শুক্রবার, ২২ জুন ২০১৮

কেমন আছেন নুরানী পদ্ধতির আলো হাতে ঘুরে বেড়ানো কারী বেলায়েত হুসাইন?

OURISLAM24.COM
জুন ২২, ২০১৭
news-image

হাসান আল মাহমুদ
প্রতিবেদক, আওয়ার ইসলাম

বাংলাদেশের ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক শিক্ষার নাম নুরানী। বাংলাদেশের শহরে-গ্রামে নুরানী মাদরাসা নামে যেসব মাদরাসা গড়ে উঠেছে, সবই ষাটের দশকে গবেষণালব্ধ ‘নুরানী পদ্ধতি’ শিক্ষার ফসল। এই ‘নুরানী পদ্ধতি’ শিক্ষার প্রবর্তক হলেন হজরত মাওলানা ক্বারী বেলায়েত হুসাইন।

চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি থানার কৃষ্ণপুর গ্রাম বর্তমান নাম বেলায়েত নগরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে প্রায় ১৯০৭ সালে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। জন্মের তিন বছর বয়সে বাবা আব্দুল জলিল এবং ছয় বছর বয়সে মা সাইয়েদা খাতুন নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান। দুই বোনের মধ্যে ছোট বোন বয়সে তার ১৮ বছরের বড়। শৈশবে বাবা-মা হারা এই ছেলেটিই একদিন হয়ে ওঠেন একটি বৈপ্লবিক শিক্ষা পদ্ধতির আবিষ্কারক।

দরদি চিন্তা-ভাবনা আর কলাকৌশলের সংমিশ্রণে কুরআন শিক্ষার সুন্দর ও সহজতম বৈপ্লবিক শিক্ষা ‘নুরানী পদ্ধতি’ সম্পর্কে জানতে হাজির হই রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবস্থিত নুরানী পদ্ধতি শিক্ষার প্রবর্তক মাওলানা ক্বারী বেলায়েত হুসাইন-এর নিজ বাসভবন নুরানী মঞ্জিলে।

ঘড়িতে সময় তখন দুপুর। মেইন রোড লাগোয়া সুদর্শন বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে দু-তলায় গিয়ে আঁতকে উঠি দরোজায় সাঁটানো একটি কাগজের ঘোষণা পড়ে। কাগজে লেখা ‘ রুগীর শয্যাপাশে ১/২ মিনিটের অতিরিক্ত সময় না থাকা এবং কোন ধরনের কথা বা আওয়াজ না করার জন্য অনুরোধ করা হল।- আদেশক্রমে ডাঃ মোঃ আব্দুল হাই। ব্যক্তিগত চিকিৎসক, মাওঃ ক্বারী বেলায়েত হুসাইন’।

ভেতরে প্রবেশ করে দেখি টাইলস করা রুমের এক পাশে চাদর গায়ে জড়িয়ে শুয়ে আছেন মাওলানা ক্বারী বেলায়েত হুসাইন। কোনো শব্দ নেই, রাও নেই। নিস্তব্ধ নীরব। কেবল ঠোঁট দুটো মাঝে মাঝে নড়ছে। আল্লাহ আল্লাহ শব্দের মত কিছু উচ্চারণ শোনা যায়।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ৪ ডিসেম্বর রাত ১০টায় বার্ধক্যজনিত কারণে ব্রেইন স্ট্রোক করে সেই যে বিছানায় শায়িত হলেন আর উঠতে পারেননি। পরিবার জানায়, বাংলাদেশের নানা হাসপাতালসহ সিঙ্গাপুরে নিয়েও চিকিৎসার চিন্তা করেছিলাম আমরা।

ক্বারী বেলায়েত সাহেবের চোখ বন্ধ। মাঝে মাঝে নাকি চোখ খোলেন। নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকেন যাকে সামনে পান তার দিকে। যেন চোখ দিয়েই বলে দিতে চান উম্মাহ’র দরদি চিন্তায় শিক্ষার আলো বিলাতে কাজ করে যাও।

