রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮

দাওয়াত ও তাবলীগের নীতি ও আদর্শ এবং মাওলানা সাদ প্রসঙ্গ

OURISLAM24.COM
এপ্রিল ৬, ২০১৮
news-image

শাইখুল হাদীস মুফতী মনসূরুল হক
জামিয়া রাহমানিয়া মুহাম্মদপুর ঢাকা

পূর্ব প্রকাশের পর

অন্যান্য আকাবিরের পৃষ্ঠপোষকতা: সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. লিখেছেন যে, “হযরত মাওলানার ধারণায় এই সমস্ত উলামায়ে দীনের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা অত্যন্ত জরুরি ছিল, যা ছাড়া তিনি এই কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং আশঙ্কাজনক মনে করতেন”। [দীনী দাওয়াতঃ পৃষ্ঠা, ৮০]

এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ইলিয়াস রহ. দাওয়াতের কাজ শুরু করার পর সর্বপ্রথম যখন আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার জন্য জামা‘আত তৈরি হয়, তখন তিনি এ জামা‘আতকে হযরত মাওলানা মুফতী কেফায়াতুল্লাহ রহ. এর কাছে প্রেরণ করেন, তার পরামর্শ এবং সমর্থন লাভের আশায়।

২৮, ২৯, ৩০ নভেম্বর ১৯৪১ খৃষ্টাব্দে ‘গোড়গানওয়াঁ’ জেলার নূহ অঞ্চলে এক বিরাট তাবলীগী ইজতিমা হয়, সেখানে মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ.- যিনি মজমায় জুম‘আর নামায পড়িয়েছিলেন এবং মাওলানা কেফায়াতুল্লাহ সাহেব রহ. সহ অনেকেই শরীক ছিলেন। [দীনী দাওয়াত : পৃষ্ঠা. ১১৫]

বিভিন্ন সময়ে হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের মাশওয়ারার জন্য আকাবিরদের একত্রিত করতেন।

যেখানে দারুল উলূম দেওবন্দের মুহতামিম মাওলানা ক্বারী তাইয়্যিব সাহেব, মাওলানা মুফতী কেফায়াতুল্লাহ সাহেব, দিল্লীর আব্দুর রব মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা মুহাম্মাদ শফী’ সাহেব, সাহারানপুর মাযাহিরুল উলূম মাদরাসার নাযিম মাওলানা আব্দুল লতীফ সাহেব, দারুল উলূম দেওবন্দের উস্তাদ মাওলানা ই’যায আলী সাহেব ও শাইখুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া সাহেব, মাওলানা আব্দুল কাদের রায়পুরী রহ. সহ যুগশ্রেষ্ঠ অনেক আলেম ও বুযুর্গানে দীন উপস্থিত হতেন। [দীনী দাওয়াত পৃষ্ঠা. ১২৬-১২৭]

সারকথা, দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের অধিক যোগ্য এবং হকদার হলেন উলামায়ে কেরাম এবং তারাই এ মোবারক মেহনতের বাগানে পানি সিঞ্চন করেছেন। তারাই এ কাননের রক্ষাণাবেক্ষণকারী। তবে হ্যাঁ, জনসাধারণ যারা এ নূরানী মেহনতের সাথে শরীক হয়েছেন, তারাও নূরানী হয়ে গিয়েছেন।

বাংলাদেশে তাবলীগের আগমন ও তত্ত্বাবধান

বাংলাদেশে হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর পদ্ধতিতে দাওয়াত ও তাবলীগের যে কাজ শুরু হয়েছিলো, সেটাও মূলত থানভী রহ. এর এক শাগরিদের মাধ্যমেই আল্লাহ তা‘আলা শুরু করেছিলেন। তিনি হলেন মুজাহিদে আজম শামসুল হক ফরিদপুরী (সদর সাহেব হুজুর) রহ.।

হাকীমুল উম্মাত থানভী রহ. এর দরবার থেকে বাংলাদেশে আসার পর হযরত সদর সাহেব রহ. মাওলানা আব্দুল আজীজ রহ. কে হিন্দুস্তানে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ শিখে আসার জন্য পাঠান।

আব্দুল আজীজ রহ. প্রথমত কলকাতা মারকাযে, এরপর দিল্লীর নিযামুদ্দিন মারকাযে হযরতজী ইউসুফ রহ. এর সোহবাতে থেকে এ কাজ শিখে এসে বাংলাদেশে দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত আরম্ভ করেন।

বাংলাদেশে প্রথম মারকায ছিলো বাগেরহাটের উদয়পুর মাদরাসার মসজিদ, যার মুহতামিম ছিলেন বড় হুজুর মাওলানা আব্দুল আজীজ রহ. এর শ্বশুর। দ্বিতীয় মারকায : ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে খুলনা জেলার তেরখাদা থানাধীন বামনডাঙ্গায় বড় হুজুরের নিজ গ্রামে।

তৃতীয় মারকায : দক্ষিণবঙ্গের সবচেয়ে বড় দীনী প্রতিষ্ঠান; ঐতিহ্যবাহী জামি‘আ ইসলামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম খুলনা সংলগ্ন তালাবওয়ালী মসজিদ।

চতুর্থ মারকায : চতুর্থ পর্যায়ে মারকায নির্ধারিত হয় লালবাগ শাহী মসজিদ। (তখন ছদর সাহেব রহ. লালবাগ জামি‘আ কুরআনিয়ার মুহতামিম ছিলেন।)

পঞ্চম মারকায : একসময় লালবাগ শাহী মসজিদে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ইজতিমার সুবিধার্থে কেল্লার উত্তর-পশ্চিম দিকে মাঠ সংলগ্ন খান মুহাম্মাদ মসজিদকে মারকায করা হয়।

ষষ্ঠ মারকায : কিছুদিন পর এখানেও জায়গা হচ্ছিল না। সদর সাহেব রহ. শহরের ভেতরে বড় মাঠ সংলগ্ন কোন মসজিদ দেখতে বললেন। তখন রমনা পার্ক সংলগ্ন মোঘল আমলে তৈরি মালওয়ালী মসজিদের সন্ধান মিলল; কিন্তু আয়তনে খুব ছোট।

