২০১৮-০২-১৯

বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

বেফাকের অধীনে ইফতার পরীক্ষা: আদৌ কী সম্ভব?

OURISLAM24.COM
news-image

মুফতি মুহাম্মদ শরীফ মালিক

উপমহাদেশে পৃথকভাবে তাখাসসুস ফিল ইফতা (উচ্চতর ইসলামি আইন গবেষণা বিভাগ) এর সূচনা হয় ঊনবিংশ শতাব্দির মাঝামাঝির দিকে। এর আগে এ বিষয়টি পৃথকভাবে ছিল না; বরং তা দরসিয়াতের মধ্যেই সন্নিবেশিত ছিল।

আকাবিরে দেওবন্দের মধ্যে যাদের আমরা ফকিহ হিসাবে অনুসরণ করি তারাও দরসিয়াতে সীমাবদ্ধ থেকেই ফকিহ হয়েছেন। সময়ের আবর্তনে ব্যস্তময় জীবনে দরসিয়াতে সীমাবদ্ধ থেকে বিশেষ দিকগুলোতে ছাত্ররা পাকাপোক্ত হচ্ছিল না দেখে আকাবিরে দেওবন্দ মানবীয় সবচে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তথা ‘ফিকাহ’কে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে তা পৃথকভাবে অধ্যয়নের ব্যবস্থা করেন।

তখন থেকেই তাখাসসুসের ধারাবাহিকতার সূচনা হয়। আস্তে আস্তে এ ধারাবাহিকতা বাংলাদেশেও শুরু হয়।

একুশে বইমেলার সব বই দেখতে ও কিনতে ক্লিক করুন

বর্তমান বাংলাদেশে সাধারণত তিন ধরনের ইফতা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ১. দারুল উলুম দেওবন্দের আদলে ইফতা বিভাগ। ২. পাকিস্তানের আদলে দারুল ইফতা ওয়াল ইরশাদ। ৩. সৌদি আরবের কুল্লিয়ার আদলে কিসমুদ্দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদ।

দারুল উলুম দেওবন্দের ইফতা কোর্স এক বছরের। দারুল উলুম করাচিসহ পাকিস্তানের স্বনামধন্য দারুল ইফতা ওয়াল ইরশাদের মেয়াদকাল তিন বছর, তন্মধ্যে দুই বছর বাধ্যতামূলক ও এক বছর ঐচ্ছিক।

সৌদি আরাবিয়ার কুল্লিয়ার মেয়াদ চার বছর। প্রত্যেকের মানহাজ (সিলেবাস) ভিন্ন ভিন্ন।
বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সব দারুল ইফতা ও মাঠ-ময়দান সার্ভে করে প্রমাণিত হলো, এক বছরের তুলনায় দুই বছরের কোর্সেই ছাত্ররা বেশি উপকৃত হচ্ছে।

অনেকে বলছেন, এক বছরে এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রপ্ত করা দূরহ ব্যাপার। সিলেবাসের দিক থেকে কারো কারো মতে দারুল উলুম দেওবন্দের সিলেবাসই মাননীয়। আবার অনেকেই বলছেন, দারুল উলুম করাচি বা পাকিস্তানের সিলেবাসই আধুনিকায়নসমৃদ্ধ ও অধিকতর ফলপ্রসু।

আবার অনেকেই সৌদি আরবের মানহাজকে উপকারী মনে করছেন।

তাছাড়াও প্রতিটি দারুল ইফতাতেই আমাদের দেশের ভাবধারা, ছাত্রদের মেধা ও জাতীয় চাহিদার প্রতি খেয়াল করত উল্লিখিত তিন মডেলের মানহাজেই সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, বেফাকের দশম কাউন্সিলে ইফতা বিভাগের সমাপনী পরীক্ষা বোর্ডের আওতায় নেয়ার সুপারিশ আনা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, তা কীভাবে সম্ভব! মডেল তো তিনটা, মানহাজ (সিলেবাস) তো বে-শুমার।

তাহলে বেফাক কাকে মডেল হিসাবে ধরবে কাকে ছাড়বে? কার মানহাজকে ফলো করবে আর কারটা উপেক্ষা করবে? না-কি সবগুলোর আদলে নতুন মানহাজ বানাবে? না সবগুলো বাদ দিয়ে ভিন্ন মানহাজ (সিলেবাস) তৈরি করবে?

