসা হবে তখন বরকতহীন প্রসাধের লাশ৷ হালাল খেতে হয় আলেম হবার আগ্রহীদের৷ থাকতে হয় হালালখোরদের সাথে৷ কারিগরি শিক্ষা হতে পারে হালাল আয়ের মাধ্যম৷