সদর সাহেব রহ. বললেন, প্রয়োজনে পার্কের জায়গা বরাদ্দ নিয়ে মসজিদ বড় করা যাবে। এটাই মারকায হোক। ছয় উসূলের মেহনতের সেই ষষ্ঠ মারকাযই আজকের ঐতিহাসিক কাকরাইল মসজিদ। এসব মারকাযে তখন মুকীম হিসেবে কেউ থাকতেন না; সবাই আসা-যাওয়া করে কাজ করতেন। একমাত্র বড় হুযূর রহ. সব মারকাযেই একা পড়ে থাকতেন।

তো হিন্দুস্তানে যেমন দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ শুরু হয়েছিলো উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে, তেমনি বাংলাদেশেও [বরং পুরো পৃথিবীতে] তা শুরু হয়েছে উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে। আর এ কথা স্বীকৃত যে, যে দীনী কাজ যামানার হক্কানী উলামায়ে কেরাম সমর্থন করবেন, নিঃসন্দেহে তা হক এবং মকবুল কাজ।

কেননা, নবীজির যবানে আল্লাহ তা‘আলা এ উম্মাতের সাথে এ ওয়াদা করেছেন যে, উম্মাত ঐক্যবদ্ধভাবে কখনোই ভ্রষ্টতার উপরে একমত হবে না। কাজেই এ হক কাজ এখন আমাদের আওয়াম খাওয়াস সকলেরই করতে হবে এবং দীনী কাজ হওয়ায় এর তত্ত্বাবধানও করতে হবে উলামায়ে কেরামকে, যেমনটি করেছেন আমাদের আকাবির রহ.।

তবে এ কাজ করার আগে এ কাজের মাকসাদ কী? এবং এ কাজ করার তরীকা আর আদাব কী? তাও জানতে হবে।

তাবলীগী মেহনতের মাকসাদ কী?

হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. তার ‘মালফুযাত এবং মাকাতিব’-এর মধ্যে কয়েকটি উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন।

১. সকল জায়গায় উলামায়ে কেরাম ও বুযুর্গানে দীন এবং দুনিয়াদারদের মাঝে মেলামেশা ও সৌহার্দ্য ভালবাসা ও সম্পৃীতি সৃষ্টি করা [মালফুযাতে মাওলানা ইলিয়াস; মালফুয নং ১০২]

২. তিন জিনিসকে যিন্দা করা; যিকির, তালীম এবং তাবলীগ। অর্থাৎ তাবলীগের জন্য বের হওয়া যেন সাথীদেরকে যিকির এবং তালীমের প্রতি আরও বেশি গুরুত্ববান করে তোলে। [মাকাতিবে হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ., মেওয়াতীদের প্রতি লিখিত ১নং চিঠি]

৩. তিন তবকার লোকদের নিকট তিন উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে যাওয়া উচিৎ। এক. উলামায়ে কেরাম এবং বুযুর্গানে দীনের খেদমতে দীন শিখা ও দীনের ভাল তা’ছীর হাসিল করার জন্য।

দুই. নিজ হতে নিম্ন শ্রেণীর লোকদের মাঝে দীনী কথা বার্তা প্রচার করে নিজের দীনের মধ্যে মযবুতি হাসিল করা এবং নিজের দীনকে পরিপূর্ণ করার জন্য। তিন. বিভিন্ন লোকদের নিকট তাদের ভাল গুণাবলী হাসেল করার জন্য। [মালফুযাতে মাওলানা ইলিয়াস রহ., মালফুয নং ৮৬]

৪. এক কথায়, সমস্ত মুসলমানদের নবীজির আনীত দীন, অর্থাৎ ইসলামের পুরো ইলমী এবং আমলী নেযামের সাথে উম্মাতকে সম্পর্কযুক্ত করে দেওয়া। [মালফুযাতে মাওলানা ইলিয়াস রহ., মালফুয নং ২৪]

এ কারণেই হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস রহ. ছয়টি উসূল বর্ণনা করেছেন, যার মধ্যে ইসলামের পুরো ইলমী এবং আমলী নেযামের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। দাওয়াত ও তাবলীগের ময়দানে কাজ করার সময় কাজের মাকসাদ এবং ছয় ছিফাতের সঠিক ব্যাখ্যা স্বরণ রাখা আবশ্যক।

ছয় উসূলের ব্যাখ্যা

দাওয়াত ও তাবলীগে যে ছয়টা সিফাতের কথা বলা হয়, এগুলোর একটা নির্দিষ্ট মাকসূদ আছে। এগুলোর মাকসূদ হলো সূরা বাকারার ১৭৭ নং আয়াতে পাঁচটা বিষয় বলা হয়েছে। এই পাঁচটা বিষয় হলো দীনের মৌলিক কাজ।

১. শিরক মুক্ত ঈমান, ২. ইবাদত বন্দেগী সুন্নাত তরীকায় করা, ৩. মু‘আমালাত তথা রিযিক হালাল রাখা, ৪. মু‘আশারাত, তথা বান্দার হক আদায় করা, ৫. তাযকিয়া তথা অন্তরের দশটা রোগের চিকিৎসা করা।

মাওলানা হাকীমুল উম্মত থানভী (রহ:) এই আয়াতকে পুরা দ্বীনের খুলাসা বলেছেন। আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীন হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ, এর দিলে যে ছয় সিফাত ঢেলেছেন, তা মূলত এ আয়াতেরই খোলাসা।

কালিমা প্রসঙ্গ: ঐ ছয় ছিফাতের মধ্যে যে কালিমা আছে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য শিরক মুক্ত ঈমান। শুধু যতটুকু বলা হয়, আল্লাহর থেকে সব কিছু হয়, আল্লাহর হুকুম ছাড়া কিছু হয় না, এর সাথে শিরিকমুক্ত ঈমানও শিখতে হবে। একটা শিরক করলে পুরা ঈমান বাতিল।

নামায প্রসঙ্গ: এই নামায অর্থ শুধু নামায না। বরং নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, কাফন দাফন, ইবাদত বলতে যা বুঝায়। নামাযের জন্য সূরা-কিরাআত, মাসআলা-মাসাইল শিখতে হবে এবং বাস্তব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তা আমলে পরিণত করতে হবে। বাস্তব প্রশিক্ষণ ছাড়া সহীহ নামায শিক্ষা করা সম্ভবপর নয়।

ইকরামুল মুসলিমীন প্রসঙ্গ: ইকরামুল মুসলিমীন বলে দুটো বিষয় বুঝানে হয়েছে। এক নম্বর হলো, মু‘আমালাত। ভাইদের সাথে যে লেন দেন করা হবে, এটা সহীহভাবে করতে হবে।

ইকরামের সাথে করতে হবে। এজন্য ঐ আয়াতে বলা হয়েছে “والموفون بعهدهم إذا عاهدوا” মু‘আমালাতে কথা রক্ষা করবা, ভাইকে ঠঁকাইতে চেষ্ট করবা না। ইকরামুল মুসলিমীনের দুই নম্বর হলো মু‘আশারাত। এ জন্য ঐ আয়াতে বলা হয়েছে “وآت المال على حبه ذوى القربى واليتامى والمساكين” বান্দার হক।

ইকরামুল মুসলিমীন থেকে এটা মাথায় আনতে হবে যে, আমার বাপ মা বেঁচে থাকলে সাতটা হক, মরে গেলে আরো সাতটা হক। আমার বিবির এই এই হক। সন্তানের আসল হক তাকে মুসলমান বানানো। সারকথা হলো, ইকরামুল মুসলিমীনের প্রয়োগস্থল হলো মু‘আমালা ও মু‘আশারা।

তাসহীহে নিয়ত প্রসঙ্গ: তাসহীহে নিয়ত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আত্মশুদ্ধি। অর্থাৎ অন্তরের দশটা রোগ দূর করো, দশটা গুন অর্জন করো। তাসহীহে নিয়ত দশটা গুনের একটা। আরো নয়টা গুন আছে। দশটা রোগ দূর করতে হবে।

তাকাব্বুর দূর করতে হবে, হাসাদ দূর করতে হবে, যবানের হিফাযত শিখতে হবে ইত্যাদি। ইমাম গাজালী রহ. তাবলীগে দীন কিতাবে দশটা গুন ও দশটা রোগের বয়ান করেছেন, এই কিতাব বাংলা হয়ে গিয়েছে।

তাহলে এ পাঁচটা কথার মধ্যে পুরা দীন তথা আকাইদ, ইবাদাত, ইকরামুল মুসলিমীনে মু‘আমালাত মু‘আশারাত, আর তাসহীহে নিয়তের মধ্যে আত্মশুদ্ধি। এখন হলো, এই পাঁচটা ছিফাত আমার মধ্যে আসবে কিভাবে? আসার জন্য এখানে দুটো পয়েন্ট রাখা হয়েছে।

১. আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া, ২. ইলম ও যিকর। আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে দীনের উপর চলার আগ্রহ সৃষ্টি করো এবং উলামায়ে কেরাম থেকে মাসআলা-মাসাইল শিখো, যিকির শিখো, বিশেষভাবে বড় যিকির সহীহভাবে কুরআন তিলাওয়াত শিখো।

এই হলো, ছয় ছিফাতের খোলাসা, আর তার বাস্তবতা আমি এখন যা বললাম এই। ছয় ছিফাতকে যদি আমরা এভাবে বুঝতে পারি, তাহলে মাওলানা ইলিয়াস সাহেব (রহ:) (আল্লাহ ওনাকে জান্নাতুল ফিরদাউসের আ‘লা মাকাম নসীব করেন) যেটা বুঝাতে চেয়েছেন তা হবে।

মেহনতের আদব

১. দাওয়াত ও তাবলীগের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আদব হলো- যা আওয়াম-খাওয়াস, উলামা-জনসাধারণ সকলের জন্যই মনে রাখা আবশ্যক- এ মেহনতের দ্বারা সর্বপ্রথম নিজের হিদায়াতের নিয়ত, নিজের ঈমান মজবুত করার নিয়ত।

দ্বিতীয়ত যাকে দাওয়াত দেওয়া হচ্ছে , তার হিদায়াতের নিয়ত করা। আজ সমস্ত ‘দীনী তাহরীক’ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে , এর একটি মৌলিক কারণ হলো যে, মেহনতের দ্বারা অন্যের ইসলাহ এবং সংশোধনের নিয়ত করা হয়। নিজের সংশোধনের নিয়ত করা হয় না।

পবিত্র কুরআনে কারীমে সূরা ইয়াসীনে আল্লাহ তা‘আলা এক মুমিন বান্দার ঘটনার মাধ্যমে দাওয়াতের আদব শিক্ষা দিয়েছেন যে, দাওয়াতের ক্ষেত্রে সম্বোধন করতে হবে নিজেকে এবং সর্বপ্রথম মাকসাদ হবে নিজের হিদায়াত। [সূরা ইয়াসীন; আয়াত ২২]

وَمَا لِيَ لَا أَعْبُدُ الَّذِي فَطَرَنِي وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ

মাওলানা ইলিয়াস রহ.ও বলেছেন যে, “আমাদের এই দীনী দাওয়াতের কাজেরত সমস্ত সাথীদের একথা ভালভাবে বুঝিয়ে দেওয়া উচিৎ যে, তাবলীগ জামাতের বের হওয়ার উদ্দশ্য শুধু অন্যকে পৌঁছানো ও বাতলানো নয়। বরং এর দ্বারা নিজের ইসলাহ এবং তালীম ও তরবিয়তও উদ্দেশ্য। [মালফুযাতে হযরত মাওলানা ইলয়াস, মালফুয নং ১৩৪]

