২০১৬-০৬-১১

বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮

মুসা আল হাফিজ : মহাসত্যের বাঁশি

OURISLAM24.COM
news-image

book copy

বাছিত ইবনে হাবীব : জাগতিক প্রক্রিয়ায় জীবনের স্রোতধারায় অন্তর্গত আলোর আহবানে সবাই সাড়াদিতে পারে না। যারা সাড়া দেয়, তারাসত্যের সমুদ্রে ভেলা ভাসায় । অনেকপ্রাণের কথা একটি কণ্ঠস্বরে নিঃসৃত হয়। এই সত্যের প্লাবনের পরশে কেউ ধন্যহন। কেউ মুগ্ধ হন ।কেউ হন স্নাত , পরিস্নাত।

সত্যের আবিস্কারেসমুদ্রের ঊর্মিমালার অভিঘাতে কেউ কেউ চিরদিনের জন্যে ছেড়েছেন এই পথ। কেউপেয়েছেন আঘাতের পর আলোআর ঊষার আসল ঠিকানা।

বিশ্ব সাহিত্যেরউল্লেখযোগ্য অনুষঙ্গ বাঁশী। খেলার মাঠের বাঁশী দৃশ্যমান। এর সাবধানবাণীশ্রাব্য। হৃদয়ের বাঁশী বাইরে বাজে না, তাই শোনাও যায় না। রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরবিভিন্নভাবে বাঁশীকে উপস্থাপন করেছেন ‘সে কি মোর তরে পথ চাহে/সেকি বিরহগীত গাহে/ যার বাঁশরী ধ্বণি শুনি/ আমি ত্যাগিলাম গেহ’।

বাঁশী কবিতায়জীবনযাত্রীকে করুণ আহবানের কথা স্মরণ করে দেয়া হয়েছে। ‘বাঁশীর করুণ ডাকবেয়ে / ছেঁড়াপাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে /এক বৈকুণ্ঠের দিকে’।

সেই বৈকুণ্ঠ বিষ্ণুর বাসস্থান স্বর্গের ইঙ্গিত করছে ।

কালের ও কাজের বাঁশীর ডাকে সবাইকে সাড়া দিতে হয়। দৃশ্যমান জগতের এইশ্রাব্য আহবান মানুষকে তার কর্মধারার সত্যের দিকে আহবান করে। তারপ্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দেয়।

বাঁশীর করুণ মধুর সুর বাজে প্রিয়তমারকর্ণকুহরে । প্রিয়জনের প্রতীক্ষারত বিরহী প্রিয়ার মর্মলোকে । সাথে সাথেপ্রিয়জনের হৃদয়ে প্রিয়তমার সাথে সাক্ষাতের অপেক্ষায় । যেমনটি রাধারমণবলেন-‘প্রাণ সখীরে ঐ শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে’/বংশী বাজায় কে রে সখীবংশী বাজায় কে?’
এভাবে অদৃশ্য অঞ্চল থেকে দৃশ্যমান পরিসীমায় বোধের সহজদিগন্তে অরুপকে রুপের মধ্যে নিয়ে আসার আশার আলো দেখায় বাঁশী। ভূ-ভারতেরসীমানা ছাড়িয়ে পারস্যদেশে ফারসীভাষায় মহাকালের বাঁশীর সুরে যে মহাসত্যেরঠিকানা গোপন রয়েছে মরমী কবি জালালুদ্দীন রুমীর পূর্বে এই শুভ সন্দেশ ওসুবাসধারা আর কারকাছে পাওয়া গিয়েছিলো ?

কতভাবে, কতশত চেতনায় বহুবাররুমীর বাঁশী অনুদিত হয়েছে , বিশ্বকাব্যসঞ্চয়ে স্থান পেয়েছে। তবুও অতৃপ্তহৃদয়ের তৃষ্ণা নিবারিত হয়নি পরিপূর্ণভাবে। এই অনিঃশেষ তৃষ্ণা নিবারণেরলক্ষ্যে সত্যের বাণীর বহর ও বাহার নিয়ে মহাসত্যের বাঁশী বাজিয়ে আজ আমাদেরসামনে উপস্থিত হয়েছেন মুসা আল হাফিজ।

আপন সত্তা আবিষ্কারে নিমগ্নকাব্যচর্চার কবি রুমী। তার মসনবী শরীফে কী স্নিগ্ধ উচ্চারণ ‘সূর্যের আলোদেয়ালে পড়িয়া / দেয়াল উজ্জ্বল হয় / কোন্ সে বেকুব সূর্যেরে ছাড়ি/ দেয়ালেমশগুল হয়।’

