Tag Archives: আব্দুল হাই পাহাড়পুরী

‘শাইখুল হাদিস বললেন, আব্দুল হাই! তুমি পড়াতে থাকো’

সময় ২০১৪। এক দুপুরে হাজির হলাম কামড়াঙ্গিচর। জামিয়া নূরিয়া থেকে বন্ধু আকরাম হুসাইনের সহযোগীতায় খুজেঁ নিলাম পাহাড়পুরি হুজুর বাসভবন। হুজুর তখন অনেকটা সুস্থ। হুজুরের বড় ছেলে আশরাফ ভাই আমার নাম বলতেই চিনতে পারলেন।তখন একটি সাক্ষাৎকার নিলাম। হুজুরের নিজের ছাত্রজীবনের অনেক অজানা কথা বললেন। বিশেষ করে তার উস্তাদ শাইখুল হাদীস রহ. এর স্মৃতিচারণ করলেন। রাহমানী পয়গাম ২০১৪ এর র্মাচ সংখ্যায় সাক্ষাৎারটি ছাপা হয়েছিল।

পত্রিকা ছাপা হওয়ার পর আমি তখন কপি হুজুরের কাছে পাঠাতে পারিনি। এমন সময় একদিন সকালে হুজুরের সাহেবজাদা আশরাফ ভাই এর ফোন করলেন বললেন, আমি পত্রিকা দোকান থেকে কিনছি। আব্বাকে দেখাইছি। আব্বা বলছেন পড়ে শুনাইতে। আমি পুরা সাক্ষাৎকার আব্বাকে পড়ে শুনাইছি।আব্বা অনেক খুশি হইছেন। লেখাটা চোখের সাথে লাগাইছেন। মনভরে দোয়া দিছেন। বলছেন, আমার এমন অগুছালো কথাগুলো এহসান এত সুন্দর করে লেখছে..।

লেখাটা পড়ে আশরাফ ভাই নিজেও অনেক আনন্দিত হয়েছিলেন। হুজুরের এই অভিব্যক্তি শুনে সেদিন কি যে আনন্দ পেয়েছিলাম ভাষায় ব্যক্ত করার মত নয়।

পাহাড়পুরি হুজুর আজ আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন। হাজারো লক্ষ ছাত্র-ভক্তদের শোক সাগরের ভাসিয়ে চলে গেছেন মাওলার সান্নিধ্যে।

আজ শেষ বারের মত হুজুরকে দেখলাম। জানাযার খাটিয়া কাধে বহন করে ধন্য হলাম।বুকের সাথে জড়িয়ে রেখে দিলাম কবরে, শেষ ঠিকানায়…

[তৎকালিন সময়ে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি ভুমিকাসহ তুলে ধরা হলো।]

সময়ের প্রবীণ ও প্রাজ্ঞ মুহাদ্দিসদের অন্যতম মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরি দা. বা.। হযরত হাফেজ্জি হুজুর রহ. এর জামাতা। হযরত শাইখুল হাদীস রহ. এর অত্যন্ত স্নেহের ছাত্র। শাইখুল হাদীস রহ. যখন নূরিয়ায় বুখারি আউয়ালের দরস দিতেন, তখন মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরি সেখানে বুখারি সানির শিক্ষক। নিজের পড়ানো শেষ করে এসে শাইখুল হাদীসের দরসে বসতেন, ছাত্রদের মতো ইবারতও পড়তেন। এভাবেই শাইখুল হাদীসের কাছে পাঁচ ছয় বার বুখারি পড়ার বিরল কৃতিত্ব অর্জনকরেন। হযরতের পিতাও ছিলেন একজন কামেল মানুষ, বড় কাটারার সাবেক মুদাররিস, হাফেজ্জি হুজুর রহ. এর খলিফা মাওলানা আখতারুজ্জামান রহ.। পাহাড়পুর মাদরাসায় মুহতামিম হিসেবে প্রায় ৭০ বছর দায়িত্ব পালন করেন। মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরি নিজ শিক্ষা জীবনে লালবাগ থেকে দাওরা শেষ করে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাকিস্তান গমন করেন। সেখানে ফুনুনাতের ওপর একবছর পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষক হিসেবে নূরিয়ায় যোগ দেন। সেখান থেকে জামিয়া মুহাম্মাদিয়া, জামিয়া রাহমানিয়া হয়ে বর্তমানে লালমাটিয়া জামিয়া ইসলামিয়ায় বুখারির দরস দিচ্ছেন। অসংখ্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের সাথে নানা ভাবে যুক্ত থাকলেও বার্ধক্যের কারণে এখন তিনি অনেকটাই নীরব। আপনজনদের কাছে ইবাদত বন্দেগি করেই এখন তার সময় কাটে। সাক্ষাৎ প্রার্থীদের সাথে যৎসামান্য কথা বলেন। শাইখুল হাদীসের নাম বলতেই অনর্গল বলা শুরু করলেন স্মৃতি কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- মুহাম্মদ এহসানুল হক

paharpuri_interviw

আপনার শিক্ষা জীবনের সূচনা কোথায়?

মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী: আমার শিক্ষা জীবনের সূচনা আমাদের গ্রামেই হয়েছে। পাহাড়পুর এমদাদুল উলুম মাদরাসায় আমি প্রথম দিকের জামাতগুলো পড়েছি।

ঢাকায় কবে কিভাবে আসলেন?

মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী: ঢাকায় এসেছি ১৯৬৭/৬৮ সালের দিকে। লালবাগ জামিয়া কুরআনিয়ায় তখন দেশের শীর্ষস্থানীয় অনেক আলেমে দ্বীন ছিলেন। হযরত হাফেজ্জি হুজুর রহ. শাইখুল হাদীস রহ. সহ আরও অনেকে। আমি আমার আব্বাজানকে বললাম, আমি মিশকাত দাওরা লালবাগে পড়তে চাই। আব্বা তখন আমাকে অনেকগুলো শর্ত দিলেন, বললেন, লালবাগে অনেক মুরুব্বিরা আছেন, হযরত হাফেজ্জি হুজুরকে মুরুব্বি বানিয়ে চলতে হবে। সমস্ত উস্তাদদের সাথে সুসস্পর্ক রেখে চলতে হবে। এ জাতীয় অনেকগুলো শর্ত দিলেন। আমি বললাম ইনশাআল্লাহ আমি পারবো। অনুমতি পেলাম। তার পর আমি ঢাকায় এসে মেশকাত জামাতে ভর্তি হলাম। মেশকাত আউয়াল হযরত শাইখুল হাদীস রহ. এর কাছে পড়লাম।

সেই সময়ের কোনো স্মৃতি কি মনে পড়ে?

মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী: হুজুরের দরসে আমি নিয়মিত এবারত পড়তাম। মাওলানা রফিকুল ইসলাম বাইতুল মুকাররমের যিনি ইমাম ছিলেন, তিনিও পড়তেন। আমরা দুজন এক সঙ্গেই বসতাম। ক্লাসে প্রথম দ্বিতীয় আমরা দুজনই হতাম। কখনো তিনি আউয়াল হতেন আবার কখনো আমি আউয়াল হতাম, এভাবেই চলতো। শাইখুল হাদীস রহ. চাইতেন দরসে আমিই যেন এবারত পড়ি। হুজুরের চাওয়া হিসেবে আমিই বেশি এবারত পড়তাম। এভাবে মেশকাত জামাতটা কেটেছে।

রাহমানী পয়গাম: শাইখুল হাদীস রহ. এর ঘনিষ্ট হওয়ার সুযোগ হলো কী করে?

মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী: মিশকাত জামাত শেষ করার পর হুজুর আমাকে জিজ্ঞাস করলেন, রমজানে কোথায় থাকবে? আমি বললাম, রমজানে মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. এর কাছে থাকার ইচ্ছা করেছি। হুজুর বললেন, না যেও না। আগামী বছর দাওরা পড়বে। বুখারি শরিফ পড়বে। আমার কাছেই তো পড়বে। আমি কয়েক বছর যাবত বুখারি পড়াচ্ছি না। রমজানের পর থেকে ইনশাআল্লাহ আবার বুখারি পড়াবো। তুমি রমজানে আমার কাছে থাকো। সদর সাহেব হুজুরের কাছে অন্য সময় থেকো। হুজুরের কথায় আমি রাজি হয়ে গেলাম। ওই বছর রমজানে আর কোথাও গেলাম না, হুজুরের খেদমতে লালবাগ মাদরাসায় থেকে গেলাম।

রমজানের সময়টা কিভাবে কাটলো?

মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী: হুজুর প্রতিদিন সকালে মাদরাসায় এসে দফতরে বাংলা বুখারির কাজ করতেন। হুজুর আমাকে বললেন তুমি রমজানে কী করবে? আমি বললাম, হুজুর আমাকে যা করতে বলবেন তাই করবো। হুজুর বললেন, আমার বাংলা বুখারির তো প্র“ফ দেখতে হয়, তুমি তো আগামী বছর বুখারি পড়বে, যদি বুখারির প্র“ফ দেখো তাহলে তোমার জন্য উপকার হবে। আমি তোমাকে প্রতিদিন প্র“ফ দেখার জন্য লেখা এনে দিবো। তুমি দেখে আমাকে দিয়ে দিবে। পরের দিন আবার দিবো। সেমতে হুজুর আমাকে বুখারির বঙ্গানুবাদের প্র“ফ এনে দিতেন, আমি সারা দিন রাত দেখে কাজ শেষ  করে রাখতাম। পরের দিন হুজুরকে দিয়ে দিতাম, হুজুর তখন আমাকে আরও নতুন কতগুলো দিতেন। এভাবেই আমার বাংলা বুখারির কাজে শরিক হওয়ার সুযোগ হলো।

শাইখুল হাদিস আল্লামা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী আর নেই

এরই মধ্যে একদিন হুজুর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি আর কী করবে? আমি বললাম, আপনি যা করতে বলবেন তাই করবো। তবে আমার ইচ্ছা ছিল, কাশশাফের শরাহ আল ওয়াসসাফ আলাল কাশশাফ, যেটা মাওলানা ইদ্রীস কান্দলভি রহ. এর ছেলে মাওলানা মালেক কান্দলভি সাহেব লিখেছেন- সেটা প্রতিদিন একটু করে মুতালাআ করা। হুজুর শুনে খুব খুশি হলেন, বললেন তুমি তো ছাত্র, মাদরাসা থেকে তোমাকে কিতাব দিবে না। ঠিক আছে কিতাব আমি আমার নামে তুলে তোমাকে দিবো। হুজুর মাদরাসা থেকে কিতাব তুলে আমাকে মুতায়ালার জন্য দিলেন। আমি সারা রমজান সেটা পড়লাম। রমজান শেষ করার পর আবার হুজুরকে দিয়ে দিলাম।

বুখারির প্রুফ দেখলাম, ওয়াসসাফ মুতালাআ করলাম, হুজুরের খেদমতে থাকলাম এভাবে রমজানটা কাটলো।

রমজানে কি পরিমাণ সময় শাইখুল হাদীস রহ. মাদরাসায় থাকতেন?

মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী: হুজুর সকাল সকাল মাদরাসায় চলে আসতেন। লেখার কাজ করতেন। প্র“ফও দেখতেন। কয়েক ঘণ্টা মাদরাসায় অবস্থান করতেন।

হুজুরের স্নেহের কোনো উদাহরণ যদি দিতেন?

মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী: দাওরায়ে হাদিসের বছর প্রায় সময় আমি এবারত পড়তাম। অন্য কেউ এবারত পড়লে তিনি খুশি হতেন না। সবকের মধ্যেই বলতেন, আব্দুল হাই তুমি পড়। অন্য কেউ যদি পড়তো তাহলে সে কিছুক্ষণ পড়ার পর হুজুর বলতেন এবার আব্দুল হাই পড়–ক। হুজুরের কাছে সারা সপ্তাহ বুখারি পড়তাম। আর শুক্রবার আসলে ছাত্রদের নিয়ে লালবাগের বিভিন্ন মসজিদে তাকরার করতাম। হুজুর সারা সপ্তাহ যা পড়াতেন সেগুলো তাকরার করতাম।

তাকরার করতে মসজিদে যাওয়ার কী কারণ ছিল?

মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী: মসজিদ নিরিবিলি হওয়ার কারণে তাকরার করতে সুবিধা হত। সঙ্গী সাথিদের নিয়ে তাকরার করতাম। লালবাগে এমন মসজিদ কম ছিল যেখানে গিয়ে আমরা তাকরার করিনি। হুজুরের তাকরির ক্লাসে লিখতাম। আর তাকরারে আমি সেগুলো আলোচনা করতাম। এভাবে বছরটা শেষ করলাম।

সেই সময়ের বিশেষ কোনো ঘটনা কি মনে পড়ে?

মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী: আমি যেই বছর দাওরায়ে হাদিস পড়ছি সেই বছরেরই মাঝমাঝি সময়ে একবার আমার আব্বা ঢাকায় আসলেন। বললেন শাইখুল হাদীস সাহেবকে আমাদের মাদরাসায় দাওয়াত করবো। আব্বা আমাকে নিয়ে হুজুরের আজিমপুরের বাসায় গেলেন। আজিমপুরের বাসায় তখনও বিল্ডিং হয়নি। টিনের ঘর ছিল। আব্বা বাসার ভিতরে খবর পাঠালেন। আমাদের ভিতরে যেতে বলা হলো। আমরা ঘরে প্রবেশ করলাম। হুজুর তখনও বাংলা বুখারির কাজ করছিলেন। আব্বা হুজুরকে পাহাড়পুর মাহফিলের জন্য দাওয়াত দিলেন। হুজুর বললেন আলহামদুলিল্লাহ আমি তো দাওয়াত কবুল করলাম, কিন্তু আমি তো পাহাড়পুর চিনি না আমি যাব কী করে। তখন আব্বা আমাকে দেখিয়ে বললেন, আমার ছেলে আপনাকে নিয়ে যাবে। ও আপনার সাথে যাবে। হুজুর আশ্বস্ত হলেন।

