70598

একজন কিশোরীর ডায়েরিতে পাওয়া আদীব হুজুর

ফাতিমা যাহরাহ
অালেমা ও লেখিকা

শুরুটা আর অন্য দশজনের কাহিনির মতই সাধারণ। দরসের কিতাবে প্রথম ‘এসো আরবী শিখি’ পড়া। তারপর ঘটনাক্রমে ‘বাইতুল্লাহর মুসাফির’ হাতে আসা। জানাটা তখন থেকেই শুরু। যদিও তখন লেখকের চেয়ে বেশি আগ্রহ ছিলো ‘হাফেজ্জী হুজুর’ এর প্রতি।

কত সাধারণভাবে একজন অসাধারণ মানুষের সাথে আমাদের পরিচয় করিযে দিচ্ছেন! এতোটুকু বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না। সবগুলো দৃশ্য যেনো চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

খুব ইচ্ছে হতো তাকে বলি, আচ্ছা! এতো চমৎকার লেখেন কেন ? আমাকে শেখাবেন ? বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে চিঠি লিখতাম। জানতাম এই চিঠি কখনোই লেখক পর্যন্ত যাবে না।তারপরও মনের আনন্দে লিখতাম।নিজেই লিখতাম, নিজেই জবাব দিতাম। আব্বু এই কাণ্ড দেখে একদিন বললেন, আচ্ছা, আমি তাকে খুঁজে বের করবো। তুমি তার জন্য সুন্দর করে একটা চিঠি লেখো।

এই ঘটনার কিছুদিন আগে আব্বু আমাকে তিনটা ডায়রি এনে দিয়েছিলেন। প্রথমদিনই একটা ডায়রি আলাদা করে রেখেছিলাম। তাকে উপহার দেয়ার জন্য। সেই ডায়রিটা প্যাকেট করলাম। তারপর একটা চিঠি লিখলাম।যা মনে আসলো তাই লিখলাম। আর দ্বিতীয়বার পড়লাম না। চিন্তাভাবনা করে লিখলে বা লেখার পর চিন্তাভাবনা করে পড়লে সেটা আর দিতে পারতাম না। সবকিছু ঠিক করে রেখে ঘুমিয়ে গেলাম।

ফজরে আব্বু নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। সেদিন ছিলো ইংরেজি মাসের ৩০ তারিখ। তার দু’দিন পর রোযা শুরু হবে। পরেরদিন অর্থাৎ শা’বান মাসের ত্রিশ তারিখ সকালে আব্বু জানালেন, তিনি একজনের কাছে খোঁজ পেয়েছেন। এখন রওয়ানা দিবেন।

এগারোটা কি বারোটার দিকে ফোন দিলে বললেন ভুল ঠিকানা দিয়েছিলো। এখন আবার খুঁজছেন। বললাম না পেলে ফিরে আসুন। আল্লাহ যদি ভাগ্যে রাখেন তাহলে একদিন নিশ্চিত তার কাছে যেতে পারবো। আব্বু বললেন, ইনশাআল্লাহ্‌! আর একবার চেষ্টা করে দেখি। দুআ করতে থাকো বেশি বেশি।

বিকালে ফোন এলে আম্মু ধরলো। আব্বু আমাকে চাইলেন। সালাম দিতেই আব্বুর কান্নার আওয়াজ। ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে আব্বু? কিছুক্ষণ চুপ। মনে হলো নিজেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন তিনি। তারপর বললেন, আমি নিজে হাতে তাকে আপনার হাদিয়া দিয়েছি। তিনি খুশী হয়ে গ্রহণ করেছেন। আপনাদের জন্য দুআ করেছেন। হাদিয়াও পাঠিয়েছেন আপনাদের জন্য …।

ফোনের ওপ্রান্তে আব্বু কাঁদছেন আর এদিকে আমি। আম্মু আর ভাইবোনরা আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। সবার চোখে পানি। আমার এতোদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো। এ কান্না যে আনন্দের! রাব্বে কারীমের প্রতি কৃতজ্ঞতার! কথা শেষে আম্মু বললেন হাসতে হাসতে (চোখে পানিও) এবার নাও, সালাতুস শোকরের নামায আদায় করো। ভাইবোনদের দিকে ঘুরে বললেন, তোমরাও আদায় করো। আজকে তোমার আপুর আনন্দের দিন।

তৃতীয় রামাযান

তার পাঠানো উপহার আমার হাতে দিলেন আব্বু। সুন্দর প্যাকেটে মোড়ানো বই। দু’বোনের জন্য চারটা বই। ‘হাদীসের আলো জীবনের পাথেয় ‘, আমার ঈমান ‘আমার জন্য।  ‘এসো উর্দু শিখি ‘, তাওবা ও ইস্তেগফারের হাকীকাত ‘ ছোটবোন যুলাইখার জন্য।

বই খুলতেই চমৎকার আরবীতে লেখা ‘লিল বিনতিল আযীযাহ ফাতিমা যুহরা ‘ (অবশ্য আমি এখন লিখি যাহরাহ) নিচে তার নাম স্বাক্ষর করা। রাত জেগে আমরা বইগুলো পড়লাম। অবশেষে যেন একটু আলোকবিন্দুর ঝিলিক দেখলাম। ঐ দূরে কোথাও।

এরপরের কয়েকটা দিন শুধু গল্পই শুনে গেলাম আব্বুর কাছে। তার সাথে কীভাবে দেখা হলো, কী কী কথা হলো, কেমন দেখলেন তাকে!

এখানে একটা জিনিস উল্লেখ করা আবশ্যক।  অনেক সাধারণ পরিবাবে আমাদের বেড়ে ওঠা। সব ভাইবোনের মধ্যে আব্বুই শুধু দীনের পথে। আলেম ওলামাদের সাথে সম্পর্ক রাখেন, তাদের কাছ থেকে দীন শেখার জন্য। আর এই উদ্দেশ্যেই আমাদের কওমি মাদরাসায় পাঠিয়েছেন। যা তিনি অর্জন করতে পারেননি তা যেনো আমরা অর্জন করতে পারি এই আশায়।

যাইহোক, আলেমদের সাথে উঠাবসা করতে গিয়ে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিলো তার। আব্বু পেশায় গাড়ি চালক। আর যখনই এই কথাটা শুনতো কিছু আলেম ! তখন…। তিক্ত কথা যত কম হবে ততই উত্তম। জীবনে শুধু সৌন্দর্যগুলোই থাক। কাঁটাগুলো আড়ালে থাকুক।

আব্বু জানালেন তাকে তিনি কেমন দেখেছেন! জায়নামাযে বসে ছিলেন। আব্বু যখন কামরায় প্রবেশ করলেন তখন উঠে আব্বুর হাত ধরে আব্বুকে পাশে সামনে বসালেন। তার অভ্যাসমত সব খোঁজ নিলেন। কিভাবে এলেন, খেয়েছেন কিনা, কি করেন ইত্যাদি সবকিছু। আব্বুর কাছ থেকে আম্মুর ফোন নাম্বার নিয়ে রাখলেন আমার সাথে কথা বলার জন্য।

ষষ্ঠ রামাযান

সাহরি শেষ করে ফযরের আযানের অপেক্ষা করছি। আম্মুর ফোন বেজে উঠলো। আমি ধরে অভ্যাসমত সালাম দিলাম। ধীর, স্পষ্ট একটা কণ্ঠে জবাব ভেসে এলো। নিজের অজান্তে কেঁপে উঠলাম। তিনি কী ?

– তুমি কি ফাতিমা ? ওপার থেকে প্রশ্ন এলো।
– জ্বী। আপনাকে চিনতে পারলাম না! হৃৎপিণ্ডের ধুকধুক স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি।আশা নিরাশা একসাথে কিছু বলছিলো। ধীর কণ্ঠে চমৎকার উচ্চারণে ভেসে এলো, -“আমি আবু তাহের মিসবাহ। ”

ইয়া রাব্বে কারীম! আমার সৌভাগ্য আমার দরজায় কড়া নাড়ছে! শুকরান রাব্বী!
এরপর শুধু মন্ত্রমুগ্ধের মত শুধু শুনেই গেলাম।কত প্রতীক্ষার পর…! মাঝে দুই একটা প্রশ্নের উত্তর দিলাম।

– তুমি ভালো আছো ? তোমার আব্বা আম্মা কেমন আছেন ? ইনশাআল্লাহ্‌! আজ আমি বাইতুল্লাহর সফরে রওয়ানা হচ্ছি। তুমি আমার জন্য দুআ করবে কেমন ? আমিও তোমার জন্য,  তোমাদের জন্য দুআ করি। তোমার পাঠানো চিঠি আর উপহার আমি পেয়েছি…।’

কিছু বাস্তবতা কেন স্বপ্ন মনে হয় ? অথচ এই দিনের প্রতীক্ষাতেই একসময় আমি ছিলাম! শুকরান রাব্বী।

পহেলা শাওয়াল (ঈদের দিন)

ঈদের নামাযের পর সবাই মিলে এক সাথে খেলাম। আমার দুইভাই বাইরে বেরিয়ে গেলো ঘুরতে। আব্বু কামরায় বিশ্রাম নিচ্ছেন। আম্মুও কামরায়। আমরা দুইবোন উঠানে পাটি বিছিয়ে গল্পের বই নিয়ে বসলাম। ফোন বেজে উঠলো। নির্ঘাত কোন বান্ধবী।

প্রথম সংখ্যাগুলো খেয়াল করিনি। শেষে পঁচিশ। ইয়া আল্লাহ! নূরে জান্নাত আপু নিশ্চই! ঈদের শুভেচ্ছা জানানো হয়নি! ধরলেই বকা খেতে হবে! ধরলাম না। কেটে গিয়ে আবার বেজে উঠলো।

এবার খেয়াল করলাম।বাংলাদেশী নাম্বার না। তাহলে নিশ্চই ছোটচাচা। খুশী মনে ধরে সালাম দিলাম।একই সাথে ওপ্রান্ত থেকেও সেই ধীর কণ্ঠে সালাম ভেসে এলো। আদীব হুযূর! আল্লাহর তরফ থেকে এতো সুন্দর ঈদের উপহার! আলহামদুলিল্লাহ্‌।

— ফাতিমা?
–জ্বী। (প্রথমদিনের মত ভয় পেলাম না) কেমন আছেন?
— ফাতিমা! আমি বাইতুল্লাহ সামনে রেখে তোমার সাথে কথা বলছি!

(আচ্ছা, সেই সময় কি তার চোখের তারায় আনন্দরা ঝিকিমিকি করছিলো? আমার অন্তর্চক্ষু থাকলে তার চোখের দিকে তাকালে,  সেখানে কি বাইতুল্লাহর ছায়া দেখতে পেতাম!)

অতি আনন্দে মানুষ কি করবে আর কি করবে না সেটা নাকি বুঝে উঠতে পারে না।আমিও অবুঝ হয়ে গেলাম। যে আমি তিন বছর ধরে খাতার পাতায়, মনের পাতায় অজস্র কথা লিখে রেখেছিলাম, সেই আমি সব ভুলে গেলাম। কি শুনছি জানি না। কি বলছি জানি না। কানে শুধু একটি কথাই বাজছে। হৃদয়ে শুধু একটি কথাই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, ‘বাইতুল্লাহ সামনে রেখে তোমার সাথে কথা বলছি! ’

আবার শুরু করলাম চিঠি লেখা। এবারের চিঠিগুলোও আব্বুই পৌঁছে দেন। এতো ইহসানের উপর আরো ইহসান পেলাম। আমার না-লায়েক ভাইটাকে নিজের কাছে নিলেন। ভাই তার কাছে থাকে। আর কল্পনা করি আমি তার কাছে আছি। ভাই বিরতিতে বাসায় এসে গল্প শোনায়, তার হেঁটে বেড়ানো, তার দরস নেয়া, ছোটদের সাথে খেলা করা, কখনো কখনো ভাবগম্ভীর হয়ে অনেক দূরে কোথাও তাকিয়ে থাকা!

আমার কল্পনা তখন কল্পনা থাকে না। আমি যেনো স্পষ্ট তাকে অনুভব করতে পারি। আমার ফুলগাছগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়াই। মনে মনে ওদের সাথে গল্প করি। ওদের গল্প শোনাই আদীব হুজুরের। আমার খুশীতে ওরাও খুশী হয়। আমার ছোট্ট আর সাধারণ জীবনটা হঠাৎ করেই নিজের কাছে অসাধারণ হয়ে উঠলো। নিজেকে নিজেই গিবতা করতে শুরু করলাম।রাব্বে কারীম আমাকে আঁচল পূর্ণ করে দান করলেন!

– ‘আপনার চিঠি পড়ে হুযূর খুশী প্রকাশ করেছেন।’ একদিন আব্বু আদীব হুযূরের কাছ থেকে ফিরে বললেন।তিনি বলেছেন, ‘আপনার লেখা তিনি ভালোবাসেন …’।

আমার অগোছালো আর অসুন্দর লেখাগুলো তিনি ভালোবেসেছেন!! আর কি পেতে চাও বান্দী! তোমার রব তোমাকে সব দিয়েছেন! আঁচল উপচে দান করেছেন! আলহামদুলিল্লাহ্!

আমি বিশ্বাস করি, জীবনে আলো এবং অন্ধকার দু’টোই থাকে। কিন্তু আলোর দিকটা প্রকাশ করা উচিৎ।যেনো অন্যরা আলোকিত হতে পারে। অন্তত নিজে আলোর মধ্যে বাস করতে পারে। তেমনি আমার জীবনেও অন্ধকার এসেছে এবং সেটা আমারই পদস্খলনের কারণে।

তবে যে মহান রাব্বে কারীম আমাকে অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন, তার কাছে আশা রাখি তিনি এই অন্ধকার দূর করে আবার আমাকে আলোতে আনবেন। আমার জীবনে আবার পূর্ণিমা আসবে। কোন কালো মেঘের ছায়া পড়বে না।

কবি হেলাল হাফিজের একটা কবিতার অংশ মনে পড়ে গেল –
“হে পয়মন্ত সকালের হাওয়া,
ঠিকানা তো জানো, জানো রাস্তাও
খবর আমার পৌঁছে দিও
কী বলতে চাই তুমি জানো তাও।”

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে মাওলানা আবু তাহের মেসবাহর দুটি কথা

ad

পাঠকের মতামত