সার্বক্ষণিক একজন স্বেচ্ছায় আগ্রহী খাদেম থাকেন রুমে। চোখ মেললে, কিংবা অন্য কিছুর প্রয়োজনে খাদেম বা উপস্থিত যারা থাকেন এগিয়ে আসেন। সারা জীবন কুরআন শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ‘নুরানী পদ্ধতি’ হাতে পাড়ায়-মহল্লায় ঘুরে বেড়ানো আল্লাহর এই বান্দা দুনিয়ার আর বাকি দিনগুলোতে যেন বিশ্রাম নিয়ে তবেই মাওলা পাকের দরবারে যেতে পারে সেজন্যই বুঝি দীর্ঘ পাঁচ বছরের বেশি সময় বিছানায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে আছেন।

১১০ বৎসর বয়সী হাজারও নুরানী মুয়াল্লিম বানানোর কারিগড়, নুরানী পদ্ধতির প্রবর্তক মাওলানা ক্বারী বেলায়েত হুসাইন, তার প্রবর্তিত নুরানী পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয় জানতে তারই সুযোগ্য পুত্র মাওলানা ক্বারী ইসমাইল বেলায়েত হুসাইন এর মুখোমুখি হই।

বাবার সম্পর্কে জানতে চাইলে ক্বারী ইসমাইল বেলায়েত হুসাইন আওয়ার ইসলামকে বলেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁকে নিজ হাতে তুলে এ কাজের জন্য ইন্তেখাব করেছেন। আব্বাজানের বয়স যখন তিন বছর, তখন আমার দাদাজানের ইন্তেকাল হয়ে গেছে। উনার বয়স যখন ছয় বছর, তখন উনার দাদিজানেরও ইন্তেকাল হয়ে গেছে। আর এই মাঝখানে তাঁর কোনো বড় ভাইও নাই। তার আগে উনার বড় দুই বোন ছিল। ছোট বোনের আঠারো বছর পরে আব্বাজানের জন্ম। দাদাজানের স্বপ্ন ছিল আল্লাহ যদি তাকে একটা ছেলে দেয়, তাহলে তাকে আলেম বানাবে। মুফতি শফী সাহেব রহ: রচিত তরজমাতুল কুরআন এক জিল কিনে তিনি আগেই রেখে দিয়েছেন যে, আল্লাহ ছেলে দিলে তাকে আলেম বানাবো। কিন্তু ছেলে আল্লাহ দিলেন; ছেলে দিয়ে উনাকে নিয়ে গেলেন। দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ভাই তো আর নেই। চাচাজানরা আবার বড় ব্যবসায়ী ছিলেন ঢাকার চকবাজার এলাকায়। তো, চাচা আব্বাজানকে ঢাকায় নিয়ে আসলেন। উনার বয়স তখন সাত বছর। এখানে এসে তিনি চাচার দোকানে চাকরি করেছেন দুই বছর। দুই বছর পর বাড়ি গেলে বড় ফুপি বললেন, দেখতো ভাইয়া! আব্বা তো তোকে নিয়ত করেছে আলেম বানাবে। কিন্তু চাচার সাথে তো সেখানে তোর পড়ালেখা হবে না। উনি বললেন, আমিও তো পড়তে চাই।
তো, চাচা ব্যবসার পরিধি বাড়াবেন, উনি চলে যাবেন, এজন্য সব গুছিয়ে নিয়েছেন।

ভাই-বোন যুক্তি করে পালাইছে, আমাকে যদি পড়তেই হয়, তাহলে চলে যেতে হবে। পালিয়ে গিয়ে উঠলেন অন্য এক খালার বাড়িতে।

পরবর্তীতে আব্বার খালার হাজব্যান্ড উনি আকার প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার।

খালু ভালো নজরে নেন নাই। উনি বললেন, থাকতে হলে কাম-কাজ করে থাকতে হবে। আমার ছাগল-গরু আছে, এগুলা পালতে হবে। এরপরে অবসর সময় পেলে পারলে পড়াশোনা করবে।

খালতো ভাইরা পড়তেন। আব্বা পড়তেন না, উনি ছাগল চড়াতেন। ছাগল চড়াতে গিয়ে মাঠে থেকে থেকে স্কুলে আসা-যাওয়ারত ছাত্রদের কাছ থেকে কিন্তু আল্লাহ পাক একদিন এমন একটি পরিস্থিতি নিয়ে এলেন যে, খালতো ভাইরা পড়তেছে কিন্তু ভুল পড়তেছে। তো, তিনি বলে দিলেন তোমার এটা ভুল হয়েছে। এটা এমনে হবে না ওমনে হবে। তখন খালুর হুশ হইছে, ঘটনা কি তারে তো স্কুলে যেতে দেই নাই। তারে তো ছাগল চড়াতে দিয়েছিলাম। তাতেও সে লেখাপড়ায় বেশ মনোযোগী। তাহলে ঠিক আছে তুমিও পড়ো। স্কুলে যাবার সময় ছাগল মাঠে দিয়ে যাবা আবার আসার সময় নিয়ে আসবা। এভাবে ছয় মাস গেছে। পরে ভাই-বোন আবার এক সাথে হবার পরে আসলে এই পড়াতো টার্গেট না।

নুরানী মঞ্জিল, সামনে মার্কেট, ভেতরে কারী বেলায়েত হুসাইনের বাসা

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার বারোপাইয়া নামক একটা গ্রাম আছে, সেখানে মাওলানা ক্বারী সিরাজুল ইসলাম সাহেব একটা মাদরাসা করেছেন। খবর নিয়ে তিনি সেখানে চলে গেলেন। এতিম, যার তেমন কোনো অভিভাবক নেই এরকমের একটা ছেলে পড়তে এসেছে। হুজুররা খুব মহাব্বতের সাথে একটা লজিং দিয়া দিলো। লজিং দিলেই বা কি হবে, লজিংয়ে তো আবার পড়াইতে হয়। উনারতো কোনো এলেম কালাম নাই। এই ক্বারী সিরাজুল ইসলাম সাহেব আব্বার সবচে মুহসেন-প্রিয় উস্তাদ। আমরা বিভিন্ন সময়ে সফরে দেখতাম আব্বা উনার কবরের কাছে নেমে যিয়ারত করে তারপর যেতেন।

তখন হুজুর বললেন, বেলায়েত! শোনো, আমার কাছ থেকে প্রতিদিন যাই পড়বা তাই যেয়ে তোমার লজিং বাড়িতে বাচ্চাদের পড়াইবা। আর এখানে কিতাবের সবক ধরবা। এ অবস্থায় আব্বাজান ওখানে কাফিয়া পর্ডন্ত পড়ে শেষ করেন। এর মাঝে কত চড়াই উতড়াই অতিবাহিত হল। ফাঁকে ফাঁকে ওই সময়েই তিনি দর্জি কাজ শিখতেন। কাটিং মাস্টার। রমজান মাস পুরাটা খালি। কাটিং মাস্টারি করে সারা বছরের খরচ যুগিয়ে ফেলতেন।

আসাতিযায়ে কেরামগণ কখনো কখনো প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তুমি তো মানুষে যেসব ফেতরা, যাকাত ইত্যাদি দেয় ইচ্ছা করলে তা তুমি নিতে পারো। আল্লাহ পাক উনাকে এমন বানাইছেন, উনার জীবনে এত কষ্ট গেলেও উনি যাকাত-ফেতরা গ্রহণ করেন নাই। কষ্টের কোনো অন্ত ছিল না, কিন্তু তারপরও এ জাতীয় কোনো কিছু নিতেন না।

দু-এক বছরের মধ্যে আশরাফুল উলূম বড়কাটারা মাদারাসা প্রতিষ্ঠিত হল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এবার তাহলে বড়কাটারায় চলে যাই। যথাক্রমে তিনি বারোপাইয়া মাদরাসা থেকে বড়কাটারা মাদরাসায় চলে এলেন। এখানে এসেই পেয়ে গেলেন বিখ্যাত ব্যক্তিদের।