স্রষ্টা যখন আপন বন্ধুর মতো ডেকে বলেন:
‘শুকনো সকল ক্ষেতখামারে/ আমি তুমুল বৃষ্টিধারা/
মনের যতো উজাড় শহর / সাজিয়ে করি দৃষ্টিকাড়া।
(আয় মনে আয়! পৃ-১৫৮)

অবিশ্বাসের অন্ধকারে আলোক সম্পাত করে রুমী কত সুন্দর করে বলেছেন:
যে ভ্রুণ আপন ক্ষুদ্র দেশে খুনের কাছে ভিক্ষে মাগে
ভিন্ন জগত তার জানা নেই , জানে কেবল রক্তটাকে
(অবিশ্বাসী ভ্রুণের মতোপৃ-১৫৯)

‘আমি’ কবিতায় রুমী তার সত্ত্বার পরিচয়ের সুষ্পষ্টউদ্ভাস রেখেছেন :
আমার স্থান হচ্ছে স্থানহীন ,চিহ্ন হচ্ছে চিহ্নহীন/ আমি নই দৈহিক ,বিদেহী ও নই,
আমি তো জীবন পাই পরম সত্তায়।
(পৃষ্ঠা-১৫৫, আমি)

musa
বই ও লেখক

যেনো মনসুর হাল্লাজের সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত কবিতার ছায়া। উকতুলুনি ইয়া সিকাতি উকতুলু /ইন্নাফীফি কতলে হায়াতি।
‘আমায় হত্যা করো হে আমার বিশ্বস্ত বন্ধুজন
আমার মৃত্যুতেই যে আমার জীবন।’
অর্থাৎ নিজ সত্তা বিসজর্নের মধ্য দিয়েই ঘটে নূতন রুপান্তর। কিংবা
‘আনা মান আহওয়া ওয়ামান আহওয়া আনা ’
অর্থাৎ আমি যারে চাই আমি হয়ে যাই সে
যাকে আমি চাই সে হয়ে গেছে আমি।
হাল্লাজের এই মরমী চেতনাকে ইঙ্গিত করে ইকবাল তাঁর মহাকাব্যিক ‘জাভেদনামায়’ হাল্লাজকে চিরপথচলা মানব তৃষ্ণার চরিত্র হিসেবে রুপায়ণ করেছেন। হাল্লাজেরপরে বেশ কয়েক শতাব্দি তেমন মহৎ কোনো আরবী সুফি কবিতা পাওয়া যায় নি। লেখাহয়েছে সুফি চিন্তা ও চর্চার প্রাণহীন গুরুত্বপূর্ণ সব গদ্যপুস্তক। সেইকবিতা আবার পাওয়া গেলো ত্রয়োদশ শতাব্দিতে, চেঙ্গিস খান ও তার উত্তরসুরীদেররাজনৈতিক ও সামাজিক ধ্বংসযজ্ঞের কালে।
(দিওয়ানে মনসুর হাল্লাজ : আলোচনা ও ভাষান্তর জাভেদ হুসেন পৃ-৬৮)

রুমীর কবিতার সৌন্দর্যলোকে বিমুগ্ধ মুসা আল হাফিজ প্রকৃতপক্ষে এমন একবিশাল সাম্রাজ্যে প্রবেশ করেছেন যেখানে আত্মা আলোকিত হতে বাধ্য। মিষ্টিসুরভি পান করতে বাধ্য হৃদয়। প্রশান্ত হতে বাধ্য প্রেমের পরিধি। আশিক মাশুকসম্পর্ক গভীরতর হতে বাধ্য। কিছু উদাহরণ দেয়া যাক মুসা আল হাফিজের অনবদ্যঅনুবাদ থেকে –
এখন আকাশ আমাকে নিয়ে হয়রান
এই হতভাগাটা ঘুমাতে ভুলে গেছে কেন?
হায়রে আকাশ ! প্রেমের সবক শিখে গেছে আমার বিবাগী হৃদয় ,
এ সবক যে পেয়েছে সে ঘুমাবে কখন?
(প্রেম ও নিদ্রা পৃ-১৮৬)

খোদার বসন্ত এসেছে বলে
শুকনো ও সবুজ গাছ হলো একাকার !
(বসন্তে-পৃ-১৮৬)

প্রিয় হে! এ কেমন প্রেম?
আমি তোমার অস্তিত্ব দেখছি , তোমাকে নয়!!
(কথোপকথন-পৃ-১৮৯)

সময় কবিতার মহামূল্যবান বাণী অস্থির মানব জাতির জন্যে মহৌষধের মতো:

প্রতি মুহর্তে মরে চলে যাচ্ছো
প্রতি মুহূর্তে জীবিত ফিরে আসছো
এ পৃথিবী একটি মুহূর্ত বলেছেন মহানবী সা:
প্রতি মুহূর্তে নূতন কিছু পরিধান করছে জীবন
প্রতি মুহূর্তে আমাদের দেহ অভিন্ন সান্নিধ্যের প্রতিফলন মাত্র!!
সময় আর স্থিতি মূলত এক বাহ্যিক রুপ
উৎস তার পরমের দ্রুততর কাজ!
(সময় পৃ-১২৮)

অনেক ঘুরেছো তো
দৃষ্টিহীন শিল্পের পিছে
নিপুন তোমার হাত
যে প্রতিমা গড়েছে তা মিছে।
(দার্শনিক শুনোপৃ-১৮৩)

যদি কেউ প্রশ্ন করে -কেমন করে মরা মানুষ জিন্দা হতো যিশুর ডাকে ?
ঠোঁটে তার একটি মধুর চুমু দিয়ে বলো তাকে ‘এমন করে’।
(হ্যাঁ, এমনই, পৃ-১৭৯)

শামসে তাবরিজের ইন্তেকালের পর তার জন্যে রুমীর শোকগাঁথা যেনো এক চিরন্তন পাঠ্যপুস্তক-
‘তিনিতো মাটির গভীরে লুকানো এক সোনালি সঞ্চয়
দু জাহান তার কাছে এক যবের দানা যেনো ।
বিশ্বের দেহটিকে তিনি ছুঁড়ে ফেলেছেন বিশ্বে
আত্মা আর অনুভ’তিকে তিনি জান্নাতে নিয়ে গেছেন।
খোদার কসম! প্রেমাস্পদের কাছে তিনিসমর্পিত হয়েছেন ।
(নিরবতা স্বর্র্ণময়,পৃ-১৭৮)

 

মানুষ উদরসর্বস্ব জীব নয়। তাবৎ ভোগবিলাসকে আত্মার ঔজ্জ্বল্য বিকাশের মাধ্যম বিবেচনা করাই উত্তম। পয়গাম কবিতায় কবি তা-ই বুঝাতে চান।
[১]
উদর থাকুক
ক্ষুধায় তবু
আত্মা তোমার উর্ধ্বে যাক
পর্দা ছাড়াই
যেনো তোমায়
সালাম জানান রব্বে পাক।

[২]
যখন তোমার পা থাকে না
তখনও হে সফর করো
শহর কোনো না পেলে হে
নিজের ভেতর শহর গড়ো।

দু চোখ দিয়ে চলবে কত?
হাজার হাজার চোখ গড়ে নাও
নতুন জগত গড়ার আগে
নিজের দিকে রোখ করে নাও।

রুমীর রুহানী বাগানের ফসল মুসা আল হাফিজের হৃদয় ছোঁয়ে করকমলের পরশে এখনবাংলাভাষা ও সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। মুসা আল হাফিজ সেই অনন্য মনীষা, যিনিঅনুসন্ধানী অভীপ্সা নিয়ে খোঁজেন কোথায় শূন্যতা,কোথায় প্রয়োজন। যেনো আলবতজানেন। আমাদের সাহিত্যে অনেক রাহিত্য রয়েছে। এসব রাহিত্য দূর করা আমাদেরদায়িত্ব।

রূমী নিয়ে বাংলা সাহিত্যে বিস্তর লেখালেখি হলেও মুসা আলহাফিজ এই পথে স্বাতন্ত্র নিয়ে রুমীর আত্মাকে অনুবাদ করেছেন । এ কাজে তারসাফল্যের স্বীকৃতিনতুন নয় ।

মুসা কেন রূমির প্রেমাসক্ত তার জবাবমহাসত্যের বাঁশি গ্রন্থের নবম পৃষ্ঠায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে বিবৃত- “হাঁটতেহাঁটতে সব কটা ক্ষুধার্ত গ্রহ পেরিয়ে এলেন কবি। রক্তের ভেতরে এক সাথে গর্জনকরছে শুরু ও সমাপ্তি। চারদিকে অপার্থিব সৌন্দর্য রঙিন মেঘের মত ভাসছেকিন্তু সকল সৌন্দর্যকে পেঁচিয়ে বৈদ্যুতিক অক্ষরে রচিত হচ্ছে পিপাসারবিবৃতি। কার পিপাসা? পরমের পিপাসা।’

প্রেমের প্রভাব ও প্রতাপের কাছে বিমোহিত রুমীর উচ্চারণমুসা আল হাফিজের কণ্ঠে:
যাত্রা যখন উর্ধ্বপানে ,তৃষ্ণা শুধু বাড়ছিলো
গতির কাছে সকল গ্রহের জটিলতা হারছিলো।
অথবা
পর্বতে সন্ধান করি হিরাত কান্দাহারে
গীরিখাদে, উপত্যকায়, নেই, তিনি নেই।
যখন ফিরেছি আমি হৃদয়ের ধামে
সেখানে বিরাজে দেখি তার অধিবাস।

রুমীর আলোকিত উদ্যানের ফসলী সম্ভার যে মানবজাতির ক্ষুধার্ত অশান্ত আত্মারউপাদেয়, এ কথা জগদ্বাসীকে জানান দিতেই এ পথে মুসার রোমাঞ্চকর ও কষ্টকরযাত্রা।রহস্যের সংলাপ অধ্যায়ে মুসা আল হাফিজ বলছেন, ‘রুমীর ভেতরে বরাবরইবসবাস করতেন এক দার্শনিক। সে দার্শনিক শহীদ হন আত্মহারা এক প্রেমিকেরছুরিতে। তার রক্ত খেকে জন্ম নিলেন বেহালাবাদক রুমী। আত্মার ভেতর সর্বদাবাজনা বাজানো যার কাজ।’
(পৃ-১৫)

রুমীর কবিতার পাঠকরা জানেন দুনিয়ার সকলেই মাতাল । কেউ কামনায়। কেউ খোদাপ্রেমে। উভয়ের পার্থক্য কী? রুমী জানাচ্ছেন-
‘যারা কামনায় মাতাল তারা এক হলেও দ্বিধাবিভক্ত,যারা খোদায় মাতাল , তারা সহস্র হলেও মূলত এক। ’

প্রেমিকের প্রশ্নগুলো রূমীর কাছে শুনলেই অনুভূত হবে রুমীকে ।বুঝা যাবে তার মহাসত্যের বীণাকে কেন আজও আমাদের এতো প্রয়োজন।
প্রেমিক: পোশাক পরিহিত মানুষ সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা কী?
রুমী: অনেক মানুষ দেখেছি , যাদের পরণে পোষাক ছিল না । আবার অনেককে দেখেছি যাদের পরণে পোষাক ছিল কিন্তু ভেতরে মানুষ ছিল না।
প্রেমিক: জীবনের পরম পুঁজি কী ?
রুমী : আমাদের জীবনের পরম পূঁজি আছে হৃদয়ের ভদ্রতায়,চরিত্রের কোমলতায়।এ পূঁজি প্রেমিকদের বদলে দেয়,তারা বদলাতে থাকে।
প্রেমিক: আমাদের আসলে কী বদলানো উচিত?
রুমী : নিজেকে। চালাক মানুষ নিজেকে ছাড়া সবকিছু বদলাতে চায়।যখন আমিঅপরিপক্ক ছিলাম।তখন বিশ্বকে বদলাতে চাইতাম। যখন জ্ঞানী হলাম, নিজেকেবদলাবার চেষ্টা করছি।
প্রেমিক:কীভাবে উজ্জ্বল হবো? পূর্ণ হবো? মিলিত হবো ?
রুমী:বিলীন হয়ে যাও। তিনি তোমাকে উজ্জ্বল করবেন সূর্যের মতো। নিজেকে রিক্তকরো ।তিনি তোমাকে সবকিছুদিয়ে পূর্ণ করবেন। লুটিয়ে পড়ো। তিনি তোমাকে আপনকাননে মিলিয়ে নেবেন।
প্রেমিক : আমার ভেতরে কীসের তাড়া?
রুমী : তোমার ভেতর তাড়া করছে একটি সকাল। উজ্জ্বল আলো বিস্ফুরিত হবে বলে ।
প্রসঙ্গত গালিবের সেই কথাটি মনে পড়ছে জীবন একটি জ্বলন্ত প্রদীপ যা ভোর হওয়া পর্যন্ত জ্বলে।
প্রেমিক: সন্ধান পাবো কীভাবে?
রুমী: তোমার হৃদয়কে ভাঙতে থাকো ,যতক্ষণ তা খুলে না যায়।
(মহাসত্যের বাঁশি ,পৃ-১৮)

রুমীর স্বগতোক্তি নির্বিচার ও বিবেকহীনতার জগতকে যুক্তি- বুদ্ধির সম্পদে বিত্তবান করে তুলেছে। যেমন-
বলা হলো- দাবি করলে বিচারক সাক্ষ্য চায়
বলা হলো- অশ্রুধারাই আমার সাক্ষ্য ,বিমর্ষ চেহারাই আমার দলীল ।
বলা হলো – কে ডেকেছে তোমাকে এখানে?
বললাম-তোমার পেয়ালার ঘ্রান।
(মহাসত্যের বাঁশি পৃ-২১)

রুমীকে চেনার জন্য আমরা শুনবো তার দার্শনিক , ইঙ্গিতময় ভাষ্য । তাকেবুঝতে হলে ফাঁদ থেকে মুক্ত করতে হবে নিজেকে । কারণ রুমী বলেছেন চালাকমুরগীছানাফাঁদে ধরা দেয় না। মুসা আল হাফিজ সেই ফাঁদ থেকে মুক্তির ভাষ্যনির্মাণ করছেন । তার মহাকাব্যের কোকিল , মরমী মহারাজ, মহাসত্যের বাঁশি সেইভাষ্যের স্বাক্ষর । এসব গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে উপচে পড়েছে রুমী, জামী ওহাল্লাজের অনুগামী এক প্রেমিক হৃদয়ের শিল্পময় সুরজাল । বস্তুবাদ পীড়িতআজকের পৃথিবীতে এই সুর মানবতার মুক্তির অভিনব প্রতিশ্রুতি বহন করছে । এইসময়ে বাংলা সাহিত্য এমন এক প্রেমিক ও শিল্পির জন্য অপেক্ষমাণ ছিলো যেন ।যিনি নিজেকে মোমবাতির মতো জ্বালাতে জ্বালাতে রচনা করবেন হৃদয়ের দহনেরকথামালা ।

মুসা আলহাফিজের কবিতায় আমরা সেই কথামালা শুনেছি, সচকিতহয়েছি বারবার । এখন তিনি ব্যাপক বিহার করছেন, অনুবাদ করছেন, প্রাণস্পর্শীগদ্যে চিত্ত জাগিয়ে তুলছেন । এর মাধ্যমে খুলে যাচ্ছে নতুন দরোজা । আমাদেরসাহিত্যে যুক্ত হচ্ছে রত্নভান্ডার । রুমীর দিকে পৃথিবী এখন নতুনভাবেপ্রত্যাবর্তন করতে চাইছে । মনের খাদ্যের জন্য পশ্চিমা জগত রুমীর দিকে হাতবাড়াচ্ছে । কিন্তু তা করতে গিয়ে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বহু বিকৃতি । মুসা আলহাফিজ সেই বিকৃতির কালো দাগগুলো ধরিয়ে দিয়েছেন । শত শত বছর ধরে বিভিন্নভাষায় রুমীচর্চার বাঁকগুলো তিনি দেখিয়েছেন অসামান্য পারদর্শিতায় । বাংলাসাহিত্যে রুমীর হৃদয়বৃত্তি কীভাবে প্রভাব সৃষ্টি করে আসছে, তাও তিনিদেখিয়েছেন । কবির গদ্য ঠিক যেন বাঁশীর মাধুরী । ভাবে ও ভাষায় সেই মাধুরীঅপূর্ব তানে উচ্ছ্বসিত হয়েছে তার গ্রন্থে ।

সত্যের এ বাঁশীবিপদগামীমানবসন্তানদের জন্যে একটি করুণ সুরের মধ্য দিয়ে চিরায়ত বিদায় ও বেদনার কথাবলেছে । বিশ্বাসের জাগরণের কথা বলেছে । সকল মানুষকে হৃদয়ের দিকে আহ্বানকরেছে । ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবী গড়ার শপথ শুনিয়েছে । আমাদের উচিত সেই শপথেযুক্ত হওয়া । আমরা কি প্রস্তুত ?

আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকম / এসএস