২০১৬-১১-১৪

বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮

তালাকপ্রাপ্তা নারীর আর্থিক নিরাপত্তা

OURISLAM24.COM
news-image
us-muslim-womanআ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: মুসলিম শরীয়াহ আইনানুসারে একজন স্বামী যেকোনো সময় তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে। তালাকের পর ইদ্দতকালীন ৯০ দিনের খোরপোশ দেয়া ছাড়া স্ত্রীর প্রতি স্বামীর সকল দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনে তালাক দেয়া আগের মতো যথেচ্ছ না রেখে কিছুটা নিয়মনীতিতে আনা হয়েছে। ঐ আইনের সুবাদে তালাক দিতে হলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নোটিস করতে হয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সালিশ বৈঠক করে তালাকের নোটিস কার্যকর বা বাতিল করার এখতিয়ার রাখে।

বর্তমান আইনেও তালাকপ্রাপ্তা নারী ইদ্দতকালীন খোরপোশ ছাড়া অন্য কিছু পাওয়ার অধিকারী হন না। তালাকের পর তালাকপ্রাপ্তা নারী কোথায় যাবেন? একবারেই প্রস্তুত জবাব—বাবার বাড়ি। ইসলাম ধর্মীয় বিধানানুসারে তালাকপ্রাপ্তা নারী তার পিতার বাড়িতে বা নিজগোত্রে ফিরে যাবে। আমাদের দেশের বিদ্যমান সামাজিক কাঠামোতে তালাকপ্রাপ্তা নারীর পিতা জীবিত এবং সচ্ছল থাকলে নারী পিতার বাড়ি যেতে পারেন। কিন্তু এটা কি সবক্ষেত্রে সম্ভব?

সামাজিক অবকাঠামোতে আমাদের সমাজব্যবস্থা গোত্রভুক্ত নয়। এখন একান্নবর্তী পরিবারেরও কোনো অস্তিত্ব আছে বলে শোনা যায় না। পিতার মৃত্যুর পরে এমনকি কখনো কখনো পিতার জীবদ্দশাতেও সন্তানেরা পৃথক পরিবারে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এ রকম একটি সমাজব্যবস্থায় তালাকপ্রাপ্তা নারী কি ফিরে যাবেন তার কোনো ভাইয়ের কাছে? একাধিক ভাই থাকলে কার কাছে? বাবা, ভাই বা ভাইপোদের সবক্ষেত্রেই কি সামর্থ্য থাকে ভাগ্যাহতা ঐ নারীকে দেখভালের?

একা একজন পুরুষ বা একা একজন নারী সংসার তৈরি করতে পারে না। সংসার গঠনের জন্য প্রয়োজন একজন নারী ও একজন পুরুষের বৈবাহিক জীবন। তিল তিল করে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে মিলে গড়ে তোলে সংসার। স্বামীর মুখের কথায় একজন নারী তার তিল তিল করে গড়ে তোলা সংসার হতে উচ্ছেদ হয়ে যাবেন? সংসারের দাবিতে নারীরা পেশা ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু কোনো পুরুষ সংসার সামলানোর জন্য পেশা ছেড়ে দিয়েছে—এমন কোনো নজির কেউ দেখাতে পারবেন না। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পুলিশ)  ক্যাডারে প্রথমবারে যোগদান করা দুইজন নারী কর্মকর্তার একজন চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন সংসারের দাবি মেটাতে। তার ব্যাচমেটরা এখন সরকারের সচিব পর্যায়ে কর্মরত। আরো অনেক শিক্ষিতা-অশিক্ষিতা নারীই তাদের পেশা ছাড়েন সংসার সামলানোর জন্য। বিয়ের দুই-তিন বছর পর কোনো কারণে তালাকপ্রাপ্তা হলে নারীর বাবা-মা আত্মীয়-স্বজন পুনঃবিয়ের ব্যবস্থা করে সহজেই নারীর একটি হিল্যা করে থাকেন। কিন্তু ২০/২৫/৩০ বা ৫০ বছর পরে কোনো উপযুক্ত কারণে বা কারণ ছাড়া নারী তালাকপ্রাপ্তা হলে তিনি কোথায় যাবেন?

এই দীর্ঘ দিনে তার স্বামীর পরিবারই নিজের পরিবার হয়ে গেছে। নিজের বাবার কুলের আত্মীয়-স্বজনের সাথে হয়ে থাকেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ৯০ দিনের খোরপোশই কি তার জন্য যথেষ্ট? দীর্ঘদিনের ভোগ করা সামাজিক মর্যাদার ফলে তালাকপ্রাপ্তা নারী কি সহজেই জীবিকার জন্য যেকোনো পেশা বেছে নিতে পারবেন? শিক্ষিতা হলেও কি তার জন্য যখন-তখন কোনো পেশায় যোগদান করা খুব সহজ কিছু?  কোনোকিছুই অতো সহজ না, যতো সহজ বাংলাদেশে একজন নারীকে তালাক দেয়া।

আল্লাহপাকের দৃষ্টিতেও তালাক একটি অপছন্দের বিষয় যদিও তা বৈধ করা হয়েছে। যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণে তালাক দেয়া কারো কারো জন্য অপরিহার্য হতে পারে। তবে তালাকের সঙ্গে সঙ্গে একজন নারী কপর্দকহীন হয়ে পড়বে এটা কারো কাম্য হতে পারে না।

যেদিন স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক প্রদান করছে  সেদিন স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির নির্দিষ্ট অংশের হকদার হতে পারতো। স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির প্রাপ্য অংশ লাভের পর ধর্মীয় বিধানানুসারে ৯০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর পুনরায় বিয়ে করতে পারতো।

তাহলে স্বামীর মৃত্যুব্যতীত তালাকের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক শেষ হলে নারী কেন স্বামীর সম্পত্তির অংশ পাবে না?

নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি ও তালাকপ্রাপ্তা নারীকে আর্থিক সংকট হতে রক্ষা করার জন্য তালাকপ্রাপ্তা নারীকে স্বামীর তরফ হতে গৃহপ্রদান ও স্বামীর সম্পত্তির অংশীদারিত্ব দেয়ার বিধান তৈরি করা প্রয়োজন। তালাক না হয়ে স্বামীর মৃত্যুজনিত কারণে ফরায়েজ অনুযায়ী স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির যে পরিমাণ সম্পত্তি পেতে পারতো, তালাকের ফলে ঘটনার সময় স্বামীর ঐ সময়ের সম্পত্তির প্রাপ্য অংশ স্ত্রীকে প্রদান বাধ্যতামূলক করা হলে নারীর প্রতি অকারণ তালাকের ঝুঁকি হ্রাস পাবে। নারী নিরাপত্তার ভিতর দিয়ে সংসারধর্ম পালন করতে পারবে। নারী বিয়ের সময় উপহার হিসেবে যা পেয়েছে তা স্ত্রীর অধিকারেই থাকবে।

স্বামীর পিতা বা পিতামহ জীবিত থাকায় স্বামী সম্পত্তির মালিক না হলে, স্ত্রীকে তালাক প্রদানের সময় সম্পত্তির বিভাজন হলে স্বামী যে পরিমাণ সম্পত্তি পেতে পারতো তা হতে স্ত্রীকে তার প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দিতে হবে। প্রদানযোগ্য কোনো সম্পত্তি না থাকলে বিয়ের সময় ধার্যকৃত দেনমোহরানার সমপরিমাণ অর্থ ও বিয়ের পরের প্রতি বছরের জন্য ১২.৫০% সরলহারে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত অর্থ স্ত্রীকে প্রদান করতে হবে। সম্পদের এক-অষ্টমাংশ বা দেনমোহরানা যোগ প্রতি বছরের জন্য বৃদ্ধির পরিমাণের মধ্যে স্ত্রী যেটি দাবি করবেন স্বামীকে সেটিই প্রদানের বিধান রাখতে হবে। তবে সকল ক্ষেত্রেই স্ত্রীকে বসবাসের জন্য গৃহের সংস্থান করে দিতে হবে।

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনে ঈষত্ সংশোধনী এনে উপরের প্রস্তাবটির অনুকূলে আইনের ধারা যুক্ত হলে বর্তমানে বিয়ের নিবন্ধন ও কাবিননামার প্রতি গ্রামাঞ্চলে গুরুত্বের  যে অভাব রয়েছে তা দূর হবে। ভবিষ্যত্ নিরাপত্তার প্রত্যাশায় কন্যাপক্ষ বিয়ের নিবন্ধন করাতে ও কাবিননামা সংরক্ষণ করতে উত্সাহী হয়ে উঠবে। ফলে বাল্য বিয়েও কমিয়ে আনা যাবে।

এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে, স্ত্রী যদি স্বামীকে তালাক দেয় তাহলেও স্ত্রী সম্পত্তির ভাগ পাবে কিনা? আইন অনুযায়ী স্বামীর জীবদ্দশায় স্ত্রী মৃত্যুবরণ করলে স্ত্রী যেমন স্বামীর সম্পদ পান না তেমনি স্ত্রী স্বামীকে তালাক প্রদান করলে তিনি স্বামীর সম্পত্তির অংশ পাবেন না। তবে স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তানরা যথাযথভাবে তাদের পিতার অংশের ভাগীদার হবেন। তালাকপ্রাপ্তা নারীর অসহায়ত্ব দূর করতে ও তাদের তালাক জীবনের আর্থিক নিরাপত্তা প্রদানের জন্য বিষয়টি ভেবে দেখার সময় এসেছে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব এবং সাবেক প্রকল্প পরিচালক, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন প্রকল্প

সূত্র: ইত্তেফাক

এফএফ