শুক্রবার, ২২ জুন ২০১৮

দেশত্যাগ ছাড়া পথ নেই রোহিঙ্গাদের

OURISLAM24.COM
নভেম্বর ২৯, ২০১৬
news-image

কুতুপালং উখিয়া থেকে  রোকন রাইয়ান

unnamedমিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর কেমন নির্যাতন চলছে জানতে চাইলে মাস খানেক আগে মংডু থেকে পালিয়ে আসা নূর আজিজ বললেন ‘এহানো কোনো মানুষ ন থাকবার পারি’।

আধো আধো বাংলা জানেন তিনি। তবে সেটাও চাটগায়ের ভাষা। বুঝতে সহযোগিতা করলেন স্থানীয় রাহবার আবদুল্লাহ।

নূর আজিজ একজন আলেম। আরাকানের এক দাওরায়ে হাদিস মাদরাসায় হাদিসের কিতাব পড়াতেন। তার গল্প আরেকদিন বলা যাবে। আজ মিয়ানমারের মুসলিম নির্যাতন বিষয়ে জানা যাক।

আরাকানের কিছু ছবি ও ভিডিও চিত্রে আমরা দেখেছি বিভৎস দৃশ্য, গলা কাটা লাশ, কোথাও মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে, এসব ঘটনা কি ছহি? শুনে নূর আজিজ বললেন, আপনারা যা দেখছেন তা সামান্যই। আরাকানে এর চেয়ে ভায়াবহ নির্যাতন চলছে। পুরষদের দেখলেই গুলি করা হচ্ছে। নারীদের ধরে নিয়ে প্রথমে ধর্ষণ পরে হত্যা করে রেখে যাচ্ছে। আবার বহু তরুণীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যারা আর কখনো ফিরে আসছে না।

নূর আজিজের কণ্ঠ ভেজা। সোনালি সেই দিনের কথা স্মরণ করে কেদেই দিলেন তিনি। আপনারা কী শুনতে চান, আমাদের অস্তিত্বই তো আর সেখানে থাকল না। মুসলিমরা তাদের ভয়াবহ নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে চলে আসছে বাংলাদেশে। চলে আসা ছাড়া কোনো উপায়ও নেই। আমরা আমাদের দেশ হারালাম এর চেয়ে ভয়াবহ দৃষ্টান্ত তো আর নেই।

নির্যাতিতরা কেন প্রতিরোধ করতে পারছে না জানতে চাইলে নূর আজিজ বলেন, কিভাবে পারবে তাদের তো কোনো অস্ত্র নেই। আরাকানে মুসলিম পরিবারগুলোতে প্রতিদিন তল্লাশি হয়। সেখানে পেয়াজ কাটার জন্য ছুড়িও বাড়িতে রাখা নিষেধ। কোথাও দা খন্তি পেলে সাথে সাথে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।

গত ৯ অক্টোবর থেকে মিয়ানমারের আরাকানে এই দাঙ্গা চলছে। সেখানকার স্থানীয় বৌদ্ধদের পাশাপাশি মগরা (মিয়ানমারের সেনাবাহিনী) এই দাঙ্গায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের নির্যাতন এতটাই পৈশাচিক ওখানে থাকার মতো অবস্থা নেই। গ্রামের পর পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে। পুরুষদের ফায়ার করছে পুলিশ। এই চিত্র পুরো আরাকানের।

উপায় না দেখে গত কিছুদিন ধরে নির্যাতিত এসব মানুষ প্রাণ বাঁচানোর আশায় ছুটে আসছেন বাংলাদেশে। সীমান্তে বিজিবির সতর্ক প্রহরার মুখেই তারা ঢুকছে বাংলাদেশে। তবে বিজিবির সামনে পড়লে তাদের ফিরে যেতে হচ্ছে। সে কারণে অনেকেই রাতের আধারে অনুপ্রবশ করছেন।

rohinga11
কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের একাংশ

নির্যাতিত এসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশের নাফ নদী হয়ে সীমান্তের হোয়াইক্যংয়ের খারাইংগা ঘোনা, তম্রু, মিনা বাজার, খারাংখালী, কান্জরপাড়া, লম্বাবিল, হ্নীলার জাদিমুরা, নোয়াপাড়া, লেদা, মোচনী, নাইট্যংপাড়া, কাউকখালী খাল দিয়ে প্রবেশ করছে। তারা আশ্রয় নিচ্ছে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শিবিরে।

আশ্রয় পাওয়া অনেক রোহিঙ্গা জানালেন, নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে খাদ্যসংকট প্রবল। না খেয়ে মারা যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। আক্রান্ত নারী শিশুরা ঠিকমতো চিকিৎসা পাচ্ছে না।

বাইরে থেকে বিপদগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের আর্থিক সযোগিতাও সহজ নয় বলে জানালেন আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, এখানে নানারকম সিন্ডিকেট আছে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে আছে বাণিজ্যও। বাইরে থেকে কেউ সাহায্য নিয়ে এলে তার ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই। স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বার বা দালালদের মাধ্যমে সাহায্য পাঠাতে হয়। এসব হাত গলে যার নামকাওয়াস্তে জিনিসই পায় শরণার্থীরা।

তিনি জানান, রোহিঙ্গা এড়িয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে স্থানীয়দের নির্বাচিত লিডার। যাদের আঞ্চলিক ভাষায় মাঝি নামে ডাকা হয়। ব্যক্তিগত সহায়তার অধিকাশং তাদের পকেটস্ত হয়ে যায় সহজেই।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। উখিয়ার কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গাদের রেজিস্টার্ড ক্যাম্পসহ টেকনাফের বিভিন্ন অস্থায়ী ক্যাম্পে তারা প্রবেশ করছে বলে জানা যায়। নতুন করে অনুপ্রবেশ সুখকর নয় জেনেও তারা দলে দলে আসছে এখানে। রেজিস্টার্ড ক্যাম্পগুলোতে বলে দেয়া আছে নতুন অনুপ্রবেশকারীদের কেউ আশ্রয় দিলে তার নাম কেটে দেয়া হবে।

কুতুপালং রেজিস্টার্ড ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে, উঁচুনিচু ভূমিতে মাটির ছোট ছোট ঘর। দাঁড়ালে মাথা ছুঁয়ে দেওয়া ছোট্ট কুঠুরির মতো একেকটি ঘরে সাত আটজন করে মানুষ। কোথাও ১২-১৫ জনও থাকছেন। এসবে নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

রোহিঙ্গা পুরষদের জন্য উপার্যনের সুযোগ খুব কম। কিছু কিছু পুরুষ আশপাশের এলাকাগুলোতে কাজের সুযোগ পান। তাতে যে আয় হয় এ দিয়ে চলে সংসার। নারীরা সাধারণত ঘর থেকে বের হন না। কিশোরী বা অবিবাহিত নারীদের দেখা পাওয়া অসম্ভব। রোহিঙ্গা নারীদের সবাই পর্দার বিধান মেনে চলেন কঠোরভাবে।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক নির্যাতিত রোহিঙ্গা জানান, গত পরশু মিয়ানমারের মংডু অঞ্চলের হাতিমারা গ্রামে ২৫ জন রোহিঙ্গা পুলিশকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কিন্তু এসব ঘটনা কোথাও তেমন একটা আসছে না। হাতিমারার বিভৎস ওই ঘটনার মতো ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। বিশ্ব জানতে পারছে খুব কম।

মিয়ানমারে ৯ অক্টোবর থেকে নতুন করে শুরু হওয়া নির্যাতন ক্রমেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। কিন্তু এই নিয়ে বিশ্ব বা মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করা ছাড়া কোনো কার্যকরি ভূমিকা রাখছে না। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান দেশটিতে সফর করলেও তিনি কোনো শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হননি। সারা বিশ্ব থেকে বিভিন্ন দল উপদলের ছোট ছোট প্রতিবাদ বিক্ষোভ কোনো প্রতিক্রিয়া ঘটাতে পারছে না। সুতরাং আরাকানে এই মুসলিম নিধন কতদূর গিয়ে শেষ হয় সেটা তা অনিশ্চিত।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে সরেজমিন আরো প্রতিবেদন, ফিচার ও সাক্ষাৎকার পড়তে আওয়ার ইসলামের সঙ্গেই থাকুন…

এফএফ