২. হযরত মাওলান ইলয়াস রহ. এর মালফুযাত, মাকাতিব খুব বেশি বেশি পড়তে হবে। কেননা, তার মালফুযাত এবং মাকাতিবের মধ্যে এ কাজের সঠিক নকশা দেয়া হয়েছে। উলামা এবং আওয়াম সকলের জন্যই তাতে হিদায়াত এবং দিক নির্দেশনা রয়েছে। বিশেষ করে যখন দাওয়াত ও তাবলীগ নিয়ে ফেতনা হচ্ছে, তখন এ বিষয়ের প্রথম মুরব্বীর দিক নির্দেশনা ছাড়া এ ফেতনা থেকে উত্তোরণ সম্ভব নয়।

৩. এ আদব দুটি ছাড়াও বিশেষভাবে উলামায়ে কেরামের জন্য এ মেহনতের সময় মনে এ কথা রাখতে হবে যে, আমার কাছে পুরো উম্মাতের দীনী আমানত রয়ে গিয়েছে। আমি ব্যবসায়ীদের জন্য ‘কিতাবুল বুয়ূ’ পড়েছি, আমি কৃষিজীবিদের জন্য ‘কিতাবুল মুযারআত, মুসাকাত’ পড়েছি, আমি বিচারক ও শাসনকর্তাদের জন্য ‘কিতাবুল হুদূদ, কিতাবুল কাযা’ ইত্যাদি পড়েছি, আমি সরকারী আমীন [জমি পরিমাপকারী]-এর জন্য কিতাবুল ফারায়েয, ‘কিতাবুল কিসমাহ’ পড়েছি। কাজেই ব্যবসায়ী, কৃষিজীবি, শাসনকর্তা, সরকারী আমীন তথা পুরো উম্মাতের আমানত আমার কাছে রয়ে গেছে।

কাজেই আমি উম্মাতের দ্বারে দ্বারে যাবো সেই আমানত পৌছে দেওয়ার জন্য। উম্মাত হিসাবে, ওয়ারিসে আম্বিয়া হিসাবে ‘নিয়াবাতে নববীর দায়িত্ব পালনের জন্য আমি আল্লাহর রাস্তায় বের হবো।

৪. আর জনসাধারনের জন্য দাওয়াতের এ মেহনত করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদব রয়েছে-

ক. দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের মাধ্যমে কেবল দীনের উপর চলার আগ্রহ সৃষ্টি হবে, এখন এ আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে উলামায়ে কেরামের কাছ থেকে দীনী মাসাইল শিখতে হবে এবং হক্কানী পীর-মাশায়েখের কাছ থেকে আত্মশুদ্ধির মেহনত করতে হবে।

মাওলানা ইলিয়াস রহ. নিজেই বলেছেন যে, ‘ইলম ও যিকির হাসিল করার তরীকা হলো যে, এই সাথীদেরকে আহলে ইলম এবং আহলে যিকিরগণের নিকট পাঠানো হবে, যেন এরা তাঁদের তত্ত্বাবধানে তাবলীগও করে এবং তাঁদের ইলম ও সাহচর্য দ্বারা উপকৃতও হয়। [মালফুযাতে হযরত মাওলানা ইলিয়াস, মালফুয নং ৫৪]

একদিন ফজর নামাযের পর যখন এই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী সাথীদের নিযামুদ্দীন মসজিদে একটি মজমা হচ্ছিল এবং হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. তখন এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন যে, তিনি বিছানায় শুয়ে শুয়েও উচ্চ আওয়াযে কথা বলতে পারছিলেন না, তখন তিনি খুব গুরুত্ব দিয়ে এক খাস খাদেমকে ডাকালেন এবং তার মাধ্যমে পূরা জামাতকে এই কথা বলে পাঠালেন যে, আপনাদের এই সমস্ত ঘুরা ফেরা (তাবলীগে সময় লাগানো) এবং সমস্ত চেষ্টা মেহনত সব বেকার হয়ে যাবে যদি আপনারা এর সাথে সাথে ইলমে দীন এবং যিকরুল্লাহর পরিপূর্ণ ইহতেমাম না করেন।

(যেন এই ইলম ও যিকির দুইটি ডানা যা ব্যতীত আকাশে উড্ডয়ন করা যায় না।) বরং ভীষণ ভয় এবং কঠিন আশংকা রয়েছে যে, যদি এই দুই বিষয়ের ব্যাপারে গাফলতি করেন তাহলে এই চেষ্টা মেহনত ফেৎনার উৎস এবং গোমরাহীর এক নতুন রূপ ধারণ করবে।

যদি দীনী বিষয়ে ইলমই না থাকে তাহলে ইসলাম ও ঈমান শুধু রসমী (গতানুগতিক) এবং নামকাওয়াস্তে থাকবে।…[মালফুযাতে হযরত মাওলানা ইলিয়াস, মালফুয নং ৩৫]

শাইখুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া রহ. কে লেখা এক পত্রে মাও. ইলিয়াস রহ. উল্লেখ করেন,
‘আমার দীর্ঘ দিনের আকাংক্ষা এই যে, তাবলীগের জামা‘আতগুলো বুযুর্গানে দীনের খানকাগুলোতে গিয়ে খানকার পরিপূর্ণ আদব রক্ষা করে সেখানকার ফয়েয-বরকতও গ্রহণ করুক।

খানকায় অবস্থানের সময়ের ভিতরেই অবসর সময়ে আশপাশের গ্রামগুলোতে গিয়ে দাওয়াতের কাজগুলোও যেন জারী থাকে। আপনি এই ব্যাপারে আগ্রহী লোকদের সাথে পরামর্শ করে কোন একটি নিয়ম ঠিক করে রাখুন। বান্দাও কিছু সংখ্যক সাথীসহ এই সপ্তাহেই হাজির হয়ে যাবে। দেওবন্দ এবং থানাভবনে যাওয়ারও ইচ্ছা আছে।’ [দীনী দাওয়াত: পৃ. ১০১]

দাওয়াত ও তাবলীগের মেওয়াতী সাথীদের প্রতি লেখা এক চিঠিতে হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. তাদের হিদায়াত দিয়ে লিখেছেন যে, “তাবলীগে বের হওয়ার খোলাসা (সারকথা) তিন জিনিসকে জিন্দা করা: যিকির, তালীম, তাবলীগ।

মেরে দোস্তোঁ আযীযোঁ! তোমাদের এক এক বছর সময় লাগানোর সংবাদ পেয়ে আমার যে আনন্দ হয়েছে তা লিখে প্রকাশ করার মত না। আল্লাহ কবুল করেন এবং আরো বেশি বেশি তাওফীক দান করেন।

আমি কয়েকটি বিষয়ে তোমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি: (১) নিজ নিজ এলাকায় যারা আগেই যিকির শুরু করেছে বা এখন করছে বা শুরু করে ছেড়ে দিয়েছে, তাদের তালিকা করে আমাকে বা শাইখুল হাদীস সাহেবকে লিখে পাঠাবে।

একটু পর লিখেন, ‘এক নম্বরে উল্লিখিত যিকির দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যাদেরকে বার তাসবীহের আমল দেওয়া হয়েছে তারা তা যথারীতি পূর্ণ করছে কিনা? এবং তারা আমাদেরকে জিজ্ঞেস করে আমল শুরু করেছে ?

নাকি নিজেদের সিদ্ধান্তে যিকিরকারীদের দেখে দেখে শুরু করেছে? প্রত্যেকের কাছে জিজ্ঞেস করে ধারাবাহিকভাবে বিস্তারিত জানাবে।

(২) আর যারা বাইআত হয়েছে, তাদের তালিকা এবং তারা বাইআতের পর যে হিদায়াত দেওয়া হয়েছে, তা পালন করছে কিনা তাও লিখবে। যারা বার তাসবীহের যিকির করছে, তাদেরকে রায়পুর গিয়ে একচিল্লা দেওয়ার জন্য উদ্ধুদ্ধ করবে। [মাকাতিবে হযরত মাওলানা ইলিয়াস ; পৃ. ১৩৬, মেওয়াতিদের প্রতি ১ নং চিঠি]

আর রায়পুর হলো, সাহারানপুর জেলার অন্তর্গত একটি এলাকা, এখানে উদ্দেশ্য,রায়পুরে অবস্থিত হযরত শাহ আব্দুর রহীম সাহেব রায়পুরীর খলীফা হযরত মাওলানা আব্দুল কাদের সাহেবের খানকা!

হযরত মাও. ইলিয়াস রহ. এর হিদায়াত দ্বারা স্পষ্ট বোঝা য্য়া যে, তিনি প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলীগ কে আত্মশুদ্ধির জন্য মোটেই যথেষ্ট মনে করতেন না; বরং আত্মশুদ্ধির জন্য বুযুর্গানে দীনের খানকায় যাওয়াকে আবশ্যক মনে করতেন।

বর্তমানে এ ব্যাপারে গোমরাহী ব্যাপকতা লাভ করেছে যে, দাওয়াত ও তাবলীগে কয়েক চিল্লা দিয়েই এ মানসিকতা তৈরি হয়ে যায় যে, আমার আত্মশুদ্ধি হয়ে গেছে! অথচ তার এ ধারণা বাস্তবতার বিরোধী বটেই, এমনকি হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর দৃষ্টিভঙ্গিরও সম্পূর্ণ বিপরীত।

সুতরাং আল্লাহর রাস্তায় সময় লাগানো পাশাপাশি উলামায়ে কেরামের সংশ্রবে ইলম শিক্ষা করা এবং পীর-মাশায়েখের সোহবাতে থেকে আত্মশুদ্ধির মেহনত করাও একান্ত আবশ্যক। এ বিষয়টি খুব ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে।

দীনী পরিবেশে যত জায়গায় ফেতনার সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল কারণ হলো, দায়িত্বশীল ও সংশ্লিষ্টদের আত্মশুদ্ধি না থাকা।

খ. দাওয়াতের এ মেহনতকে উলামায়ে কেরামের পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হয়েছে, এ বিশ্বাস নিজের মধ্যে ধারণ করে দাওয়াত ও তাবলীগ সহ সকল দীনী বিষয়ে তাদের নেতৃত্ব মেনে নিতে হবে এবং তাদের সাথে জুড়ে মিলে থাকতে হবে।

মনে রাখতে হবে যে, ঐ উম্মাত ধ্বংস হয়ে গেছে, যে উম্মাত তাদের হক্কানী উলামায়ে কেরাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। এ কারণেই হযরত আলী নদভী রহ. মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখ করে বলেন যে, আওয়াম ও উলামায়ে কেরামের অপরিচয় ও দূরত্ব কিছুতেই তাঁর বরদাশত ছিল না।

এটাকে তিনি মনে করতেন উম্মতের বিরাট দুর্ভাগ্য, ইসলামের ভবিষ্যতের জন্য বিরাট খাতরা এবং ধর্মহীনতা ও ধর্মদ্রোহিতার পূর্ব লক্ষণ মনে করতেন। [দীনী দাওয়াত; পৃ. ১২২]

গ. উলামায়ে উম্মাতের ব্যাপারে খারাপ ধারণা করা থেকে বেঁচে থাকা। তাদের সাথে মুহাব্বাত রাখা এবং তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ না করা। কেননা, উলামায়ে কিরামের প্রতি বিদ্বেষ সমস্ত মেহনতকে বরবাদ করে দেয়। এই উম্মতের কাছে বিশুদ্ধ দীন পৌঁছিয়েছেন উলামায়ে কেরাম।

তারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের নায়েব বা উত্তরাধিকারী। তারা জনগণকে দীন শিক্ষা দেয়ার জন্য পুরো জীবন ওয়াকফ করে দিয়েছেন। এইজন্য উম্মত উলামায়ে কেরামের কাছে ঋণী।

উলামাদের এই সহযোগিতা দুনিয়ার মতো আখেরাতেও লাগবে। আখেরাতে যে সমস্ত বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, ও মাদরাসা-মসজিদের হিতাকাংক্ষীরা নিজের আমল দিয়ে জান্নাতে যেতে অক্ষম হয়ে যাবে আল্লাহ তা‘আলা তাদের জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য হাফেয ও আলেমদের অনুমতি দিবেন।

তারা বেছে বেছে সেই সব মানুষদেরকেই জান্নাতে নিবেন, যারা দীনের কল্যাণকামিতায় উলামায়ে কেরামকে মুহাব্বাত করে মাদরাসা-মসজিদের উন্নতি-অগ্রগতিতে এবং দীনী মেহনত ও দীনী প্রতিষ্ঠানের বিপদাপদে পাশে ছিলো আর সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলো। কাজেই জান্নাতে যেতে উলামায়ে কিরামের সাহায্য লাগবে।

যারা দীনের মেহনত করেন -চাই তাবলীগের সাথী হোন বা চরমোনাইয়ের কর্মী, কিংবা মাদরাসা-মসজিদের কমিটি- যদি এই মেহনতের পরিণতিতে তাদের মনে উলামাদের প্রতি ইজ্জত ও আযমত এবং মুহাব্বত সৃষ্টি না হয় তাহলে তার মধ্যে দীন আসে নাই।

দীনের যত বড় থেকে বড় মেহনতকারীই হোক না কেন, দিলের মধ্যে যদি উলামায়ে দীনের প্রতি অভক্তি, ঘৃণা ও বিদ্বেষ থাকে তাহলে তার ঐ মেহনত আর দীনদারীর দুই পয়সারও দাম নেই। ফেতনার সময় যে কোনো মূহুর্তে তা কচুপাতার পানির মতই অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে।

ঠিক তেমনিভাবে দাওয়াত ও তাবলীগের বর্তমান পদ্ধতি-যা হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. শুরু করেছেন- নিঃসন্দেহে দীনের একটি মোবারক এবং বড় মেহনত। কিন্তু যদি এ মেহনতের দ্বারা উলামাদের প্রতি ইজ্জত এবং আযমত ও মুহাব্বাত সৃষ্টি না হয়, তবে বুঝতে হবে তার মধ্যে মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর তাবলীগ আসেনি; বরং অন্য কোনো তাবলীগ এসেছে।

কেননা, মাওলানা ইলিয়াস রহ. নিজের দারুল উলূম দেওবন্দের সন্তান এবং সারাজীবন তিনি উলামায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ এবং সহযোগিতার মাধ্যমে দাওয়াত ও তাবলীগের এ মোবারক কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন।

হযরতজী ইলিয়াস রহ. এর শায়খ হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাংগুহী (রহ.) বলেছেন, ‘যারা উলামায়ে কেরামের প্রতি অন্তরে বিদ্বেষ এবং বদগুমানী পোষণ করে তাদের চেহারা কবরে কুদরতিভাবে কেবলার দিক থেকে ঘুরিয়ে দেয়া হবে। যতই তাদের চেহারা কেবলামুখী করা হোক, তা কেবলার দিক থেকে ঘুরে যাবে!’

কাজেই অন্তরে উলামায়ে কিরামের প্রতি আযমত এবং মহব্বত থাকা দীন এবং ঈমান পরিপূর্ণ থাকার আলামত। আর যদি অন্তরে উলামায়ে কিরামের প্রতি বিদ্বেষ, আপত্তি এবং ঘৃণা থাকে তাহলে বুঝতে হবে, দীন ও ঈমানের মধ্যে ঘাটতি আছে।

সুতরাং অন্তরে উলামায়ে কিরামের প্রতি ঘৃণা এবং আপত্তি থাকলে মৃত্যুর আগে অতিসত্বর তওবা করে সেই আলেমের কাছ থেকে মাফ চেয়ে নেয়া জরুরী এবং আযমত ও মুহব্বতের সাথে তাদের অনুসরণ ও সহযোগিতা করা অপরিহার্য।

অন্যথায় পরিপূর্ণ দীনদার এবং পাক্কা সাচ্চা ঈমানদার হিসেবে দুনিয়া ত্যাগ করার ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে! সাইয়্যেদ আবুল হাসান নদভী রহ. বলেন, “মাওলানা ইলিয়াস রহ. দাওয়াত ও তাবলীগের সাথীদের মধ্যে উলামায়ে কেরামের কোন কথা বা কাজ বুঝে না এলে এর সুব্যাখ্যা গ্রহণ এবং সুধারণা পোষণের অভ্যাস গড়ে তুলতেন। [দীনী দাওয়াত; পৃ. ১২৩]

হযরতজী এটাও বলেছেন যে, “একজন সাধারণ মুসলমান সম্পর্কেও কোন কারণ ছাড়া বদগুমানী (খারাপ ধারণা পোষণ করা) নিজেকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করে। আর উলামায়ে কেরামের উপর প্রশ্ন উত্থাপন (বদগুমানী করা) তো এর চেয়ে অনেক বেশী মারাত্মক ও ভয়ংকর। [[মালফুযাতে হযরত মাওলানা ইলয়াস, মালফুয নং ৫৪]

ঘ. দীনী যে কোনো বিষয়ে উম্মাতের মাঝে বিশৃংখলা সৃষ্টি হলে, দীনী বিষয়ে বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কেরামের সিদ্ধান্তকেই যথার্থ এবং আমলযোগ্য মনে করা। উলামায়ে কিরামের অনুসরণে সকল ফিতনা থেকে হেফাজতের নিশ্চয়তা।

অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে, যারা উলামায়ে কিরামের প্রতি অন্তরে আযমত ও মুহব্বত লালন করে এবং উলামায়ে কিরামের জামা‘আতের সাথে জুড়ে তাদের পরিপূর্ণ অনুসরণ করে তারা ভয়ঙ্কর সব ফিতনা আর দীনের নামে বদদীনী থেকে নিরাপদে এবং হেফাজতে থাকে।

পক্ষান্তরে যারা উলামায়ে কেরামের নৈকট্য ও অনুসরণ থেকে বিরত থাকে এবং তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখে তারাই ফিতনা এবং গোমরাহীতে লিপ্ত হয়।

হযরতজী ইলিয়াস রহ. বলতেন, ‘প্রত্যেক যুগের সবলোকই নিজেদের বড়দের কাছ থেকে ইলম ও যিকিরের সবক নিতেন এবং তারাও তাদের তত্ত্বাবধানে থেকে এবং তাদের দিকনির্দেশনায় তা পরিপূর্ণ করতেন। এমনিভাবে আজও আমরা আমাদের বড়দের (উলামায়ে কেরাম ও বুর্যাগানে দীন) মুহতাজ।

অন্যথায় ورنہ شیطان کے جال میں پھنس جانے کا بڑا اندیشہ ہے۔
শয়তানের জালে আমাদের ফেঁসে যাওয়ার বড়ই আশংকা রয়েছে। [মালফুযাতে হযরত মাওলানা ইলিয়াস, মালফুয নং ১৩৪]

হযরত মাওলানা সা‘আদ সাহেব প্রসঙ্গ

মাওলানা সা‘আদ সাহেবের প্রতি উলামায়ে কেরামের আস্থা না থাকার মৌলিক কারণগুলো হলো-

১. দীনের বিভিন্ন বিষয়ের মনগড়া ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ।

২. তাবলীগের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে তাবলীগ ব্যতীত দীনের অন্যান্য মেহনতকে (যেমন, মাদরাসা শিক্ষা, তাসাওউফ ইত্যাদি) হেয় এবং গুরুত্বহীন সাব্যস্ত করা।

৩. পূর্ববর্তী মুরব্বীদের কাজের উসূল থেকে সরে যাওয়া।

এ তিনটি বিষয়ে উলামায়ে কিরাম বিস্তারিতভাবে তাদের অভিযোগ ও আপত্তি পেশ করেছেন।

সর্বশেষ উপমহাদেশের উলামায়ে কেরামের সারে তাজ দারুল উলূম দেওবন্দ সাদ সাহেবের ব্যাপারে তাদের সর্বশেষ যে অবস্থান তুলে ধরেছেন, তা সবিশেষ লক্ষণীয়-

“এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। সেটা হলো, এই (মূসা আ. এর) ঘটনার বিষয়েতো মাওলানা (সা‘আদ সাহেবে)-র রুজুকে সন্তোষজনক বলা যায়, কিন্তু তাঁর চিন্তাগত বিচ্যুতির ব্যাপারে দারুল উলুমের পক্ষ থেকে যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিলো, সে আশঙ্কা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

কারণ, কয়েকবার রুজুর পরও কিছুদিন পর পর তার এমন কিছু নতুন বয়ান আমাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, যেগুলোর মধ্যে আগের সেই মুজতাহিদসুলভ আন্দায, ভুল প্রমাণপদ্ধতি এবং দাওয়াতের ব্যাপারে নিজের বিশেষ চিন্তার সাথে শরী‘আতের বক্তব্যকে অন্যায়ভাবে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা বিদ্যমান।

এই কারণে শুধু দারুল উলুমের দায়িত্বশীলগণই নন, বরং অন্যান্য হক্কানী উলামায়ে কিরামদের মাঝেও মাওলানা (সা‘আদ) সাহেবের ‘সামগ্রিক চিন্তার’ ব্যাপারে প্রচন্ড রকমের অনাস্থা রয়েছে।

মাওলানা (সা‘আদ) সাহেবের এই অনর্থক ইজতিহাদ দেখে মনে হয় যে, আল্লাহ না করুন, তিনি এমন এক নতুন দল তৈরির দিকে চলেছেন, যারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত বিশেষ করে নিজেদের আকবিরদের থেকে ভিন্ন রকমের হবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে আকাবির ও পূর্বসুরীদের পথ ও পদ্ধতির উপর অটল রাখুন। আমীন।”

কাজেই মাওলানা সাদ সাহেবের প্রসঙ্গে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় হলো-

১. যেহেতু বিষয়টি দীনী বিষয়, এবং এমন একটি বিষয়, যুগ যুগ ধরে যার পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছেন উলামায়ে কেরাম, কাজেই আমাদের উচিত হবে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাকরাইল অন্যান্য স্থানের উলামায়ে কেরামের পরামর্শ অনুযায়ী নিজেদের পরিচালিত করা।

২. দ্বিতীয়ত, এ মূলনীতি মনে রাখতে হবে যে, ইসলামে স্থান বা ব্যক্তির পূজা করা নিষেধ। কোনো স্থান কখনোই অনুসরণীয় হতে পারে না। মক্কা-মদীনা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বরকতময় স্থান, কিন্তু কুরআন-হাদীসে কোথাও বলা হয়নি যে, মক্কা-মদীনার অনুসরণ করতে হবে।

হ্যাঁ, ব্যক্তি অনুসরণীয় হতে পারে, যতক্ষণ সে হকের উপর থাকবে। খলীফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.) একদিন জুম‘আর নামাযের খুতবায় সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি যদি কুরআন-হাদীসের বিপরীত কোনো কাজ করি তাহলে তোমরা কী করবে? উত্তরে একজন যুবক দাঁড়িয়ে তলোয়ার কোষমুক্ত করে বললো, আমরা বোঝাতে সক্ষম না হলে এই তলোয়ার দিয়ে আপনাকে সোজাপথে আনা হবে।

৩. তৃতীয়ত, মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে, কাজেই জীবিত কোনো মানুষের ব্যাপারে এমন ধারণা না করা যে, তার থেকে কোনো ভুল প্রকাশ পাওয়া অসম্ভব। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন-

لا يقلدن أحدكم دينه رجلا، فإن آمن آمن، وإن كفر كفر، وإن كنتم لا بد مقتدين فاقتدوا بالميت ; فإن الحي لا يؤمن عليه الفتنة

তোমাদের কেউ যেন কারো এমনভাবে অনুসরণ না করে যে, সে [অনুসৃত ব্যক্তি] ইমান আনলে, সেও [অনুসরণকারী ব্যক্তিও] ঈমান আনে।

সে কুফরী করলে সেও কুফরী করে। যদি কারো অনুসরণ করতেই হয়, তবে মৃত ব্যক্তিদের অনুসরণ করো, কেননা, জীবিতগণ ফেতনার আশঙ্কামুক্ত নন। তবরানী কাবীর; হা.নং ৮৭৬৪ মাজমাউয যাওয়ায়েদ; হা.নং ৮৫০ হাদীসটির সনদ হাসান।

