২০১৮-১১-০৭

সোমবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ইসলামি অর্থব্যবস্থা

OURISLAM24.COM
news-image

আহনাফ আবদুল কাদির
আলেম ও লেখক

পৃথিবীর এই সুখ সম্ভারে কোনো কিছুরই অভাব নেই। অবারিত সম্পদে ভরপুর পৃথিবী। তবুও ‘কেউ খায় দুধ-চিনি, কারো পাতে শাক-বালি। কারো আছে কাড়ি কাড়ি টাকা। কারো হাত খালি।’

ইসলাম এই নীতিতে বিশ্বাসী নয়। বরং এই নীতিকে চ্যালেঞ্জ করে জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে ইসলামি অর্থব্যবস্থা এমন এক যুগান্তকারী প্রকল্প গ্রহণে উৎসাহিত করে, যা একই সাথে দারিদ্রে মূলোৎপাটন ও সামাজিক সমতা আনয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রদ্ধি সুসংহত করে।

জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ সবধরনের মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা রয়েছে এখানে।

অতি প্রয়োজনীয় এসকল মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যক্তিকেই বেশি তৎপর হতে হবে। পবিত্র কোরানের ভাষায়, “নামায শেষে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড় এবং মহান আল্লাহর দেয়া অনুগ্রহ তালাশ কর। সুরা জুময়া : ১০

রাসুল সা. বলেন, “নিজের হাতে উপার্জিত অর্থের চেয়ে উত্তম আয় আর কিছুই হতে পারেনা”। সুনান ইবনে মাজাহ: ২/২১৩৮

সেজন্য যোগ্যতা ও উদ্যেগের সাথে সঙ্গতি রেখে কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকা বাঞ্চনীয়। সকলের জন্য উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া মুসলিম সমাজের সামষ্টিক দায়িত্ব।

ইমাম ইবানে তাইমিয়া এ সম্পর্কে বলেন, “নাগরিকের নূন্যতম মৌলিক চাহিদা পূরণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। বাইতুল মাল হতেই এ উদ্যেগ নিতে হবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ ছাড়া বেকারত্ব দূর হবেনা। এজন্য সরকার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে”। ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা : ৩৩

তারপরেও রাষ্ট্রে বসবাসরত এমন কিছু লোক থাকে যারা শারীরীক অক্ষমতা, অসুস্থতা এবং দুর্বলতার কারণে উপার্জনে সক্ষমতা হারিয়েছে। কিংবা এমন নারী ও শিশু যাদের ভরণ-পোষণের কেউই নেই। সমাজে বসবাসরত এসব গরিবদের মৌলিক চাহিদা পূরণের এই দায়িত্ব মুসলিম সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব ও কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত।

পবিত্র কুরআনে এই দায়িত্ব পালনে বারবার তাকিদ প্রদান করা হয়েছে। “আর আত্মীয়-স্বজন, নিঃস্ব অভাবী ও মুসাফিরদের অধিকার প্রদান কর”। বনি ইসরাঈল: ২৬

হাদিসের ভাষায়, যে মানুষের উপর দয়া করে না আল্লাহ তার উপর দয়া করেননা”। বুখারিঃ ১২, মুসলিমঃ ৬৬, ইবনে হিব্বানঃ ২২৩৬

আরো বলা হয়েছে, সে প্রকৃত ঈমানদার নয় যে নিজে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে”। আল-আদাবুল মুফরাদঃ ১৩৭৯

মহানবী সা. বলেন, “অভাব ও দুর্দশাগ্রস্থের অভাব দূর কর, ক্ষুধার্তকে অন্য দাও এবং অসুস্থ ব্যাক্তির সেবা কর”। বুখারিঃ ৪৯৮১,আবূ দাউদঃ ২৭০২,ইবনে হিব্বানঃ ৩৪০৬

অন্য হাদিসে এসেছে, যে মুসলিম কোন বস্ত্রহীনে বস্ত্র দান করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের সবুজ বস্ত্র পরিধান করাবেন। যে মুসলিম কোন অনাহারীর মুখে খাবার তুলে দিবে, আল্লাহ তায়ালা জান্নাতের ফল দিয়ে তাকে আহার করাবেন। যে মুসলিম কোন পিপাসার্তকে পানি পান করাবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে ছিপি আঁটা বোতলের কোমল পানীয় পান করাবেন”। আবু দাউদ: ১৬৮২

নাগরিকের এসব মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। কারণ জনসাধারণের এসব অধিকার পূরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রপ্রধানের অন্যতম দায়িত্ব। রাষ্ট্র কখনো এই দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না।

রাসুল সা. এমন দায়িত্ববান প্রশাসক ব্যাক্তিকে অভিসম্পাত করেছেন যারা তাদের অধিনস্তদের দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন নয়।

উম্মুল মুমীনীন হযরত আয়শা রা. বলেন, আমি রাসুল সা. কে আমার এই ঘরে বসে বলতে শুনেছি, “হে আল্লাহ! যে আমার উম্মতের কোন কাজের কোন দায়িত্ব নিয়ে তাদের কষ্টে ফেলবে, তুমিও তাকে কষ্টে ফেলো। আর যে আমার উম্মতের কোন কাজের দায়িত্ব নিয়ে তার সাথে সদাচরণ করবে, তুমিও তার সাথে সদাচরণ করো”। মুসলিমঃ ৪৮২৬৯

তিনি আরো বলেন, “এমন আমির যার উপর শাসনভার অর্পিত হয় অথচ সে তাদের কল্যাণ সাধনে চেষ্টা করে না এবং মঙ্গল কামনা করে না। আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না। মুসলিমঃ ৪৫০২

এ সম্পর্কে ইমাম ইবনে হাযম তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল-মুহাল্লাতে বলেন, “প্রতিাট এলাকার ধনীরা তাদের নিজ নিজ এলাকায় বসবাসরত অসহায় ও নিঃস্বদের মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধ্য। এজন্য রাষ্ট্রপ্রধান জোড় প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। যদি সামর্থ্যবান মুসলিম জনসাধারনের সম্পদ ও যাকাতের অর্থ দিয়ে পুরোপুরিভাবে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব না হয়।

তবে রাষ্ট্রপ্রধান তাদের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, শীত ও গ্রীষ্মকালীন সময়ের জন্য পরিধেয় পোষাক এবং নিরাপত্তার সাথে বসবাসের জন্য অধিক সূর্যের আলো ও বৃষ্টির পানিমুক্ত স্থানে বাসস্থানের ব্যবস্থা করবেন”। আল-মুহাল্লা বিল আছার, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ২৮১, মাসয়ালাঃ ৭২৫

অভাবে স্বভাব নষ্ট এ কথা সর্বজন বিদিত। কোন দেশের জনসরধারণের মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণ না হলে সামাজিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক দৈন্যদশা দেখা দেয়। সাধারণ মানুষ মানবিক চাহিদা মেটাতে না পেরে অমানবিক ও অনৈতিক পন্থায় জড়িয়ে পড়ে।

ছোটখাটো অপরাধ থেকে শুরু করে এমন কোন অপরাধ নেই যা হয় না। ফলে সমাজে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, ধর্ষণ, পাপচার, সন্ত্রাস, হত্যা ও বিশৃঙ্খলা মহামারীর মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

তাই ইসলাম মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা দিয়ে অস্থিরতা ও নৈরাজ্যমুক্ত একটি কল্যাণকর সমাজ গড়ার যুগোপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

এ প্রসঙ্গে ইমাম শাতেবী রহ. এর বক্তব্য হচ্ছে, “সমাজের এসকল নিম্নস্তরের মানুষের অস্তিত্ব সমাজের নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই প্রয়োজন”। আল-মুওয়াফফাত ফি উসুলিশ-শারিয়াহ, ২য় খন্ড, পৃঃ ১৭৭

শাবাস ইলহান ও রাশিদা তালিব!

এএফএম