শামছুল হক ফরিদপুরী রহ., হাফেজ্জী হুজুর রহ. সহ এদেশের বাঘা বাঘা সব আলেম ব্যক্তিত্বের সাক্ষাত পেলেন। এখানে তিনি রমজানে কাটিং মাস্টারি করে জমানো যেই টাকা সাথে করে নিয়ে এলেন, তা তিন-চার যেতেই শেষ হয়ে গেল। মাদরাসায় তখন টাকা দিয়ে খেতে হত। টাকা শেষ হওয়ায় তিনি পড়লেন কষ্টে। মাদরাসার অবস্থাও এরকম ছিল যে, ফ্রি খাওয়াবে তার ব্যবস্থা নেই।

নদীর ওপার কালিগঞ্জে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে একটা লজিং এর ব্যবস্থা করে দেয়া হল মাদরাসা থেকে। প্রতিদিন সকালে লজিং থেকে হেঁটে হেঁটে মাদরাসায় এসে ক্লাস করতেন এবং আবার চলে যেতেন। লজিং বাড়ির মসজিদে তাঁকে নামায পড়াতে হত। জোহর বাদে চার ওয়াক্ত এবং জুমার নামায। বিনা বেতনে; থাকা-খাওয়ার বদৌলতে।

তাতে একবার ঘটল এক ঘটনা। রমজান মাস। সারা মাস নামায পড়ালেন তিনি। ঈদের সময় কাছাকাছি। তিনি এক নামাযের পর মিম্বারে বসা। এমন সময় মসজিদের মুতাওয়াল্লি লিস্টি হাতে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনাদের এখনও যাদের ফেতরার টাকা বাকি আছে, সত্ত্বর দিয়ে দেন। আব্বা উঠে বললেন, কিসের জন্য এই টাকা!  মুতাওয়াল্লি বললো, আপনার বুঝার দরকার নেই। আমরা প্রতি বছরই ফেতরার টাকা উঠিয়ে ইমাম সাবকে দিয়ে দেই।

আব্বা বললেন, লিস্টিটা দেন তো। লিস্টিটা হাতে নিয়ে তিনি সেখানেই সবার সামনে কেচ কেচ করে ছিঁড়ে বাইরে ফেলে দিলেন। মুতাওয়াল্লি রাগে গজগজ করে দাঁড়িয়ে বললো, থাক থাক, আপনারা যারা যারা আমার কাছে ফেতরার টাকা দিয়েছেন সবাই নিয়ে নেবেন। আমগো ইমাম সাব বড় লোক; তিনি ফেতরার টাকা খান না। অথচ আব্বার অবস্থা তখন এরকম ছিল যে, গায়ে দেয়ার তেমন জামা ছিল না।

এভাবে কষ্ট করে করে পড়ালেখা করতে করতে মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. এর নজরেও পড়ে গেছেন। তখন ১৯৪৭ সাল। তিনি মেশকাত পড়েছেন। এমন সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। জায়গায় জায়গায় বোম ফুটছে। সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। বড়কাটারা মাদরাসাও বন্ধ হয়ে গেল। মাদরাসা থেকে বলে দেওয়া হল, এখন তোমরা সবাই যার যার বাড়িতে চলে যাও। পরবর্তীতে যুদ্ধ শেষ হলে চলে আসবা।

যুদ্ধ শেষ হল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হল। মাদরাসা খোলা হল। ছাত্ররা সবাই চলে এলো। আব্বাজানও মাদরাসায় এলেন। ১৯৪৮ এ দাওরা ফারেগ হলেন। শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. ফারেগিনদের সবাইকে শেষ নসিহত করেছিলেন ‘ফারেগ হয়ে যেন সবাই শিক্ষকতার সাথে জড়িত থাকে’।

দাওরা ফারেগ হলে ছাত্ররা সবাই বিদায় নিয়ে চলে গেলে তিনি ফরিদপুরী রহ. এর কাছে গিয়ে বললেন, ‘হজরত! আপনি তো সবাইকে পড়ানোর নসিহত করেছেন, আমারও তো পড়াতে ইচ্ছে হয় কিন্ত আমি তো কোনো কিতাব বুঝি নাই, আমি কেমনে পড়ামু। আমাকে যদি কাজে লাগাতে হয়, তাহলে আমাকে আবার পড়াতে হবে’।

