168640

‘আমি হিন্দু তবে মোদীর মতো নই’

পাকিস্তানের জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক জং এর সম্পাদকীয়তে আজ প্রকাশিত হয়েছে প্রখ্যাত সাংবাদিক হামিদ মীর এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কলাম। কলামটির শিরোনাম “আমি হিন্দু তবে মোদীর মতো নই”। কলামটি অনুবাদ করেছেন আবু শাহামা হাবীবুল্লাহ মিসবাহ।


ব্রিটেনের ব্রেডফোর্ড শহরের সিটি কাউন্সিল হলে আয়োজিত কাশ্মির সেমিনারে বক্তব্য শেষে বের হলাম। হলের বাইরে এক পুরনো বন্ধুকে সামনে দেখে বিস্ময়াবিভূত হলাম। বন্ধুটি বাংলাদেশী এবং বর্তমানে ক্যামব্রিজ বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক।

যখনই সাক্ষাত হয় ভাঙ্গা ভাঙ্গা উর্দূতে এ মর্মে নিশ্চয়তা নেন, “তুমি তোমার লেখায় আমার নাম নিবে না এবং আমি যে তোমার সাথে সাক্ষাত করেছি এটা মতি ভাইকে বলবে না।” আমি সবসময় তাকে জিজ্ঞেস করি, মতি ভাইকে তুমি এত ভয় পাও কেন?

আমাকে সে উত্তর দেয়, মতি ভাই সাহসী মানুষ, হাসিনা ওয়াজেদের সামনে সে দাঁড়াতে পারবে, আমরা পারবো না। আমি বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে চলে এসেছি জানতে পারলে তার খারাপ লাগবে।

আমি তাকে সবসময় ‘প্রফেসর’ বলে সম্বোধন করি, আর সে আমাকে ‘রক্তখেকো’ ডেকে আনন্দ পায়। আমার সাথে সাক্ষাত করতে ক্যামব্রিজ থেকে সে ব্রোডফোর্ড এসেছিল এবং দুপুরে খাবারের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।

তাকে বলেছিলাম, আমি সোজা অক্সফোর্ড যাচ্ছি, সেখান থেকে আগামিকাল লন্ডন যাবো, তুমি লন্ডনে চলে এসো। ‘প্রফেসর’ নিরাশ হয়ে কিছুক্ষণ ভেবে বলল, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তো এখন ছুটি, তুমি সেখানে কার কাছে যাচ্ছো?

বললাম, অক্সফোর্ডের শিক্ষক ড. আদিল মালিক আমার বন্ধু, তার সাথে সাক্ষাত করতে হবে, তুমিও সাথে চলো। সে বলল, আমারও অক্সফোর্ডে একটি কাজ আছে। তুমি কি কাল সকালে মাত্র আধা ঘণ্টা সময় দিতে পারবে? আমি মাথা নেড়ে হাঁ সূচক উত্তর দিলাম।

‘প্রফেসর’ তখন আমাকে অক্সফোর্ডের ব্রোডাস্ট্রিটে অবস্থিত ব্লাকহোয়েল বুক শপের নিকটবর্তী তার এক বন্ধুর কফি হাউজের ঠিকানা দিলেন। সেদিন সন্ধ্যায় ড. আদিল মালিকের হাতে রান্না মজাদার চিকেন ফ্রাই খেয়ে আমি ‘প্রফেসর’কে ফোন করে বললাম, সকালের পরিবর্তে আজ রাতেই চলে আসুন। সে বলল, অক্সফোর্ড থেকে দুই ঘণ্টার দূরত্বে আছি, কাল সকালে দেখা করবো।

পরের দিন সকালেই প্রফেসরের মুখোমুখি হলাম। সে জিজ্ঞেস করল, অনেকদিন যাবৎ তুমি মতি ভাইয়ের পত্রিকায় লিখ না।

আমি বললাম, মতি ভাইয়ের প্রতি [বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ] হাসিনা ওয়াজেদ নারাজ, এজন্য তার পত্রিকায় লিখি না, যাতে মতি ভাইকে সমস্যায় পড়তে না হয়।