যদি কোনো একটা গ্রহণ করে, তাহলে অন্যরা তা মানতে পারবে কী? আর যদি সবগুলো বাদ দিয়ে ভিন্ন কিছুর অবতারণা করে তাহলে দীর্ঘ দিন থেকে চলে আসা উচ্চমানের দারুল ইফতাগুলোর স্বকীয়তা ও খ্যাতি বহাল থাকবে কি-না?

এছাড়াও জটিল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় মুফতিদের মধ্যে যারা নিজেদের সার্বক্ষণিক তাখাসসুসের খেদমতের সঙ্গে নিয়োজিত রেখেছেন বা যারা আজ জাতির প্রতিক্ষিত মুফতি হিসাবে মনোনীত হয়েছেন তারাও কিন্তু তিনভাগে বিভক্ত।

তারা নিজ নিজ আইডল ও মানহাজকে ফলো করেই ইফতার কাজ আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। এদের অনেকেই বেফাকের বিশেষ কোনো পদে নেই।

আবার যে বা যারাই বেফাকের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছেন তাদের কোনো উল্লেখযোগ্য দারুল ইফতা নেই বা মুফতি হিসাবে খ্যাত নন।

তাহলে কারা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ করবেন? কাকে মডেল হিসাবে চয়ন করবেন? কোন মানহাজকে ফলো করবেন? এটা জাতির জিজ্ঞাসা।

যে কথা না বললেই নয়, বাংলাদেশের ফতোয়া বিভাগগুলো অনেকটাই মুফতিকেন্দ্রিক। প্রত্যেক মুফতি নিজ নিজ অভিরুচি, মতাদর্শ ও সুদূরপ্রসারী চিন্তাধারার আলোকে তা পরিচালনা করে থাকেন।

শিক্ষার্থীরাও নিজেদের রুচি ও পছন্দসই মুফতি থেকে বিশেষ পি.এইচ.ডি অর্জন করার ইখতিয়ার লাভ করে থাকে।

আর পি.এইচ. ডি যেহেতু সাধারণত নির্দিষ্ট ব্যক্তির অধীনেই করতে হয় তাহলে বোর্ডের অধীনে হওয়ার ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত দক্ষ ও খ্যতিমান মুফতি বাদ দিয়ে বোর্ড থেকে উক্ত ডিগ্রি অর্জন বাধ্যমূলক হয়ে যাচ্ছে।

এতে ছাত্ররা যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন বাদ দিয়ে ডিগ্রির পেছনে ছুটতে থাকবে। তাছাড়াও বিশেষ কিছু মনীষীর হৃদয়গ্রাহী, চেতনাশীল ও বিপ্লবী তরয-তরিকা থেকে এদেশের ছাত্ররা বঞ্চিত হবে। এটাও কাম্য নয়।

মোট কথা হলো, বর্ণিত সমস্যগুলোর শুরাহা না করে পরীক্ষা গ্রহণের চিন্তধারা আদৌ সম্ভব কি-না এটা ভাববার বিষয়। এ বিষয়ে বেফাকের পদক্ষেপ কী? এ নিয়েও জনমনে নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

আশাকরি, ‘বেফাক’ কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো আন্তরিকতার সাথে বিবেচনা করবেন। উল্লিখিত সমস্যাবলী থেকে উত্তরণের পথ-পন্থা জাতির সামনে অতিসত্তর পরিষ্কার করবেন।

আল্লাহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন॥

লেখক: প্রধান মুশরিফ: উচ্চতর ইসলামী আইন গবেষণা বিভাগ, শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা