২০১৮-০২-১৭

সোমবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

দৈনিক পত্রিকার ধর্মপাতা ও একটি সরল পর্যালোচনা

OURISLAM24.COM
news-image

সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন

ধর্ম কোনো পণ্য নয়। ধর্ম আমাদের সত্য এবং মিথ্যার ব্যবধান শেখায়। সুমহান হতে চাইলে অবশ্যই ধর্মব্যবসা পরিত্যাগ করতে হবে আমাদের।

এমন ভাবনা থেকেই আজকের লেখায় দেশের পাঠকপ্রিয় কয়েকটি দৈনিকের ধর্ম পাতা নিয়ে সাপ্তাহিক আয়োজনের একটি পর্যালোচনা তুলে ধরা হলো। এক্ষেত্রে ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত পত্রিকার তথ্য নেওয়া হয়েছে।

প্রথমেই বলছি দৈনিক যুগান্তর-এর ‘ইসলাম ও জীবন’ পাতা নিয়ে। এ সংখ্যায় লিড হিসেবে রয়েছে সাইফু ইসলাম-এর লেখা ‘মাতৃভাষায় কলম ধরার আর কত দেরি পাঞ্জেরি’ শিরোনামের লেখাটি।

একুশে বইমেলার সব বই দেখতে ও কিনতে এখানে ক্লিক করুন

তিনি লিখেছেন, ‘…প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো কোনো মাদরাসায় কিছুটা হয়তো বাংলা রয়েছে; কিন্তু মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চতর পর্যায়ে বাংলা পড়ানো তো হয়ই না, বাংলা মাধ্যমেও কিছু পড়ানো হয় না। এমনকি কোনো কোনো মাদরাসায় তো শিক্ষকরা ক্লাসের পাঠদান পর্যন্ত করেন আরবি, উর্দু, ইত্যাদি ভাষায়। সেগুলোতে প্রাথমিক পর্যায়েও বাংলা পড়ানোর কোনো ব্যবস্থা নেই।’

মাদরাসাগুলোতে আদতেই বর্তমানে এমন পরিবেশ আছে কিনা লেখক আরেকটু ভেবে দেখবেন। আমি যতদূর জানি এখন বাংলা চর্চায় মাদরাসা বেশ এগিয়েছে। এর প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে একই পাতার পরের একটি লেখায়।

আসিফ আসলাম ‘একদিন মাদ্রাসা পড়ুয়ারা বাংলা সাহিত্যের নেতৃত্ব দেবেন’ শিরোনামের লেখায় তুলে ধরেছেন ১৯৮৪ সালের ১৪ মার্চ কিশোরগঞ্জের জামিয়া ইমদাদিয়া প্রাঙ্গণে বিশিষ্ট আলেম, ইসলামি বৃদ্ধিজীবী ছাত্র-শিক্ষক সম্মেলনে ব্যক্ত করা সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর বক্তব্য।

অংশবিশেষ ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় পুণ্য নেই, পুণ্য শুধু আরবিতে, উর্দুতে কোথায় পেয়েছেন এ ফতোয়া? এ ভ্রান্ত ও আত্মঘাতী ধারণা বর্জন করুন, এটা অজ্ঞতা, এটা মূর্খতা এবং আগামী দিনের জন্য এর পরিণতি ভয়াবহ।’

‘মুসলিম বাঙালির ভাষাপ্রেম’ শিরোনামে তরীকুর রহমান লিখেছেন, ‘…ঐশীগ্রন্থগুলো যদি নবী-রাসুলদের স্বজাতির ভাষা বৈ অন্য ভাষায় নাজিল হতো তাহলে মহিমান্নিত এই গ্রন্থগুলো নাজিলের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হতো। সত্য সুন্দরের পথ প্রদর্শন ও মর্ম অনুধাবনের পরিবর্তে পরম শ্রদ্ধাভরে গ্রন্থগুলো আলমিরাতে সাজানো বৈ আর কোনো লাভ হতো না। আল্লাহ প্রদত্ত এই ঐশীগ্রন্থগুলো নাজিলের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে মর্মার্থ বুঝে পড়া।’

‘কোরআনে ভাষার আলোচনা’ শীর্ষক লেখায় মোহাম্মদ আবু তালহা তারীফ লিখেছেন, ‘…মানব জীবনে অপরিহার্য হলো তার ভাষা। ভাষার মাধ্যমে বিকশিত হয় তার সৌরভ।’

‘বইমেলায় তরুণ আলেমদের বই’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তানজিল আমির তুলে ধরেছেন অমর একুশে গ্রন্থমেলায় এ প্রজন্মের তরুণ আলেমদের প্রকাশিত কয়েকটি বইয়ের পরিচিতি। বলা যায়, ভাষার মাসে যুগান্তর-এর এ সংখ্যাটি ছিল ভাষাকেন্দ্রিক লেখা নিয়ে আয়োজন। বিভাগীয় সম্পাদককে সাধুবাদ জানাই তার মাতৃভাষাপ্রেম বিবেচনায়।