প্রফেসর এক শীতল নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, আমাদের রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় গেলে বদলে যায়, যেমন বদলে গেছে ইমরান খান। আমি মুচকি হেসে তার সমালোচনাকে উপেক্ষা করলাম। কফি পানের পর ‘প্রফেসর’ আমাকে ব্রোডাস্ট্রিটে নিয়ে গেল এবং সামনের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, এটা হলো এখানকার শহীদমিনার।

১৫৫৫ খৃষ্টাব্দে ব্রিটেনের রানী মেরি টিউডার পার্লামেন্টের মাধ্যমে কয়েকজন পাদ্রীকে মৃত্যুদ- দিয়েছিলেন। তাদেরকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। কারণ পাদ্রীরা ছিল প্রোটেষ্ট্যান্ট খৃষ্টান, যাদের সাথে রানীর ধর্মীয় মতভিন্নতা ছিল।

পাদ্রীদের স্মরণে এখানে একটি মিনার তৈরী করা হয়, আমরা এটাকে ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ বলি। প্রফেসর বললেন, ঢাকার শহীদমিনার তো তুমি দেখেছো, সেটা বাংলাভাষার জন্য প্রাণোৎসর্গকারীদের স্মৃতিস্তম্ভ আর এটি অক্সফোর্ডের শহীদমিনার; ধর্মবিশ্বাসের কারণে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা ব্যক্তিদের স্মৃতিস্তম্ভ।

ঘটনাটি বলে প্রফেসর আমাকে আবার কফি হাউজে নিয়ে এসে বললেন, পাকিস্তানের ছয়জন প্রধানমন্ত্রী এই অক্সফোর্ড বিশ^বিদ্যালয়ে গ্রাজুয়েট; লিয়াকত আলী খান, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, ফিরোজ খান নুন, জুলফিকার আলী ভুট্টো, বেনজির ভুট্টো এবং ইমরান খান।

ভারতের দুইজন প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রাগান্ধী এবং মনমোহন সিংও ছিলেন এই বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র। ভারত ও পাকিস্তানের জন্য ব্রিটেনের রানী মেরি টিউডারের পথে হাঁটা এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বী সংখ্যালঘুদের হত্যা করা উচিত হবে না। আমি তাকে পরিস্কার ভাষায় বললাম, পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের ওপর অনেক সময় ব্যক্তিগত আক্রমন হলেও রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে নয়।

প্রফেসর আবারও কফির অর্ডার দিয়ে বলতে লাগলেন, আজ তোমাকে আমার গবেষণা সম্পর্কে জানাতে চাই। রানী মেরি টিউডারকে ‘রক্তখেকো মেরি’ বলা হতো। আর আমি আমার গবেষণার ফলশ্রুতিতে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী হলো এ সময়ের ‘রক্তখেকো মোদী’।

প্রফেসর জানালেন, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের ওপর চালিত দমন পীড়নের প্রেক্ষাপট নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ‘হিন্দু মহাসভা’ এবং আরএসএস এর চিন্তা-দর্শন সম্পর্কে আমার জানার সুযোগ হয়।

তিনি এই ভেবে মারাত্মক উদ্বিগ্ন যে, ভারতের ক্ষমতাসীন সরকার মূলত ‘হিন্দু মহাসভা’ ও আরএসএস এর ন্যায় অখ- ভারতে বিশ্বাসী এবং তারা কেবল জম্মু ও কাশ্মিরকে নিজেরদের ভূমি মনে করে না বরং ভবিষ্যতে তারা পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রিলংকা, মায়ানমার এবং আফগানিস্তানের ওপরও কব্জা করতে চায়। যার পরিণতিতে তৃতীয় বিশ^যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে।

প্রফেসর তার আইপ্যাড খুলে আমাকে বলছিলেন, ‘রক্তখেকো মোদী’ অত্যন্ত কৌশলে মুসলিমদেরকে পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। একদিকে সৌদিআরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন থেকে পুরস্কৃত হচ্ছে ওদিকে ভারতে মুসলিমদের ওপর জাতিগত নিধন চালাচ্ছে।

প্রফেসর বলল, কাশ্মির ছাড়াও আসামের মুসলিমদের দুঃখের কথা আপনাদের ভাবা উচিত। বিজেপির বক্তব্য হলো, শিখ, জৈন এবং বৌদ্ধধর্মমতের অনুসারীরা মূলত ছিল হিন্দু।

সুতরাং তারা পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরে আসুক। আর ইসলাম এবং খৃষ্টবাদ দুটি বিদেশী ধর্ম। বিজেপি যে কেবল পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে হিন্দুরাজ্য বানাতে চায় তা কিন্তু নয় বরং এ অঞ্চলের মুসলিমসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদেরকেও জোর করে হিন্দু বানাতে চায়।

প্রফেসর বললেন, ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ঘটে আরবদের মাধ্যমে। কাশ্মিরে ইসলাম আসে মধ্যএশিয়া ও ইরানের পথ ধরে। এজন্য মোদী আজ আরবদের নয়নমণি। ভারত মধ্যএশিয়ার দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক রাখার পাশাপাশি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মুসলিমদেরকে ঘৃণা করে।

বাংলাদেশের সুফীসাধক হযরত শাহজালাল (রহিমাহুল্লাহ) তুরস্কের কোনিয়াতে জন্মগ্রহণ করেন এবং মক্কাতে বড় হয়েছিলেন। পাকিস্তানের সুফিসাধক দাতাগঞ্জ বখ্শ [রহিমাহুল্লাহ] এবং ভারতের সুফিসাধক খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী (রহিমাহুল্লাহ) আফগানিস্তান থেকে আগমন করেছিলেন। ‘রক্তখেকো মোদী’ আফগানিস্তানের সাথে বন্ধুত্বে দাবি করলেও ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মুসলিমদেরকে সে চায় নিধন করতে।

আমি প্রফেসরকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি গবেষণাপত্রটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করবেন? তিনি দৃষ্টি অবনত করে বললেন, প্রথমে নিজের পরিবারকে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে এসে তারপর গ্রন্থ প্রকাশ করবো, নইলে ‘রক্তখেকো মোদী’ আমার পরিবারকে ওখানেই শেষ করে ফেলবে।

তার ঠোঁট দুটো কাঁপছিল। কাঁপা হাতে কফির পেয়ালা ধরে ভয়ার্ত ভঙ্গিতে বলছিলেন, আমি ভারতের মুসলিমদের সামনে এক ভয়ঙ্কর ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে পাচ্ছি। বহু শতাব্দী আগে আরববণিকদের মাধ্যমে তারা মুসলমান হয়েছিল এটিই তাদের অপরাধ। আজ সেই আরবরাই বাণিজ্যিক স্বার্থে মুসলিমদেরকে উপেক্ষা করে ‘রক্তখেকো মোদী’কে চোখের মণিকোঠায় বসিয়েছে।

প্রফেসর যাওয়ার জন্য অনুমতি চেয়ে আমার হাত ধরে বললেন, শুধু পাকিস্তান নয় বরং বাংলাদেশ থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত পুরো দক্ষিণ এশিয়া আজ হুমকির মুখে। তবে আমার নাম প্রকাশ করবে না, কারণ আমার পরিবার এখনো বাংলাদেশে আছে, ‘রক্তখেকো মোদী’ আমার পরিবারকে ছাড়বে না। কেননা যদিও আমি হিন্দু তবে সব হিন্দু মোদীর মতো নয়।

লেখক: হামিদ মীর, পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট, প্রেসিডেন্ট জি নিউজ নেটওয়ার্ক (জিএনএন) পাকিস্তানের দৈনিক জং ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ইং সংখ্যা থেকে আবু শাহামা হাবীবুল্লাহ মিসবাহ ভাষান্তর।

-এটি

ad

পাঠকের মতামত

Comments are closed.