৪. চতুর্থত, দাওয়াত ও তাবলীগের প্রাণপুরুষ হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর মালফুয আমাদের হৃদয়ঙ্গম করতে হবে-

হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস রহ. ইরশাদ করেন, “এই সিলসিলার একটি উসূল এই যে, স্বাধীনভাবে ও নিজের মনমত না চলা। বরং নিজেকে ঐ সমস্ত বুযুর্গদের পরামর্শ অনুযায়ী পরিচালনা করা যাদের উপর দীনী বিষয়ে আমাদের পূর্ববর্তী আকাবির হযরতগণ আস্থা রেখে গেছেন ।

যে সকল বুযুর্গদের আল্লাহ তা‘আলার সাথে খাস সম্পর্ক রয়েছে- বোঝা যায় এবং সেটা সর্বস্বীকৃত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর সাহাবা কেরাম রাযি. এর সাধারণ মাপকাঠি এটিই ছিল যে নবীজি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদের উপর বেশী আস্থা রাখতেন তারাও তাদের উপর বেশী আস্থা রাখতেন।

পরবর্তীতে যুগে আস্থারযোগ্য ঐসমস্ত বুযর্গানে দীন ছিলেন যাদের উপর হযরত আবু বকর রাযি. ও হযরত উমর রাযি. রেখে গেছেন। দীনের কাজে আস্থা রাখার জন্য বহুত সতর্কতা ও হুশিয়ারীর সাথে নির্বাচন করা জরুরী। অন্যথায় অনেক বড় ধরনের গোমরাহীর আশঙ্কা রয়েছে। [মালফুযাত : ১৪৩নং মালফুয]

কাজেই বর্তমানে নিযামুদ্দীনকে অনুসরণীয় মনে করা যেমন ভুল, তেমনি সাদ সাহেবের ভুল হওয়ার পরও [গ্রহণযোগ্য রুজু না হওয়া পর্যন্ত ] তার অনুসরণ করা, কিংবা তাকে ভুলের উর্ধ্বে জ্ঞাণ করা, কিংবা নিযামুদ্দীনের প্রবীন মুরব্বীদের তত্ত্বাবধান, দারুল উলূম দেওবন্দ সহ পুরো বিশ্বের উলামায়ে কেরামের অনাস্থা প্রকাশের পরও তাকে মেনে নেয়া এবং মান্য করা নিঃসন্দেহে গোমরাহী।

[শাইখুল হাদিস মুফতি মনসূরুল হকের সমস্ত বয়ান, মালফুজাতসহ উলামা ও তাবলীগের মুরব্বিদের অসংখ্য বয়ান ও কিতাবের অন্যন্য অ্যাপ ইসলামী যিন্দেগী। উপকারী অ্যাপটি আপনার মোবাইলে এখনই ইনস্টল করতে ক্লিক করুন ]

এ গোমরাহী থেকে বাঁচার জন্য যতদিন পর্যন্ত সা‘আদ সাহেব নিম্নোক্ত দুটি কাজ না করবেন, ততদিন তাকে অনুসরণ করার অর্থ হবে একটি ‘গোমরাহ দল’ সৃষ্টিতে সহায়তা করাঃ

ক. সবধরনের বিতর্কিত বক্তব্যের ব্যাপারে প্রকাশ্যে, স্পষ্ট শব্দে ভুল স্বীকার করত সঠিক ব্যাখ্যা দিবেন এবং এ রুজু উপর তিনি অটল-অবিচল থাকবেন। কেবল দারুল উলূমের সামনে তাওবা করলে হবে না। কেননা, তাওবার নিয়ম হলো যে, অপরাধ প্রকাশ্যে হলে প্রকাশ্যে আর গোপনে হলে গোপনে তাওবা করতে হবে।

সাহাবী হযরত মু‘আজ ইবনে জাবাল রাযি. কে নবীজি ওসীয়্যত করে বলেন,
عليك بتقوى الله ما استطعت، واذكر الله عند كل حجر، وشجر، وما عملت من سوء فأحدث لله فيه توبة، السر بالسر، والعلانية بالعلانية

তুমি যথাসম্ভব আল্লাহর ভয় অর্জন করো। প্রত্যেক পাথর এবং গাছের নিকটে আল্লাহর যিকির করো। আর যে গোনাহের কথা তোমার মনে আছে, তার ব্যাপারে তাওবা করো। প্রকাশ্যে [গোনাহ] হলে প্রকাশ্যে [তাওবা করো], গোপনে [গোনাহ] হলে গোপনে [তাওবা করো]। [তবরানী কাবীর; হা.নং ৩৩১, মাজমাউয যাওয়ায়েদ; ১৬৭৫৩]

কাজেই সা‘আদ সাহেব যেহেতু বিতর্কিত বক্তব্যগুলো আম বয়ানে বলেছেন, কাজেই তাওবা এবং রুজুও আম বয়ানে হতে হবে। এক একটি ভুল উল্লেখ করবেন, আত্মস্বীকৃতি দিবেন, এবং সঠিক বিষয়টি তুলে ধরবেন।

ক. তাবলীগের পূর্ববর্তী তিন হজরতজীর ‘নির্দেশিত পন্থায়’ তাবলীগের কাজ করবেন এবং এ জন্য নিযামুদ্দীনের প্রবীণ মুরব্বীদেরকে নিযামুদ্দীনে ফিরিয়ে এনে তাদেরকে চোখের সামনে রেখে দেখে দেখে, তাদের পরামর্শমত চলবেন।

তবে, সবসময়ের জন্য লক্ষ রাখতে হবে যে, উলামায়ে কিরাম মাওলানা সা‘আদ সাহেবের রুজুর স্বীকৃতি দেয়ার আগ পর্যন্ত জনসাধারণ তার অনুসরণ ত্যাগ করলেও হক্কানী উলামায়ে কিরামের তত্ত্বাবধানে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ সর্বাবস্থাতেই চালিয়ে যেতে হবে। এ ব্যাপারে কোন অলসতা করা যাবে না।

আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন।

প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন