শুক্রবার, ২২ জুন ২০১৮

একজন হিন্দুস্তানি সাহাবি

OURISLAM24.COM
জুন ১৫, ২০১৭
news-image

নাসিম মুমতাজী
তরুণ লেখক ও প্রাবন্ধিক

আমরা সকলেই অবগত আছি, হিন্দুস্তানের পবিত্র ভূমিতে সাহাবায়ে কেরাম রা. এর পদধূলি পড়েছিলো। নবী করীম [সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর এর দর্শন ও সান্নিধ্যলাভে ধন্য বুযুর্গদের সুভাগমন ঘটেছিলো।

বাংলাদেশের খুলনা শহরে তো খোদ হুজুর স. এর জীবদ্দশায়ই (এমনকি মদীনাতে হিজরত করার পূর্বেই) সাহাবায়ে কেরাম রা. দ্বীনের দ্বীপ্ত মশালহাতে ছুটে এসেছিলেন

শুধু কি তাই! খুলনা শহরের ‘খুলনা’ নামটাও তাঁদের কথোপকথন থেকে রাখা হয়েছে। কিন্তু, এ উপমহাদেশে জন্ম, এখানেই বেড়ে ওঠা; যাঁর শৈশব-কৈশোর-যৌবন কেটেছে এ মাটিতেই যিনি ধর্মগত দিক দিয়ে হিন্দু ধর্মানুসারী ছিলেন পরবর্তীতে ইসলামরবির উদয়স্থল পবিত্র ‘মক্কা’ নগরীতে গিয়ে ইসলামগ্রহণ করে হুজুর স. এর বরকতময় সান্নিধ্যলাভে ধন্য হয়ে সাহাবা হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন, এমন ভাগ্যবান মানুষের কথা কমই জানি।

তাই আসুন! ফিরে যাই ইতিহাসের পাতায়। দৃষ্টি বুলিয়ে দেখি কে ছিলেন তিনি? কোথায় ছিলো তাঁর নিবাস? কী ছিলো তাঁর পেশা? আর কী কারণেই বা তিনি ইসলামের সুমিষ্ট ‘অমৃত’ পান করলেন?

জয়নুদ্দীন’ একজন মুসলিম ইতিহাসবিদ। তাঁর রচিত একটি ইতিহাসগ্রন্থ হলো ‘তুহফাতুল মুজাহিদীন’। সে গ্রন্থে একজন হিন্দুরাজার মক্কাগমন ও হযরত মুহাম্মদ স. এর নিকট উপস্থিত হওয়া এবং স্বেচ্ছায় ইসলামগ্রহণের প্রদত্ত বিবরণ পাওয়া যায়।

সে গ্রন্থে এটাও পাওয়া যায় যে রাজা কিছুকাল হযরত মুহাম্মদ স. এর নিকট অবস্থান করে প্রত্যাবর্তনের সময় ‘শহর’ নামক স্থানে পরলোকগমন করেন।

এর দ্বারা বুঝা গেলো, তিনি একজন রাজা ছিলেন। কিন্তু এগ্রন্থে তার নাম বা বংশপরিচয় কিছুই দেওয়া হয়নি। তবে একই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ‘বিশ্বকোষ’- এর উদ্বৃতি দিয়ে ‘আল্লামা গোলাম আহমদ মোর্তজা’ লিখেছেন, পরাবৃত্ত পাঠে জানা যায় যে ‘চেরর’ রাজ্যের (ভারতের) শেষ রাজা ‘চেরুমল পেরুমল’ ইচ্ছা করিয়া সিংহাসন পরিত্যাগ করিয়া মুসলমানধর্ম গ্রহণঅভিলাষে মক্কানগরী গমন করেন। (সূত্র: বিশ্বকোষ, ইতিহাসের ইতিহাস)

এছাড়াও বর্তমান বঙ্গের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ, ভারতপর্যটক, বিশ্বকোষ- এর সম্পাদক ‘শ্রী সুরজিৎ দাসগুপ্ত’ তার ‘ভারতবর্ষ ও ইসলাম” গ্রন্থে আরো পরিষ্কার ও স্পষ্টভাবে লিখেছেন, মালাবার (বর্তমান ভারতের মাদ্রাজ বা তামিলনাড়ু প্রদেশের একটি জেলার নাম, যার পূর্বনাম ছিলো ‘চেরর’) রাজাদের মধ্যে ‘চেরুমল পেরুমল’ই প্রথম ইসলামধর্ম গ্রহণ করেন।

তিনি ছিলেন ‘পেরুমল’ বংশীয় শেষরাজা। শুধু নিজে ধর্মান্তরিত হয়েই চেরুমল পেরুমল ক্ষান্ত হননি, প্রজাদের মধ্যে ইসলামধর্ম প্রচারে তিনি সচেষ্ট হন। তবে যেদিক থেকেই দেখা হোক না কেন একজন দক্ষিণ ভারতীয় রাজা অন্তরের আকর্ষণে ইসলামধর্ম গ্রহণ করেছেন এবং প্রচারের জন্য বিদেশ এসে চেষ্টা করেছেন, এ ব্যাপারটা অশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বহু পুরুষ বাহিত ধর্ম ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় উদ্দীপ্তচিত্তে ইসলামধর্ম গ্রহণ করেছেন। এ রকম নজীর ভারতবর্ষের অন্যত্র বিরল। (সূত্র: ভারতবর্ষ ও ইসলাম, চেপে রাখা ইতিহাস)

হিন্দুস্তানে আরবদের যাতায়াত ছিলো ইসলামপূর্ব যুগ থেকেই। মালাবারে আরব ব্যবসায়ীেদর ঘাঁটি ছিলো বর্বরতার যুগেই। অতঃপর আরবে ইসলামধ্বান্তারি কিরণমালা ছড়ালে সে কিরণছটা নিয়ে আরব্য মুসলিমব্যবসায়ী এসে তাবলীগ করলে অনেকেই ইসলামধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁদের মানবিক গুণ, সাদাসিধা আচরণের আলোচনা তখন সবার মুখে মুখে। রাজদরবারেও তাঁদের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় মনখুলে। রাজা তাঁদের ব্যাপারে কৌতূহল প্রকাশ করেন। আগ্রহ ব্যক্ত করেন। রাজদরবারে তাঁদের আলোচনা হলে তিনি এতে মনোনিবেশ করেন। দরবারিদের মুখ থেকে তাঁদের ব্যাপারে করা মন্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আরো অনেক প্রশ্ন করেন। এতে রাজা অনুপ্রাণিত হন।

হবারই তো কথা! যে ভারতে বর্ণভেদ প্রথায় শত শত মানুষ জর্জরিত ৷ যে ভারতে শ্রেণিবৈষম্যের দেয়াল ছুত-অচ্ছুতের মাঝে বিবেদ চালু রেখেছে ৷ যে ভারতে ব্রাহ্মণ-পুরোহিতেরা শূদ্র-ক্ষত্রিয়ের মাঝে ঘৃণার প্রাচীর তুলে ধরেছে ৷ যে ভারতে গ্রাম্য-শহুরে এক কুঁয়োর পানি পান করে না ৷ যে ভারতে উচ্চবর্ণের লোকেরা নিম্নবর্ণের লোকের উপর নির্বিচারে গণহত্যা চালানো ধর্মীয় কর্তব্য জ্ঞান করে ৷ যে ভারতে শহুরে লোকেদের পাশবিক অত্যাচারে গ্রাম্য-শূদ্ররা গুমরে কেঁদে মরে ৷ যে ভারতে মন্দিরে কালী মূর্তির সামনে শূদ্র-অচ্ছুতদের বলি দেয়া হত ৷ যে ভারতের মন্দিরে নিম্নবর্ণের লোকেরা প্রবেশাধিকার পেত না ৷

আজ সে ভারতের বুকেই এক আমীরের পেছনে উঁচু-নীচু, শাদা-কালো, ধনী-গরীব, গ্রাম্য-শহুরে এক কাতারে দাঁড়িয়ে নিরাকার প্রভুর ‘ইবাদত করছে। তাঁদের কাছে উঁচু-নীচুর পার্থক্য নেই। শাদা-কালোর বিভেদ নেই। ধনী-গরীবের প্রভেদ নেই। গ্রাম্য-শহুরের ঘৃণা নেই। এমন স্বর্গীয় দৃশ্য দেখে তো যে কেউ অনুপ্রাণিত হবেই।

সুতরাং, রাজা সে নতুনধর্ম সম্পর্কে জানতে চাইলেন এবং আরবে আসার আগ্রহপ্রকাশ করলেন। তাই আরব্য মুসলিমব্যবসায়ীরা তাঁকে আরবে (মক্কায়) নিয়ে আসলো। মক্কা নগরীতে আসার পর কোন্ ঘটনা তাঁকে ইসলামধর্মের প্রতি আকর্ষিত করলো এবং সে ধর্মগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করলো, তা জানতে হলে আমাদেরকে চৌদ্দশত বৎসর পূর্বের ইতিহাসের পাতা উল্টাতে হবে।

আসুন না! ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে দেখি, তখন কী ঘটেছিলো সেখানে? কোন্ ঘটনা সংগঠিত হয়েছিলো আরবের মরুভূমিতে।

মক্কার প্রতিমাপূজারী কাফের-মুশরিকদল একবার হযরত রাসূলুল্লাহ স. এর কাছে উপস্থিত হয়ে তাঁর নবুওয়াত ও রেসালাতের স্বপক্ষে কোনো নিদর্শন চাইলো। তখন আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণস্বরূপ চন্দ্র বিদীর্ণ হওয়ার মু’জেযা প্রকাশ করে দিলেন।

এই মু’জেযার প্রমাণ কুরআন শরীফের চুয়ান্ন নম্বর সূরা ‘সূরাতুল ক্বামার’- এর প্রথম আয়াত সহ অনেক সহীহ হাদীসেও রয়েছে। এসব হাদীস সাহাবায়ে কেরামের একটি বিরাট দলের রেওয়ায়াতক্রমে বর্ণিত। তাঁদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা. আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.জুবায়ের ইবনে মুত’ইম রা. ও আনাস ইবনে মালেক রা. প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা. এ কথাও বর্ণনা করেন যে তিনি তখন অকুস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং চন্দ্র বিদীর্ণ হওয়ার মু’জেযা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন।

ঘটনার সার-সংক্ষেপ এই যে একদিন রাসূলুল্লাহ স. মক্কার ‘মিনা’ নামক স্থানে উপস্থিত ছিলেন। তখন মুশরিকদল তাঁর কাছে গিয়ে নবুওয়াতের স্বপক্ষে কোনো নিদর্শন দেখাতে বললো। তখন ছিলো চন্দ্রোজ্জ্বল রাত্রি। আল্লাহ তা’আলা তাদের সবাইকে এই সুস্পষ্ট অলৌকিক ঘটনা দেখিয়ে দিলেন যে উজ্জ্বল চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হয়ে একখণ্ড পূর্বদিকে ও অপর খণ্ড পশ্চিম দিকে চলে গেলো আর উভয় খণ্ডের মাঝখানে পাহাড় অন্তরাল হয়ে রইলো।

তখন রাসূলুল্লাহ স. উপস্থিত সবাইকে বললেন , ‘দ্যাখো! এবং সাক্ষ্য দাও! সবাই যখন পরিষ্কারভাবে, স্পষ্টরূপে, স্বচক্ষে এই মু’জেযা দেখে নিলো, তখন দ্বিখণ্ডিত চন্দ্রের উভয় খণ্ড পুনরায় একত্রিত হয়ে গেলো। কোনো চক্ষুষ্মান ব্যক্তির পক্ষে এই সুস্পষ্ট মু’জেযা অস্বীকার করা সম্ভবপর ছিলো না, কিন্তু মুশরিকদের অন্তরে তো মোহর! তাই তারা অস্বীকার করে বলতে লাগলো এটা জাদু! নিঃসন্দেহে এটা জাদু! মুহাম্মদ আমাদের জাদু করেছে। (না‘ঊযুবিল্লাহ) তবে সে সারা বিশ্বের মানুষকে জাদু করতে পারবে না। বহিরাগত লোকেদের অপেক্ষা করো।

তারা আসুক, অতঃপর তারা কী বলে, শুনে নাও। এরপর বিভিন্ন স্থান থেকে আগন্তুক মুশরিকদের তারা জিজ্ঞেস করলো। তারাও সবাই চন্দ্রকে দ্বিখণ্ডিত অবস্থায় দেখেছে বলে স্বীকার করে নিলো। (সূত্র: তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআন, মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ. সূরাতুল ক্বামারের তাফসীর দ্রষ্টব্য)

তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআনে মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ. চন্দ্র বিদীর্ণ হওয়ার মু’জেযা সম্পর্কে দলীলসহ বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন এবং সুন্দরভাবে তার উপর উত্থাপিত প্রশ্নাবলীর জবাব প্রদান করেছেন। সাথে এটাও উদ্ধৃত করেছেন, ভারতের সুপ্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য ‘তারীখে ফেরেশতা’ গ্রন্থে এই ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে।

মালাবারের জনৈক মহারাজা এই ঘটনা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং তাঁর রোজনামচায় তা লিপিবদ্ধও করেছিলেন। এই ঘটনাই তাঁর ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়েছিলো। উপরোল্লিখিত উদ্ধৃতিসমূহ দ্বারা এটাই বুঝা গেলো, হিন্দুস্তানের চেরর (মালাবার) জেলার পেরুমল বংশের সর্বশেষ রাজা যার নাম চেরুমল পেরুমল।

আরব্য মুসলিমব্যবসায়ীদের আচরণে মুগ্ধ হয়ে আরবে গিয়ে দরবারে রেসালাতে হাজির হয়ে চন্দ্র বিদীর্ণ হওয়ার মু’জেযা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে বুঝতে পেরেছিলেন, ইসলামই খাঁটি ধর্ম আর হযরত মুহাম্মদই স.  সত্য রসূল।

সুতরাং, তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয়গ্রহণ করেন এবং (এক বর্ণনা মতে) নিজদেশে এসে ইসলাম প্রচার করেন। অবশ্য ইসলামগ্রহণের পর তাঁর নাম কী রাখা হয়েছিলো, তা জানা যায়নি (জানতে পারিনি)

কোটি দেবতায় বিশ্বাসী, মূর্তিপূজারী একজন রাজা মিথ্যার বেড়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে সত্যান্বেষণে আরবে ছুটে গিয়ে নিজ চোখে চন্দ্র বিদীর্ণ হওয়ার মু’জেযা প্রত্যক্ষ করে ইসলামগ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহস. এর বরকতময় সোহবত লাভে ধন্য হয়ে সাহাবায়ে কেরামের বিশাল জামা’আতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। আমাদের উপমহাদেশের গৌরব হিন্দুস্তানি সাহাবি’র উত্তরসূরি হতে পারায় আমরা ধন্য।

এসএস/