169080

বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকিং ও কর্জে হাসানা

এ কিউ এম ছফিউল্লাহ আরিফ, অতিথি লেখক


বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকগুলো এবং কনভেনশনাল ব্যাংকের ইসলামি ব্যাংকিং শাখা ও উইন্ডোগুলোতে কর্জে হাসানা প্রথার কনসেপ্টই প্রচলিত ছিল না। ৯ নভেম্বর, ২০০৯ ঈসায়ী তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রকাশিত ইসলামি ব্যাংকিং গাইড লাইনে বিনিয়োগ পদ্ধতি হিসেবে এ বিষয়টি সন্নিবেশিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকগুলো এবং ইসলামি ব্যাংকিং শাখা ও উইন্ডোগুলোতে কর্জে হাসানা নামে এক ধরনের সুদবিহীন ঋণের প্রচলন আছে।

ব্যাংকে কোনো ব্যক্তির মেয়াদি জমা থাকলে গ্রাহকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই মেয়াদি জমার সর্বোচ্চ শতকরা আশিভাগ এরূপ ঋণ প্রদান করা হয়। মেয়াদি জমার বিপরীতে যে পরিমাণ টাকা ঋণ হিসেবে প্রদান করা হয় ওই পরিমাণ মেয়াদি জমার উপর ঋণ থাকাকালীন কোনো প্রফিট দেয়া হয় না। এ বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইড লাইনে বর্ণিত হয়েছে। তবে কোনো কোনো ব্যাংক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সীমিত আকারে কর্জে হাসানা প্রদান করে থাকে, যা ব্যাংকের বৈধ আয় নয়।

এমন ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকগুলো বিভিন্নভাবে সার্ভিস চার্জ গ্রহণ করে থাকে। ব্যাংকগুলোতে কর্জে হাসানা ফান্ডে নিম্নোক্ত পন্থায় অর্থের জোগান হতে পারে-

এক. ব্যাংকের পরিচালকদের দান কিংবা ঋণ : ব্যাংকের পরিচালকরা আল্লাহর ওয়াস্তে পরকালীন সওয়াবপ্রাপ্তির আশায় কর্জে হাসানা ফান্ডে সামর্থ্য অনুযায়ী দান করতে পারেন কিংবা বিনালাভে এ ফান্ডে অর্থ কর্জ দেবেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দুবাই ইসলামি ব্যাংকের কর্জে হাসানা তহবিল গঠিত হয়েছে ওই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান আলহাজ লুতার ব্যক্তিগত অর্থ থেকে।

দুই. শেয়ারহোল্ডারদের দান বা ঋণ : ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররাও কর্জে হাসানা ফান্ডে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দান করতে পারেন, কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ ঋণ দিতে পারেন। এর বিনিময়ে তারা কোনো পার্থিব লাভ পাবেন না। তবে যে মেয়াদ উল্লেখ করে তারা যে পরিমাণ অর্থ ঋণ প্রদান করবেন ওই মেয়াদ শেষে প্রদত্ত মূল অর্থ ফেরত পাবেন।

তিন. সবস্তরের জনসাধারণের দান : যেকোনো শ্রেণী ও পেশার লোক কর্জে হাসানা ফান্ডে অর্থদান বা মেয়াদ উল্লেখপূর্বক নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বিনালাভে ঋণ প্রদান করতে পারেন। এ ফান্ডে অর্থ জমা দিতে হলে তা বিরাট অঙ্কের হতে হবে বা প্রচুর সম্পদশালী ব্যক্তির পক্ষ থেকে হতে হবে এমনটি নয়, বরং যিনি যতটুকু সামর্থ্য রাখেন তিনি সেই পরিমাণ অর্থই এ ফান্ডে দান করতে পারেন বা ঋণ দিতে পারেন, অর্থের পরিমাণ যা-ই হোক না কেন।

চার. সান্ড্রি অ্যাকাউন্টের অর্থ : এমন অনেক আমানতকারী আছেন যারা টাকা ব্যাংকে জমা দেয়ার পর আর কোনো যোগাযোগ করছেন না। হয়তো কোনো দিনও করবেন না। এ ধরনের বিপুল পরিমাণ দাবিদারবিহীন অর্থ ব্যাংকের সান্ড্রি অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে থাকে। এছাড়া ব্যাংকে আরও বিভিন্ন ধরনের মুনাফা প্রদান করতে হয় না এমন অনেক জমা থাকে। এসব টাকা থেকে একটি নির্ধারিত অংশ কর্জে হাসানা ফান্ডের জন্য বরাদ্দ রাখা যেতে পারে।

পাচ. সমাজসেবার জন্য বরাদ্দ সরকারি অর্থ : সরকারের সমাজসেবা, পল্লী উন্নয়ন, দারিদ্র্যবিমোচন, কৃষি উন্নয়ন ইত্যাদি ধরনের প্রকল্প ও খাতে বিনাসুদে বা স্বল্পসুদে ঋণ (মাইক্রো ক্রেডিট) সুবিধার ব্যবস্থা আছে। এসব টাকা থেকে একটি নির্ধারিত অংশ কর্জে হাসানা ফান্ডে বরাদ্দের জন্য আবেদন করা যায়।

ছয়. সন্দেহজনক আয় : বিভিন্ন অনিবার্য কারণে ইসলামি ব্যাংকগুলোতে এমন কিছু মুনাফা অর্জিত হয় যেগুলোকে সরাসরি হালাল আয় হিসেবে গণ্য না করে সন্দেহজনক আয় হিসেবে গণ্য করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী তা ব্যয় করা হয়; এরূপ মুনাফা কোনোক্রমেই ব্যাংকের আয় হিসেবে গণ্য করে শেয়ারহোল্ডার ও ডিপোজিটরদের মধ্যে বণ্টন করা হয় না। এরূপ অর্থের একটি অংশও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ডের অনুমোদন সাপেক্ষে কর্জে হাসানা ফান্ডে প্রদান করা যেতে পারে।

লেখক : সেক্রেটারি জেনারেল, সেন্ট্রাল শরীয়াহ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস অব বাংলাদেশ

আরএম/

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.