মাওলানা ফরিদপুরী রহ. জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তোমার মত একটা ছেলেকেই তো আমি খোঁজতেছি। যেখানে ছাত্ররা সময় দিতে প্রস্তুত না, তুমি সময় চেয়ে নিচ্ছো। তোমাকে দিয়েই আসলে অনেক কাজ করা যাবে। তুমি চলো আমার সাথে’।

মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. আব্বাকে সাথে নিয়ে গেলেন উনার প্রতিষ্ঠিত গওহরডাঙ্গা মাদরাসায়। সেখানে কাকতালীয় ঘটনা ঘটল। ওখানে তিনদিন মেহমান হিসাবে থাকলেন। তিনদিন পরে মাদরাসার মুহতামিমকে ডেকে ফরিদপুরী রহ. বললেন ‘তুমি এই ছেলেটার সাথে কথাবার্তা বলে তাকে কাজে লাগাও’।

মুহতামিম সাহেব আব্বার কাছে এসে বললেন ‘আপনাকে আমরা আমাদের মাদরাসায় রেখে দিতে চাই, আপনার তাকাযা কেমন, কিরকম দিতে হবে আপনাকে? বললে ভালো হত’। আব্বা বললেন ‘আমি তো বুঝি না, কী বলছেন আপনি; আমি তো এখানে পড়তে এসেছি; পড়াতে নই’।

মুহতামিম সাহেব সদর সাহেবের কাছে তা বললে তিনি বললেন, ঠিক আছে, তাকে ডাকো। এবার তিনজন একত্রিত হয়ে বললেন, ‘আপনাকে কত দেয়া লাগবে? আব্বা মিশকাত শরীফের একটা হাদিসের ইঙ্গিত করলে সদর সাহেব একেবারে খামুশ হয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে বাবা, তুমি কাজ করতে থাকো’।

আব্বা বললেন ‘আমি তো পারি না’। সদর সাব বললেন ‘তুমি আমার কাছ থেকে সবক শিখবা তারপর পড়াইবা। মসজিদের ইমামতিও করবা, জুমা পড়াইবা, খুতবা কি পড়বা সেটাও আমাকে শুনাইবা’।

এভাবে হাতে ধরে ধরে সদর সাব হুজুর আব্বাজানকে দুই বছর ওখানে রাখলেন। সদর সাহেব তখন ঢাকা থেকে প্রতিমাসে দু-তিনবার করে গওহরডাঙ্গা মাদরাসায় যেয়ে দেখভাল করতেন। ওই দুই বছর আব্বাজান ছাত্রদের এমনভাবে পড়ালেন যে, আশির নিচে কোনো ছাত্রকে নাম্বার দিতে পারেননি পরীক্ষক আসাতিযায়ে কেরাম।

আব্বার এক ছাত্র হেলাল সাহেব। তিনি বলতেন, ‘আমাদেরকে হুজুর মিযান-নাহু এমনভাবে পড়াইছেন যে, সফওয়াতুল মাসাদিরের এগারো শত মাসদারের সবকটাই মুখস্থ। শিক্ষকতার দুই বছর অতিবাহিত হলো। সদর সাহেব হুজুরের কাছে চাঁদপুরের জামিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলুম জাফরাবাদ মাদরাসা থেকে একজন মুহতামিম প্রয়োজনের আবেদন আসলো। তিনি আব্বাকে বললেন ‘বেলায়েত! আল্লাহর হাওলা করে তুমি জাফরাবাদ মাদরাসার মুহতামিমেরর দায়িত্ব নাও’।