এবার আলোচনায় আসছে দৈনিক ইত্তেফাক-এর ‘ধর্মচিন্তা’। সাপ্তাহিক আয়োজনে পাতাটির শতকরা ৬৫ ভাগ জুড়ে আছে বিজ্ঞাপন। ধর্মচর্চায় আগ্রহীরা পাতা দেখে হতাশ হয়েছেন নিশ্চয়ই।

লিড ‘দৈনন্দিন জীবনে মাতৃভাষা চর্চা’ শিরোনামে লিখেছেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান। অংশবিশেষ, ‘…প্রত্যেক মানুষের উচিত মুখ থেকে বেফাঁস কোনো কথা বের করার আগে এর পূর্বাপর সব দিক চিন্তাভাবনা করা।’

তার এই বার্তাটি সত্যিই আমাদেও ভাবিয়ে তুলে। ‘তব নাম’ শীর্ষক লেখাটিতে আবদুন নূর চলতি গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত একটি বইয়ের পরিচিতি তুলে ধরেছেন।

মুফতি হেলাল উদ্দীন হাবিবী লিখেছেন ‘এতিমের সম্পদ আত্মসাতের পরিণাম’ শিরোনামের লেখাটি। হতে পাওে এটি বিভাগীয় সম্পাদকের পছন্দের বা ফরমায়েসী একটি লেখা এটি। যে লেখার সাথে জলছাপ হয়ে জড়িয়ে থাকতে পারে সম্প্রতি আদালতের দেওয়া খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের বিষয়টি। আলোচিত সংখ্যায় প্রকাশিত তিনটি লেখাই পরিসরে খুবই ছোট।

অন্তত মূল দুটি লেখা আরও ব্যাপক হলে ভালো হতো। বলা যায়, সংখ্যা না বাড়িয়ে স্বল্প পরিসরে একটি লেখাও দেওয়া যেত।

দৈনিক ইনকিলাব-এর ধর্ম বিষয়ক পাতার নাম ‘ইসলামী জীবন’। ভাষার মাস হলেও আলোচিত সংখ্যায় মূল লেখা হিসেবে স্থান পেয়েছে ‘জাহান্নামের শাস্তি শেষ হবে না কখনো’। লিখেছেন মোহাম্মদ জাফর ইকবাল ।

ধারাবাহিক লেখাটির এদিন প্রকাশিত হয় শেষ পর্ব। অংশবিশেষ পাঠ করা যেতে পারে ‘…জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া হবে কোনো বান্দার জন্য সবচেয়ে সেরা সফলতা। তাই আমাদের সর্বদা পাপের কাজ ত্যাগ করা প্রয়োজন।’

‘ইসলামে নারী শিক্ষার গুরুত্ব’ শীর্ষক লেখাটি লিখেছেন মাওলানা আবদুল হান্নান তুরুকখলী। গতানুগতিক ধারার একটি লেখা।

আরও একটি গতানুগতিক ও ধারাবাহিক লেখা ‘ইসলামে মানব সম্পদ উন্নয়নের গুরুত্ব’। লিখেছেন মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান।

তবে ভিন্ন কিছু হিসেবে রয়েছে ‘ইসলামী কর্মতৎপরতা’ বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনের খবর; ‘আল কোরআন ও আল হাদীসের আলোকে’ বিভাগে একটি করে আয়াত ও হাদীসের অনুবাদ; ‘আল কোরআনের কাব্যানুবাদ’; অতি সংক্ষেপে ‘মহানবীর সা. ধারাবাহিক জীবনী’; ‘দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম’ (প্রশ্নোত্তর)।

দৈনিক সমকাল-এর ‘ইসলাম ও সমাজ’ শীর্ষক ধর্ম বিষয়ক পাতাটি ছিল ৯ নং পাতার নিচের ভাগ (অর্ধেক)। বলা যায়, একটা বিভাগ ধরে রাখার চেষ্টা। হতে পারে ডিজিটাল যুগের ভালোবাসা দিবস (!) বিবেচনায় রেখে ‘মুমিনের ভালোবাসা’ এই সংখ্যার মূল লেখা। লিখেছেন আবু রুফাইদাহ রফিক।

‘ওয়াদা রক্ষা করুন’ শিরোনামে লিখেছেন কাজী সুলতানুল আরেফিন। ভাষার মাসে ‘ইসলামে মাতৃভাষার মর্যাদা’ শিরোনামে লিখেছেন মাওলানা শাহ আবদুস সাত্তার। এই লেখাটি লিড করলে খুব বেশি বাজে কিছু হতো না নিশ্চয়ই।

দৈনিক কালের কণ্ঠ-এর ‘ইসলামী জীবন’ পাতায় প্রকাশিত মূল লেখাটি হচ্ছে, ‘কোরআন ও বিজ্ঞানের আলোকে ভাষার জন্মকথা’। লিখেছেন মাওলানা কাসেম শরীফ।

রুকন রাশনান ইনআম লিখেছেন ‘কোরআনের অনুবাদে সর্বাধিক সতর্কতা প্রয়োজন’। ‘সাহাবায়ে কেরামের ভাষা ও সাহিত্যচর্চা’ শিরোনামে লিখেছেন মুহাম্মাদ মিনহাজ উদ্দিন।

অংশবিশেষ পাঠ করা যেতে পারে ‘… রাসুল (সা.)-এর সাহাবিদের প্রত্যেকেই ছিলেন নিজস্ব ভাষা (আরবিতে) অত্যন্ত পারদর্শী ও সাহিত্যপ্রতিভার অধিকারী। কবিতার ক্ষেত্রে রাসুলের সাহাবিখ্যাত ‘ত্রয়ী’ হাসসান ইবনে সাবিত, আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ও কাব ইবনে মালিক (রা.)-এর পারঙ্গমতা সাহিত্যমহলে সুবিদিত।

প্রধান চার খলিফার তিনজনই সাহিত্যাকাশে চৌদ্দশির মতো আলো ঝলমলে। ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনানুযায়ী তাঁদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা প্রচুর কবিতা রয়েছে। প্রসিদ্ধ কিছুসংখ্যক সাহাবির শের বা কবিতা নিয়ে বৃহৎ কলেবরে অনেক বইও বের হয়েছে।’

‘ভাষা আন্দোলনের সাক্ষী চাঁদপুরের ওসমানিয়া কওমি মাদরাসা’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি লিখেছেন মুহাম্মদ আরিফুর রহমান।

এককথায় বলা যায়, সমৃদ্ধ একটি সংখ্যা। সাধুবাদ জানাই দৈনিক কালের কণ্ঠ-এর  ‘ইসলামী জীবন’ পাতার বিভাগীয় সম্পাদককে।

দৈনিক নয়া দিগন্ত-এর ‘ইসলামী দিগন্ত’ পাতায় দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ইঙ্গিত করে আলোচ্য সংখ্যার লিড ‘সংলাপের গুরুত্ব’। ড. ইউসুফ আল কারযাভীর লেখাটি অনুবাদ করেছেন সানাউল্লাহ।

‘ভাষা আল্লাহর কুদরতি নিদর্শন’ শিরোনামে লিখেছেন জাব্বার করিম। মাওলানা জাফর আহমাদ লিখেছেন ‘সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে সূরা হুজরাত’ শীর্ষক লেখাটি। ‘মসজিদমুখী হোক যুবসমাজ’ শিরোনামের লেখাটি লিখেছেন মুহাম্মদ ছফিউল্লাহ হাশেমী। একই সংখ্যায় ইয়াসমিন নূর লিখেছেন ‘মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ কল্যাণ বয়ে আনে’।

ইফোর্ট: টি শার্টে আধুনিকতা ও শালীনতার সমন্বয়

দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ-এর ‘ইসলাম ও সমাজ’ পাতায় মূল লেখা ‘তোমরা কি তবুও জাগবে না’। মূল সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদবী; অনুবাদ : মুফতি আবদুল হালীম।

‘একাধিক বিয়ে ও নারী নির্যাতন’ শিরোনামে লিখেছেন মুফতি কাজী সিকান্দার। ‘জুমার দিনের সুন্নতগুলো’ লিখেছেন রোমানা আক্তার। আবু আফিফা লিখেছেন ‘মসজিদে নামাজের ১১ উপকারিতা’ শিরোনামে।

পাঠক হিসেবে ধর্মকেন্দ্রিক এসব পাতায় আরও ভালো কিছু পেতে চাই। বিষয় নির্বাচনে বিভাগীয় সম্পাদকরা আরও সতর্ক ও যত্নবান হবেন বলে আশা করি। নিছক পাঠক ধরে রাখার জন্য কোনো রকমের একটা পাতা করাটাও হবে ধর্মের বিচারে প্রতারণা।

প্রসঙ্গত, এই লেখা কোনো যুক্তিতেই আমার অনধিকার চর্চা নয়; একটা সময় ছিল যখন দু’হাতে লিখেছি ধর্ম বিষয়ে। প্রথম শ্রেণির কোনো দৈনিকে নামে-বেনামে কিংবা সংক্ষিপ্ত নামে একদিনে একাধিক লেখাও লিখেছি মহান রাব্বুল আলামিনের দয়ায়।

লেখক : কবি, গবেষক ও সাংবাদিক
সহযোগী সম্পাদক, আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকম