শুক্রবার, ১৭ আগস্ট ২০১৮

ইসলামী ব্যাংকিং ও অর্থনীতি বিষয়ে ড. আলি আল কারাদাগির বক্তব্য

OURISLAM24.COM
নভেম্বর ৪, ২০১৬
news-image

঳ মুফতি ইউসুফ সুলতান

গতকাল মালয়েশিয়ায়  International Center for Education in Islamic Finance (INCEIF) -এ শেখ Dr. Ali Al Qaradaghi (د. علي القره داغي) এর একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য ছিল। সমকালীন যেসব স্কলার ইসলামী ব্যাংকিং ও অর্থনীতির প্রসারে ভূমিকা রাখছেন, তিনি তাদের অন্যতম। এওফির শরীয়াহ বোর্ডসহ বিশ্বব্যাপী বড় বড় শরীয়াহ বোর্ডে তিনি সদস্য বা চেয়ারম্যান। তাঁর বক্তব্যে সার-সংক্ষেপ তুলে ধরছি:

১. ইসলামের সকল চুক্তিকে যদি দাঁড়িপাল্লায় মাপা হয়, তাহলে দেখা যাবে চুক্তির উভয় পক্ষের পাল্লা সমান। কেউ এককভাবে লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। অথচ রিবা ভিন্ন। এতে দাড়িপাল্লা একেবারে হেলে পড়ে ঋণদাতার দিকে। অর্থাৎ এর যত ইতিবাচক দিক আছে, সব নিয়ে নেয় ঋণদাতা, আর সব নেতিবাচক দিক গিয়ে পড়ে ঋণগ্রহীতার ঘাড়ে।

২. আজ থেকে বছর পঞ্চাশেক আগের উলামায়ে কিরাম যখন রিবা নিয়ে মানুষকে সতর্ক করেছেন, তখন মানুষ জানতে চাইত, এর বিকল্প কী? – শায়খদের কাছে এর বাস্তব কোনো বিকল্প সামনে ছিল না। আলহামদুলিল্লাহ ধীরে ধীরে একটি বিকল্প (ইসলামী ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স) আমাদের সামনে এসেছে। মুরাবাহা দিয়ে শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে ইস্তিসনা, মুশারাকা, মুদারাবা, সালাম ইত্যাদি চুক্তি যুক্ত হয়েছে।

(শায়খ ১৯৭০ এর দশক থেকে বর্তমান পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকিং বিকাশের ইতিহাস সংক্ষেপে তুলে ধরেন)

ইসলামী ব্যাংকিং বিকাশে বর্তমান সময়ে যেসব চ্যালেঞ্জ ও বাধা রয়েছে, তিনি তার কিছু তুলে ধরেন:

১. কিছু চুক্তি ও প্রোডাক্ট বাজারে বিদ্যমান, যেগুলোকে বিষাক্ত ও অভিশপ্ত বলা যায়। যেমন: সাজানো তাওয়াররুক (তাঁর ভাষায় তাওয়াররুক মালউন)। যেখানে প্রকৃতপক্ষে কোনো পণ্যের মালিকানা আদান প্রদান হয় না, বরং আখেরে কিছু ঋণের বিনিময় হয়ে থাকে কিছু অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে।

এর বিকল্প হিসেবে তিনি একটি প্রস্তাবনা পেশ করেন:

বিভিন্ন ব্যাংক তাদের ফান্ড ও এ্যাসেটকে একত্রিত করে একটি ফান্ড গঠন করবে, এর ভিন্ন সত্ত্বা থাকবে (শাখসিয়াহ ই’তিবারিয়্যাহ)। এই ফান্ড ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকতে পারে, অথবা কোনো একক ব্যাংকও হতে পারে। ফান্ডটি প্রতিদিন মূল্যায়ন বা ভ্যালুয়েশন করা হবে। এবং পুরো ফান্ড বিভিন্ন ইউনিটে বিভক্ত থাকবে। কারো ক্যাশ টাকার প্রয়োজন হলে এখান থেকে নির্দিষ্ট কিছু ইউনিট ক্রয় করবে, এবং ঘণ্টা কয়েক পরে এখানেই আবার বিক্রয় করবে। স্টক মার্কেট থেকে এর পার্থক্য হলো, স্টক মার্কেটে প্রায় সময়ই স্টকের মূল্য এর ফান্ডামেন্টাল বিষয়াদির ওপর নির্ভর করে মূল্য ওঠা-নামা করে না। কাজেই সেখানে নানা ইস্যু তৈরি হয়, যা এখানে হবে না। গ্রাহক তার ক্যাশ পাবে, শরীয়াহসম্মত উপায়ে, আবার ব্যাংকগুলোও লাভবান হবে।