সদর সাহেব আব্বাকে জাফরাবাদে পাঠিয়ে দিলেন। আব্বাজান জাফরাবাদ মাদরাসায় এলেন। চলতে লাগলো মাদরাসা। এ মাদরাসার শিক্ষকবৃন্দ যারা ছিলেন, তারা সবাই লিখিতভাবে সদর সাহেব হুজুরের কাছে একটা অভিযোগ পাঠালো- ‘আমাদের মুহতামিম সাহেব ক্লাস নিবেন দাওরায়ে হাদিস বা উপরের যে কোনো ক্লাস। কিন্তু খুবই খারাপ লাগে আমাদের কাছে, তিনি উপরের ক্লাস তো নেনই না, সারাদিন বাচ্চাদের ক্লাস নিয়ে বসে থাকেন’। এ চিঠির খবর আব্বার কাছে এলে তিনি সদর সাহেব হুজুরের কাছে চিঠি লিখলেন- ‘এখানে আরো যোগ্য লোক দেন, যারা বড়দের পড়াতে পারবেন, আমার তো বাচ্চাদের দিকে ঝোঁক বেশি। বাচ্চাদের পড়াইতেই আমার ভালো লাগে বেশি। আমি আল্লাহর ওয়াস্তে আপনার কাছ থেকে ইস্তফা চাচ্ছি’।

সেখান থেকে চলে এলেন এই ভেবে যে, এখানে আমি থাকলে উনারাও বিরক্ত হবেন, আবার আমার যে চিন্তা-ভাবনা তারও বাস্তবায়ন হবে না।

সেখান থেকে বাড়ি এসে উঠলেন। ওয়ারিস সূত্রে যে জমি পেলেন তার কিছু জায়গা বন্ধক রেখে এলাকার ও নিজের জায়গা মিলিয়ে মাদরাসা খুলে নিজের নিজের খেয়ে পড়াতে লাগলেন। যেভাবে পড়ালে বাচ্চারা কুরআনুল কারীম শুদ্ধ করে পড়ার সাথে সাথে তাদের ইলমে ফরীজাহ (ইসলামের আবশ্যকীয় জ্ঞান) অর্জন হবে সেভাবে নিজের মত করে পড়াতে লাগলেন। এভাবে তিনি আর এলাকায় বেশি দিন থাকতে পারেন নি। আব্বার গ্যাসটিক আলচার রোগ হয়ে গেছিল। সে রোগের চিকৎসা নিতে চট্রগ্রামের তখনকার সময়ে সবচে বড় হাসপাতাল চন্দ্রগোনা হাসপাতালে আম্মার কিছু গয়না বিক্রি করে দেখানো হলে হাসপাতালের সবচে বড় চিকিৎসক এ রোগের অবস্থা দেখে চিকিৎসা নেই বলে জানিয়ে দেন।

আব্বা বাড়িতে এসে আম্মাকে বললেন, ‘আমার যেহেতু দিন শেষই হয়ে যাচ্ছে, তাই আমি বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছি অজানাপথে। আমার যে বাচ্চাদের ইলমে ফারীজাহ পড়ানোর পদ্ধতি রয়েছে তা যেন সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে পারি। আমার মত করে যেন অন্যরাও পড়াতে পারে।

শিক্ষার হালাত নিয়ে অন্তরের ব্যথা তিনি ছোটবেলা থেকেই অনুভব করে আসছেন। যখন বারোপাইয়া পড়তেন, তখন ক্বারী সিরাজুল ইসলামের কাছে পড়ার সময় আব্বাকে লজিং দেয়া হয়েছিল। আব্বা বলেছিলেন ‘আমি তো পড়াইতে পারি না’। হুজুর বলেছিলেন ‘ঠিক আছে তুমি আমার কাছে যা শিখবা তাই গিয়ে লজিং বাড়িতে পড়াইবা’। তখন তিনি অনুভব করছেন, হুজুর আমাকে যেভাবে শিখিয়ে দিয়েছেন সেভাবে আমি যে বাচ্চাগুলোকে পড়াচ্ছি, তারা তো পারছে, কিন্তু গতানুগতিক যারা আসতেছে ওরা তো এগুলো পারে না। সূচনা থেকেই তিনি ভাবতেন, গতানুগতিক যেসব মক্তব রয়েছে, সেখানে তো তারা সেভাবে পারছে না।

নুরানী পদ্ধতি নাম কিভাবে এলো, কিভাবে বেড়ে উঠে একটি স্বতন্ত্র শিক্ষা বোর্ডে উন্নীত হল, নুরানী পদ্ধতির আরো চমকপ্রদ বিষয় জানতে চোখ রাখুন প্রতিবেদনের ২য় পর্বে…