169047

শুভ্রতায় মোড়ানো মন মাতানো শরৎ

মাহমুদুল হাসান ♦

মিষ্টি সকাল। মাথার ওপরে নীলাকাশ। হালকা তাপের রোদ। দখিনা হাওয়ার তালে উত্তরে শিমুলের তুলোর মতো ভেসে চলেছে সাদা মেঘের ভেলা। নদীর ধারে ফুটে থাকে সাদা সাদা কাশফুল।

মৃদু বাতাসে দোল খায় কাশফুল। কাশফুলের মনোরম দৃশ্য থেকে সত্যিই চোখ ফেরানো যায় না। ভরা নদীর বুকে পাল তুলে মালবোঝাই নৌকা চলে যায়। ডিঙি নাও বাইতে বাইতে কোনো মাঝি হয়তোবা গেয়ে ওঠে ভাটিয়ালি গান।

পুকুরপাড়ে আমগাছের ডালে মাছরাঙা ধ্যান করে। স্বচ্ছ জলে পুঁটি, চান্দা বা খলসে মাছের রূপালি শরীর ভেসে উঠলে সে ছোঁ মেরে তুলে নেবে তার লম্বা ঠোঁটে। নদীর চরে চখাচখি, পানকৌড়ি, বালিহাঁস বা খঞ্জনা পাখির ডাক।

কলসি কাঁখে মেঠো পথে হেঁটে চলে গাঁয়ের বধূ। ফসলের খেতে অমিত সম্ভাবনা কৃষকের চোখে স্বপ্নে ছাওয়া সবুজ ধানখেতটা একবার চেয়ে দেখে কৃষক। বিলের জলে নক্ষত্রের মতো ফুটে থাকে সাদা ও লাল শাপলা। সকালের হালকা কুয়াশায় সেই শাপলা এক স্বপ্নিল দৃশ্যের আভাস আনে।

আলো চিকচিক বিলের জলে ফুটে ওঠে প্রকৃতির অপর লীলা। সাদা বক, পাখ-পাখালির দল মহা কলরবে ডানা মেলে আকাশের উজ্জ্বল নীলিমার প্রান্ত ছুঁয়ে মালার মতো উড়ে। বাঁশঝাড়ে বাচ্চা তুলেছে কালো ডাহুক। শরতের চাঁদনী রাত সৃষ্টি করে মোহনীয় ও মায়াবী পরিবেশ।

আঁধারের বুক চিরে উড়ে বেড়ায় জোনাকীরা। চারদিকে সজীব গাছপালার ওপর বয়ে যায় মৃদুমন্দ বায়ু। শিউলী, কামিনী, হাসনাহেনা, দোলনচাঁপা, বেলী, ছাতিম, বরই, শাপলা, জারুল, রঙ্গন, টগর, রাধাচূড়া, মধুমঞ্জুরি, শ্বেতকাঞ্চন, মল্লিকা, মাধবী, কামিনী, নয়নতারা, ধুতরা, কল্কে, স্থলপদ্ম, কচুরী, সন্ধ্যামণি, জিঙে, জয়ন্তীসহ নাম না জানা নানা জাতের ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করে বাতাস। এ দৃশ্য শুধু এক ঋতুতেই চোখে পড়ে। সে হল শরৎ।

ভাদ্র-আশ্বিন এ দুই মাস বাংলাদেশে শরৎকাল। শরতের সৌন্দর্য বাংলার প্রকৃতিকে করে রূপময়। শরৎ কোমল, স্নিগ্ধ এক ঋতু। শরতে রয়েছে স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের ছয়টি ঋতু ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন রূপের পসরা নিয়ে হাজির হয়।

এক-এক ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন ফুলে ও ফলে, ফসলে ও সৌন্দর্যে সেজে ওঠে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মতো পৃথিবীর আর কোন দেশের প্রকৃতিতে ঋতুবৈচিত্র্যর এমন রূপ বোধ হয় নেই।

স্রষ্টার সৃষ্টি কতই না সুন্দর৷ খুঁত নেই কোথাও৷ এরশাদ হয়েছে: ‘তোমরা দৃষ্টিকে প্রসারিত করে দেখ, কোথাও ত্রুটি দেখতে পাউ কি? আবার দেখো; আবারও। তোমার দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে আমার দিকে ফিরে আসবে (সুরা মুলক: ৩-৪)

শরতের আগমনে বাংলার প্রকৃতি থাকে নির্মল স্নিগ্ধ। সুনীল আকাশ। সবুজ ফঁসলি মাঠ৷ যেন সবুজের উপাদানে তৈরি চারপাশ৷ পাখির কলতান।

নিরবধি বয়ে চলা নদী৷ সবই বান্দার প্রতি আল্লাহর অপার দান। নেয়ামত। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তারা কি নভোমণ্ডলের প্রতি দেখে না, কিভাবে তিনি তা বানিয়েছেন, সুশোভিত করেছেন? আর নেই তাতে কোন স্তম্ভ!’ ( সুরা কাহাফ : ৬)

শরতের আকাশের মতো আকাশ আর কোন ঋতুতে দেখা যায় না। সব মিলিয়ে শরৎ যেন শুভ্রতার ঋতু। শরৎ কালের রাতে জ্যোৎস্নার রূপ অপরূপ। মেঘ মুক্ত আকাশে যেন জ্যোৎস্নার ফুল ঝরে।

চাঁদের আলোর শুভ্রতায় যেন আকাশ থেকে কল্পকথার পরীরা ডানা মেলে নেমে আসে পৃথিবীতে। বলা যায় শরৎ বাংলার ঋতু পরিক্রমায় সবচেয়ে মোহনীয় ঋতু। শরতের আকাশের ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘের সাথে শৈশবের স্বপ্নেরা ঘুরে বেড়ায়, উড়ে বেড়ায় লাটাই বাঁধা ছোট কাগজের তৈরি ঘুড়িরা।

অপরূপ বিভা ও সৌন্দর্যের কারণে শরৎ কে বলা হয় ঋতু রাণী। মানুষ মাত্রই শরৎ কালে প্রকৃতির রূপ-লাবণ্য দেখে মোহিত না হয়ে পারে না।

তাইতো প্রকৃতির এমন রূপের বাহারে কবি-সাহিত্যিকের মনোজগত ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ মেতে ওঠে। প্রকৃতির অমেয় ধারা সাধারনে সঞ্চারিত করতে সৃষ্টি করেন নতুন নতুন সাহিত্য কর্ম।

কবি বলেছেন: ‘শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি/ছড়িয়ে গেল ছাড়িয়ে মোহন অঙ্গুলি/শরৎ, তোমার শিশির-ধোয়া কুন্তলে/বনের পথে লুটিয়ে পড়া অঞ্চলে/আজ প্রভাতের হৃদয় ওঠে চঞ্চলি।’

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার অসংখ্য গান ও কবিতায় শরতে বাংলার প্রকৃতির নিখুঁত আল্পনা এঁকেছেন।

তার ‘শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ রাতের বুকে ঐ’, ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক’-সহ অনেক গানই শরৎ-প্রকৃতির লাবণ্যময় রূপ নিয়ে হাজির রয়েছে।

শরতের অসম্ভব চিত্ররূপময়তা ফুটে উঠেছে এ সব রচনায়: এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি বিছানো পথে/এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ-কিরণ রথে।/দলি শাপলা শালুক শত দল এসো রাঙায়ে তোমার পদতল/নীল লাল ঝরায়ে ঢলঢল এসো অরণ্য পর্বতে” শরত প্রকৃতিকে অপরূপ রূপে সাজিয়ে যায় যার আবেশে অতি সাধারন মানুষও ভাবাবেগে আপ্লুত হয়। ঋতুর রাণী শরত মানব মনে নতুন প্রেরণার সঞ্চার করে।

শরতের পড়ন্ত বিকেলে নদীর কোলে রবির কিরণ সৌন্দর্যের পিপাসু মানুষের মনে রেখে যায় স্থায়ী প্রতিচ্ছবি।

প্রতি দুই মাস পরপর বদলে যাওয়া একেকটি ঋতুর পরিবর্তনে বদলে যায় প্রকৃতিও, বদলে যায় সৌন্দর্য। ঠিক ঋতু আর প্রকৃতির মতই বদলে যাবে এদেশের মানুষ গুলো। গড়ে উঠবে একটি সুন্দর বাংলাদেশ। এমনটাই প্রত্যাশা সব মানুষের।

লেখক: তরুণ সাংবাদিক

-এটি

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.