সোমবার, ২১ মে ২০১৮

‘বয়সের ব্যবধান সত্বেও পরিবারে সবার বন্ধন ছিলো বন্ধুত্বের’

OURISLAM24.COM
ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৮
news-image

[জামিয়া দারুল উলুম করাচির মুখপাত্র ‘ماہنامہ البلاغ মাহনামা আল-বালাগ’ এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত বিশ্বনন্দিত আলেম, স্কলার আল্লামা তাকি উসমানির আত্মজীবনী আওয়ার ইসলামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হচ্ছে আলহামদুলিল্লাহ।

এ বিষয়ে আল্লামা তাকি উসমানি আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ার ইসলামকে ভাষান্তর করে প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন। গত ২ জানুয়ারি জামিয়া দারুল উলুম করাচির তাখাসসুস ফিল ইফতার শিক্ষার্থী, আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকমের শুভাকাঙ্ক্ষি উমর ফারুক ইবরাহীমীর মাধ্যমে আল্লামা তাকি উসমানি ও পত্রিকা কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মজীবনী ‘ইয়াদে’ অনুবাদের অনুমতি চাওয়া হলে তারা খুশি মনে রাজি হন এবং আওয়ার ইসলামকে ধন্যবাদ জানান বাংলাভাষায় ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য।

আল্লামা তাকি উসমানির নতুন ধারাবাহিক আত্মজীবনী “یادیں ইয়াদেঁ ” মাহনামা আল-বালাগে সফর ১৪৩৯ হিজরি, নভেম্বর ২০১৭ ইংরেজি মাস থেকে। আওয়ার ইসলামে লেখাটি প্রতি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হচ্ছে। আজ ছাপা হলো ১০ম কিস্তি। অনুবাদ করেছেন মাওলানা  উমর ফারুক ইবরাহীমী।]

শৈশবে ভাইজানের (জাকি কাইফি) অধিকাংশ বিষয় আশয় হজরত হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবি রহ.এর পরামর্শেই স্থির হতো। সেই ধারাবাহিকতায় ১৩৫৫ হিজরির ১০ রজব, আব্বাজান হযরত থানবি রহ.বরাবর চিঠি লিখলেন-

“মুহাম্মদ জাকি (সাল্লামাহু) এক বছরের বেশি সময় হলো, কুর’আনুল কারিমের হিফজ শুরু করেছে। কিন্তু গত ছয় মাস ধরে সে অসুস্থতায় ভুগছে। এদিকে আত্মীয়স্বজনের মশওয়ারা, জাকি কুর’আনুল কারিম হিফজের মেহনত বরদাশত করতে পারবে না। এখন আমার কী করণীয়, বুঝে উঠতে পারছি না!”

হযরত থানবি রহ.জবাবে লিখলেন-

“জাকি যদি আমার সন্তান হতো, তবে আপাতত তার হিফজ মওকুফ করে দিতাম। পরবর্তীকালে সুযোগমত (অর্থাৎ দরসি পড়াশোনা শেষে) বাকিটা পূর্ণ করাতাম। আর তখন তার জন্যও অনেক সহজ হয়ে যেতো।”

এভাবেই ভাইজান আঠারো বছর বয়স অবধি হজরত হাকিমুল উম্মত থানবি রহ.এর প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনা লাভে ধন্য হয়েছেন। তৎকালীন সময়ে একবার হজরত আব্বাজান রহ.এর একটি চিঠি হজরত থানবির কাছে দ্রুত পাঠানোর প্রয়োজন পড়লো।

আব্বাজান চাচ্ছিলেন, যে করেই হোক চিঠিটা আজই পৌঁছে যাক হজরত থানবির কাছে।

এদিকে সাহারানপুর থেকে থানা ভবনের গাড়িতে সফর সম্ভবপর ছিলো না। ভাইজান স্বেচ্ছায় এই খেদমতটুকু নিজ জিম্মায় নিয়ে নিলেন। দেওবন্দ থেকে মুজাফফরনগর এবং মুজাফফরনগর থেকে শামেলি পৌঁছলেন।

ভেবেছিলেন- হয়তো শামেলি থেকে থানাভবনের গাড়ি মিলে যাবে। কিন্তু তিনি শামেলি যেতে যেতেই গাড়ি স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। ভাইজান ওখান থেকে একটি সাইকেল ভাড়ায় নিলেন এবং শামেলি থেকে থানাভবন পর্যন্ত দীর্ঘপথ তিনি সাইকেলেই অতিক্রম করে, নির্দিষ্ট সময়ে চিঠি হজরত থানবির হাতে পৌঁছে দিলেন।

হজরত থানবি ছাড়াও দেওবন্দের হজরত মিয়াজি রহ. (হজরত মাওলানা সায়্যিদ আসগর হুসাইন) ভাইজানকে অনেক বেশি স্নেহ, মুহাব্বত করতেন এবং ভাইজানেরও তাদের খেদমত ও সোহবতের খুব করে সুযোগ হয়েছে।

