শুক্রবার, ১৭ আগস্ট ২০১৮

যেভাবে কাটছে দেওবন্দের জীবন!

OURISLAM24.COM
আগস্ট ২৩, ২০১৬
news-image
deubond22মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ: আওয়ার ইসলাম
নতুন কোনো আইটেম করা হয় না৷ ঘুরেফিরে সেই একই৷ আলু আর ডিম৷ হপ্তায় খান তিরিশেক ডিম শেষ৷ সহপাঠী ইমরান ভাই বলেন— ‘মুনশি! ডিমের ওপর চাপ কমান৷ বেচারা আপনাকে বদদোয়া দেবে৷’ তার কথা শুনে আমি শুধু হাসি৷

কামরায় যখন পা রাখি, চোখ যখন দলে দলে চেয়ে থাকা ডিমের ওপর পড়ে, অমনিই মনে হয় সত্যিই বড় জুলুম করে ফেলছি এদের ওপর৷ টানা একটি বছর ওদের সহোদর কতো ভাইবোন আমার পেটে গেছে, তার হিসেব নেই৷ নাহ, বাদ দিতে হবে এবার৷

রুটিন বদলানো দরকার৷ নতুন কিছু যোগ করা চাই৷ সকাল টু দুপুর, দুপুর টু বিকেল, সন্ধ্যে টু রাত এগোরোটা পেরোয় দর্সে দর্সে৷ নতুন কিছু ভাববার সময় মেলে না আর৷ দু’মিনিট ধীরস্থির বসবার ফুরসৎ পাই না কখনও৷ আজ না কাল, কাল না আজ এই করে হপ্তা দেড়েক কেটে যায়৷ খাবার রুটিনে কোনো বদল নেই আমার৷ আলু, ডিম কিংবা না খেয়ে থাকা৷ এর বাইরে কোনো নিয়ম আবিষ্কার করা হয় না আর৷

রান্নার ভয়ে মাঝেমধ্যে পালিয়ে বেড়াই৷ ক্লাস শেষে কামরায় আসি না৷ বন্ধুদের কেউ দেখা করতে চাইলে রুমের বাইরে দেখা করি৷ মসজিদে রশিদের বেসমেন্ট কিংবা হাউজপারের খবর দিই৷ ব্যস৷ রান্নারা আমায় ছুঁতেও পারে না৷ কিন্তু এভাবে আর কতোদিন! খেতে তো হবেই৷ বাঁচা তো লাগবেই৷

গত একটি বছরে রান্নায় বেশ অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার৷ চিকেন রান্না করতে শিখেছি কয়েক আইটেমের৷ আলু কেটে বানাতে জেনেছি হরেক তরকারি৷ স্বাদ আসুক আর না আসুক৷ আমার ভালো লাগে৷ অন্যের কাছে ভালো লাগুক আর না লাগুক, কপালে শিশির বিন্দুর মতো ঘাম একাকার করে রান্না করা আমার খাবার নিজের বড় পছন্দের৷

শুরুর দিকে ডিম ভাজিও করতে জানতাম না৷ এখন তো ডিমকেও রচনা করতে পারি কয়েকটি রূপে৷

এতোদিন পরে এখন নাকি আমার রান্না বেশ ভালো৷ পরিচিত বাঙালি আর হিন্দুস্তানিরা খুব প্রশংসা করে খেয়ে৷ বাঙালিরা না হয় আরেক দফা দাওয়াতের লোভে একটু বাড়িয়ে বলে৷ কিন্তু হিন্দুস্তানিরা কীসের লোভে বলে, আমার হেঁড়ে মাথায় ঢোকে না৷ ওদের তো আর দ্বিতীয় দফায় কামরায় আনা হয় না৷

তবে সত্যি বলতে এতোদিনে হাতের আঙুলের সব ক’টি পুড়েছে আমার বার কয়েক৷ এখনও রান্নায় আমার কষ্ট লাগে৷ পেঁয়াজ ছিঁলতে বসে চোখে জল আসে৷ কড়াইয়ের তেল ছিঁটে এসে হাত-পা জ্বলে৷

দেওবন্দের প্রথমদিকে মাকে খুব মনে পড়তো৷ রান্নার কথা খুব জিগ্গেস করা হতো ফোন করে করে৷ তার রান্না করা খাবার দেখে নাক সিঁটকাতাম বাড়ি গেলে৷ আর এখনও সেসব খাবারের কথা খুব মিস করি৷

মাকে ফোন করলে আগের মতোই এখনও জিগ্গেস করেন—‘খেয়েছিস কি?’ কচুর ডগার মতো রান্না করা আমার নানান আইটেমের কথা তখন সহাস্য বদনে বলি৷ আর না হয় দেওবন্দের প্রসিদ্ধ কারিম চিকেনে খেয়ে এসে তাকে সান্ত্বনা দিই৷

পরীক্ষাকে উপলক্ষ করে ঈদের পর থেকে পকেটটা বেশ ফাঁকা করেছে কারিম চিকেন৷ অনেক সময় খেতে গেছি৷ কিন্তু পকেটে টাকা নেই জানা ছিলো না৷ জব্বর মাস্তি করে খেয়েদেয়ে পকেটে হাত ঢুকিয়েছি৷ অমনিই মনে পড়ে গেছে টাকা তো আরেক কোর্তার পকেটে৷ ভুলে রেখে এসেছি কামরায়৷ হোটেল মালিককে কী বলবো? আমার দিকে তার বাড়ানো হাতে আমি কী রাখবো?

মুখটা মলিন করে ‘স্যরি’ বলি তখন৷ উর্দুতে পরে দেবার কথা জানাই৷ কিন্তু সে রাজি হয় না সহজে৷ দেওবন্দে সবার কাছে বাকি পেলেও তার কাছে চিন্তা করাটাও বোকামি৷ কখনো বা স্টেট ব্যাংকের এটিএম থেকে তুলে দেবার কথা বলে বুঝিয়ে রেখে আসি৷

সেদিন এমনই একটি কাহিনি হলো৷ হজরত মুফতিয়ে আজম খায়রাবাদি সাহেবের বাসায় গেলাম জরুরি কাজে৷ ফিরতে বেশ রাত হলো৷ হজরত বললেন তাঁর সঙ্গে খেয়ে যেতে৷ আমি সম্মত হলাম না৷ বোঝালাম তাড়া আছে আমার৷ কিন্তু তিনি ছাড়লেন না৷ নিজে না খেয়ে নিজের খাবারের সবটুকু প্যাক করে আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন৷ অবাক হলাম, বাংলাদেশে এমনটা হয় না বললেই চলে।

আমিও আরেক বড় দয়ালু৷ হজরতের কাছ থেকে বিদেয় নিয়ে জামিয়া ইসলামিয়া লিল বানাতের গলিপথে ঢুকলাম৷ দেখা পরিচিত এক সাথীর সঙ্গে৷ সাহারানপুর থেকে ফিরেছে সে মাত্রই৷ দুপুর থেকে তার পেটে কিছু পড়েনি আমায় জানালো৷ কথার কথা হিসেবে আমি তাকে বলি—‘এগুলো খান তাহলে?’ প্রথমে ‘না’ সূচক মাথা নাড়ালো সে৷ তবুও আমি তাকে আমার হাতের খাবারগুলো দিয়ে দিই৷ প্যাকটি নিয়ে সে একটিবার শুধু বললো—‘আপনি খাবেন না?’ আমি বললাম—‘না৷ খেয়েছি দুপুরে৷’

munshi

খিদের তীব্রতায় আমার কণ্ঠ চিরে ‘দুপুরে’ শব্দটি বেরোয়নি তেমন উচ্চস্বরে৷ বেচারা তাই শুনতে পায়নি৷ প্যাকটি নিয়ে সোজা চলে গেলো তার কামরায়৷ কী আর করা! খাজনার ওপর বাজনা হয়ে গেলো আমার৷

নিরুপায় আমি একমাত্র আশ্রয় কারিম চিকেনে ঢুকলাম শেষমেষ৷ সেদিন পকেট ফাঁকা, সত্যি সত্যিই আমার জানা ছিলো৷ তবু বড়সড় সালাম দিয়ে অর্ডার করলাম৷ হোটেল মালিককে কাছে ডেকে তার রান্না করা খাবারের ভূয়সী প্রশংসা করলাম৷ বেচারাও দেখলাম আমার উর্দুতে দেয়া ছেঁড়াফাটা কৃত্রিম হাওয়ায় ফুলে ফেঁপে ওঠলো৷ একপর্যায়ে খানা খাওয়া শেষ হলো৷ বিল দেবার পালা৷

পকেটে টাকা রয়েছে ভাব করে হাত ঢুকালাম৷ ইয়ে, কিয়া হোয়া? পায়সে কাহা হে? বিড়বিড়াতে লাগলাম পকেট ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে৷ হোটেল মালিক বুঝে গেলো আজকেও টাকা ভুলে রেখে এসেছি হয়তো বা কামরায়৷

কাছে এলাম এবার৷ কণ্ঠস্বর অনেকটা ধরা ধরা ভাব করে বললাম— ‘আঙ্কেল, মেরে পাস তো পায়সে হায় নেহি ফিলহাল৷ কিয়া কারু? হো সাকতা হায় এটিএম মে হায়৷ কাল নেকাল কে দে দোঙ্গা৷ ঠিক হে?’
উনি বললেন—‘আভি দে দো নেকাল কে৷’

দারুল উলুমের সামনে তিনটে মাত্র এটিএম বুথ— স্টেট ব্যাংক, পাঞ্জাব ব্যাংক আর ইন্ডিয়া ওয়ান ব্যাংকের৷ স্টেট ব্যাংকের বুথের হালত তো মাশাআল্লাহ! একদিন খুললে দশদিন বন্ধ৷ আর পাঞ্জাবে লিমিট৷ এতো রাত অবধি তো বহু লোকে তুলেছে৷ সুতরাং সেটাও বাদ৷ বাকি রইলো ইন্ডিয়া ওয়ান৷ সেটা তো চব্বিশ ঘণ্টায়ই কেবল সিসি সার্ভিস৷ টাকার কোনো খবর নেই৷ নামমাত্র ইনকোয়ারির বাড়তি সুবিধে৷ আর রাত এগারোটার পরে তো কোনোটারই কল্পনা করা যায় না খোলা থাকার৷

মোটকথা আমি নিশ্চিত, এটিএম এখন খোলা নেই৷ টাকা বের করতে পারবো না৷ কিন্তু হোটেল থেকে বেরিয়ে দেখি স্টেট ব্যাংকের লোগো আজ জ্বলজ্বল করছে৷ হায়রে, খোলা থাকার আর দিন মিললো না! বেচারা হোটেলঅলাও আমায় ছাড়লো না৷

এভাবে কাটে আমার এবং আমাদের দেওবন্দি জীবন৷ ইদানীং আবার অলসতা আমায় পেয়ে বসেছে৷ রান্না করতে বিল্কুল ভালো লাগছে না৷ মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়লাম৷ সবমিলিয়ে টানা তিনটে দিন আমার কামরায় ফের গ্যাস জ্বলছে না৷ আবার সেই কারিম চিকেনের সঙ্গে দোস্তি-মাস্তি৷

আমার মতো এমন কতো ছাত্রের অলসতাকে কারিম কাজে লাগাচ্ছে৷ যাকগে, তবুও ভালো৷ না হয় বিপদের বন্ধু হয়ে খাবার নিয়ে পাশে দাঁড়াতো কে!

বেঁচে থাকো কারিম চিকেন৷ আরও বেশি বেশি পকেট কাটো আমাদের৷ আরও বাড়ুক তোমার কাস্টমার৷ তবে কমে যাক খাবারের দাম-কিমাত৷ (চলবে)

লেখক | শিক্ষার্থী : দারুল উলুম দেওবন্দ, ভারত