২০১৮-১২-০৫

সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮

‘ধর্মীয় বিষয়ে আলেমদের অনুসরণের বিকল্প নেই’

OURISLAM24.COM
news-image

ধর্মীয় অংঙ্গনে এখন সবচেয়ে বড় সংকট দাওয়াত ও তাবলিগের বিরোধ ও মতপার্থক্য। মাওলানা সাদ সাহেবের বিতর্কিত বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড এবং তাবলিগ জামাতকে বিপথগামী করার তৎপরতায় উলামাদের মাঝে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।

এ সংকট নিরসনে বাংলাদেশের আলেমদের মধ্যে যারা কাজ করছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন, জামিয়া রাহমানিয়ার প্রিন্সিপাল, বেফাকের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুহ হক।

বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধি হয়ে তিনি নিযামুদ্দীন ও দারুল উলুম দেওবন্দও সফর করেছেন। চলমান এই সমস্যার নানাদিক নিয়ে তার সাথে কথা মুহাম্মদ এহসানুল হক

তাবলিগ জামাতের মধ্যে বর্তমান সময়ে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে এর সূচনা কোত্থেকে বা কিভাবে শুরু হলো?

মাওলানা মাহফুজুল হক : তাবলিগ জামাতের মাঝে বর্তমানে যে সমস্যা পরিলক্ষিত হচ্ছে, এর সূত্রপাত মূলত তাবলিগের তৃতীয় হজরতজী মাওলানা এনামুল হাসান সাহেব রহ. এর ইন্তেকালের পর থেকে।

মাওলানা এনামুল হাসান রহ. ইন্তেকালের দুই বছর পূর্বে ১৯৯৩ সনে তাবলিগের কাজ সুষ্ঠু সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য দশ সদস্য বিশিষ্ট একটা শূরা গঠন করেছিলেন। এর মধ্যে নিযামুদ্দীনের ছিলেন পাঁচজন, পাকিস্তানের চারজন আর বাংলাদেশ থেকে একজন।

নিযামুদ্দীনের যে পাঁচজন ছিলেন, তাদের মধ্যে বয়স ও অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে কনিষ্ঠ ছিলেন মাওলানা সাদ সাহেব। শুরার দশজনের একজন হিসেবে এবং নিযামুদ্দীনের পাঁচজনের একজন হিসেবে তাবলিগের বেশ কিছু দায় দায়িত্ব পালনের সুযোগ আসে মাওলানা সাদ সাহেবের।

তিনি তখন তাবলিগের কাজে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন আনেন। তার বক্তব্যের মাঝেও নানা ধরনের অসঙ্গতি দেখা দেয়। এতে করে সমস্যা সৃষ্টি হতে থাকে। এক পর্যায়ে তিনি নিজেকে সারা বিশ্বের আমির হিসেবে ঘোষণা করেন। তখনই সমস্যা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।

শুরা সদস্যদের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্ব কনিষ্ঠ। তাহলে তিনি আমির হয়ে গেলেন-এই সুযোগটা এলো কিভাবে?

মাওলানা মাহফুজুল হক : নিযামুদ্দীনে যে পাঁচজন ছিলেন তাদের মধ্যে তিনজন খুব অল্প সময়ের মধ্যে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। মাওলানা ইযহারুল হাসান রহ. ৯৬ সনে, উমর পালনপুরি রহ. ৯৭ সনে, এরপর ৯৮ সনেও আরেকজন শুরা সদস্য ইন্তেকাল করেন।

বাকি থাকেন মাত্র দুইজন; মাওলানা যুবাইরুল হাসান রহ. ও মাওলানা সাদ সাহেব। ২০১৪ সালে মাওলানা যুবাইরুল হাসান রহ. ও ইন্তেকাল করেন। অপর দিকে নিযামুদ্দীনের বাইরে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে বাংলাদেশের আব্দুল মুকিত সাহেব রহ. ইন্তেকাল করেন।

পাকিস্তানের হাজি আব্দুল ওহাব সাহেব ছাড়া বাকি তিনজনও ইন্তেকাল করেন। অবশেষে দশজনের দুইজন মাত্র অবশিষ্ট থাকেন; মাওলানা সাদ সাহেব আর হাজি আব্দুল ওহাব সাহেব।

আরেকটা ব্যাপার হলো, নিযামুদ্দীনে ২০১৪ সন পযর্ন্ত শুরা সদস্যদের মধ্যে মাত্র দুইজন ছিলেন যুবায়ের সাহেব ও সাদ সাহেব। যুবায়ের সাহেব ছিলেন খুব নরম তবিয়তের মানুষ।

স্বাভাবিকভাবে অনেক বেশি তৎপর ছিলেন সাদ সাহেব। আর সাদ সাহেব মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর নাতির ছেলে। এজন্য তার বাড়তি একটা গুরুত্বও ছিল। সব মিলিয়ে তিনি নিযামুদ্দীনে একক আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হন।

এর মধ্য দিয়েই সমস্যা ধীরে ধীরে শুরু হয়, যুবাইরুল হাসান রহ. এর ইন্তেকালের পর সমস্যাটা প্রকট আকার ধারণ করে।

এই যে শুরার একজন করে বিয়োগ হলেন, সেখানে শূন্যস্থান পূরণ করা হলো না কেন?

মাওলানা মাহফুজুল হক : এক্ষেত্রে মূল ভূমিকা সাদ সাহেবেরই। তিনি তাবলিগের মূল মারকায নিযামুদ্দীন চালাচ্ছেন। তিনি ইলিয়াস রহ. এর খান্দানের সন্তান। নিযামুদ্দীনের বাকি চারজন মুরুব্বির তিনজনই নেই। যিনি ছিলেন তিনিও একেবারেই নরম তবিয়তের মানুষ।

সুতরাং সাদ সাহেবকে বাদ দিয়ে অন্য কারো পক্ষে শুরার শূন্যস্থান পূরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা কঠিন ছিল। আর তিনি বিভিন্নভাবে শূন্যস্থান পূরণের বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।

সাদ সাহেবের উপর আপত্তির বিষয়গুলো কি? সংক্ষেপে একটু বলা যায়?

মাওলানা মাহফুজুল হক : এক. তিনি কুরআন হাদিসের মনগড়া ব্যাখ্যা করছেন। অথচ তাবলিগের পূর্বেকার সকল বুযুর্গানে দ্বীন এবং সমকালীন মুরুব্বিরা সবাই এ ধরনের কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন।

কুরআন হাদিসের ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে জমহুর ওলামায়ে কেরামের নিকট গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা করাটাই তাদের নীতি ছিল সব সময়। কিন্তু এর সম্পূর্ণ বিপরীত তিনি কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আরম্ভ করলেন।

দুই. তাবলিগ যেমন দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগ, তেমনি দ্বীনের আরও যে বিভাগগুলো আছে-দ্বীনি শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি ইত্যাদি। এগুলোকে কটাক্ষ না করা, অন্য বিভাগগুলোকে হেয় প্রতিপন্ন না করা, অন্য বিভাগগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে হেয় প্রতিপন্ন করা থেকে সর্বাত্মক এবং যথাসাধ্য বিরত থাকাটা তাবলিগের মূলনীতি ছিল।

বিশেষ করে দাওয়াত ও তাবলিগের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে পরোক্ষভাবেও যেন অন্য কোন বিভাগকে হেয় না করা হয় এদিকেও পূবের্র মুরুব্বিগণ সর্তক দৃষ্টি রাখতেন। কিন্তু এই নিয়মের বিপরীত সাদ সাহেব দ্বীনের অন্যান্য বিভাগগুলোকে হেয় করে, কটাক্ষ করে বয়ান করা শুরু করলেন। যা তাবলিগের উসুলের সম্পূর্ণ খেলাফ।

দাওয়াত ও তাবলিগের ছয় উসূলের ব্যাপারে একেবারে শুরু থেকেই মুরুব্বিগণ স্পষ্ট করে বলেছেন যে এই ছয় উসূলই পূর্ণাঙ্গ দ্বীন নয়, বরং এগুলো মেনে চলাটা পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের উপর চলার জন্যে একটা যোগ্যতা মানুষের মধ্যে তৈরি করে।

কিন্তু তিনি এর বিপরীত দিকে গিয়ে বয়ান করা শুরু করলেন যে, এই ছয় উসূলই হলো পূর্ণাঙ্গ দ্বীন। তার আলোচনায় এ ধরনের বিভিন্ন সমস্যা প্রকাশ পেতে লাগলো।

তিন. দাওয়াত ও তাবলিগের কাজের ক্ষেত্রে আগের তিন মুরুব্বি-মাওলানা ইলিয়াস হাসান রহ. মাওলানা ইউসুফ হাসান রহ. আর মাওলানা এনামুল হাসান রহ. সহ সকল মুরুব্বির নিয়ম ছিল তাবলিগের কাজের মধ্যে কোন ধরনের পরিবর্তন করতে হলে সকল মুরুব্বিদের ঐক্যমতের ভিত্তিতে সেটা করতেন।

কিন্তু মাওলানা সাদ সাহেব সমকালীন সকল মুরুব্বিদের মতামতকে উপেক্ষা করে তাবলিগের কাজের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রতিষ্ঠা করতে লাগলেন।

এর কি একটা উদাহারণ দেয়া যায়?

মাওলানা মাহফুজুল হক : অনেক উদাহরণই আছে। যেমন আগে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজের একটা নিয়ম ছিল, যাকে যেখানে দ্বীনের কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায়, সেখানেই তাকে দ্বীনের কথা বলা ও দ্বীনের দাওয়াত দেয়া। এটাকে সঙ্কুচিত করে তিনি উসূল বানিয়েছেন, দ্বীনের কথা বলতে হবে শুধু মসজিদেই, বাইরে কোথাও কথা বলা যাবে না।

এই যে আমূল একটা পরিবর্তন, এর কারণে কাজটা ব্যাপকভাবে সঙ্কুচিত হয়ে গেল। একটা মানুষের দৈনিক আড়াই ঘন্টা তাবলিগের কাজে সময় লাগানোর কথা, আগে নিয়ম ছিল যার যেখানে সুযোগ হয় সে সেখানে দাওয়াত দিয়ে কথাবার্তা বলে সে দ্বীনের কাজে সময় ব্যায় করবে।

কিন্তু তিনি এককভাবে অন্য মুরুব্বিদের অমত সত্বেও নিয়ম করলেন, দ্বীনের কথা বলা মসজিদে হতে হবে। বাইরে শুধু দাওয়াত দিবে মানুষকে মসজিদে আনার জন্য। প্রচার করলেন যে দ্বীনের কথা মসজিদেই বলা সুন্নত, মসজিদের বাইরে দ্বীনের কথা বলা সুন্নতের খেলাফ।

তালিমের জন্য কিতাব ছিল ফাযায়েলে আমাল। তিনি সবার মতামত উপেক্ষা করে এককভাবে তালিমের জন্য মুনতাখাব হাদিস যোগ করেছেন ফাযায়েলে আমালকে সঙ্কুচিত করে।

একদিকে তিনি কুরআন হাদিসের মনগড়া ব্যাখ্যা করছেন, পাশাপাশি দাওয়াতের কাজের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে দ্বীনের অন্য বিভাগগুলোকে হেয় প্রতিপন্ন করছেন, আরেক দিকে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে যে উসূল বিগত তিন বুযুর্গের আমলে চলে আসছিল

সেগুলোর মধ্যে মুরুব্বিদের পরামর্শ উপেক্ষা করে এককভাবে নিজের পক্ষ থেকে পরিবর্তন আনছেন, স্বাভাবিকভাবেই তাবলিগের প্রবীণ মুরুব্বিগণ তার এ সকল কর্মকান্ড মেনে নিতে পারেননি।

বিশেষত ২০১৪ সালে যুবাইরুল হাসান সাহেবের ইন্তেকালের পর তখন নিযামুদ্দীনে শুরা সদস্যদের মধ্যে একা মাওলানা সাদ সাহেব থাকেন, তখন সমস্যাগুলো মারাত্মক আকার ধারণ করে।

এবং তখন তিনি নিজের একক এমারত প্রতিষ্ঠার জন্য অপপ্রয়াস চালানো শুরু করেন। এমনকি ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট নিযামুদ্দীনের এক মাশওয়ারায় ‘ম্যাঁয় আমীর হুঁ’ বলে তিনি নিজেকে আমীর ঘোষণা করেন। সাথে এ কথাও যোগ করেন, যে আমাকে না মানে সে জাহান্নামে যাক।

নিযামুদ্দীনে তখন প্রতিনিয়ত নানা ধরনের গন্ডগোল হতে থাকলো। এমনকি ২০১৬ সালে ১৪৩৮ হিজরির রমজান মাসে বড় ধরনের মারপিটের মত ন্যাক্কারজনক ঘটনাও নিযামুদ্দীনে ঘটেছিল।

২০১৪ সনে যুবাইরুল হাসান রহ. এর ইন্তেকালের পর আলমীভাবে একটা শুরা গঠন করা হয়েছিল শুনেছিলাম, এ বিষয়টা যদি একটু বলতেন?

মাওলানা মাহফুজুল হক : ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে রায়ভেন্ডের ইজতেমায় সকল মুরুব্বিরা উপস্থিত ছিলেন। রায়ভেন্ডের ইজতেমাও অনেক বিশাল হয়, সারা দুনিয়া থেকে মুরুব্বিরা আগমন করেন।

মুরুব্বিরা চিন্তা করলেন, রায়ভেন্ডের ইজতেমায় বিষয়টার সুরাহার জন্য শেষবারের মত একটা চেষ্টা করবেন। মাওলানা সাদ সাহেবও সেই ইজতেমায় উপস্থিত ছিলেন।

রায়ভেন্ড ইজতেমায় এনামুল হাসান রহ. এর রেখে যাওয়া শুরা আরেকটু ব্যাপক ও পূর্ণতা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। সেখানে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তের সদস্য বিশিষ্ট একটা শুরা গঠন করা হয়।

আগের শুরার দু‘জন মাওলানা সাদ সাহেব ও হাজি আব্দুল ওয়াহাব সাহেব এর সাথে নতুন আরও এগারোজনকে সংযোজন করে তেরো সদস্যের নতুন শুরা গঠন করা হয়।

এই তেরোজনের পাঁচজন ছিলেন নিযামুদ্দীনের, পাঁচজন পাকিস্তানের আর তিনজন বাংলাদেশের। সেখানে তেরোজনের এগারোজন এই প্রস্তাবনা বা সিদ্ধান্তের সাথে একমত হন।

কিন্তু মাওলানা সাদ সাহেব ওই মজলিসেই এর সাথে একমত হননি, সাথে আমাদের বাংলাদেশের ওয়াসিফুল ইসলাম সাহেবও এই সিদ্ধান্তের সাথে একমত হননি। কিন্তু বাংলাদেশের অপর দুইজন মাওলানা যোবায়ের সাহেব ও মাওলানা রবিউল হক সাহেব এই সিদ্ধান্তে একমত ছিলেন।

মাওলানা সাদ সাহেব রায়ভেন্ডের ইজতেমা থেকে নিযামুদ্দীন ফিরে গিয়ে নিযামুদ্দীনের যে পাঁচজনকে নতুন শুরায় রাখা হয়েছিল, তাদের সাথে নতুন করে আরও তিনজন যোগ করে নতুন করে আরেকটা শুরা গঠনের ঘোষণা দেন। কিন্তু তার একক এই শুরার সাথে সারা দুনিয়ার মুরুব্বিরা কেউ একমত হননি।

তিনি সবার মত উপেক্ষা করে নিজের মত করে শুরা গঠন করেন। নিযামুদ্দীনের ওই পাঁচজনের মধ্যে ছিলেন মাওলানা ইয়াকুব সাহেব, মাওলানা ইবরাহীম দেওলা সাহেব, মাওলানা আহমদ লাট সাহেব, মাওলান সাদ সাহেব, মাওলানা যুহাইরুল হাসান সাহেব।

এই পাঁচজনের চারজনই তার পরবর্তী শুরার সাথে একমত হননি। এবং তার কোন কাজকে সমর্থন করেননি।

তাবলিগের এই সমস্যাগুলো এখন প্রকাশ্যে আসছে, বিভিন্ন বইপত্র লিখিত হচ্ছে, অনেকেই মনে করেন এসব প্রকাশ্যে না এসে ঘরোয়াভাবে বিষয়গুলো সমাধান করা যেত। আসলে ঘরোয়াভাবে সমস্যা সমাধানের কতটুকু চেষ্টা করা হয়েছে?

মাওলানা মাহফুজুল হক : ঘরোয়াভাবে সমস্যা সমাধানের অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। মাওলানা ইয়াকুব সাহেব, মাওলানা ইবরাহীম দেওলা সাহেব, মাওলানা আহমদ লাট সাহেব, মাওলানা ইসমাঈল সাহেব, মাওলানা ওসমান সাহেব, ড. সানাউল্লাহ সাহেব, ভাই ফারূকসহ অন্যান্য প্রবীণ ব্যক্তিবর্গ যাদের কেউ বিশ বছর, কেউ ত্রিশ বছর, কেউ পঞ্চাশ বছর ধরে নিযামুদ্দীনে থাকেন এবং ওখানে মুরুব্বি হিসাবে কার্যরত ছিলেন।

তারা সকলেই চেষ্টা করেছেন। প্রাথমিকভাবে তারা আলাদাভাবে একেকজন সাদ সাহেবের সাথে কথা বলেছেন, সতর্ক করেছেন। আশা করেছেন যে ধীরে ধীরে সংশোধন হয়ে যাবেন।

এককভাবে কাজ হয়নি তখন তারা জামাতবদ্ধভাবে চেষ্টা করেছেন। মৌখিকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। এরপর তারা লিখিতভাবে আপত্তির বিষয়গুলো জানিয়েছেন।

তারপরেও যখন কাজ হয়নি তখন ২০১৬ এর আগস্ট মাসে তারা নিযামুদ্দীন থেকে বের হয়ে গেছেন এবং তাবলিগের কাজকে সঠিক ধারার ওপর রাখার উদ্দেশ্যে লিখিতভাবে সমস্যাগুলো দুনিয়ার সামনে তুলে ধরেছেন।

বাংলাদেশ কি এ ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকতে পারতো না?

মাওলানা মাহফুজুল হক : মাওলানা ইয়াকুব সাহেব, মাওলানা ইবরাহীম দেওলা সাহেব, মাওলানা আহমদ লাট সাহেবসহ আরও অন্যান্য মুরুব্বিয়ানে কেরামের এই বক্তব্যগুলো যখন লিখিতভাবে সামনে এলো, তখন বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরামের মধ্যে প্রতিনিধিত্বশীল প্রায় ত্রিশ জন আলেম ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার অফিসে মিলিত হন।

সেখানে বিষয়টাকে আদ্যোপান্ত সবকিছু পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত হয় যে, আমরা প্রথমে বাংলাদেশে তাবলিগের মুরুব্বিদের সাথে বৈঠক করব।

বেফাকের বৈঠকে পর্যালোচনার পর একটা লিখিত প্রস্তাবনা তৈরি করা হয় এবং কাকরাইলের মুরুব্বিদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে ২৫ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশজন আলেমের একটি জামাত কাকরাইলে সেই প্রস্তাবনা নিয়ে উপস্থিত হন।

নিযামুদ্দীনের মতানৈক্যের প্রভাব যাতে বাংলাদেশে না পড়ে, বাংলাদেশের কাজ যেন সুন্দরভাবে চলতে পারে সে লক্ষ্যে আমাদের পক্ষ থেকে কাকরাইলের মুরুব্বিদের কাছে তিনটা প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছিল।

এক. কাকরাইল মারকাজের শুরা সদস্য যারা আছেন, তারা যেন মাওলানা সাদ সাহেবকে রায়ভেন্ডের ২৯১৫ ইজতেমায় গঠিত শুরা মানানোর জন্য চেষ্টা করেন।

দুই. যতক্ষণ পযর্ন্ত সাদ সাহেব রায়ভেন্ডের ইজতেমায় গঠিত ওই শুরা না মানবেন এবং নিযামুদ্দীন ও সারা দুনিয়ার মুরুব্বিদের কাছে আবারও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে না পারবেন ততক্ষণ পর্যন্ত কাকরাইল মারকাজের মুরুব্বিরা মাওলানা সাদ সাহেবের কাছ থেকে কোন ধরনের নির্দেশনা গ্রহণ করবেন না, এবং তার সাথে সম্পর্ক আপাতত স্থগিত রাখবেন।

তিন. বাংলাদেশের আসন্ন পাঁচদিনের জোড় এবং তার চল্লিশ দিন পর বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদ সাহেবকে যেন কোনভাবে শরিক না করেন।

এই প্রস্তাবের লক্ষ্য ছিল- সমস্যা সমাধানে মাওলানা সাদ সাহেবের উপর চাপ সৃষ্টি করা, অপর দিকে বাংলাদেশের দাওয়াত ও তাবলিগের কাজকে মতানৈক্য ও বিশৃঙ্খলা থেকে হেফাজত করা। কিন্তু কাকরাইলের সাধারণ শিক্ষিতদের একটা পক্ষ নানা ছলচাতুরি করে এই প্রস্তাবকে অগ্রাজ্য করেন।

বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরাম তাবলিগের বিষয়ে না জড়ালে পারতেন না? বিরোধী পক্ষের দাবি হলো, উলামায়ে কেরাম কখনো তাবলিগ করেন না, তারা কেন আমাদের বিষয়ে ভূমিকা রাখবে?

মাওলানা মাহফুজুল হক : ওলামায়ে কেরামের জড়ানোর প্রয়োজনীয়তা এসেছে এ জন্য যে, এটা যেহেতু একটা দ্বীনি কাজ আর সমস্যাটাও দ্বীনি সমস্যা। মাওলানা সাদ সাহেব দাওয়াত ও তাবলিগের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল একজন মানুষ, তিনি সেখান থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষের মজমায় কুরআন হাদিসের অপব্যাখ্যা করছেন, কুরআন হাদিসের নতুন নতুন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিচ্ছেন, এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে ভুল পথে পরিচালিত হওয়া এবং একটা হক জামাত ধীরে ধীরে গোমরাহ জামাতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলো।

শুধু বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরামেরই না, ওই কাছাকাছি সময়ে যখন নিযামুদ্দীনের ওলামায়ে কেরাম সাদ সাহেবের ব্যাপারগুলো লিখিতভাবে উপস্থাপন করলেন তখন সারা দুনিয়া থেকে দারুল উলূম দেওবন্দে সাদ সাহেবের ব্যাপারে ইস্তেফতা আসা শুরু করল, এ মর্মে যে, এমন ব্যক্তির ব্যাপারে আপনাদের অবস্থান বা মতামত কি?

২০১৬ এর নভেম্বরে ব্যাপারগুলো ভালোভাবে তাহকিক করে দারুল উলুম দেওবন্দ সাদ সাহেবের ব্যাপারে নিজেদের মতামত বা ফতোয়া জারি করে যে, সাদ সাহেবের বেশ কিছু মতামত ও বক্তব্য সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের বিপরীত, আর আকাবির ওলামায়ে কেরামের দাওয়াত ও তাবলিগের নীতিমালার সম্পুর্ণ পরিপন্থি।

একজনের বাড়াবাড়ির কারণে তাবলিগ জামাতের কাজ সঠিক পথ থেকে বিচ্যুতির দিকে চলে যাবে আর লক্ষ লক্ষ মানুষ গোমরাহির শিকার হবে, এ ক্ষেত্রে অবশ্যই ওলামায়ে কেরামের অনেক বড় দায় দায়িত্ব রয়েছে। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের পক্ষ থেকে এহেন মুহুর্তে ভূমিকা রাখার অবশ্যই দায়িত্ব বর্তায়।

তাছাড়া ওলামায়ে কেরাম তাবলিগ করেন না এ কথাটাও ঠিক নয়। আলেমদের বড় একটা অংশ তো নিয়মিত তাবলিগের কাজে আছেন। এই আপত্তি আর প্রশ্নগুলো তো তাদের মধ্যেও এসেছে।

অনেক আলেম নিয়মিত তাবলিগ হয়ত করেন না, মাদরাসা মসজিদ খানকা ইত্যাদির সাথে সংশ্লিষ্ট, তারাও দাওয়াত ও তাবলিগের কাজকে মহাব্বত করেন। সময়ে সময়ে শরিক হন।

বিশ্ব ইজতেমায় শরিক হন, নিজেদের ছাত্রদেরকে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেন। নিজেদের মুহিব্বীন মুতাআল্লিকীনকে উৎসাহিত করে এই কাজে লাগান।

নিজেদের লোকদেরকে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন এখন তারা গোমরাহ হলে সেটার দায়িত্ব ওলামায়ে কেরামের উপরও আসবে। মাওলানা সাদ সাহেবের রুজুর ব্যাপারটাও একটা প্রহসনে পরিণত হয়েছে।

একদিকে নামকাওয়াস্তে রুজু করেন আবার সেই আপত্তিকর বক্তব্যেও পুনরাবৃত্তি করেন। যার কারণে দারুল উলুম ওনার এই রুজুর নামে তামাশার উপর আস্থা জ্ঞাপন করতে পারেনি। সব বিবেচনায় এই সংকটময় মুহূর্তে কুরআন হাদিসের আলোকেই ভূমিকা রাখা ওলামায়ে কেরাম দায়িত্ব মনে করেছেন ।

বারবার যে কথাগুলো আসছে, সাদ সাহেব রুজু করেছেন। প্রকাশ্য মজলিসে রুজু করার ঘোষণা দিচ্ছেন। তিনি তার ভ্রান্ত বক্তব্য থেকে ফিরে আসলে সমস্যা থাকছে কোথায়?

মাওলানা মাহফুজুল হক : ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ থেকে আমরা একটা প্রতিনিধি দল দারুল উলুম দেওবন্দ গিয়েছিলাম, তখন দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে লিখিত এবং মৌখিকভাবে আমাদেরকে স্পষ্ট করে জানানো হয় যে, তিনি একদিকে রুজু করেন আবার কিছুদিন পরে আগের কথাগুলোই বলেন।

তার পক্ষের লোকজন দারুল উলুম দেওবন্দ এর ফতোয়ার বিরুদ্ধে বয়ান দিচ্ছে, কথা বলছে, লিখছে, এবং সেগুলোকে ভুল প্রমাণ করতে ব্যস্ত। এসব কারণে পঁচিশে ডিসেম্বর ২০১৭ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে আমাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয় যে, আমরা মনে করি তিনি আমাদের কাছে যে রুজু করছেন সেগুলো গ্রহণযোগ্য নয়।

তাছাড়া জনসমুক্ষে তিনি যে রুজু করেছেন সেখানেও শুধু একটা বিষয়ে তিনি রুজু করেছেন; মুসা আ. এর ব্যাপারে।

অথচ দারুল উলুম দেওবন্দ উদাহরণ সহ সাতটা পয়েন্ট উল্লেখ করেছে, এর বাইরেও আরও বহু বিষয় রয়েছে। উল্লেখিত সাতটার মধ্যেও শুধুমাত্র একটার ব্যাপারে প্রকাশ্য মজমায় তিনি রুজু করেছেন।

তারপরেও রুজু এর হালাত হলো এই; আমরা দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে নিযামুদ্দীনে ফেরার পর আমাদের উপস্থিতিতে তিনি একবার রুজু করেছেন। সেই রুজুর মূল বক্তব্য হলো, যদি আমার বয়ানে কোথাও এ ধরনের বক্তব্য এসে থাকে তাহলে আমি এ থেকে রুজু করছি।

এ ধরনের রুজু আসলে কতটুকু গ্রহণযোগ্য তা সকলেই উপলব্ধি করতে পারবেন।আন্তরিকভাবে রুজু করার কোন গ্রহণযোগ্য উপায় তিনি অবলম্বন করেননি।

মাওলানা সাদ সাহেব কি কখনো বিষয়গুলো সমাধানের চেষ্টা করেছেন? কখনো দারুল উলুম দেওবন্দ এর উলামাদের কাছে গিয়ে কথা বলেছেন?

মাওলানা মাহফুজুল হক : না, আমরা যখন দারুল উলুম দেওবন্দে গিয়েছি তখন মাওলানা আরশাদ মাদানি সাহেব ও দারুল উলুমের প্রিন্সিপাল সাহেবের সাথে এ বিষয়টা নিয়েও কথা হয়েছে।

তারা পরিষ্কার বলেছেন যে, আমাদের জানামতে তিনি কখনো দারুল উলুম দেওবন্দের সীমানায় আসেননি। তিনি আগে পরে কখনোই দারুল উলুমে যাননি, এবং এই পরিস্থিতিতেও সংশোধনের জন্য দারুল উলুমে গিয়ে ওলামায়ে কেরামের সাথে আলাপ আলোচনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি।

যদি কেউ দাবি করে থাকে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দ গিয়েছেন, বা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন তাহলে সেটা সঠিক নয়।

ভারতে দারুল উলুম দেওবন্দ ছাড়াও আরও অনেক বড় মাদরাসা আছে, বড় বড় অনেক ওলামায়ে কেরাম আছেন। শোনা যায় তারা সাদ সাহেবকে সমথর্ন দিচ্ছেন, তারা দল বেঁধে নিযামুদ্দীন যাচ্ছেন?

মাওলানা মাহফুজুল হক : এটা আসলে বাস্তবতার বিপরীত কথা। ভারতের মূল বা নেতৃস্থানীয় মাদরাসাগুলোর কোনটা তাদের সাথে আছে বলে আমার জানা নেই। সাহারানপুরের শুরাও একেবারে সর্বসম্মতিক্রমে দারুল উলুম দেওবন্দের অবস্থানের সাথে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। এবং ইতিমধ্যে সাহারানপুরে আরও সিদ্ধান্ত হয়েছে যে সেখানে মুনতাখাব হাদিসের তালিম হবে না, ফাযায়েলে আমালের তালিমই হবে।

এ ধরনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তেই স্পষ্ট যে মাযাহেরে উলূম সাহারানপুরও তার সাথে একমত না।

এমনিভাবে নদওয়াতুল উলামাও তার সাথে নেই। এগুলোর বাইরে আর বলার মত প্রতিষ্ঠান হলো ডাভেল মাদরাসা, তারাও সাদ সাহেবের সাথে নেই। উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনটাই তাদের সাথে নেই।

সাদ সাহেবকে যে বাংলাদেশে ইজতেমায় আসতে দেয়া হলো না, মিটিং মিছিল করা হলো, এর মাধ্যমে তো বিষয়টা রাজনৈতিক আকার ধারণ করলো, জনসমক্ষে বেশ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো, তাকে আসতে দিলে কি সমস্যা এর চেয়ে কম হতে না?

মাওলানা মাহফুজুল হক : তিনি যেন বাংলাদেশে না আসেন সেজন্যে ওলামায়ে কেরাম ঘরোয়াভাবে অনেক চেষ্টা করেছেন। কাকরাইলের মুরুব্বিদেরকে বোঝানো, সরকারের সাথে আলাপ আলোচনা করা, মোটকথা সব রকমেই চেষ্টা করা হয়েছে যেন তার না আসার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়।

একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে যাওয়ার পরেও তার অনুসারীরা বিভিন্ন ছলচাতুরি করে তাকে বাংলাদেশে এনেছেন। তখন যদি তাকে বিশ্ব ইজতেমায় শরিক হতে দেয়া হতো তাহলে দ্বীনি অনেক বড় সমস্যা দেখা দিতো।

কারণ কুরআন হাদিসের দৃষ্টিতে তিনি তো এখন হক পথ থেকে বিচ্যুত, তিনি কুরআন হাদিসের অগ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা করছেন এবং দাওয়াত ও তাবলিগের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে দ্বীনের অন্যান্য শাখাগুলোকে হেয় প্রতিপন্ন করছেন, সেগুলোকে ছোট করে উপস্থাপন করছেন, কটাক্ষ করছেন, দাওয়াত ও তাবলিগের কাজকে মূল উসূল থেকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন যার কারণে কাজ অনেক সঙ্কুচিত হয়ে গেছে।

এখন যদি তিনি বিশ্ব ইজতেমায় শরিক হতে পারতেন তাহলে তার এই ভ্রান্ত জিনিসগুলোই আরও বেশি প্রতিষ্ঠিত হত এবং অন্যদের ওপর প্রভাব বিস্তার করত।

তখন তাকে বাধা দেয়ার কারণে যদিও সাময়িকভাবে মানুষের সামনে একটা হট্টগোল হয়েছে, কিন্তু একটা দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা অর্থাৎ দাওয়াত ও তাবলিগের কাজকে ভুল পথ থেকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য অনেক বড় সহায়ক হয়েছে।

তিনি আসতে পারলে কাকরাইলে যারা তার অনুসারী তাদের আরও বেশি প্রভাব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হত। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের দাওয়াত ও তাবলিগের পুরো কাজটা আমাদের আকাবিরদের নীতিমালা ও কর্মপন্থা থেকে বিচ্যুত হয়ে ভিন্ন পথে পরিচালিত হওয়ার সমূহ আশংকা ছিল।

এজন্য তাকে বাধা দেয়াটাই ঠিক ছিল মনে করি। সমস্ত ওলামায়ে কেরাম তখন এটা ঠিক মনে করেই ব্যবস্থাটা নিয়েছিলেন।

তাদের দাবি কাকরাইলের শুরা সদস্যদের বেশীরভাগই সাদ সাহেবের পক্ষে, এর বাস্তবতা কতটুকু?

মাওলানা মাহফুজুল হক : কাকরাইলের শুরার সদস্য মোট এগারো জন। এদের মধ্যে একজন হলেন সম্পূর্ণ অসুস্থ, বোধশক্তিহীন বয়োবৃদ্ধ মানুষ। তিনি কোন পক্ষেই ভূমিকা রাখা বা সমর্থন দেয়ার পর্যায়েও নেই।

তিনি হলেন মাওলানা মুজাম্মেল সাহেব। তিনি হাটহাজারী মাদরাসার ফারেগ, আল্লামা আহমদ শফী সাহেবের ছাত্র। তার ইলমি অবস্থানের কারণে আমরা আস্থাশীল যে, সুস্থ সবল থাকলে তিনি কখনোই সাদ সাহেবের পক্ষাবলম্বন করতেন না। বাকি থাকে আরও দশজন। এই দশজনের মধ্যে পাঁচজন পাঁচজন করে দুই পক্ষেই।

সাদ সাহেবকে না মানার পক্ষে যে পাঁচজন তারা সবাইই গ্রহণযোগ্য আলেম, এবং দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে তারাই অনেক প্রবীণ ও গ্রহণযোগ্য।

তারা হলেন মাওলানা যোবায়ের সাহেব, মাওলানা রবিউল হক সাহেব, মাওলানা ওমর ফারুক সাহেব, মাওলানা মোহাম্মদ হোসাইন সাহেব, মাওলানা ফারুক সাহেব। এই পাঁচজন মাওলানা সা’দ সাহেবের বিপক্ষে একদম স্পষ্ট অবস্থানে।

আর অন্য পক্ষের যে পাঁচজন আছেন তাদের মধ্যে মাত্র একজন হলেন আলেম, মাওলানা মোশাররফ সাহেব। বাকি চারজনই জেনারেল শিক্ষিত; জনাব ওয়াসিফুল ইসলাম সাহেব, জনাব নাসিম শিকদার সাহেব, জনাব ইউনুস শিকদার সাহেব, শেখ নূর মোহাম্মদ সাহেব।

এই পাঁচজনের মধ্যে শেখ নূর মুহাম্মাদ সাহেব অসুস্থ, তিনি তেমন তৎপর না। চারজন সাদ সাহেবের পক্ষে তৎপর ভূমিকা রাখছেন।

এখানে আরেকটা বিষয় আছে। এই দশজন সদস্য দুইটা ক্যাটাগরিতে বিভক্ত। কয়েকজন শুধু সদস্য, আর কয়েকজন আমীরে ফায়সাল। অর্থাৎ, এক সপ্তাহ এক সপ্তাহ করে পালাক্রমে আমীরে ফয়সাল থাকেন।

এগারোজনের মধ্যে মোট সাতজন ছিলেন ফয়সালা দানকারী সদস্য, মুজজাম্মেল সাহেবও এই ক্যাটাগরির অর্থাৎ ফয়সালা দানকারী সদস্য ছিলেন, এখন তার অনুপস্থিতিতে দশজনের মধ্যে ছয়জন আছেন ফয়সালা দানকারী বা আমীরে ফয়সাল সদস্য।

এই ছয়জনের মধ্যে চারজনই হলেন আলেম। তারা হলেন মাওলানা যোবায়ের সাহেব, মাওলানা রবিউল হক সাহেব, মাওলানা মোহাম্মাদ হোসাইন সাহেব, মাওলানা ফারুক সাহেব। আর অন্য পক্ষের পাঁচজনের মধ্যে ফয়সাল সদস্য হলেন মাত্র দুজন; ওয়াসিফুল ইসলাম সাহেব আর নাসিম শিকদার সাহেব।

তো সার্বিক বিবেচনায় শুরার সদস্যদের মধ্যে বেশি গ্রহণযোগ্য আর প্রবীণ সদস্যরাই সাদ সাহেবের বিপক্ষে, আর আমীরে ফয়সালদের মধ্যে বেশিরভাগই তার বিপক্ষে।

মনে করা হয় জেনারেল শিক্ষিত মানুষ বেশির ভাগ সাদ সাহেবের পক্ষে, এর কারণ কী? বা এর বাস্তবতা কতটুকু?

মাওলানা মাহফুজুল হক : আমরা যতটুকু পর্যবেক্ষণ করেছি, তাতে জেনারেল শিক্ষিতদের মধ্যে পুরাতন সাথীরা বেশিরভাগই সাদ সাহেবের পক্ষে। আর যদি নতুন পুরাতন সব মিলিয়ে সংখ্যায় বিবেচনা করি তাহলে জেনারেল শিক্ষিতদের মধ্যেও বেশির ভাগ তাবলিগি সাথিই সাদ সাহেবের বিপক্ষে।

এর বড় কারণ হলো সাদ সাহেবকে নিয়ে আপত্তির বিষয়গুলো অধিকাংশই ইলমি বিষয়।

কুরআন হাদিসের জ্ঞান যাদের নেই তাদের এই আপত্তির বিষয়গুলো সঠিকভাবে অনুধাবন করা কঠিন। আর যাদের কুরআন হাদিসের জ্ঞান নেই তাদেরকে ধর্মীয় বিষয়ে বিভ্রান্ত করাও অনেক সহজ। এজন্যই জেনারেল শিক্ষিত অনেকে বিভ্রান্তিতে পড়েছেন।

এ ইস্যুতে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কি অবস্থা?

মাওলানা মাহফুজুল হক : আমরা যতটুকু জানি, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের তাবলিগি ভাইদের অবস্থান সাদ সাহেবের বিপক্ষে। এবং তা দিনে দিনে আরও ব্যাপকতা লাভ করছে।

সাউথ আফ্রিকা, ইউরোপ ফ্রান্স, বেলজিয়াম, আমেরিকায়সহ বিশ্বের অনেক দেশের অবস্থান সাদ সাহেবের বিপক্ষে। এবারের হজের কারগুজারি শুনলাম, আগে যখন এই তিন দেশের মুরুব্বিরা আরবে যেতেন তখন আরবরাই তাদের মেহমানদারি করতেন।

এবার দুই ধরনের জামাতই হজে গেছেন। সাদ সাহেবের নেতৃত্বে জামাত গিয়েছিলেন। আহমাদ লাট সাহেব, ইবরাহীম দেওলা সাহেবদের নেতৃত্বের ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশের জামাতও হজে গেছেন।

যাওয়ার পর দেখা গেছে আরবের যেসব তাবলিগিরা আগে তাবলিগের নেতৃবৃন্দকে এস্তেকবাল করতেন তারা আহমাদ লাট সাহেব ইবরাহীম দেওলা সাহেবের জামাতকে আতিথেয়তা দিয়েছেন, সাদ সাহেবকে তারা এবার এস্তেকবাল করেননি।

মক্কা মদিনা সবখানেই তিনি হোটেলে অবস্থান করেছেন। আর এ সকল মুরুব্বিরা সেই পুরনো দিনের মতই আরবদের বাড়িতে থেকে হজের সময়টা অতিবাহিত করেছেন।

এখন এই সমস্যার সমাধান কি?

মাওলানা মাহফুজুল হক : আমরা তো সমাধানের রাস্তা একটাই দেখি; তাবলিগের কাজকে মূল তরতিব ও মূল উসুলে নিয়ে আসা। এবং সাদ সাহেবের মাধ্যমে কুরআন হাদিসের দৃষ্টিতে যে আপত্তিকর বিষয়াবলি তাবলিগে ছড়িয়ে গেছে সেগুলো থেকে তাবলিগকে মুক্ত করার যথাসাধ্য চেষ্টা অব্যাহত রাখা।

আমাদের বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরাম মজবুত অবস্থান নিয়েছেন, হিন্দুস্তানের ওলামায়ে কেরামসহ সারা বিশ্বের ওলামায়ে কেরামও সম্মিলিতভাবে মজবুত অবস্থান নিয়েছেন।

এই চেষ্টা অব্যাহত থাকলে আশা করি এক সময় সব বিভ্রান্তি দূর হয়ে যাবে। তারা সবাই তাদের ভুল বুঝতে পেরে সঠিক ধারায় ফিরে আসবেন।

সাদ সাহেবের সাথে কি বিষয়গুলো নিয়ে সমঝোতার আশা করা যায়?

মাওলানা মাহফুজুল হক : এবারের হজের সময়ও আরবরা উদ্যোগ নিয়েছিলেন দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার। কিন্তু মাওলানা সাদ সাহেব সেই চেষ্টাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন।

আমাদের অন্য মুরুব্বিরা তো সমঝোতার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু সাদ সাহেবের একের পর এক এই সমঝোতার চেষ্টাগুলো উপেক্ষা করে যাওয়াটা এক্ষেত্রে বাধা হয়ে আছে।

২০১৭ সালে আমরাও তো ইন্ডিয়া সফর করলাম। সেখানে আমাদেরও মনে হয়েছে যে, মাওলানা আহমদ লাট সাহেব, ইবরাহীম দেওলা সাহেবরা এখনও সমঝোতার জন্য প্রস্তুত এবং বিষয়গুলো নিয়ে খুব পেরেশান।

কিন্তু সাদ সাহেবের মধ্যে এ ধরনের কোন চিন্তা ভাবনা পরিলক্ষিত হয়নি। তবে আমরা প্রত্যাশা করি ও দোয়াও করি আল্লাহ তাকে সঠিক বুঝ দান করেন। এবং দ্রুত একটা সমাধানের পথ বের করে দেন এবং দ্বীনের এই মহান কাজকে ফেতনা থেকে হেফাজত করেন।

সাদ সাহেবের অনুসারীরা ওলামায়ে কেরামকে হেফাজতি ও পাকিস্তানপন্থী বলছে, এ ব্যাপারে আপনাদের বক্তব্য কী?

মাওলানা মাহফুজুল হক : আমরা সব জায়গায় স্পষ্টভাবে বলছি যে, প্রথমে সমস্যা শুরু হয়েছে নিযামুদ্দীনের মুরুব্বিদের মধ্যে। আর নিযামুদ্দীনের যেসব মুরুব্বি মাওলানা সাদ সাহেবের ওস্তাদ, তারাই প্রথম সাদ সাহেবের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে নিজেদের অবস্থান দুনিয়ার সামনে স্পষ্ট করেছেন।

এরপরে দারুল উলূম দেওবন্দ নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে, সাহারানপুর দেওবন্দের সাথে নিজেদের ঐক্যমত ব্যক্ত করেছে। এরপর বাংলাদেশের সমস্ত উলামায়ে কেরাম সাদ সাহেবের বিপক্ষে ভূমিকা নিয়েছে।

তো যারা সাদ সাহেবের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে তাদেরকে পাকিস্তানপন্থী বলাটা মূলত সরকারকে বিভ্রান্ত করার একটা অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছু না।

ওলামায়ে কেরাম তো কখনোই এই দাবি করছে না যে কাকরাইল সরাসরি রায়ভেন্ডের আনুগত্য করুক। বরং ওলামায়ে কেরাম তো বলছেন যে আগের তিন মুরুব্বি যে তরতিবে কাজ করে গেছেন কাকরাইলের কাজও সেই তরতিবেই চলবে।

পাকিস্তান বা কারও অনুসরণ করুক এ ধরনের কোন কথা ওলামায়ে কেরাম কখনো বলেননি।

তাছাড়া হেফাজতে ইসলাম একটা আলাদা সংগঠন। তাবলিগের কাজের যে সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এই উদ্যোগ হেফাজতে ইসলাম নেয়নি। হেফাজত সংশ্লিষ্ট ওলামায়ে কেরামই শুধু উদ্যোগ নিয়েছেন বিষয়টা এমনও না।

সব শ্রেণীর ওলামায়ে কেরাম এখানে উদ্যোগ নিয়েছেন। আলেমরা যারা তাবলিগের সাথে আগে থেকে আছেন তারাও এখানে ব্যাপক ভূমিকা নিয়েছেন। যারা তাবলিগের বাইরে মাদরাসার সাথে, মসজিদের সাথে, হেফাজতের সাথে আছেন তারা সবাই উদ্যোগ নিয়েছেন।

তাবলিগের ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের এই অবস্থানকে হেফাজতি বলে দাবি করা তাদের বিভ্রান্তি ছড়ানোরই একটা কৌশল। এর মাধ্যমে তারা চিহ্নত ইসলাম বিরোধীদের আনূকুল্য পেতে চায় আর কিছু না।

তাবলিগের এই ইস্যুতে সরকারের অবস্থান কি?

মাওলানা মাহফুজুল হক : তারা ওলামায়ে কেরামের মতামতকে উপেক্ষা করছে না। যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। তাছাড়া তারা এটাও উপলব্ধি করছে যে, এখানে মাওলানা সাদ সাহেবের বিপক্ষে একদিকে তাবলিগের ভেতরেও অনেক বড় একটা গ্রুপ রয়েছে, এর পাশাপাশি তাবলিগের বাইরের সমস্ত ওলামায়ে কেরাম ব্যাপকভাবে তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে সরকার এ সব কিছু উপেক্ষা করে ভিন্ন কোন চিন্তা করবে বলে মনে হয় না।

এখন তো এক রকম ভাগ হয়ে গেছে বলা চলে। সামনের দিনগুলোতে তাবলিগের কাজ কিভাবে চলবে বলে মনে করেন?

মাওলানা মাহফুজুল হক : ওলামায়ে কেরামের মধ্যে যারা তাবলিগে নিয়মিত সময় দেন না তারা তো কখনোই তাবলিগের নেতৃত্ব দিবেন না। যেসব ওলামায়ে কেরাম তাবলীগে নিয়মিত সময় দেন এবং ওলামা ছাড়াও তাবলিগের কাজে বিশাল সংখ্যক লোক আছেন যারা ওলামায়ে কেরামের সাথে একমত, তাদের নেতৃত্বে তাবলিগের কাজ চলবে।

বাকি আগে ওলামায়ে কেরাম বাহির থেকে তাবলিগের কাজের সাথে যতটুকু সহযোগিতা করতেন ও সম্পৃক্ত থাকতেন, আগামীতে সেটা আরও অনেক বৃদ্ধি পাবে। এর মধ্য দিয়ে এই কাজ তো চলবেই, আগের থেকে আরও ভালো চলবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

সাধারণ শিক্ষিত মানুষদের কী করণীয় এই বিবদমান পরিস্থিতিতে?

মাওলানা মাহফুজুল হক : এটা যেহেতু দ্বীনি বিষয় তাই তাদের করণীয় হলো, ওলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে যে মতামত পোষণ করছেন তার সাথেই একমত থাকা।

এবং যে কোন সময় যেহেতু এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তাই তাবলিগের সাথে সম্পৃক্ত প্রত্যেকেরই কর্তব্য হলো তাবলিগের কাজের পাশাপাশি কোন আলেমের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলা। জেনারেল শিক্ষিত দ্বীনদারদের জন্য এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ইজতেমা ময়দানে হামলায় আহতদের সেবায় এগিয়ে আসুন: আল্লামা শফী

মাসিক রাহমানী পয়গাম থেকে