মাহফিলের দিন আসলো। হুজুরকে নিয়ে আমি রওনা হলাম। নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত টেক্সি দিয়ে গেলাম। আমরা যখন ফরিদাবাদ মাদরাসার পাশ দিয়ে যাচ্ছি, তখন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন ফরিদাবাদ মাদরাসার একজন মুহাদ্দিস, তারও পাহাড়পুর যাওয়ার কথা। হুজুর তার প্রতি লক্ষ করেন নি। আমি তাকে দেখেছি, কিন্তু শাইখুল হাদীস সাহেবের সাথে যেহেতু আর কাউকে নিবো না তাই তাকে আমাদের টেক্সিতে উঠালাম না। তিনি এতে মনে কষ্ট পেলেন। আমি নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত হুজুরকে নিয়ে গেলাম। তিনিও নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত অন্য গাড়ি দিয়ে গেলেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে দাউদকান্দি পর্যন্ত স্টিমার চলতো। ওই ইস্টিমারে আমি হুজুরকে নিয়ে উঠলাম। মাওলানা সাহেবও ওই স্টিমারে গিয়ে উঠলেন। তার মনে একটু কষ্ট, তাই সে হুজুরের সাথে দেখা করলেন না। কাছেও আসলেন না। দূরে গিয়ে বসলেন।

ব্যাপারটা শাইখুল হাদীস রহ. এর নজরে পড়লো। হুজুর বললেন, ওই মাওলানা সাহেব সেখানে কেন বসেছে? আমাকে বললেন, ওই যে মাওলানা সাহেব বসা সে আমার ছাত্র, তাকে আমার কাছে নিয়ে আসো। আমি গিয়ে তাকে বললাম, শাইখুল হাদীস সাহেব হুজুর আপনাকে স্মরণ করছেন। তিনি নাড়াচাড়া দিয়ে উঠলেন। বললেন হুজুর কোথায়? আমি বললাম ওইখানে, তিনি এসে হুজুরের সাথে মুসাফাহা করলেন। বসলেন ও পুরো রাস্তা হুজুরের সাথে আসলেন। দাউদকান্দি পর্যন্ত আমারা পৌঁছলাম।

সেখানে পাহাড়পুরের অনেক ছাত্র এসেছিল হুজুরকে নেয়ার জন্য। দাউদকান্দি থেকে পাহাড়পুরে যাতায়াতের ভাল কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তখন রাস্তাও হয় নি। সেখান থেকে রিকশায় যেতে হতো। হুজুরকে একটি রিকশায় বসানো হলো। হুজুর রওনা হলেন। আর আমরা পিছনে পিছনে হাঁটছিলাম। কিছুদূর গিয়ে হুজুর রিকশা থামিয়ে পিছনের দিকে তাকালেন। বললেন আব্দুল হাই! তুমি হেঁটে গেলে আমি আর রিকশায় যাব না। আমি হুজুরকে অনেক করে না করলাম। কিন্তু হুজুরের এক কথা  আমার সাথে রিকশায় বসতে হবে আর না হলে আমি নেমে যাব। এক পর্যায়ে হুজুর রিকশা থেকে নেমে যেতে উদ্যত হলেন। তখন আমি বাধ্য হয়ে হুজুরের সাথে রিকশায় উঠলাম। মাদরাসা পর্যন্ত গেলাম।

হজরত পাহাড়পুরী হুজুরের বরকতময় পদধূলি

মাহফিলে হুজুর বয়ান করলেন। বয়ান শেষ করে রাত্রে মাদরাসায় ঘুমালেন। সকালে হুজুর ঢাকায় আসবেন। হুজুর আমাকে বললেন, তোমার বাসা কোথায়? আমি বললাম মাদরাসা থেকে একটু দূরে। হুজুর বললেন, তোমার বাসায় আমাকে নিয়ে চল। আমি তোমার বাড়িতে যাব। মাদরাসা থেকে আমাদের বাসায় হেঁটে যেতে হয়। রিকশাও যায় না। হুজুর হেঁটেই আমাদের বাসা পর্যন্ত গেলেন। আম্মা হুজুরের জন্য বিভিন্ন পদের খাবার রান্না করে রেখেছিলেন। হুজুরের সামনে খাবার পরিবেশন করা হলো। খাবার দেখে বললেন, আমি এই খাবার খাব না। শহরের খাবার পোলাও কোরমা আমি খাব না। এগুলোতো সব সময়ই খাওয়া হয়। আমি গ্রামের খাবার খাব।  আমি দৌঁড়ে আম্মার কাছে গেলাম। বললাম, আম্মা হুজুরতো এই খানা খাবেন না, হুজুর গ্রামের খানা খেতে চাচ্ছেন। আম্মা বললেন আমি হুজুরের জন্য গ্রামের খানাও তৈরি করে রেখেছি। লাও চিংড়ি মাছ, দেশি চালের ভাত, এগুলোও আম্মা তৈরি করে রেখেছিলেন। হুজুর খুব খুশি হলেন। বললেন, এ গুলিই না আমার খানা। শহরের থেকে আমি গ্রামে আসছি শহরের খানা খাওয়াার জন্য? হুজুর খাবারা খেয়ে আবার মাদরাসায় গেলেন। হুজুর যখন রওনা হবেন  তখন আব্বা হুজুরের হাতে গাড়ি ভাড়ার কথা বলে কিছু টাকা দিলেন। হুজুর টাকা গুলো গুণলেন। এরপর বললেন, এত টাকা তো গাড়ির ভাড়া হয় না। এখানে তো অনেক টাকা। এই কথা বলে ভাড়ার জন্য অল্প যে কয় টাকা লাগে সেটা রেখে বাকি টাকা আব্বার হাতে দিয়ে দিলেন। আর বললেন, ভাড়ার জন্য যতটুকু লাগে সেটা আমরা রেখেছি। বাকি টাকা আপনি মাদরাসার কাজে লাগাবেন।

আমরা হুজুরকে এগিয়ে দিলাম। এবার হুজুর আমাকে আর আনলেন না। আমাকে বললেন, তুমি তোমার বাবা মার খেদমতে থাকো। আমি একা যাব। তোমাকে আর কষ্ট দিবো না।

paharpur2

পড়া শেষ করে শিক্ষক হিসেবে কোথায় যোগ দিলেন?

মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী: পড়া শেষ করার পর আমি নূরিয়ার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেই। আমি পড়াতাম বুখারি সানি। আর হুজুর পড়াতেন বুখারি আউয়াল। আমি তখন হুজুরের ক্লাসে নিয়মিত বসতাম। বুখারি সানি পড়িয়ে বুখারি আউয়ালের ঘণ্টায় গিয়ে বসতাম। আমি হুজুরের কাছে এভাবে পাঁচ বার বুখারি পড়েছি। তখনো আমি ছাত্রদের মতো এবারত পড়তাম।

হাফেজ্জি হুজুরের সাথে শাইখুল হাদীসের সম্পর্ক কেমন দেখেছেন?

মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী: হযরত হাফেজ্জি হুজুর রহ. শাইখুল হাদীস রহ.  কে ‘ফখরে বাঙ্গাল’ বলতেন। একদিন আমাকে জিজ্ঞাস করলেন, তোমারা আজিজুল হক সাহেবকে কি বলে ডাকো? শাইখুল হাদীস? আমি বললাম জ্বি। হুজুর বললেন, কিন্তু আমি বলি- ফখরে বাঙ্গাল মাওলানা আজিজুল হক সাহেব। শাইখুল হাদীস তো শুধুমাত্র যে ব্যক্তি হাদিসের খেদমত করেন তার জন্য। কিন্তু বাংলাদেশে তার বহুমুখী খেদমত, কুরআনের খেদমত, হাদিসের খেদমত, সিয়াসাতের খেদমত এই সব গুলোর জন্য তাকেই সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত মনে করি। এজন্য তাকে আমি বলি ফখরে বাঙ্গাল।

রাহমানিয়ায় যোগদানের ঘটনা একটু জানতে চাই।

মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী: সেই ১৯৯৫ সালের কথা। আমি তখন মুহাম্মদপুর জামিয়া মুহাম্মাদিয়ায় পড়াই। সেদিন বাস ধর্মঘট ছিল। আমি পায়ে হেটে কিল্লার মোড়ের দিকে ফিরছিলাম। আর হুজুর আজিমপুর বাসা থেকে যাচ্ছিলেন মুহাম্মদপুর রাহমানিয়ার দিকে। পথে হুজুরের সাথে আমার দেখা হয়ে গেল। সালাম দিলাম। হুজুর জানতে চাইলেন কোথায় যাও? আমি বললাম, কিল্লার মোড় যাব। এবার জানতে চাইলেন কোথায় পড়াও? আমি বললাম আমি তো জামিয়া মুহাম্মাদিয়ায় পড়াই। হুজুর বললেন তোমার আর মুহাম্মাদিয়ায় পড়াতে হবে না। এখন থেকে তুমি রাহমানিয়ায় পড়াবে। আমি বললাম রাহমানিয়ায় এসে কী পড়াবো? হুজুর বললেন বুখারি পড়াবে। বললাম হুজুরের হুকুম পালন করতে আমি খুশি মনে রাজি আছি। যোগ্যতা তো আমার মধ্যে মোটেই নেই। তবে হুজুর দোয়া করলে আল্লাহ তাউফিক দিবেন ইনশাআল্লাহ। এই আমি মুহাম্মাদিয়া থেকে রাহমানিয়ায় এসে পড়লাম। আমাকে বুখারি সানি দেয়া হল। আমি খেদমত শুরু করলাম। আমি ক্লাস করাতাম মাগরিবের পরে, আর হুজুর পড়াতেন দিনে।

একদিন মাগরিবের পরে হুজুর মাদরাসায় ছিলেন। আমি তখন ক্লাসে। হুজুর দাওরার রুমের সামনে বারান্দা দিয়ে হাঁটলেন। আমার ক্লাসের নমুনা দেখলেন। তারপর বললেন, আব্দুল হাই! তুমি পড়াতে থাকো। এতমিনানের সাথে পড়াতে থাকো। আমি আজকে তোমার দরস শুনেছি এবং দেখেছি। মাশাআল্লাহ তুমি পড়াও। হুজুর আমাকে সাহস দিলেন, হিম্মত দিলেন।

paharpur

শাইখুল হাদীসের সাথে কখনো সফর করেছেন?

মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী: হুজুরের সাথে আমি অনেক সফর করেছি। দেশের বাইরেও গিয়েছি। লন্ডন সফরের কথা মনে পড়ে। ইস্ট লন্ডন মসজিদে হুজুর মাগরিবের পর থেকে এশা পর্যন্ত বয়ান করলেন। হাফেজ্জি হুজুর সেখানে ছিলেন। আমিও ছিলাম। হুজুর হৃদয়গ্রাহী বয়ান করলেন, খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। হুবহু স্মরণ ছিলো, এখন তো স্মরণ শক্তি চলে গেছে তাই আর হুবহু মনে করতে পারি না। সেখান থেকে আরও অনেক জায়গায় গেলেন, বার্মিংহাম গেলেন, সেখানে আর আমি যাই নি। সেখানে সফর করে হুজুর আবার ফিরে আসলেন। এটা ৮৪/৮৫ সালের কথা।

 ব্যক্তিগত যোগাযোগ কি সব সময় ছিল?

মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী: হ্যাঁ ছিল, হুজুর আমার মিরপুরের বাসায় গিয়েছিলেন। আমার দ্বিতীয় মেয়ের বিয়ের সময়। মাওলানা উবায়দুল্লাহ সাহেব এর ছেলে কাতারে থাকতো। সে দেশে আসলো, তাকে বিবাহ করাবে। পয়গাম দিলো। আমি রাজি হলাম। আমি হুজুরকে দাওয়াত দিলাম। মুফতি আমিনী সাহেবও গেলেন। আমার বৈঠকখানায় গিয়ে হুজুর বসলেন। হুজুরই বিবাহ পড়ালেন।

শেষ সাক্ষাৎ কবে করেছেন?

মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী: একবার রাহমানিয়ায় গেলাম, দোতলায় হুজুর যে কামরায় থাকতেন সেখানে গেলাম। গিয়ে বসলাম। হুজুর তখন আমাকে আপনি আপনি করে বলছিলেন। আমি বললাম হুজুর আমাকে আপনি করে বলছেন কেন, আমি তো আপনার ছাত্র। আমাকে তুমি করে বলেন। আমাকে বিভিন্ন কথা জিজ্ঞাস করলেন। আমাকে বসার জায়গা করে দিলেন।

অনেক কষ্ট করে আমাদের সময় দিলেন, আমাদের জন্য দোয়া করবেন।

মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী: তোমরাও আমার জন্য দোয়া করবে। এখন তো আমার শেষ সময়। সকালে বিকেলের আশা করি না, বিকেলে সকালের আশা করি না। সকলের কাছে দোয়া চাই।

আরআর

জানাজা অনুষ্ঠিত; তিল ধারণের ঠাই নেই

জানাজার স্থান থেকে আবদুল্লাহ মারুফ 

শাইখুল হাদিস আল্লামা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী রহ. এর জানাজা নামাজ কামরাঙ্গিরচরে জামিয়া নুরিয়ার মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এশার নামাজের পর আলেমদের বক্তৃতা শেষে রাত ৯ টা ৪৫ মিনিটে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার নামাজের ইমামতি করেন ছেলে মাওলানা আবরারুজ্জামান।

সন্ধ্যার পর থেকেই কামরাঙ্গির চরে আসতে থাকে তার ভক্তবৃন্দ। জানাজার আগে পুরো মাঠ লোক ভরপুর হয়ে উঠে। ঢাকাসহ বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জানাজায় শরিক হতে ছুটে আসেন ধর্মপ্রাণ লোকজন।

জানাজার আগে আল্লামা আবদুল হাই পাহাড়পুরীকে নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক কথা বলেন ঢাকার শীর্ষস্থানীয় আলেমগণ। বক্তব্য রাখেন, মাওলানা আবদুল মালেক, মুফতি দেলোয়ার হুসাইন, মাওলানা মাহমুদুল হাসান, ড. মাওলা মুশতাক আহমদ, অধ্যক্ষ ইউনুস আহমদ, মুফতি ফয়জুল্লাহ, মাওলানা মামুনুল হক, মাওলানা শাহ আতাউল্লাহ, জুনাইদ আল হাবিব, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক, মাওলানা হাসানাত আমিনী, মাওলানা আবু সাঈদ, মুফতি ইমাদুদ্দীন প্রমুখ।

কিছুক্ষণের মধ্যে মরহুমকে হাফেজ্জি হুজুরের কবরের পাশে দাফন করা হবে বলে জানা গেছে।

paharpuri_janaja

মাওলানা আবদুল মালেক বলেন, তিনি যে জিনিসগুলো হাসিল করেছেন তা হাছিল করা আমাদের জন্য একান্ত কর্তব্য। এটা হাছিল করলেই তার প্রতি আমাদের মহব্বতের বহিপ্রকাশ ঘটবে।

হাসপাতালে মুমূর্ষূ অবস্থার কথা শোনান তার ছেলে মাওলানা আবরারুজ্জামান। তিনি বলেন, গত তিনদিন আগে একটি মাদ্রাসা থেকে মুদারিরস হিসেবে আমাকে নিতে আসে এটি আমি আব্বাকে জানাই, শুনে আব্বা বলেন, আবরারের কোনো ছুটি নেই, আমাকে দাফন করার আগে। আজ সকালে যখন হাসপাতাল থেকে সংবাদ আসছিল আব্বার অবস্থা খুবই গুরুতর তখন আমার মনে বারবার উদিত হচ্চিল যে আজ সোমবার তিনদির পরিপূর্ণ হয়েছে।

paharpuri_janaja2

হাফেজ্জী হুজুরের ছেল মাওলানা শাহ আতাউল্লাহ বললেন, হাফেজ্জী হুজুরের রেখে যাওয়া মিশন কম্প্লিট করার ব্যপারে সবচে বেশি সক্রিয় ছিলেন শাইখুল হাদিস আল্লামা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী।

paharpuri_janaja3

মুফতি দেলাওয়ার হোসাইন বলেন, উলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করলে তার স্থান কিয়ামত পর্যন্ত দখল করার কেউ নেই।

মাওলানা মামুনুল হক বলেন, দরসে তিনি আকাবিরদের ঘটনা এলে তিনি আবেগে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়তেন। কান্নায় ভেঙে পড়তেন। এটি ছিল তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

paharpuri_janaja5

মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, উস্তাদের প্রতি একজন ছাত্রের কি যে আজমত হতে পারে সেটা পাহাড়পুরী হুজুর ভালোভাবে দেখিয়ে ছিলেন। তিনি আমাদের আমাদের অনেক মহব্বত করতেন।

paharpuri_janaja6

অধ্যক্ষ মাওলানা উইনুস আহমদ বলেন, আজ সকালে সূর্য উঠেছিল বিকালে আবার ডুবে গেছে। আগামী কালও আবার উঠবে কিন্তু ইলমি জগতে যে সূর্য আজ ডুবে গেল তা আর কোনো দিন উদিত হবে না।

মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, তিনি কত ইনহিমাকের সাথে মুতালায়ায় ডুবে থাকতেন নতুন প্রজন্মকে ওই পরিমাণ চেষ্ঠা আদায় করতে হবে। তিনি যেভাবে ইলমের সাগরে ডুবে থাকতেন তার প্রচেষ্টা আমাদের করতে হবে।

paharpuri_janaja8

মাওলানা হাসানাত আমিনী বলেন, আমার ছোট খালুজান রহ. ঈমানের পরীক্ষায় পাশ করে গেছেন। তার প্রমাণ শত শত মুসল্লিদের উপস্থিতি। শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিকুল হক রহ. এর জানাজায় আমার আব্বাজান আমিনী রহ. একটি কথা বলেছিলেন তা হলো, আপনারা হুজুরের জন্য এক খতম কুরআন পড়বেন। আমিও সে কথাটিই বলি। আপনারা এক খতম কুরআন তিলাওয়াত করে মরহুমের রুহে বখশে দিবেন।

paharpuri_janaja9

জানাজার ছবিগুলো তুলেছেন, ইখলাস আল ফাহিম

hai

আরআর

আল্লামা পাহারপুড়ীর ইন্তেকালে আলেমদের শোক

paharpuri_ourislamমতামত নিয়েছেন আব্দুল্লাহ বিন রফিক ও মোস্তফা ওয়াদুদ

সদ্য ইন্তেকাল করেছেন এদেশের খ্যাতনামা আলিমে দ্বীন হাজারো লক্ষ্য আলিমের মুরুব্বী শায়েখ আব্দুল হাই পাহাড়পুরী রহ.। তার ইন্তেকালে যা শূন্য হয়ে গেলো তা কখনও পূরণ করা যাবে কী না তা আল্লাহই ভালো জানেন। তার মৃত্যুতে রাজধানীর শীর্ষস্থানী আলেমগণ আওয়ার ইসলামের মাধ্যমে শোক জানিয়েছেন।

মাওলানা আব্দুল মালেক

‘আল্লাহ হজরতকে জান্নাত নসীব করুন। সারাটা জীবন তিনি ব্যয় করেছেন দ্বীনের স্বার্থে।’ তারপর হুযুর কান্নায় ভেঙে পড়েন আর কথা বলতে পারেননি।

মহিউ মাওলানা মাহমুদুল হাসান

তিনি বলেন, ‘‘হযরত অত্যন্ত মুখলিস একজন মানুষ ছিলেন। তাঁর সাথে আমার গভীর সম্পর্ক ছিলো। একসাথে পাকিস্তানে পড়ালেখা করেছি। তিনি পাকিস্তানেও অনেক কষ্ট করে পড়া-লেখা করেছেন। আল্লাহ তাঁকে জান্নাত নসীব করুন। আমি অসুস্থ না হলে আমিও তাঁর জানাযায় যেতাম।’’

শাইখুল হাদিস আল্লামা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী আর নেই

আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ

মাওলানা আবদুল হাই পাহাড়পুরীকে বিশুদ্ধ মানুষ গড়ার কারিগর উল্লেখ করে বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান ও ঐতিহাসিক শোলাকিয়ার ইমাম আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলেন, দারুল উলূম দেওবন্দ ও আকাবীরের উত্তরসূরী মাওলানা আবদুল হাই পাহাড়পুরী কওমী অঙ্গনের আলোকবর্তিকতা হিসেবে কাজ করতেন। তার মৃত্যুতে দেশ একজন দরদি শিক্ষক ও অভিভাবক হারালো।
আজকের তরুণপ্রজন্মকে কুরআন হাদিসের বুৎপত্তি অর্জনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আল্লামা মাসঊদ বলেন, পড়ালেখায় কঠোর পরিশ্রম ও নিজেকে গড়া তোলা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। মাওলানা পাহাড়পুরীসহ বিশেষজ্ঞ আলেমদের মৃত্যুতে শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায়ে মনোনিবেশ করার অঙ্গীকারই হবে প্রথম কাজ।

shirsha alem

আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী

আল্লামা আব্দুল হাই পাহাড়পুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাষ করে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী।  তিনি বলেন, আমরা জাতির এক অতন্দ্র প্রহরীকে হারালাম। তিনি আমাদের জন্য অনেক বড়ো এক নেয়ামাত ছিলেন। তার শূন্যতা আমি প্রতি সময় উপলব্দি করবো। তিনি তাঁর ব্যাপারে সংক্ষেপে স্মৃতিচারণ করে বলেন, তিনি ইলমের লাইনে ছিলেন এক মহান জ্ঞানী। আবার তাসাউফের লাইনে ছিলেন মহান সাধক। আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাত নসীব করুন।

অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনুস আহমদ

ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুস আহমদ তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বলেন, আল্লামা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী আমাদের জন্য একটি সূর্য ছিলেন। আমরা প্রতিদিন সূর্য দেখি। কিন্তু তিনি এমন সূর্য ছিলেন যা আর আমরা দেখবো না। একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই জানেন, যুগের এ মহান মনিষীর জায়গা পূরণ হবে কিনা। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন।

জানাজা আজ রাতে কামরাঙ্গির চরে

ড. আ.ফ.ম. খালিদ হোসেন

‘‘আমরা হযরতকে হারিয়ে অত্যন্ত মর্মাহতও শোকাহত। তিনি সারা জীবন সুন্নাহর দেখানো পথ অনুসরণ করেছেন। আমরা যেনো সারা জীবন তিনি যে পথে হেটেছেন আমরাও যেনো সে পথে হাটতে পারি। এবং দু‘আ করি আল্লাহ তাকে জান্নাত নসীব করুন।’

আরআর

হজরত পাহাড়পুরী হুজুরের বরকতময় পদধূলি

হজরত পাহাড়পুরী হুজুরের বরকতময় পদধূলি

মুফতী মাহমূদুল আমীন

এক. আহলে দিলের সোহবত অনেক বড়ো নেয়ামত। এ নেয়ামত যার নসীব হয় সেও ধীরে ধীরে আহলে দিল হয়ে যায়। আল্লাহর প্রিয় বন্ধুতে পরিণত হয়। কোনো বয়ান যদি নাও হয় তবুও আল্লাহওয়ালা বান্দার হৃদয়ের তাপ ও উত্তাপ সোহবত গ্রহণকারীর দিলকেও তাপিত করে। আহলুল্লাহর দরদভরা দিলের মহব্বতের আগুন সোহবত গ্রহণকারীর হৃদয়কেও ছুঁয়ে যায়। জনৈক বুযুর্গের ভাষায়,
আগ কি জো খাসিয়াত হ্যায়, ইশ্ক কি ও খাসিয়াত হ্যায়।
এক খানা বা খানা হ্যায় এক সীনা বা সীনা হ্যায়।
অর্থ : ইশ্কের স্বভাব আগুনের স্বভাব, আগুনের মতোই তাহার প্রভাব। এক ঘর থেকে ঘর, আরেক অন্তর থেকে অন্তর।

paharpur2

বুযুর্গ হয়ত প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নি¤েœ বর্ণিত হাদীসের সারাংশ পেশ করেছেন। হযরত আবু মূসা আশ‘আরী রাযি. থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, নেককার সহচর ও বদকার সহচরের উদাহরণ হলো, সুগন্ধি বিক্রেতা ও কামারের হাপরের ন্যায়। হয়ত সুগন্ধি বিক্রেতা থেকে সুগন্ধি কিনে নেবে, নতুবা তুমি সুগন্ধির ঘ্রাণ অবশ্যই পাবে; এর অন্যথা হবে না। আর কামারের হাপর হয়ত তোমার শরীর জ্বালিয়ে দেবে বা কাপড় পুড়িয়ে ফেলবে, নতুবা তুমি তার দুর্গন্ধ অবশ্যই পাবে। (সহীহ বুখারী; হা.নং ২১০১)

এ জন্যই মহান রাব্বুল আলামীন আদেশ করেছেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা তাকওয়া হাসিল কর এবং নেক লোকদের সঙ্গ অবলম্বন কর। (‘সূরা তাওবা’- ১১৯)

অর্থাৎ নেক লোকদের সঙ্গ অবলম্বন দ্বারা তাকওয়া অর্জিত হবে। শুধু ইহজীবনেই নয় ইন্তিকালের সময়ও যেন তাঁদের সঙ্গ নসীব হয় সেজন্য আল্লাহ তা‘আলা দু‘আ শিখিয়েছেন, হে আল্লাহ আপনি আমাদের গুনাহগুলোকে মাফ করে দিন আমাদের ভুল-ত্রুটিগুলো মার্জনা করুন এবং নেককার লোকদের সাথে আমাদের মৃত্যু দান করুন। (‘সূরা আলে ইমরান’- ১৯৩)
আর এ দু‘আর কথাগুলোই আল্লাহর এক পেয়ারা বান্দার আশেকানা যবানে এভাবে গুঞ্জরিত হয়েছে,

মেরে যিন্দেগী কা হাসেল জিস্ত কা সাহারা
তেরে আশেকুঁ মেঁ জীনা তেরে আশেকুঁ মেঁ মরনা

আমাদের এ সবুজ বাংলার সবুজ বুকে আল্লাহর বহু আশেক ও পেয়ারা বান্দা যুগে যুগে ছিলেন এবং এখনো আছেন। এ সকল আহলে দিল আল্লাহওয়ালার সোহবত হাসিল করে আমাদের এই কালিমাযুক্ত মৃতপ্রায় অন্তরগুলোকেও আলোকিত ও আল্লাহর প্রেমে জীবন্ত করে তুলতে পারি। হতে পারি আল্লাহ তা‘আলার প্রিয়জন। (আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে তাওফীক দিন। আমীন।)
দুই. আলহামদুলিল্লাহ! মা’হাদুল বুহুসিল ইসলামিয়ায় মাঝে মাঝেই আল্লাহর ওলীগণ তাশরীফ রাখেন। তাঁদের আগমনে মা’হাদের অঙ্গে অঙ্গে নব চেতনার সঞ্চার হয়। তাঁদের উৎসাহ দু‘আ ও নসীহত আমাদেরকে পথ দেখায়, সাহস জোগায়। আল্লাহওয়ালাগণের আগমনের ধারাবাহিকতায় গত ১৪/০৯/২০১৪ খ্রিস্টাব্দে তাশরীফ এনেছিলেন বাংলার বিশিষ্ট বুযুর্গ হযরত মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী হুযূর দা.বা.। এর দুই দিন পূর্বে শুক্রবার মা’হাদের সহসভাপতি হাফেয মাওলানা রকীবুল্লাহ ভাইসহ গিয়ে হুযূরের খিদমতে দাওয়াত পেশ করেছিলাম। হুযূর দাওয়াত কবুল করেছিলেন। হুযূরের বড়ো পুত্র মাওলানা আশরাফুয্যামান ও মেজো পুত্র মাওলানা আবরারুয্যামান ভাইও পিতার সাথে মা’হাদে আসবেন বলে সাগ্রহে কথা দিয়েছিলেন। ফিরে এসে মহান রব্বুল আলামীনের কাছে দু‘আ করতে লাগলাম, ‘হুযূর যেন সহীহ সালামতে আমাদের মাঝে আসতে পারেন। তাঁর আগমন যেন সহজ হয়। হুযূরের মন যেন মা’হাদে এসে খুশি হয়। আমরা যেন হুযূরের নেক দু‘আ লাভ করতে পারি। আমাদের থেকে যেন হুযূরের কোনো বে-এহতেরামী প্রকাশ না পায়।’ রোববার ভোর রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে তালিবে ইলমগণ আল্লাহর কাছে দু‘আ করলেন। ফজরের নামাযের পূর্বেই সাফাইসহ সব প্রস্তুতি মোটামুটি শেষ হলো। ফজরের একটু পরেই হযরত পাহাড়পুরী হুযূরের দুই বিশিষ্ট শাগরেদ আমাদের উস্তাদ ও মুরব্বী জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়ার স্বনামধন্য মুহতামিম হযরত মাওলানা হিফজুর রহমান সাহেব (মুমিনপুরী হুযূর) দা.বা. ও জামি‘আ রাহমানিয়ার শাইখে সানী হযরত মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক মানিকগঞ্জী হুযূর দা.বা. আগমন করলেন। মুশফিক ও মুহসিন উস্তাদদ্বয়কে পেয়ে আমরা যারপরনাই খুশি হলাম। বস্তুত মা’হাদের মূল চালিকা শক্তি হলো আমাদের উস্তাদগণের নেক দু‘আ। তাঁদের দু‘আ ও পরামর্শে মা’হাদ জন্ম লাভ করেছে। তাঁদের দু‘আ ও পরামর্শেই মা’হাদ এগিয়ে চলেছে। সময়ে অসময়ে যখনই আবদার করি আসাতিযা হযরত মা’হাদে এসে আমাদেরকে ধন্য করে যান। এটা আমাদের পরম সৌভাগ্য। (হে আল্লাহ! এই সৌভাগ্যকে আমাদের জন্য সর্বদা বহাল রেখো)

paharpur

কিছু নসীহতের জন্য আবদার করলাম। প্রথমে হযরত মানিকগঞ্জী হুযূর নসীহত করলেন, এরপর হযরত মুমিনপুরী হুযূর। ইতোমধ্যে আরো অনেক উলামায়ে কেরাম তাশরীফ এনেছেন। হযরত পাহাড়পুরী হুযূরের খলীফা, আমার পরম মুহসিন উস্তাদ ও মুরুব্বী হযরত মাওলানা আহমাদুল্লাহ সাহেব হুযূর দা.বা.ও এসেছেন। আল্লাহওয়ালাগণের আগমনে মা’হাদের সফেদ আঙিনা আলো ঝলমল হয়ে উঠল। সকাল প্রায় সাড়ে সাতটা নাগাদ হযরত পাহাড়পুরী হুযূর আগমন করলেন। হুযূর বিভিন্ন রোগে খুবই মা’যূর হয়ে পড়েছেন। চোখে খুব সামান্য আবছা আবছা দেখতে পান। নীচতলা থেকে দুজনে ধরে ধীরে ধীরে হুযূরকে দোতলায় উঠালাম। মা’হাদে প্রবেশ করে হলরুমে বয়ানের জন্য নির্দিষ্ট চেয়ারে বসলেন। হযরত মুমিনপুরী হুযূর, মানিকগঞ্জী হুযূর, আহমাদুল্লাহ সাহেব হুযূর প্রমুখ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। অতি আপন এ সকল বরেণ্য শাগরেদদের সাক্ষাতে হুযূর খুব খুশি হলেন। এরপর বয়ান শুরু করেন। হুযূর বলেন,

ইলমের মারকায বড়ো মূল্যবান, বড়ো মর্যাদাবান। ইলম কেবল আল্লাহ তা‘আলাই দান করেন এবং মানুষকে দান করেন। আল্লাহ তা‘আলা যাকে এই ইলম দান করেন তার মর্যাদা কত উচ্চ, কত মহান, মানুষ তা কল্পনাও করতে পারবে না। এখানের চৌদ্দজন তালিবে ইলম চৌদ্দ হাজার তালিবে ইলমের মর্যাদা রাখেন। একেক জন তালিবে ইলম এক হাজার তালিবে ইলমের মর্যাদা রাখেন। আল্লাহ তা‘আলা এইসব তালিবে ইলমকে কবুল করুন এবং তাদেরকে তালিবে ইলমের প্রকৃত মর্যাদা দান করুন। সবেমাত্র ইফতা বিভাগ খোলা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা মকতব থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত চালু করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

আরো পড়ুন: শাইখুল হাদিস আল্লামা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী আর নেই

সাথে সাথে হুযূর ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে সমস্ত শর্ত ও আদবের প্রতি লক্ষ রেখে চলার ব্যাপারে ছাত্রদেরকে মনোযোগী হতে বললেন। বিশেষ করে কেউ যেন ইলম অর্জন করার পর অহমিকায় লিপ্ত না হয়। অযথা মানুষের সাথে তর্কে লিপ্ত না হয়। অতঃপর হুযূর সকলকে বিশেষ করে আহলে ইলমকে আমলের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার ব্যাপারে নসীহত করতে গিয়ে বলেন, তারা যেন সর্বদা খোদার যিকিরে লিপ্ত থাকে। অহেতুক কথাবার্তায় লিপ্ত না হয়। অযথা সময় ক্ষেপণ না করে।

এরপর হুযূর উযূর দু‘আর ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, উযূ ছাড়া নামায হয় না। আমাদের উচিত, আমরা যেন উযূতে কথাবার্তা না বলি। যদি কথা বলতে হয় তাহলে এমন কথা বলব যাতে আল্লাহ তা‘আলা খুশি হন।
এরপর হুযূর আফসোস করে বলেন, কথা বলার জন্য তো আরো অনেক সময় পাওয়া যাবে। উযূতে গিয়েও কি আমাদের কথা বলতে হবে?
শেষে হুযূর বলেন,
এখানে যারা আছেন, আল্লাহ তা‘আলা যেন তাদের একজনকে দেখার দ্বারা এক হাজার জনকে দেখার সওয়াব দান করেন। আমীন।
হুযূরের দরদভরা দিলের তড়প ও আহাজারি আমাদের দিলকেও তাপিত করছিল। হুযূরের প্রতিটি শব্দ শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছিল। বয়ান শেষে হুযূর মা’হাদের জন্য, মা’হাদের আসাতিযা, তালিবে ইলম, প্রতিষ্ঠাতা, জামিদাতা, শুভাকাক্সিক্ষসহ সবার জন্য দু‘আ করলেন। হুযূরের দু‘আর মাধ্যমে মজলিস শেষ হলো।

দু‘আ শেষে পাহাড়পুরী হুযূর অফিস রুমে এসে বসলেন। জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়ার দরসের সময় হয়ে গেছে বিধায় হযরত মুমিনপুরী হুযূর ও মানিকগঞ্জী হুযূর বিদায় নিলেন। বিদায়ের সময় এক মধুর দৃশ্য দেখার তাওফীক হলো। আমাদের মানিকগঞ্জী হুযূর যখন বিদায় চাইলেন পাহাড়পুরী হুযূর দা.বা. তাঁর এ প্রিয় শাগরেদের মাথা নিজের কোলের মধ্যে নিলেন, আর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলতে লাগলেন,
-আব্দুর রাজ্জাক যখন নূরীয়ায় পড়ত তখন সে আমার মাথার চুল কেটে দিতো। এখনো যখন আমার চুল কাটার প্রয়োজন হয় তখনই আব্দুর রাজ্জাকের কথা মনে হয়।

তিন. নাশতা পরিবেশিত হলো। আমাদের মা’হাদের সহসভাপতি মাওলানা রকীবুল্লাহ ভাই এবং তার ভায়রা মা’হাদের আবাসন সম্পাদক মাওলানা আশরাফুল ইসলাম সাহেব বাসা থেকে নাশতা রান্না করে এনেছেন। নাশতা শেষে প্রায় সাড়ে নয়টার সময় হুযূর বিদায় নিলেন। বিদায়ের পূর্বে মা’হাদের আসাতিযা, কমিটির সদস্যবৃন্দ ও তালিবুল ইলমগণ একে একে হুযূরের সাথে মুসাফাহা করে দু‘আ নিলেন। আমার ছেলে তিন বছর বয়সি আইমান মাহমূদ সকাল থেকেই পাজামা পাঞ্জাবি পরে মা’হাদে আসার জন্য অপেক্ষায় ছিল। আমি গিয়ে তাঁকে নিয়ে এলাম। হুযূর আইমান মাহমূদের জন্য মন ভরে দু‘আ করলেন। মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। গাড়িতে উঠার পর হযরত আহমাদুল্লাহ সাহেব হুযূর বিদায়ী মুসাফাহা করলেন। তখন পাহাড়পুরী হুযূর জিজ্ঞাসা করলেন,
-আপনি মা’হাদের সাথে যুক্ত আছেন না কি?
আমি পাশ থেকে বললাম,
-হ্যাঁ, হুযূর আমাদের মুরব্বী।
পাহাড়পুরী হুযূর বললেন,
-খুব ভালো।

এরপর তিনি আহমাদুল্লাহ সাহেব হুযূরের বুকে হাত বুলিয়ে দিলেন এবং বিদায় নিলেন। হযরত পাহাড়পুরী হুযূরের এই ঘণ্টা দুয়েক সময়ের সোহবত আমাদের দিলে এক অন্যরকম হালত পয়দা করল। সবার হৃদয় মিনারে এক অনাবিল প্রশান্তি ছুঁয়ে গেল।
হযরত পাহাড়পুরী হুযূর তাঁর প্রিয় খলিফা আহমাদুল্লাহ সাহেব হুযূরকে খুব মহব্বত করেন। যেদিন পাহাড়পুরী হুযূরকে দাওয়াত দিতে গিয়েছিলাম সেদিন নিজের পরিচয় দিয়েছিলাম এই বলে যে, আমি জামি‘আ রাহমানিয়ার মাওলানা আহমাদুল্লাহ সাহেবের ছাত্র। তখন পাহাড়পুরী হুযূর বলেছিলেন,
-উনার সাথে আমার খুব মহব্বতের সম্পর্ক আছে।

পাহাড়পুরী হুযূর মা’হাদে আগমনের কয়েকদিন পর তাঁর উস্তাদ মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ সাহেব (মুহাদ্দিস সাহেব) রহ.এর জীবনী ও স্মারকগ্রন্থ হায়াতে মুহাদ্দিস সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থের সংকলক হযরত আহমাদুল্লাহ সাহেবের সাথে আবারো পাহাড়পুরী হুযূরের কাছে গিয়েছিলাম। গ্রন্থটি হাতে পেয়ে খুশিতে হুযূর বাচ্চাদের ন্যায় কান্না শুরু করলেন। অনেকক্ষণ পর্যন্ত অস্বাভাবিক কান্না কাঁদলেন। তাঁর সাথে আমরাও কাঁদলাম। পাহাড়পুরী হুযূর আহমাদুল্লাহ সাহেব হুযূরকে অনেক দু‘আ দিলেন। দু’হাত তুলে কেঁদে কেঁদে আল্লাহ তা‘আলার দরবারে দু‘আ করলেন। বিদায় বেলায় আমি দু‘আর দরখাস্ত করলাম। হুযূর বললেন,
-দিল ফেড়ে তো দেখানো যায় না দিলে যে কত দু‘আ আছে …।

লেখক : মুদীর, মা’হাদুল বুহুসিল ইসলামিয়া
শিক্ষক, জামি‘আ ইসলামিয়া, চরওয়াশপুর, ঢাকা
খতীব, আজিমপুর সরকারি কলোনি (পার্টি হাউস) জামে মসজিদ,আজিমপুর, ঢাকা

লেখাটি চলতি বছরের এপ্রিল মাসে লেখা। সূত্র: মা’হাদুল বুহুসিল ইসলামিয়া

আরআর

শাইখুল হাদিস আল্লামা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী আর নেই

paharpur
ছবি; ইমরান হোসাইন

আওয়ার ইসলাম : পরলোকে পাড়ি জমিয়েছেন শাইখুল হাদিস আল্লামা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী রহ:। আজ দুপুর আনুমানিক তিনটায় খিদমাহ হাসপাতালে তিনি ইনতেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

২০১৫ সালের রমাযানের ১০ তারিখ থেকেই তিনি অসুস্থ। অনেকগুলো সমস্যা নিয়ে পুরোপুরি শয্যাশায়ী ছিলেন। ব্রেন স্ট্রোক করার পর থেকে আর কথা বলতে পারতেন না।

দুই সপ্তাহ আগে তাকে ঢাকার খিদমাহ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসারত অবস্থায় ইন্তেকাল করেন বলে পারিবারিক সূত্র আওয়ার ইসলামকে নিশ্চিত করেছে।

আল্লামা আবদুল হাই পাহাড়পুরী রহ: এর শিক্ষাজীবনের সূচনা পাহাড়পুর এমদাদুল উলূম মাদরাসায়। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী শেষে ১৯৬৭/৬৮ সালের দিকে লালবাগ মাদরাসায় এসে মিশকাত জামাতে ভর্তি হন। শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. কৃত বুখারির ব্যাখ্যা গ্রন্থের সম্পূর্ণ প্রুফ হজরত পাহাড়পুরী হুজুরই দেখেছেন। দাওরায়ে হাদিস শেষ করার পর জামিআ নূরিয়া আশরাফাবাদ কামরাঙ্গীর চড়ে শিক্ষকতার জীবন শুরু করেন। তারপর জামিআ মুহাম্মাদিয়ায় শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৯৫ সালে জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া মুহাম্মাদপুরে শিক্ষকতা আরম্ভ করেন। তারপর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি জামিয়া লালমাটিয়ার শায়খুল হাদিস ছিলেন।

আল্লামা আবদুল হাই পাহাড়পুরী রহ: এর জানার স্থান ও সময় এখনো নির্ধারণ হয়নি।

বিস্তারিত আসছে….

paharpur2
-আবদুল্লাহ মারুফ

পড়ুন : জীবন সায়াহ্নে ৫আলেম

আমাদের সব খবর পেতে: ourislam24.com