২. অধিকাংশ দেশে ইসলামী ব্যাংকিং আইন না হওয়া। যার ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা ও নীতিমালা – যা সুদী ব্যাংকের জন্য প্রযোজ্য – তা ইসলামী ব্যাংককেও অনেক জায়গায় মানতে হয়। তিনি তুলে ধরেন যে, অনেক সময় ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকের লাভ বেশি হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারের হিসাবে লাভ বণ্টন করতে বলে, যেন সুদী ব্যাংকগুলোর ক্ষতি না হয়।

৩. লাইবর- আইবর ইত্যাদি বেঞ্চমার্কের অতিরিক্ত অনুসরণ – এমনকি মুদারাবা-মুশারাকা ও মুরাবাহার মাঝেও। ফলে এমন শর্ত করা হয় যে বেঞ্চমার্ক থেকে বেশি লাভ হলে অপর পক্ষ লাভের ক্ষেত্রে তার অধিকার ছেড়ে দিবে (তানাযুল) – ইত্যাদি। বরং, ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রভাবমুক্ত বেঞ্চমার্ক থাকতে পারে।

৪. আন্তর্জাতিক ব্যবসার ক্ষেত্রে বিদেশী আইনি প্রতিবন্ধকতা। যেমন ব্রিটিশ আইন, ফ্রেঞ্চ আইন – তাদের সাথে ব্যবসা করতে চাইলে, বা তাদের কোর্টে মামলা আসলে ইসলামী শরীয়াহ অনুসারে এর ফয়সালা সম্ভব হয় না।

৫. গবেষণার অপ্রতুলতা: গবেষণা বাড়াতে হবে, বিশেষ করে ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্টের ওপর গবেষণা করতে হবে। ব্যাংকগুলো তাদের লাভের একটি ক্ষুদ্র অংশ গবেষণার জন্য বরাদ্দ রাখতে পারে। হতে পারে তা ০.৫% বা এমন কিছু।

৬. মাকাসিদে শারিয়াহ বা শরীয়াহর লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে ফিকহুল মুয়ামালাতের বিস্তর অধ্যয়ন। এখানে মুয়ামালাতের মাকাসিদ, মুকাল্লিফদের মাকাসিদ এবং মা’আলাতুল আফ’আল ইত্যাদি প্রসঙ্গ আসবে। শায়খ এ বিষয়ে লিখছেন বলে জানিয়েছেন।

সবশেষে শায়খ সাম্প্রতিক প্রকাশিত কিছু কিতাব ইনসিফকে হাদিয়া দেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘আল-ওয়াসীত’ – যা মূলত ইমাম গাযযালী রহ. রচিত ফিকহ শাফেয়ীর একটি বিখ্যাত কিতাব। তিনি তা তাহক্বীক-তা’লীক তথা পরিমার্জন ও টিকা সংযোজন করেন। এ কিতাব লেখা প্রসঙ্গে তিনি জানান, তিনি যখন প্রথম জীবনে লেখালিখি করতেন, তখন একবার স্বপ্নে ইমাম গাযযালী রহ. কে দেখেন যে, তিনি বলছেন, “আলী! আমার ব্যাপারে কিছু লেখ”। শায়খ এরপর আল-ওয়াসিত নির্বাচন করে কাজ শুরু করেন। এক সময় বিভিন্ন ব্যস্ততায় তা থেমে যায়। আবার একদিন গাযযালী রহ. কে স্বপ্নে দেখেন যে তিনি বলছেন, “কী হে! আমার ওয়াসীতের কী খবর?” – এরপর শায়খ দ্রুততার সাথে কাজ শেষ করেন। মোট বত্রিশ বছর সময় নিয়ে এটা শেষ করেন তিনি।

আরআর