এমনিতেও ছোট্টবয়স থেকেই তিনি বুযুর্গদের ফয়েজ লাভ এবং তাদের খেদমত ও সোহবতে থেকে ফায়দা উঠানোর খুব খুব আগ্রহশীল ছিলেন।

নিম্নের পঙক্তি তো তার মুখেই মানায়-

অবেলায় আমি তব রুপে প্রসক্ত হলাম;/ যবে ভালোবাসার ব্যাপারে অনুভূতিশূন্য ছিলাম।

বুযুর্গদের সোহবতে থেকে ভাইজান, দ্বীনদারী এবং দ্বীনি প্রজ্ঞার রঙে নিজেকে এতটাই রাঙিয়ে তুলেছিলেন যে, তিনি কখনোই কোন পরিবেশ-পরিস্থিতির কাছে হার মানেন নি। যেখানে, যেমন পরিবেশেই ছিলেন, সর্বদা দ্বীনের রঙে অন্যকে রাঙিয়েছেন।

চতুর্থতম বোন ছিলেন, হাসিবা খাতুন (রহিমাহাল্লাহ)। তাকে আমরা “বি জান” বলতাম। আর পঞ্চম ছিলেন, মুহতারামা রাকিবা খাতুন (মাদ্দাজিল্লুহা)।তাকে বলতাম ‘ছোট আপা’।

বয়সে উভয়েই আমার চেয়ে অনেক বড়। তবে তখনো কারোরই বিয়ে হয়নি। তারা শুরু থেকেই আমাকে এতটাই লৌকিকতাহীন করে নিয়েছিলেন, বয়সের বড় ব্যবধান সত্বেও সবসময় আমাদের বন্ধন ছিলো বন্ধুত্বের।

এই বোনদের শিক্ষা দীক্ষা বলতে, ফুফু উম্মাতুল হান্নান সাহেবার মক্তবে এবং ঘরে বেহেশতি জেওর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিলো। কিন্তু হজরত আব্বাজানের শিক্ষা, তরবিয়তের ফলে তাদের শিক্ষা, সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ, নিঃসন্দেহে ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের চেয়ে বহুগুণ বেশি ছিলো।

তাদের মুতালা’আর (ব্যক্তিগত অধ্যয়ন) পরিধিও অনেক প্রশস্ত ছিলো। শুধুমাত্র দূর্বোধ্য কথা বুঝার অসাধারণ দক্ষতাই নয়, বরং তারা নিজেরাই উচ্চমানের শের, কবিতা বানিয়ে আবৃতি করতেন।

নমুনারূপে বড়বোন মুহতারামা হাসিবা খাতুনের এই শের বা কবিতাগুলো দেখুন-

ھمیں تو آتاہے رونامآل گلشن پر/ بھلا یہ ہنستے ہیں کیوں گلستاں نہیں معلوم

পুষ্পোদ্যানের অন্তিমদশা আমাদের চোখে অশ্রুঝরায়;/ হায়! কেন যে মানুষ মনের সুখে হেসেখেলে ঘুরে বেড়ায়?!

گزررہی ہیں نشیمن سے بے سلام وپیام/ خفاخفاسی ہیں کیوں بجلیاں نہیں معلوم.

সালাম, কালাম ছাড়াই কেন বিজলি আসর ছেড়ে পালায়;/ কোন সে হেতুই নারাজ সেজে ভেবে পাওয়াই দায়!

এবং মুহতারামা রাকিবা খাতুন সাহেবার এই কবিতা-

ضبط غم بھی ڈبڈباہی گئ/ آنکھ دل سے شکست کھا ہی گئ.

অনুধ্যান যত নিয়েছি সয়ে,/তবুও কেন অশ্রু ঝরে?/ তবে কী দিল হেরেই গেছে, দুচোখের সনে!

سنتے سنتے مرا فسانہء غم/ چاند تاروں کو نیند آہی گئ.

দুঃখের কাহানি শুনে শুনে মোর; /চাঁদ,তারারাও হয়ে গেলো ঘুমঘোর!

সেই ছোট্টবয়সে আমার অধিকাংশ সময় তাদের সাথেই কাটতো। আমার কাপড় পরিবর্তন করা থেকে শুরু করে যত মান-অভিমান, বায়না পূরণে তারা বাধ্য থাকতেন। তাদের সংস্রব বাল্যকালেই আমার মধ্যে সাহিত্যের বীজ বপন করে দিয়েছিলো।

যার ছিটেফোঁটা ইনশাআল্লাহ সামনে আসবে। চলবে ইনশাআল্লাহ…

আগের পর্বগুলোর ধারাক্রম: ভাইজানকে লেখা থানবি রহ. এর চিঠি