২০১৮-১১-১১

সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮

শাইখুল হাদিস যাকারিয়া রহ.-এর অশ্রুসিক্ত বিদায়!

OURISLAM24.COM
news-image

সাজ্জাদ আকবর

‘প্রতিটি প্রাণীকে ভোগ করতে হবে হিমশীতল মৃত্যুস্বাদ’;  আল কুরআনের কী অমোঘ বিধান। এই শাশ্বত সত্য বারবারই দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে যায় আমাদের ভেতরটাকে। ভাবতেই পারছি না আমাদের শাইখুল হাদিস আল্লামা যাকারিয়া রহ. আর নেই। তিনি আজ ‘রহ.’ হয়ে গেছেন।

মাগরিব নামাজ পড়তে দাঁড়াবেন, এমন সময় আল্লাহর দূত এসে হাজির। আল্লাহ তাঁর বন্ধুকে তলব করেছেন।হুজুর বললেন, ‘আমাকে শুইয়ে দাও।’ তৎক্ষনাৎ কালিমা পড়তে শুরু করলেন। আর চলে গেলেন মহান আল্লাহর কাছে।

এই গতকালও তো হুজুর আমাদের দরস দিয়েছেন। কী সুন্দর দরাজ উচ্চারণ, অথচ তিনি চার মাসের বিছানায় পড়া রোগী।পায়ের অপারেশন হয়েছে রোজার কিছুদিন পরে। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই হুজুর চলে এসেছেন দরসে।

মাদরাসা কর্তৃপক্ষের কোনো ধরাবাঁধা ছিলো না। তবু হুজুর চলে এসেছেন। দরস করতে এসেছেন দুজন ছাত্রের কাঁধে ভর করে, কখনো হুইলচেয়ারে চড়ে। শুধু কি তাই, নরসিংদীর ইসলামপুরেও যেতেন প্রতি সপ্তাহে।সেখানেও তিনি বুখারির দরস দিতেন। আমরা হুজুরকে নিজের কারণে কখনো দরস ছেড়ে দিতে দেখি নি।

আজ সারা দেশের মানুষ হুজুরকে চিনেছে মাদানীনগরের শাইখুল হাদিস বলে।অথচ তাঁর নিজের নামে খুব কম লোকই তাঁকে চিনতো।এর কারণ, হুজুর সম্পূর্ণ দুনিয়াবিমুখ ছিলেন। দুনিয়ার প্রতি সামন্যতম আগ্রহ তাঁর ছিলো না। কী ছিলো না তাঁর? ইলম কি কম ছিলো?

মাদানীনগর মাদরাসার শাইখুল হাদিস মাওলানা যাকারিয়ার ইন্তেকাল

একদিকে তিনি ছিলেন ভারতের রাজস্থান মাদরাসার দীর্ঘ প্রায় অর্ধ যুগের শাইখুল হাদিস, অন্যদিকে তিনি দেশের বড় ও প্রবীণ মুহাদ্দিসদের উস্তাদ।ফরিদাবাদ মাদরসার হযরত মাওলানা যিকরুল্লাহ খান সাহেব, মাওলানা ইউনুস সাহেব, মাওলানা মুফতি আবদুস সালাম সাহেব, মাওলানা নজরুল ইসলাম সাহেব, মাদানীনগর মাদরাসার নাযেমে তালীমাত হযরত মাওলানা মুফতি আবদুল বারী সাহেবসহ দেশবরেণ্য বহু ওলামায়ে কেরাম তাঁর স্নেহধন্য শাগরেদ।

মাটির চেয়েও সাদা মন ছিলো হুজুরের।অহঙ্কার বা আমিত্ব বলে কোনো জিনিস তার জীবন-অভিধানে ছিলো না।একবার ইজতেমার ‘আমমাঠে’ হুজুর গাদাগাদি করে বিছানা করছিলেন।মুহতামিম সাহেব হুজুর শায়খকে ওলামা প্যান্ডেলে চলে আসতে বললেন। তখন খুবই বৃষ্টি হচ্ছিলো। হুজুর তৎক্ষণাৎ জবাব দেন, ‘আমি এখানে ভোগ করতে আসি নাই।আপনারা ওখানে যান,আমি এখানেই থাকবো।’

হুজুরের স্বভাবকে হযরত ওমর এর সাথে তুলনা করা যায়। হককে হক আর বাতিলকে বাতিল বলতে বিন্দুমাত্র পরোয়া করতেন না। অকপটে সবখানে সব হক বলে দিতেন। হুজুরের এ সততা ও স্পষ্টভাষিতার কারণে তাঁর শত্রুও কম ছিলো না। হুজুর যখন ইসলামপুর মাদরাসায় ছিলেন, তখন দুষ্কৃতিকারীরা খাবারে বিষ মিশিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিলো। কিন্তু মহান আল্লাহ কুদরতে তিনি বেঁচে উঠেছিলেন।

তাকওয়াই ছিল জীবনের অনন্য সৌন্দর্য। হুজুর যখন হজে গিয়েছিলেন, সাফা মারওয়া সাঈ করার সময়ে তাঁর পায়ের জোতা হারিয়ে গিয়েছিলো,। তারপর পুরো সাতবার সাঈ করেছেন খালি পায়েই। পড়ে থাকা কোন জোতাই তিনি পায়ে দেননি। এর ফলে জখমে হুজুরের পায়ের চামড়া খসে পড়েছিলো । সবক্ষেত্রে হুজুর ‘আযিমাত’ এর উপর আমলের চেষ্টা করতেন, দীনের ক্ষেত্রে ছোট থেকে ছোট বিষয়েও ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না। তিনি ফিদায়ে মিল্লাত হযরত মাওলানা আসাদ মাদানী রহ.এর খলিফা ও শাগরেদ ছিলেন।

আজকের এ বিষণ্ন মুহূর্তে মনকে সান্ত্বনা দিই একটা স্মৃতি স্মরণ করে। আমরা যখন জালালাইন পড়ি, হুজুর খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ডাক্তার আমাদেরকে যে কোনো মুহূর্তে প্রস্তুত থাকার কথা বলছিলেন, তখন সারা মাদরাসায় দোয়া-কান্নার রোল পড়ে গিয়েছিলো।

আমরা জালালাইনের সাথীরা খতম করে করে দোয়া করছিলাম, ‘হে আল্লাহ, হুজুরের দরসে হাদিস থেকে আমাদের মাহরুম করবেন না। হুজুরের রূহানি ফয়েজ থেকে আমাদের মাহরুম করবেন না।’ আমাদের সেই দোয়া আল্লাহ কবুল করেছেন। আমরা হুজুরের দরসে হাদিসে শরিক হতে পেরেছি।

হুজুর আর নেই। কিন্তু তাঁর মিশন রয়ে গেছে। আজকের এ দুর্দিনে হুজুরের জীবনাচার থেকে এই শিক্ষা নিতে পারি, বাতিলের সামনে কখনো মাথানত করা যাবে না। মুহূর্তের জন্যও ছাড়া যাবে না হককে। দুশমনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বেদআতকে বাদআত বলতে দ্বিধা করা যাবে না। সুন্নতের জন্য প্রয়োজনে জানমাল সবকিছুই উৎসর্গ করে দিতে হবে।

হুজুরের ইন্তেকালের খবরে সারা দেশ থেকে ওলামায়ে কেরাম ও হুজুরের ছাত্ররা জমায়েত হতে থাকেন মাদানী নগর মাদরাসায়। বেফাকের মহাসচিব মাওলানা আবদুল কুদ্দুস, ফরিদাবাদের মাওলানা যিকরুল্লাহ খান সাহেব, লেখক মাওলানা যাইনুল আবেদীনসহ দেশবরেণ্য হাজারো উলামায়ে কেরাম জানাজায় উপস্থিত হন। জানাজায় ইমামতি করেন মাদানীনগর মাদরসার মুহতামিম হযরত মাওলানা ফয়জুল্লাহ সন্দীপি।

পারিবারিক জীবনে হুজুর রেখে যান , তিন মেয়ে ও দুই ছেলে।আল্লাহ হুজুরকে রহমতের চাদরে ঢেকে রাখুন এবং তার রুহানি ফয়েজ আমাদের জন্য অব্যাহত রাখুন।

জামিল মাদরাসা বগুড়ার সাবেক প্রিন্সিপালের ইন্তেকাল

এসএস